আখলাকুন্নবী (ﷺ)
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
হাদীস নং: ৮৫০
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
নবী (ﷺ) পার্থিব বস্তুর প্রতি অনাসক্ত, ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে নিজের তুলনায় অপরকে প্রাধান্য দিতেন, দুর্বলদের মাঝে সম্পদ বণ্টন করে দিতেন। দানশীলতা আর অল্পে তুষ্ট থাকা ছিলো তাঁর স্বভাবজাত গুণ। তিনি পার্থিব বস্তুর চাইতে পরকালীন বিষয়কে অধিক ভালবাসতেন। এ ছাড়া তিনি কোন যাঞ্চাকারীকে কখনোই খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না, কোন আবেদনকারীকেই নিষেধ করতেন না। আল্লাহ্ তাঁর উপর, তাঁর বংশধরদের উপর ও তাঁর মহীয়সী স্ত্রীদের উপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।
৮৫০। জাবির ইব্ন আব্দুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার সকাল বেলায় রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) ক্ষুধার্ত ছিলেন অথচ ঘরে খাবার মতো কোন কিছুই পান নাই। ওদিকে আবূ বক্রও সে দিন ক্ষুধার্ত অবস্থায় পরিবারের লোকদের জিজ্ঞেস করলেন। খাবার মতো ঘরে কিছু আছে কি? তারা বললো নেই। অতপর নবী করীম (ﷺ)-এর কাছে কিছু পাওয়া যায় কিনা তিনি সে উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। তিনি যখন নবীজী (ﷺ)-এর কাছে উপস্থিত হন, নবী (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, হে আবূ বক্র! আপনি সকাল থেকে ক্ষুধার্ত, ঘরে খাবার জন্য কিছুই পাননি। তিনি বললেন, হ্যাঁ। নবীজী (ﷺ) তাঁকে বসতে বললেন। সে দিন উমরও ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘরে খাবার না পেয়ে নবীজী (ﷺ)-এর কাছে উপস্থিত হন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে উমর! আপনি সকাল থেকে ক্ষুধার্ত, ঘরে কোন খাবার পাননি, তাই না? উমর (রা) উত্তরে বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, বসুন। এমনি করে দশজন পূর্ণ হলো। নবী (ﷺ) তাদের বললেন, চলো অমুক আনসারীর বাড়িতে যাই। তাঁরা তখন সে বাড়ি গিয়ে বাগানের পাশেই তাকে পেলেন এবং সালাম দিয়ে বাড়িতে বসলেন। লোকটি তাঁর খেজুর বাগানে গেল এবং গাছে চড়ে এমন একটি গুচ্ছ খেজুর পেড়ে আনলো যাতে পাকা, আধা-পাকা ও অল্প পাকা খেজুর ছিল। সে গুচ্ছটি এনে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর সামনে রাখলো। নবী (ﷺ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, একই ধরনের খেজুর আনলে না কেন? লোকটি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি আপনার কাছে অল্প পাকা, আধা-পাকা ও পাকা খেজুর হাযির করতে পছন্দ করলাম । সুতরাং আপনার যেখান থেকে পছন্দ খেতে পারেন। তিনি বললেন, তাহলে ঠিক আছে। তারপর লোকটি তার স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললো, নবী (ﷺ) আবূ বক্র, উমর ও অন্যান্য সাহাবী ক্ষুধার্ত অবস্থায় এসেছেন, তোমার কাছে কি আছে দেখো আর খাবার তৈরী করে ফেলো। তার স্ত্রী বললো, আমার কাছে যা আছে আমি তাই প্রস্তুত করছি আর আপনার কাছে যা আছে (ছাগল যবাই করে) তৈরী করে নিয়ে আসুন। তারপর স্ত্রীলোকটি আটা তৈরী করে রুটি বানাতে বসে গেল। আর আনসারী ব্যক্তি তার একটি ছাগল যবাই করে গোশ্ত তৈরী করলো এবং ভেজে আনলো। এরপর খাদ্য প্রস্তুত হয়ে গেলে নবী (ﷺ)-এর সামনে উপস্থিত করলো। নবীজী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীগণ পেটভরে খেলেন। তারপর নবী (ﷺ) কে বললেন, এ খাবারও সে সব নিয়ামতের অন্তর্ভুক্ত যে সম্পর্কে কিয়ামতের দিন তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে। তারপর নবী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীগণ উঠে রওয়ানা দিলেন। তখন স্ত্রীলোকটি তার স্বামীকে বললো, আমি তো আপনার চেয়ে ভীরু লোক আর দেখি নাই। লোকটি জিজ্ঞেস করলো, কেন কি হয়েছে? সে বললো, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) আমাদের বাড়িতে এসে চলে গেলেন অথচ খায়র বরকতের জন্য দু'আ করিয়ে নিতে পারলেন না? লোকটি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-কে অনুসরণ করলো। তিনি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার? লোকটি বললো, আমার স্ত্রী এরূপ মন্তব্য করেছে। নবীজী (ﷺ) বললেন, তোমার স্ত্রীকে তো দেখাছি খুবই বুদ্ধিমতি। অতপর নবীজী (ﷺ) ফিরে এসে তাদের জন্য দু'আ খায়ের করে গেলেন।
أبواب الكتاب
بَابٌ: ذِكْرُ زُهْدِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَإِيثَارِهِ الْأَمْوَالَ عَلَى نَفْسِهِ، وَتَفْرِيقِهَا عَلَى الْمُخْفِينِ مِنْ أَصْحَابِهِ إِذِ الْكَرَمُ طَبْعُهُ، وَالْبُلْغَةُ مِنْ شَأْنِهِ، وَالْقَنَاعَةُ سَجِيَّتُهُ، وَاخْتِيَارِهِ الْبَاقِي عَلَى الْفَانِي، وَأَنَّهُ مِنْ عَادَتِهِ أَلَا يَرُدَّ سَائِلًا، وَلَا يَمْنَعَ طَالِبًا، صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ.
850 - حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ جَعْفَرِ بْنِ نَصْرٍ الْجَمَّالُ، نَا يَعْقُوبُ بْنُ إِسْحَاقَ الدَّشْتَكِيُّ، نَا عَلِيُّ بْنُ عَاصِمٍ، عَنِ الْجُرَيْرِيِّ، عَنْ أَبِي نَضْرَةَ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: أَصْبَحَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ جَائِعًا، فَلَمْ يَجِدْ فِي أَهْلِهِ شَيْئًا يَأْكُلُهُ، وَأَصْبَحَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ جَائِعًا، فَقَالَ لِأَهْلِهِ: عِنْدَكُمْ شَيْءٌ؟ قَالُوا: لَا، فَقَالَ: آتِي النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، لَعَلِّي أَجِدُ عِنْدَهُ شَيْئًا آكُلُهُ، فَأَتَاهُ فَسَلَّمَ، فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا أَبَا بَكْرٍ، أَصْبَحْتَ جَائِعًا، فَلَمْ تَجِدْ شَيْئًا تَأْكُلُهُ؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: اقْعُدْ قَالَ: وَأَصْبَحَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ مِثْلَ ذَلِكَ، فَلَمْ يَجِدْ عِنْدَ أَهْلِهِ شَيْئًا يَأْكُلُهُ، فَأَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ لَهُ: يَا عُمَرُ، أَصْبَحْتَ جَائِعًا فَلَمْ تَجِدْ عِنْدَ أَهْلِكَ شَيْئًا تَأْكُلُهُ؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: اقْعُدْ، حَتَّى وَافَوْا عَشَرَةً، فَقَالَ لَهُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: انْطَلِقُوا بِنَا إِلَى دَارِ فُلَانٍ مِنَ الْأَنْصَارِ، فَأَتَوْهُ، فَوَجَدُوهُ فِي حَائِطٍ، فَسَلَّمُوا، وَقَعَدُوا، وَانْطَلَقَ الرَّجُلُ إِلَى نَخْلَةٍ لَهُ فَصَعَدَهَا فَقَطَعَ مِنْهَا عَذَقًا فِيهِ رُطَبٌ، وَتَذْنُوبٌ وَبُسْرٌ، فَجَاءَ بِهِ حَتَّى وَضَعَهُ بَيْنَ يَدَيْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فَهَلَّا كَانَ مِنْ نَوْعٍ وَاحِدٍ؟ فَقَالَ: أَحْبَبْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنْ آتِيَكَ بِهِ بُسْرًا، وَتَذْنُوبًا، وَرُطَبًا، فَتَضَعُ يَدَكَ حَيْثُ أَحْبَبْتَ، قَالَ: فَنَعَمْ إِذًا. قَالَ: ثُمَّ أَتَى الرَّجُلُ أَهْلَهُ، فَقَالَ لَهَا: إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ وَأَصْحَابَهُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ قَدْ جَاءُوا جِيَاعًا، فَانْظُرِي مَا عِنْدَكَ، فَأَصْلِحِي، فَقَالَتْ: أَمَّا مَا عِنْدِي فَأَنَا أُصْلِحُهُ، فَانْظُرْ مَا عِنْدَكَ فَاكْفِنِي، فَقَامَتْ إِلَى دَقِيقٍ لَهَا فَعَجَنَتْ، وَعَمَدَ الرَّجُلُ إِلَى عَنَاقٍ كَانَتْ عِنْدَهُ، فَذَبَحَهَا، وَأَصْلَحَهَا، وَشَوَاهَا، فَلَمَّا أَدْرَكَ طَعَامَهَا، أَتَى بِهِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَوَضَعَهُ بَيْنَ يَدَيْهِ قَالَ: فَأَكَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَأَصْحَابُهُ حَتَّى شَبِعُوا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: هَذِهِ الْأَكْلَةُ مِنَ النَّعِيمِ، لَتُسْأَلُنَّ عَنْهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ، ثُمَّ قَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَقَامُوا مَعَهُ، فَقَالَتِ الْمَرْأَةُ لِلرَّجُلِ: مَا أَعْلَمُ أَحَدًا أَجْبَنَ مِنْكَ، قَالَ: لِمَ؟ قَالَتْ: دَخَلَ عَلَيْكَ [ص:179] رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْزِلَكَ، ثُمَّ خَرَجَ، لَمْ يَدْعُ لَكَ بِخَيْرٍ؟ فَتَبِعَهُ، فَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَقَالَ: مَا شَأْنُكَ؟ قَالَ: قَالَتْ لِيَ الْمَرْأَةُ كَذَا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَلَا أُرَاهَا أَكْيَسَ مِنْكَ؟ قَالَ: فَرَجَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَدَعَا لَهُمْ بِخَيْرٍ
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীস থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি, ধৈর্য ও দারিদ্রের একটি ধারণা লাভ করা যায়। এছাড়া নবীজীর সাথে তাঁদের গভীর সম্পর্ক ও আনুগত্যের সুস্পষ্ট ধারণা করা যায়। পিতা-মাতার সাথে সন্তানের সম্পর্কের মতই ছিল তাঁদের কর্মকাণ্ড। ঘরে খাবার না পেয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে এসে উপস্থিত। কারণ তাঁরা মনে করতেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কল্যাণে আল্লাহ্ই একটা ব্যবস্থা করে দিবেন। তাছাড়া এ হাদীস থেকে আনসারীদের অসাধারণ সেবাপরায়ণতা ও নিজ কুরবানীর চিত্র লাভ করা যায়। কেননা তাঁরা সবকিছুই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছিলেন। আর তিনিও তাঁদের ঘরকে নিজের ঘর হিসেবেই ভাবতেন। এ হাদীস থেকে আরো জানা যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্র নিয়ামতকে কতটুকু মর্যাদা দিতেন। দু'তিনদিন পর আহার মিলেছে অথচ তিনি সাহাবীগণকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন আল্লাহ্র পবিত্র বাণী ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ “অতপর সেদিন তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে এ নিয়ামতের কথা।” আমরা রাত-দিন আল্লাহ্র অসংখ্য নিয়ামত পেয়ে উপকৃত হচ্ছি; কিন্তু এ সবের না শুকরিয়া করছি আর না এতটুকু চিন্তা করছি যে, এগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? বরং আমরা এতই নাদান যে, আল্লাহ্র অবাধ্যতায় এসব নিয়ামত ব্যবহার করতেও লজ্জাবোধ করছি না।
এ হাদীস থেকে আরো জানা যায় যে, আল্লাহ্ কোন প্রিয় বান্দা মেহমান হয়ে ঘরে উপস্থিত হলে তার কাছে দু'আর আবেদন জানানো যাবে।
এ হাদীস থেকে আরো জানা যায় যে, আল্লাহ্ কোন প্রিয় বান্দা মেহমান হয়ে ঘরে উপস্থিত হলে তার কাছে দু'আর আবেদন জানানো যাবে।