আখলাকুন্নবী (ﷺ)
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
হাদীস নং: ১৭৭
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
নবী (ﷺ) -এর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা এবং ক্রোধ সংবরণ বিষয়ক রিওয়ায়াতসমূহ
১৭৭। হযরত আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে জনৈক বেদুঈন নবী (ﷺ) -এর নিকট কিছু সাহায্য প্রার্থনার জন্য আসলো। নবী (ﷺ) তাকে কিছু দান করলেন। তারপর বললেন, আমি কি তোমার প্রয়োজন পূরণ করিনি ? তোমার প্রতি অনুগ্রহ করিনি ? বেদুঈন উত্তর দিলো না, (আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেন নি এবং) আমার প্রতি সদাচার করেন নি। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটির উত্তর শুনে উপস্থিত মুসলিমগণ ক্ষেপে গেলেন এবং তারা লোকটির দিকে উঠে আসলেন। কিন্তু নবী (ﷺ) তাদের হাতের ইশারায় থামিয়ে দেন। উঠে দাঁড়ালেন এবং হযরত ইকরিমা (রাযিঃ) বলেন, যে বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর নবী (ﷺ) বাড়ির দিকে চলে গেলেন। তারপর বেদুঈন লোকটিকে বাড়ি আসার জন্য ডেকে পাঠালেন। (লোকটি, আসলে) তিনি তাকে বললেন যে, তুমি আমাদের কাছে এসে কিছু প্রার্থনা করেছো। আমরা তোমাকে (যতটুকু সম্ভব) দান করেছি। অথচ তুমি এর উপর যা বলার বলে দিয়েছো। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর নবী (ﷺ) তাকে আরো কিছু মালামাল দান করে জিজ্ঞেস করলেন, এবার কি আমি তোমার সাথে সুন্দর আচরণ করলাম ? লোকটি উত্তর দিল, জ্বী, হ্যাঁ! আল্লাহ্ আপনাকে এবং পরিবার-পরিজনকে উত্তম বিনিময় দান করুন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) লোকটিকে বললেন, দেখ, তুমি আমাদের কাছে এসে কিছু প্রার্থনা করেছো। আমরা তোমাকে কিছু দান করলাম। তাতে তুমি যা বলার বলেছো। কিন্তু এর কারণে আমরা সাহাবীদের মনে (তোমার উপর) অসন্তুষ্টির সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই তুমি যদি ভাল মনে করো তাহলে তাদের সামনে গিয়েও তুমি এ কথাটি বলো যা এখন আমার সাথে বলেছো। তা হলে তোমার ব্যাপারে তাদের মনে যে অসন্তুষ্টি বিদ্যমান তা দূরীভূত হয়ে যাবে। বেদুঈন লোকটি বললো, খুব ভাল কথা । হাদীসের বর্ণনাকারী ইকরিমা (রাহঃ) বলেন যে, হযরত আবু হুরায়রা (রাযিঃ) বলেন, অতঃপর যখন প্রভাত হলো (কিংবা তিনি বলেছেন) যখন সন্ধ্যা হলো তখন লোকটি (সাহাবীদের কাছে) আসলো। এ সময় নবী (ﷺ) সাহাবীদেরকে লক্ষ করে বললেন, তোমাদের এই সাথী আমার কাছে এসে কিছু প্রার্থনা করেছিল। আমি তাকে কিছু দান করলাম । তাতে সে যা বলার বলেছে। এরপর আমি তাকে বাড়ি ডেকে নেই এবং আরো কিছু প্রদান করি। ফলে সে সন্তুষ্ট হয়ে গেছে। (তারপর তিনি বেদুঈন লোকটির দিকে তাকিয়ে) বললেন, ঘটনা কি এরূপ নয় ? সে উত্তর দিল, জ্বী, হ্যাঁ। আল্লাহ্ তাআলা আপনাকে এবং আপনার পরিবার-পরিজনকে উত্তম বিনিময় দান করুন। হযরত আবু হুরায়রা (রাযিঃ) বলেন, অতঃপর নবী (ﷺ) বললেন, দেখো এ বেদুঈন লোকটির সাথে আমার উদাহরণ হলো এমন যেমন কোন ব্যক্তির, যার একটি উট্নী ছিলো। উট্নী সেই লোকের কাছ থেকে ভয় পেয়ে পালাতে লাগলো। এ সময় লোকজন তাকে ধরার জন্য পেছনে পেছনে ছুটলো। ফলে তার ভয় আরো বেড়ে গেলো । উট্নীর মালিক তখন লোকজনকে বললো, তোমরা আমাকে আমার উট্নীর পেছনে ছুটতে দাও। কেননা আমি এ উট্নীর প্রতি তোমাদের চেয়ে অধিক ন্যায়পরায়ণ এবং তার প্রকৃতি সম্পর্কে তোমাদের চেয়ে অধিক জ্ঞাত। তারপর মালিক নিজে তার দিকে অগ্রসর হলো এবং তাকে একটি উঁচুস্থানে গিয়ে ধরে ফেললো। তারপর ধীরে ধীরে তাকে ফিরিয়ে আনলো। উট্নী ফিরে আসার পর মালিক তাকে বসাতে চাইলে সে বসে গেলে এবং তার পিঠের উপর বোঝা বেঁধে নিলো। কাজেই আমি যদি তোমাদেরকে বেদুঈন লোকটির কথা বলার সময় ছেড়ে দিতাম তাহলে তখন তোমরা তাকে হত্যা করে ফেলতে। আর তাকেও জাহান্নামে চলে যেতে হতো।
أبواب الكتاب
مَا رُوِيَ فِي كَظْمِهِ الْغَيْظَ وَحِلْمِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
177 - حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْعَبَّاسِ بْنِ أَيُّوبَ، نَا إِسْحَاقُ بْنُ الضَّيْفِ، نَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ الْحَكَمِ بْنِ أَبَانَ، عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ أَعْرَابِيًّا، جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْتَعِينُهُ فِي شَيْءٍ، فَأَعْطَاهُ شَيْئًا، ثُمَّ قَالَ: أَحْسَنْتُ إِلَيْكَ؟ فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ: لَا، وَلَا أَجْمَلْتَ قَالَ: فَغَضِبَ الْمُسْلِمُونَ، وَقَامُوا إِلَيْهِ، فَأَشَارَ إِلَيْهِمْ أَنْ كُفُّوا. قَالَ عِكْرِمَةُ: قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: ثُمَّ قَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَدَخَلَ مَنْزِلَهُ، ثُمَّ أَرْسَلَ إِلَى الْأَعْرَابِيِّ، فَدَعَاهُ إِلَى الْبَيْتِ، فَقَالَ: إِنَّكَ جِئْتَنَا فَسَأَلْتَنَا، فَأَعْطَيْنَاكَ، فَقُلْتَ: مَا قُلْتَهُ، فَزَادَهُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْئًا، ثُمَّ قَالَ: أَحْسَنْتُ إِلَيْكَ؟ قَالَ الْأَعْرَابِيُّ: نَعَمْ، فَجَزَاكَ اللَّهُ مِنْ أَهْلٍ وَعَشِيرَةٍ خَيْرًا، فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّكَ كُنْتَ جِئْتَنَا فَسَأَلْتَنَا، فَأَعْطَيْنَاكَ، وَقُلْتَ مَا قُلْتَ، وَفَى أَنْفُسِ أَصْحَابِي شَيْءٌ مِنْ ذَلِكَ، فَإِنْ أَحْبَبْتَ فَقُلْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ مَا قُلْتَ بَيْنَ يَدَيَّ، حَتَّى تُذْهِبَ مِنْ صُدُورِهِمْ مَا فِيهَا عَلَيْكَ. قَالَ: نَعَمْ. قَالَ عِكْرِمَةُ: قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: فَلَمَّا كَانَ الْغَدُ أَوْ الْعَشِيُّ، جَاءَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ صَاحِبَكُمْ هَذَا كَانَ جَاءَ فَسَأَلَنَا، فَأَعْطَيْنَاهُ، وَقَالَ مَا قَالَ، وَإِنَّا دَعَوْنَاهُ إِلَى الْبَيْتِ فَأَعْطَيْنَاهُ فَزَعَمَ أَنَّهُ قَدْ رَضِيَ، أَكَذَلِكَ؟ قَالَ الْأَعْرَابِيُّ: نَعَمْ، فَجَزَاكَ اللَّهُ مِنْ أَهْلٍ وَعَشِيرَةٍ خَيْرًا. قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَلَا إِنَّ مَثَلِي وَمَثَلَ هَذَا الْأَعْرَابِيِّ كَمَثَلِ رَجُلٍ كَانَتْ لَهُ نَاقَةٌ فَشَرَدَتْ عَلَيْهِ، فَاتَّبَعَهَا النَّاسُ، فَلَمْ يَزِيدُوهَا إِلَّا نُفُورًا، فَنَادَاهُمْ صَاحِبُ النَّاقَةِ: خَلُّوا بَيْنِي وَبَيْنَ نَاقَتِي، فَأَنَا أَرْفَقُ بِهَا وَأَعْلَمُ، فَتَوَجَّهَ لَهَا صَاحِبُ النَّاقَةِ بَيْنَ يَدَيْهَا وَأَخَذَ لَهَا مِنْ قُمَامِ الْأَرْضِ، فَرَدَّهَا هَوْنًا هَوْنًا هَوْنًا حَتَّى جَاءَتْ وَاسْتَنَاخَتْ وَشَدَّ عَلَيْهَا، وَإِنِّي لَوْ تَرَكْتُكُمْ حَيْثُ قَالَ الرَّجُلُ مَا قَالَ، فَقَتَلْتُمُوهُ، دَخَلَ النَّارَ
হাদীসের ব্যাখ্যা:
উল্লেখিত হাদীসটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উন্নত চরিত্র মাধুরী নির্দেশ করছে। এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নৈতিকতার সকল উন্নত আদর্শ ও গুণাবলির অধিকারী ছিলেন। মানবীয় জীবন ও চরিত্রের কোন একটি ক্ষুদ্র দিকও তার অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি থেকে বাইরে ছিলো না। তিনি সাহাবীদের মনমেজাজ ও প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। সে কারণে কারোর কোন ত্রুটির উপর তাকে তাৎক্ষণিক পাকড়াও করতেন না বেদুঈন লোকটির সাথে তাঁর আচরণ ঠিক এরূপই হয়েছিল। লোকটির অসৌজন্যমূলক উত্তর দান সত্ত্বেও তিনি তাকে কিছু বলেননি। আর সাহাবাদেরকেও কিছু বলতে অনুমতি দেননি। এহেন নরম আচরণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জন্যও অবলম্বন করেছিলেন যেন লোকটির মনে অসন্তুষ্টি আরো বৃদ্ধি পেতে না পারে। তাই তিনি তাকে নিজ বাড়ি ডেকে নেন। অতিরিক্ত আরো কিছু দান করে তাকে খুশি করে দেন। ঘটনাটিকে তিনি সাহাবীদের কাছে একটি উপমার সাহায্যে ঘটনার প্রেক্ষিতসহ বুঝিয়ে দেন, যেন তাদের অন্তরেও লোকটির ব্যাপারে কোন খারাপ ধারণা অবশিষ্ট না থাকতে পারে। এক সার্বজনীন রহমত হিসেবে তাঁর আগমন এ কথার যাবতীয় দাবি ও চাহিদা তাঁর উপরোক্ত উন্নত চরিত্র ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কর্মপদ্ধতির দ্বারা পরিপূর্ণ হলো। আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে এ সকল চরিত্র সৌন্দর্য ও প্রজ্ঞার দ্বারা সুসমৃদ্ধ করুন।