আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

১৮- বিবিধ প্রসঙ্গ।

হাদীস নং: ৮৯৭
- বিবিধ প্রসঙ্গ।
মিথ্যা বলা, অন্যের সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা, তার দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ানো এবং চোগলখোরী করা মাকরূহ।
৮৯৭। আতা ইবনে ইয়াসার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি আমার স্ত্রীর সাথে মিথ্যা বলতে পারি? রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ মিথ্যা বলার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। সে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহ্ রাসূল! আমি কি তার সাথে ওয়াদা করবো (যে, এটা করবো, এটা বানিয়ে দিবো)? রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ এতে তোমার কোন দোষ হবে না।
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরা এ হাদীস অনুযায়ী আমল করি। হাসি-ঠাট্টার ছলেই মিথ্যা বলা হোক অথবা প্রকৃতই মিথ্যা বলা হোক, তার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। মিথ্যা বলার যদি কোন সুযোগ থেকেই থাকে, তবে তা কেবল একটি অবস্থায়। কোন ব্যক্তির উপর থেকে কারো জুলুম-নির্যাতন প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলা যায়। আমরা আশা করি এতে কোন দোষ হবে না।**
الابواب الجامعة
بَابُ: مَا يُكْرَهُ مِنَ الْكَذِبِ، وَسُوءِ الظَّنِّ، وَالتَّجَسُّسِ، وَالنَّمِيمَةِ
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، أَخْبَرَنَا صَفْوَانُ بْنُ سُلَيْمٍ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ، أَنّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَأَلَهُ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَكْذِبُ امْرَأَتِي؟ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لا خَيْرَ فِي الْكَذِبِ» ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَعِدُهَا وَأَقُولُ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لا جُنَاحَ عَلَيْكَ» .
قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا نَأْخُذُ، لا خَيْرَ فِي الْكَذِبِ فِي جِدٍّ وَلا هَزْلٍ، فَإِنْ وُسِّعَ الْكَذِبُ فِي شَيْءٍ فَفِي خَصْلَةٍ وَاحِدَةٍ أَنْ تَرْفَعَ عَنْ نَفْسِكَ أَوْ عَنْ أَخِيكَ مَظْلَمَةً، فَهَذَا نَرْجُو أَنْ لا يَكُونَ بِهِ بَأْسٌ

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

** সত্যবাদিতা ও সারল্য ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতিসমূহের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যাচার একটি ঘৃণ্যতম নৈতিক অপরাধ। কিন্তু বাস্তব জীবনের এমন কতগুলো প্রয়োজনীয় ব্যাপার রয়েছে, যার জন্য শরীআতে মিথ্যার শুধু অনুমতিই দেয়া হয়নি, বরং কোন কোন অবস্থায় মিথ্যা বলা অপরিহার্য বলে ফতোয়া (فتوى) পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। লোকদের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন, ঝগড়া-বিবাদ নিষ্পত্তি এবং দাম্পত্য সম্পর্কের সংশোধন ও সংস্কার সাধনের জন্য যদি কেবল সত্যকে গোপন করেই কাজ সমাধা না হয়, তবে প্রয়োজনের সীমা পর্যন্ত মিথ্যার আশ্রয় নেয়ার পরিষ্কার অনুমতিও শরীআত দান করেছে। উদাহরণস্বরূপ যদি কোন সৈনিক শত্রুবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যায় এবং তারা যদি তার কাছ থেকে মুসলিম বাহিনীর অবস্থান ও তাদের গোপন তথ্য জানতে চায়, তখন আসল তথ্য বলে দেয়া গুনাহ এবং শত্রুর কাছে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে নিজেদের বাহিনীকে রক্ষা করা ওয়াজিব। অনুরূপভাবে যদি কোন স্বৈরাচারী যালেম কোন নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করতে চায় এবং ঐ বেচারা কোথাও আত্মগোপন করে থাকে, তবে এ ক্ষেত্রে সত্য কথা বলে তার গোপন অবস্থান জানিয়ে দেয়া গুনাহ এবং মিথ্যা বলে তার জান বাঁচানো ওয়াজিব। এ সম্পর্কে শরীআতের নির্দেশ নিম্নরূপঃ
উকবা ইবনে আবু মুঈতের কন্যা উম্মে কুলছূম (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে সন্ধি স্থাপন করে দেয়ার জন্য এবং কল্যাণ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্যে মিথ্যার আশ্রয় নেয়, সে মিথ্যাবাদী নয়" (বুখারী, মুসলিম)। মুসলিমের অপর বর্ণনায় আরো আছে, রাবী বলেন, “মানুষের কথোপকথনে মিথ্যার আশ্রয় নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে বলে শুনিনি। কিন্তু তিনটি ক্ষেত্রে অনুমতি দেয়া হয়েছেঃ যুদ্ধক্ষেত্রে, মানুষের মাঝে সন্ধি স্থাপনে এবং স্ত্রীর কাছে স্বামীর কথনে ও স্বামীর কাছে স্ত্রীর কথনে” (বুখারী, কিতাবুস সুলহি; মুসলিম, কিতাবুল বিররি; আবু দাঊদ, কিতাবুল আদাব; তিরমিযী, কিতাবুল বিররি)।
ইয়াযীদ কন্যা আসমা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেনঃ “মিথ্যা বলা জায়েয নয়। কিন্তু তিনটি ক্ষেত্রে তার অনুমতি আছে। স্ত্রীকে খুশি করার জন্য স্বামীর বক্তব্যে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া, যুদ্ধক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া এবং লোকদের মধ্যকার সম্পর্কের উন্নতি বিধানের জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেয়া” (আবু দাউদ, তিরমিযী)।
এর বাস্তব উদাহরণও হাদীসের গ্রন্থসমূহে বিদ্যমান রয়েছে। “ইহুদী নেতা কাব ইবনে আশরাফের হত্যার জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা (রা)-কে নিয়োগ করলেন, তখন তিনি অনুমতি চাইলেন, যদি কিছু মিথ্যার আশ্রয় নেয়ার প্রয়োজন হয় নিতে পারবো কি? রাসূলুল্লাহ ﷺ পরিষ্কার বাক্যে তাকে এর অনুমতি দেন" (বুখারী, বাবুল কিযবি ফিল হারব এবং বাবুল ফিতক বি-আহলিল হারব)।
“খায়বারের যুদ্ধ চলাকালে হাজ্জাজ ইবনে ঈলাত (রা) মক্কাবাসীদের কব্জা থেকে নিজের মালপত্র বের করে নিয়ে আসার জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর কাছে মিথ্যার আশ্রয় নেয়ার অনুমতি চাইলেন। তিনি তাকেও এর অনুমতি দিলেন” (মুসনাদে আহমাদ, নাসাঈ, হাকেম, ইবনে হিব্বান)।
এসব হাদীস এবং নযীরের ভিত্তিতে ফিকহবিদগণ এবং হাদীসবেত্তাগণ যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তাও দেখে নেয়া প্রয়োজন। আল্লামা ইবনে হাজার আল-আসকালানী (র) বলেন, “বিশেষজ্ঞ আলেমগণ ঐক্যমত প্রকাশ করেছেন যে, কঠিন প্রয়োজন দেখা দিলে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া জায়েয। যেমন কোন স্বৈরাচারী জালেম যদি কোন ব্যক্তিকে হত্যা করতে চায় এবং সেই দুর্বল ও নির্যাতি ত ব্যক্তি কারো কাছে আত্মগোপন করে থাকে, তাহলে আশ্রয়দাতার এই অধিকার রয়েছে যে, সে তার কাছে ঐ ব্যক্তির উপস্থিতির কথা অস্বীকার করবে। প্রয়োজনবোধে সে মিথ্যা শপথও করতে পারবে। এজন্য সে গুনাহগার হবে না” (ফাতহুল বারী, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৯০)।
আল্লামা ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়া (র) হাজ্জাজ ইবনে ঈলাত আস-সুলামী (রা)-র ঘটনা বর্ণনা করার পর তা থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেনঃ “এ থেকে জানা গেলো যে, কোন ব্যক্তি তার নিজের অথবা অন্যের জন্য মিথ্যা বলতে পারে, যদি তার ফলে অপর কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং এই মিথ্যার সাহায্যে তার ন্যায্য অধিকার আদায় করে” (যাদুল মাআদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২০৩)।
আল্লামা ইমাম নববী (র) তার ‘রিয়াদুস সালেহীন' কিতাবে (অনুচ্ছেদঃ মিথ্যা বলা হারাম) হাদীসসমূহ থেকে যুক্তি-প্রমাণ গ্রহণ করতে গিয়ে নিম্নোক্ত মূলনীতি বর্ণনা করেছেনঃ “যে কোন সৎ উদ্দেশ্য যা মিথ্যার আশ্রয় নেয়া ছাড়াই অর্জন করা সম্ভব, তা অর্জনের জন্য মিথ্যা বলা হারাম। কিন্তু তা যদি মিথ্যার আশ্রয় নেয়া ছাড়া অর্জন করা সম্ভব না হয়, তবে মিথ্যা বলা জায়েয। আর এই উদ্দেশ্য অর্জন যদি মুবাহ পর্যায়ের হয়ে থাকে, তবে এর জন্য মিথ্যা বলাও মুবাহ। আর তা অর্জন করা যদি অত্যাবশ্যকীয় হয়ে থাকে, তবে এর জন্য মিথ্যা কথা বলাও অত্যাবশ্যক" (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান