আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

১৬- হারানো বা কুড়িয়ে পাওয়া বস্তুর বিধান

হাদীস নং: ৮৫৪
- হারানো বা কুড়িয়ে পাওয়া বস্তুর বিধান
অন্যের হারানো জিনিস পাওয়া গেলে তার বিধান।
৮৫৪। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রাহঃ) বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) কাবা ঘরের সাথে পিঠ লাগিয়ে বসা অবস্থায় বলেন, যে ব্যক্তি হারানো জিনিস তুলে নিলো সে পথভ্রষ্ট।
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরা এ হাদীস অনুযায়ী আমল করি। হযরত উমার (রাযিঃ)-র এ কথার অর্থ হচ্ছে, কোন ব্যক্তি যদি আত্মসাৎ করার উদ্দেশে তা তুলে নেয় (তবে সে পথভ্রষ্ট)। কিন্তু যে ব্যক্তি মালিককে ফেরত দেয়ার উদ্দেশে অথবা ঘোষণা দেয়ার উদ্দেশে তা তুলে নিবে, তার কোন দোষ হবে না।**
كتاب اللقطة
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ، قَالَ: قَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَهُوَ مُسْنِدٌ ظَهْرَهُ إِلَى الْكَعْبَةِ: مَنْ أَخَذَ ضَالَّةً فَهُوَ ضَالٌّ.
قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا نَأْخُذُ، وَإِنَّمَا يَعْنِي بِذَلِكَ مَنْ أَخَذَهَا لِيَذْهَبَ بِهَا، فَأَمَّا مَنْ أَخَذَهَا لِيَرُدَّهَا، أَوْ لِيُعَرِّفَهَا، فَلا بَأْسَ بِهِ

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

** লুকতাহ ( اللقطة) শব্দের অর্থ হারানো অবস্থায় পড়ে থাকা জিনিস, হারানো জিনিস যা পাওয়া গেছে বা তুলে নেয়া হয়েছে। হারানো গরু-ছাগল প্রভৃতি পশুকে দাল্লা (الضالة) বলে। পথে পড়ে থাকা জিনিস সম্পর্কে কোন কোন ফিকহবিদের মত হচ্ছে, তা তুলে নেয়া জায়েয, কিন্তু স্বস্থানে পড়ে থাকতে দেয়াই উত্তম। জমহূরের মতে তা তুলে নেয়াই উত্তম, বিশেষ করে যখন তা তুলে না নিলে আত্মসাৎ হওয়ার বা নষ্ট হওয়ার আশংকা থাকে। যথাসাধ্য চেষ্টা করার পরও মালিক না পাওয়া গেলে তা দান-খয়রাত করতে হবে অথবা কোন জনকল্যাণমূলক কাজে লাগাবে। প্রাপ্ত জিনিস মালিকহীন গুপ্তধন হলে তা প্রাপক নিজে ব্যবহার করতে পারবে এবং এর এক-পঞ্চমাংশ বাইতুল মালে জমা দিতে হবে। আমাদের দেশে হারানো পশু পাওয়া গেলে তা বেঁধে রাখতে হবে। অন্যথায় তা ফসলের ক্ষতি করবে অথবা দুষ্ট প্রকৃতির লোকের হাতে পড়লে তা আত্মসাৎ হবে।
কিন্তু তা যথাস্থানে থাকতে দেয়া অধিকতর প্রশংসনীয় বলে কখনও কখনও বলা হয় । প্রাপ্ত বস্তু তুচ্ছ বা ধ্বংসশীল না হলে এক বছর সময়ের শেষে, ইমাম মালেক ও ইমাম শাফিঈর মতে, প্রাপক এই বস্তু নিজ অধিকারে রাখতে স্বত্ববান হবে এবং তা ইচ্ছামত ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফার মতে, কেবলমাত্র 'দরিদ্র ব্যক্তি' তা রাখতে ও ব্যবহার করতে পারবে। আর উক্ত সময় শেষ হওয়ার পূর্বে তা সদাকা হিসাবে দান করা ইমাম আবু হানীফা (র) ও ইমাম মালেকের মতে আরও উত্তম।
যদি মালিক উক্ত সময় শেষ হওয়ার পূর্বে উপস্থিত হয়, তবে সে তার মাল ফেরত পাবে। যদি সময় শেষ হওয়ার পরেও সে উপস্থিত হয় এবং তখনও মালটি প্রাপকের নিকট থাকে তবুও সে তা ফেরত পাবে। যদি প্রাপক আইন অনুসারে এর কোন ব্যবস্থা করে থাকে, তবে সে মালিকের নিকট এর মূল্যের জন্য দায়ী থাকবে। কেবল দাউদ যাহিরী এই ক্ষেত্রে মালিকের কোন দাবি স্বীকার করেননি। ইমাম মালেক (র) ও ইমাম আত্মাদ ইবনে হাম্বলের মতানুসারে কুড়ানো বস্তুর বর্ণনা ঠিকভাবে দিতে পারলেই মালিকানা স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, প্রমাণ উপস্থিত করার প্রয়োজন নেই। মরুভূমিতে গৃহপালিত জীবজন্তু পাওয়া গেলে সে সম্বন্ধে বিশেষ আইন অনুসৃত হয় যা জন্তুটি বিপদাশংকামুক্ত থাকলে প্রাপকের পক্ষে বেশী কঠিন এবং বিপরীত ক্ষেত্রে প্রাপকের পক্ষে কিছুটা সহজ। মক্কার হেরেম শরীফের মধ্যে কোন বস্তু পাওয়া গেলে । সম্বন্ধে ইমাম শাফিঈ (র) ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের আরও কতকগুলি বিধান আছে।
ফিকহের এই ব্যবস্থা কতকগুলি হাদীসের উপর প্রতিষ্ঠিত। এইখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, কতক ফকীহর মতে মালিকের জন্য দুই বা তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে। প্রাচীন আইনবেত্তাগণের মতে প্রাপ্ত বস্তু হলো গচ্ছিত বস্তুর (ওয়াদীআ) ন্যায়, আবার ধর্মীয় নীতিবোধ অনুযায়ী অন্যের হারানো খেজুর পেলে তা কুড়িয়ে খাওয়া উচিত নয়। কারণ তা যাকাতের মাল হতে পারে। একটি হাদীসে মক্কায় হাজ্জীদেরকে অন্যের হারানো কোন বস্তু পেলে তা কুড়িয়ে নিতে নিষেধ করা হয়েছে।
লাকীত (لقيط)ঃ কোন ব্যক্তি কর্তৃক রাস্তাঘাটে ফেলে যাওয়া শিশুকে বুঝানোর জন্য লাকীতে পরিভাষা ব্যবহৃত হয়। এটা লুকতারই অন্তর্ভুক্ত। আইনের ভাষায় কোন ব্যক্তি তার মালিকানাধীন শিশুকে দারিদ্র্যের ভয়ে অথবা যেনার অভিযোগ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাস্তায় ফেলে গেলে সেই শিশুকে লাকীত বলে। পথিপার্শ্ব থেকে যে ব্যক্তি তাকে কুড়িয়ে নেয় তাকে 'মূলতাকিত' বলে। আল্লামা ইবনে হাযম (র)-এর মতে কোন ব্যক্তি রাস্তায় পরিত্যক্ত শিশু দেখতে পেলে তাকে তুলে নিয়ে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করা তার অবশ্য কর্তব্য। তা একটা পুণ্যের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “তোমরা পুণ্য ও আল্লাহভীতিমূলক কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো এবং পাপাচার ও সীমালংঘনমূলক কাজে সহযোগিতা করো না” (সূরা মাইদাঃ ২)। মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ “আর যদি কেউ কাউকে জীবন দান করে, তবে সে যেন গোটা মানবজাতিকে জীবন দান করলো " (সূরা মাইদাঃ ৩২)। সে যদি তাকে তুলে না নেয় এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় শিশুটি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে ঐ ব্যক্তি চরম গুনাহগার হবে। কেননা সে একটি নিষ্পাপ শিশুকে অনাহারে, অতি ঠাণ্ডায় বা গরমে মরে যেতে অথবা হিংস্র প্রাণী কর্তৃক নিহত হতে দিয়েছে। এইজন্য সে নিঃসন্দেহে ইচ্ছাকৃতভাবে মানব হত্যাকারী। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “যে ব্যক্তি মানুষকে দয়া করে না, তাকে আল্লাহও অনুগ্রহ করেন না" (আল-মুহাল্লা, ৯খ, পৃ. ১৬২-৬)।
লাকীত-এর রক্ষণাবেক্ষণ ও ভরণ-পোষণের দায়িত্বভার সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। মূলতাকিত বা অন্য কোন ব্যক্তি যদি তার লালন-পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে তবে সরকার তার উপর এই দায়িত্ব অর্পণ করতে পারে। কিন্তু কোনক্রমেই তাকে বিধর্মীদের কাছে অর্পণ করা জায়েয নয়। সুলায়ম গোত্রের সুনায়ন ইবনে জামীলা উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-র খিলাফতকালে একটি মানবূয (পরিত্যক্ত শিশু) পেলেন। তিনি বলেন, আমি তা নিয়ে উমার ((রা)-র নিকট গেলাম। তিনি বলেন, কেন তুমি তা তুলে আনলে? আমি বললাম, তা পতিত অবস্থায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল, তাই আমি তুলে নিয়েছি। উমার (রা)-র ইররীফ (যে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেয়) তাকে বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! সুনায়ন একজন ভালো লোক। উমার (রা) বলেন, তাই? সে বললো, হ্যাঁ। তিনি সুনায়নকে বলেন, যাও, সে মুক্ত-স্বাধীন, তুমি তার উত্তরাধিকারী এবং তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আমাদের (সরকারের) উপর।
হাদীসটি মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, মুসনাদে ইমাম শাফিঈ, আবদুর রাযযাকের মুসান্নাফ, তাবারানীর মুজাম ও বায়হাকীর আল-আরিফা গ্রন্থে উল্লেখ আছে। শেষোক্ত গ্রন্থে আছে, উমার (রা) বলেন, “বাইতুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) হতে তার ভরণ-পোষণের ব্যয়ভার বহন করার দায়িত্ব আমাদের।” সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (র) বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-র নিকট কোন পরিত্যক্ত শিশু নিয়ে এলে তিনি তার ভরণ-পোষণের জন্য প্রয়োজন পরিমাণ অর্থ ও খাদ্য বরাদ্দ করতেন এবং অভিভাবককে তার সাথে স্নেহপূর্ণ ব্যবহার করার উপদেশ দিতেন। অভিভাবক প্রতি মাসে তার বরাদ্দকৃত অর্থ ও খাদ্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার হতে তুলে নিতো। তার দুধ পানের ব্যয়ভারও তিনি বাইতুল মাল হতে বরাদ্দ করতেন।
তামীম নামক এক ব্যক্তি একটি পরিত্যক্ত শিশুসহ 'আলী ইবনে আবু তালিব (রা)-র নিকট আসলো। তিনি তামীমকে তার লালন-পালনের দায়িত্ব দিলেন এবং তার জন্য মাসিক ১০০ দিরহাম বরাদ্দ করলেন। অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি একটি ব্যভিচারজাত শিশুকে মাসিক ১০০ দিরহামের বিনিময়ে লালন-পালনের দায়িত্ব তামীমের উপর অর্পণ করেন।
পরিত্যক্ত শিশুর সাথে মালপত্র পাওয়া গেলে তা তারই হবে। তার শিক্ষা-দীক্ষার ব্যয়ভারও সরকারকে বহন করতে হবে। লাকীত যদি কন্যা সন্তান হয় তবে বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর তার বিবাহের ব্যয়ভারও সরকারকে বহন করতে হতে, এমনকি তার মোহরানাও সরকারকেই পরিশোধ করতে হবে (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান