আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

১২- শরীআতে যিনা ব্যভিচারের দন্ড বিধি

হাদীস নং: ৬৯৬
- শরীআতে যিনা ব্যভিচারের দন্ড বিধি
রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা)।
৬৯৬ ৷ আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। ইহুদীরা নবী ﷺ -এর কাছে এসে তাঁকে অবহিত করলো যে, তাদের মধ্যকার একটি পুরুষলোক ও একটি স্ত্রীলোক যেনা করেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করেনঃ “রজম সম্পর্কে তাওরাতে তোমরা কি নির্দেশ পাচ্ছো?” তারা বললো, আমরা এদের অপমান করি এবং বেত্রাঘাত করি । আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাযিঃ) তাদের বলেন, তোমরা মিথ্যা কথা বললে। তাওরাতে রজম করার নির্দেশ রয়েছে। তারা তাওরাত শরীফ নিয়ে এলো। তারা তাওরাত খুললো এবং তাদের এক ব্যক্তি রজম সম্পর্কিত আয়াতটি হাত দিয়ে ঢেকে রেখে তার আগে-পিছের অংশ পাঠ করলো। আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাযিঃ) বলেন, তোমার হাত সরাও। সে তার হাত তুলে নিলেই রজম সম্পর্কিত আয়াত প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সে (হাত দিয়ে আয়াতটি ঢেকে রাখা ব্যক্তি) বললো, হে মুহাম্মাদ! আপনি সত্য কথা বলেছেন। তাতে রজম সংক্রান্ত আয়াত বর্তমান আছে। অতএব রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের সম্পর্কে নির্দেশ দিলেন এবং তদনুযায়ী তাদের উভয়কে রজম করা হলো। ইবনে উমার (রাযিঃ) বলেন, আমি যেনাকারী পুরুষটিকে দেখেছি সে স্ত্রীলোকটিকে পাথরের আঘাত থেকে বাঁচানোর জন্য তার দিকে ঝুঁকে যেতো (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ)।১
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরা এসব হাদীস ও আছার-এর উপর আমল করি । কোন স্বাধীন মুসলমান বিবাহিত ব্যক্তি নিজ স্ত্রীর সাথে সংগম স্বাদ লাভ করার সুযোগ পাওয়ার পরও অপর কোন নারীর সাথে যেনায় লিপ্ত হলে তাকে রজমের শাস্তি দিতে হবে। কেননা এই ব্যক্তি মুহসান (বিবাহের দুর্গে সুরক্ষিত)। কিন্তু সে যদি স্ত্রীর সাথে যৌনস্বাদ আস্বাদনের সুযোগ না পেয়ে থাকে, বরং কেবল বিবাহ করেছে এবং সঙ্গম করেনি অথবা তার কাছে ইহুদী বা খৃষ্টান বাঁদী রয়েছে—তবে এসব কারণে সে মুহসান নয়। অতএব তাকে রজম করা যাবে না, বরং এক শত বেত্রাঘাত করতে হবে। ইমাম আবু হানীফা (রাহঃ) এবং আমাদের ফিকহবিদদের এটাই সাধারণ মত।২
أبواب الحدود في الزناء
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، أَخْبَرَنَا نَافِعٌ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، أَنَّ الْيَهُودَ جَاءُوا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَخْبَرُوهُ أَنَّ رَجُلا مِنْهُمْ وَامْرَأَةً زَنَيَا، فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا تَجِدُونَ فِي التَّوْرَاةِ فِي شَأْنِ الرَّجْمِ» ؟ فَقَالُوا: نَفْضَحُهُمَا، وَيُجْلَدَانِ، فَقَالَ لَهُمْ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَلامٍ: كَذَبْتُمْ، إِنَّ فِيهَا الرَّجْمَ، فَأَتَوْا بِالتَّوْرَاةِ، فَنَشَرُوهَا، فَجَعَلَ أَحَدُهُمْ يَدَهُ عَلَى آيَةِ الرَّجْمِ، ثُمَّ قَرَأَ مَا قَبْلَهَا وَمَا بَعْدَهَا، فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَلامٍ: ارْفَعْ يَدَكَ، فَرَفَعَ يَدَهُ، فَإِذَا فِيهَا آيَةُ الرَّجْمِ، فَقَالَ: صَدَقْتَ يَا مُحَمَّدُ، فِيهَا آيَةُ الرَّجْمِ، «فَأَمَرَ بِهِمَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرُجِمَا» .
قَالَ ابْنُ عُمَرَ: فَرَأَيْتُ الرَّجُلَ يَجْنَأُ عَلَى الْمَرْأَةِ يَقِيهَا الْحِجَارَةَ ".
قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا كُلِّهِ نَأْخُذُ، أَيُّمَا رَجُلٍ حُرٍّ مُسْلِمٍ زَنَى بِامْرَأَةٍ وَقَدْ تَزَوَّجَ بِامْرَأَةٍ قَبْلَ ذَلِكَ حُرَّةٍ مُسْلِمَةٍ وَجَامَعَهَا فَفِيهِ الرَّجْمُ، وَهَذَا هُوَ الْمُحْصَنُ، فَإِنْ كَانَ لَمْ يُجَامِعْهَا إِنَّمَا تَزَوَّجَهَا، وَلَمْ يَدْخُلْ بِهَا، أَوْ كَانَتْ تَحْتَهُ أَمَةٌ يَهُودِيَّةٌ أَوْ نَصْرَانِيَّةٌ لَمْ يَكُنْ بِهَا مُحْصَنًا، وَلَمْ يُرْجَمْ، وَضُرِبَ مِائَةً.
وَهَذَا هُوَ قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ رَحِمَهُ اللَّهُ، وَالْعَامَّةِ مِنْ فُقَهَائِنَا

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

১. বাইবেলে ‘পুরাতন নিয়ম' নামে যে তাওরাত বর্তমানে চালু আছে তাতেও যেনার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড উল্লেখ আছে। যেমন, “আর যে ব্যক্তি পরের ভার্য্যার (স্ত্রী) সহিত ব্যভিচার করে, যে ব্যক্তি প্রতিবেশীর ভার্য্যার সহিত ব্যভিচার করে, সেই ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী উভয়ের প্রাণদণ্ড অবশ্যই হইবে” (লেবীয় পুস্তক, ২০ অধ্যায়, ১০ ও ১১ নং আয়াত। এজন্য আরো দ্রষ্টব্যঃ দ্বিতীয় বিবরণ, ২২ অধ্যায়, ২২-২৬ আয়াত; যোহন, ৮ঃ ১-১১)। ইহুদীদেরকে তাওরাতের এই আইন পরিবর্তন করার কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলে যে, তাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা যেনা করলে তাদের লঘুদণ্ড দেয়া হতো, আর সাধারণ লোকেরা যেনা করলে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হলে তাদের বেলায়ও লঘুদণ্ডের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় (আবু দাউদ)। ইহুদী, খৃষ্টান বা অন্য ধর্মের কোন অমুসলিম নাগরিক বিবাহিত অবস্থায় যেনায় লিপ্ত হলে তার কি শাস্তি হবে, এ নিয়ে মতভেদ আছে। ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও আবু ইউসুফের মতে তাকেও রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা) করতে হবে। তারা এ হাদীস নিজেদের মতের সমর্থনে দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা ও মালেকের মতে যেনার ক্ষেত্রে রজমের শাস্তি কেবল মুসলমানদের উপর কার্যকর হবে (অনুবাদক)।

২. যেনা একটি হারাম এবং চরম ঘৃণিত কাজ। ইসলামী আইনে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই এ সম্পর্কে একটু বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। তৃতীয় হিজরী সনে যেনা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষিত হয়। কিন্তু তখনও তা পারিবারিক পর্যায়ের অপরাধ হিসাবে পরিবারের লোকেরাই এর শাস্তি কার্যকর করতো। প্রাথমিক পর্যায়ে বলা হয়েছে যে, কোন নারী বা পুরুষকে যেনা করতে দেখেছে বলে চারজন পুরুষ সাক্ষী যদি সাক্ষ্য দেয়, তবে উভয়কেই মারপিট করতে হবে এবং স্ত্রীলোকটিকে ঘরে আটক করে রাখতে হবে (সূরা নিসা, ১৫, ১৬ এবং ২৬ নং আয়াত দ্রষ্টব্য)। এই আয়াত নাযিল হওয়ার আড়াই কি তিন বছর পর সূরা নূর-এ যেনার শাস্তি সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয় (প্রথম রুকূ দ্রষ্টব্য)। এরপর থেকে তা সরকারী হস্তক্ষেপযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য হয় এবং সরকারের বিচার বিভাগকে এর শাস্তি বিধানের দায়িত্ব দেয়া হয়।
যেনার আইনগত সংজ্ঞা নির্ধারণে ফিকহবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। হানাফী ফিকহবিদগণ নিম্নোক্ত সংজ্ঞা দিয়েছেনঃ “একজন পুরুষের এমন এক স্ত্রীলোকের যৌনাঙ্গে সংগম করা, যে তার বিবাহিতা স্ত্রীও নয় এবং মালিকানাধীন দাসীও নয়, একথা মনে করারও কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই যে, সে তাকে নিজের স্ত্রী বা দাসী মনে করে তার সাথে এই সংগম করেছে।" এই সংজ্ঞা অনুযায়ী পায়খানার দ্বারে রতিক্রিয়া, লাওয়াতাত (Sodomy), পশুর সাথে যৌনক্রিয়া ইত্যাদি হদ্দযোগ্য যেনার পর্যায়ে পড়ে না । মালিকী ফিকহবিদগণ নিম্নোক্ত সংজ্ঞা দিয়েছেনঃ “শরীআত ভিত্তিক অধিকার কিংবা এর কোনরূপ সন্দেহ ছাড়াই যৌনাঙ্গে বা মলদ্বারে পুরুষ বা নারীর সাথে রতিক্রিয়া করা।” শাফিঈ ফিকহবিদগণ নিম্নোক্ত সংজ্ঞা দিয়েছেনঃ “যৌনাঙ্গকে এমন যৌনাঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করানো, যা শরীআতের দৃষ্টিতে হারাম, কিন্তু স্বভাবত এর প্রতি আগ্রহ ও আকর্ষণ হতে পারে”। এই দু'টি সংজ্ঞার দৃষ্টিতে লাওয়াতাত যেনার পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু মূলত তা যেনার পর্যায়ভুক্ত নয় । ইসলামী আইনে যেনা (Fornication) এবং পরস্ত্রীর সাথে যেনার (Adultry) মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য নেই। পাশ্চাত্য আইন Fonication-কে একটি নগণ্য অপরাধ এবং Adultryকে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ মনে করে।
সূরা নূর-এর আয়াতে কেবল অবিবাহিত নারী-পুরুষের যেনার শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। ইমাম শাফিঈ, আহমাদ, ইসহাক, দাউদ যাহেরী, সুফিয়ান সাওরী, ইবনে আবু লায়লা ও হাসান ইবনে সালেহ-এর মতে অবিবাহিত নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে যেনার শাস্তি হচ্ছে এক শত বেত্রাঘাত (সূরা নূর, ২ নং আয়াত দ্রষ্টব্য) এবং এক বছরের নির্বাসন (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজা, মুসনাদে আহমাদ)। ইমাম মালেক ও আওযাঈর মতে পুরুষ লোকটির শাস্তি হচ্ছে এক শত বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন ও মেয়েলোকটির শাস্তি হচ্ছে শুধু এক শত বেত্রাঘাত। ইমাম আবু হানীফা, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ এবং যুফারের মতে নারী-পুরুষ উভয়ের শাস্তি হচ্ছে এক শত বেত্রাঘাত। এর সাথে অন্য কোন শাস্তি (নির্বাসন বা জেলে আটক) যোগ করা শরীআত নির্ধারিত হদ্দ (حد) বা শাস্তি নয়, বরং তা হচ্ছে তাযীর (সরকার কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি)।
হদ্দ ও তাযীরের মধ্যে পার্থক্য এই যে, হদ্দ হলো একটি সুনির্দিষ্ট শাস্তি। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার শর্তাবলী পূর্ণ হওয়ার পর এই শাস্তি অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। এর ধরন ও পরিমাণ শরীআত নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। আর তাযীর হচ্ছে দৃষ্টান্তমূলক বা সুবিবেচনা প্রসূত শাস্তি। এর ধরন ও প্রকৃতি শরীআত নির্দিষ্ট করে দেয়নি, বরং বিচার বিভাগ পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং অপরাধের ধরন ও প্রকৃতি অনুযায়ী এই শাস্তির ব্যবস্থা করবে।
বিবাহিত নারী-পুরুষ যেনায় লিপ্ত হলে ইমাম আহমাদ, দাউদ যাহেরী এবং ইসহাকের মতে, তাদেরকে এক শত বেত্রাঘাত করার পর পাথর নিক্ষেপে হত্যা (রজম) করতে হবে। ইমাম আবু হানীফাসহ অপরাপর ফিক্হবিদের মতে তাদেরকে শুধু পাথর নিক্ষেপে হত্যা করতে হবে। কেননা হদ্দ ও তাযীর একত্রে দেয়া যেতে পারে না।
দুইজন নারী-পুরুষকে এক বিছানায় পাওয়া গেলে কিংবা সংগমপূর্ব শৃংগারে লিপ্ত পাওয়া গেলে বা উভয়কে উলঙ্গ অবস্থায় পাওয়া গেলেই তা তাদেরকে ব্যভিচারী প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়, বরং সরাসরি সঙ্গমে লিপ্ত দেখতে পাওয়া গেলেই তাদেরকে ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ডাক্তারী পরীক্ষার মাধ্যমে যেনা প্রমাণ করা এবং তার ভিত্তিতে হদ্দ-এর শাস্তির ব্যবস্থা করা ইসলাম সমর্থন করে না। তবে জোরপূর্বক ধর্ষণের ক্ষেত্রে পরীক্ষার সাহায্য নেয়া যেতে পারে, যদি ধর্ষণকারী অপরাধ অস্বীকার করে। যেসব লোককে এ ধরনের নির্লজ্জ অবস্থায় পাওয়া যাবে, তাদেরকে বিচারক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিবেন। অথবা দেশের জাতীয় সংসদ এই অপরাধের শাস্তি বিধান করবে। তা যদি বেত্রাঘাত হয়, তবে তা দশটি বেত্রাঘাতের অধিক হতে পারবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ “আল্লাহর নির্ধারিত দণ্ড ছাড়া আর কোন দণ্ডেই দশের অধিক বেত্রাঘাত করা যাবে না” (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ)।
স্বামীহীন স্ত্রীলোকের এবং মনিবহীন ক্রীতদাসীর অন্তঃসত্তা প্রকাশ পেলে, শুধু এই গর্ভকে যেনা প্রমাণের জন্য অবস্থাগত সাক্ষী হিসাবে গ্রহণ করা হবে কিনা, এ সম্পর্কে মতভেদ আছে। হযরত উমার (রা) বলেন, 'যেনার জন্য এটাই যথেষ্ট প্রমাণ।' মালিকী মাযহাব এই মত গ্রহণ করেছে। কিন্তু অধিকাংশ ফিকহবিদের মতে অন্তঃসত্তা প্রকাশ পাওয়াটাই যেনার জন্য যথেষ্ট প্রমাণ নয়। কেবল এর ভিত্তিতে কাউকে মৃত্যুদণ্ড (রজম) বা বেত্রাঘাতের শাস্তি দেয়া যেতে পারে না। এতো ভয়ংকর শাস্তি দেয়ার জন্য প্রত্যক্ষ সাক্ষী বর্তমান থাকতে হবে অথবা অপরাধীর স্বেচ্ছামূলক (বল প্রয়োগে নয়) স্বীকারোক্তি বর্তমান থাকতে হবে। ইসলামী আইনের একটি মূলনীতি হচ্ছে, 'সন্দেহ' শাস্তি দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তা মাফ করে দেয়ার দিকটিই অধিক প্রকট করে তোলে। রাসূলুল্লাহ বলেনঃ “শাস্তিদান এড়িয়ে যাও, তা যতোদূর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব” (ইবনে মাজা)। তিনি আরও বলেনঃ “মুসলমানদের ব্যাপারে শরীআতের দণ্ডসমূহ যতোদূর সম্ভব দূরে সরিয়ে রাখো। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি শাস্তি থেকে মুক্তি লাভের কোন পথ পায়, তবে তাকে সে সুযোগ গ্রহণ করতে দাও। কেননা শাসকের জন্য কাউকে ভুল করে মাফ করে দেয়া, ভুল করে শাস্তি দেয়ার চেয়ে উত্তম (তিরমিযী)।
নিজের মাহরাম (যাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন হারাম) আত্মীয়ের সাথে যেনায় লিপ্ত হওয়া সাধারণ পর্যায়ের যেনার তুলনায় অধিকতর ঘৃণিত ও মারাত্মক অপরাধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই ধরনের অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন এবং তাদের সম্পত্তি (সরকার কর্তৃক) বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দিয়েছেন (আবু দাউদ, নাসাঈ, মুসনাদে আহমাদ)। ইমাম আহমাদের মতে এই ধরনের অপরাধীকে হত্যা করা ও তার যাবতীয় সম্পত্তি ক্রোক করা আবশ্যক। ইমাম আবু হানীফা, মালেক ও শাফিঈর মতে, কোন ব্যক্তি মাহরাম আত্মীয়ের সাথে যেনা করলে তাকে যেনার জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি দিতে হবে।

সাক্ষী
কুরআনের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, যেনা প্রমাণের জন্য অন্ততপক্ষে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী ন্যায়পরায়ণ মুসলমান পুরুষ সাক্ষী বর্তমান থাকতে হবে। সাক্ষী না পাওয়া গেলে বিচারক শুধু নিজের জানার বা দেখার ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দিতে পারবে না। এমন সাক্ষী বর্তমান থাকতে হবে, যাদের মধ্যে ইসলামের সাক্ষ্য আইনের শর্তাবলী বর্তমান আছে। যেমন পূর্বে সে কোন মামলায় মিথ্যা সাক্ষী দিয়েছে বলে প্রমাণ নাই, সে আত্মসাৎকারী নয়, পূর্বে কখনো শাস্তিপ্রাপ্ত হয়নি ইত্যাদি । মোটকথা অবিশ্বস্ত লোকের সাক্ষীর ভিত্তিতে কাউকে রজমের মতো কঠিন শাস্তি দেয়া যেতে পারে না। সাক্ষীগণ সাক্ষ্য দিবে যে, তারা একত্রে চাক্ষুসভাবে অভিযুক্তদ্বয়কে সঙ্গমকার্য সম্পন্ন করতে দেখেছে, যেমন সুরমাদানীর ভেতরে সুরমা-শলাকা এবং কূপের ভেতরে পানি তোলার রশি সংরক্ষিত থাকে ঠিক সেভাবে। তারা কবে, কোথায় এবং কাকে কার সাথে যেনায় লিপ্ত দেখেছে, এ বিষয়ে তাদের সাক্ষ্য অভিন্ন হতে হবে। এসব মৌলিক বিষয়ে মতভেদ হলে সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না।

লাওয়াতাত
পুরুষে পুরুষে যৌন সম্ভোগকে লাওয়াতাত বলে। এই জাতীয় নিকৃষ্ট অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিৎ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “যে ব্যক্তি এই অপরাধ করে এবং যার সাথে করে তাদের উভয়কে হত্যা করো, এরা বিবাহিত হোক কি অবিবাহিত।” অপর হাদীসে আছে, “যে উপরে থাকে আর যে নিচে থাকে, এদের উভয়কেই পাথর নিক্ষেপে হত্যা করো।” কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর যুগে এ ধরনের কোন অপরাধ সংঘটিত হয়নি বলে এর বিচারের দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে বর্তমান নেই। হযরত আলী (রা)-র মতে অপরাধীকে তরবারির আঘাতে হত্যা করতে হবে এবং তার লাশ দাফন করার পরিবর্তে আগুনে পুড়ে ফেলতে হবে। হযরত আবু বাকর (রা)-রও এই মত। হযরত উমার ও উছমান (রা)-র মতে তাকে কোন ভগ্নপ্রায় দালানের নিচে দাঁড় করিয়ে গোটা দালানটি তার উপর ধ্বসিয়ে দিতে হবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-র ফতোয়া হচ্ছে, এলাকার সর্বোচ্চ দালানের ছাদের উপর থেকে তাকে উল্টিয়ে ফেলে দিতে হবে এবং সাথে সাথে তার উপর পাথর বর্ষণ করতে হবে।
ফিকহবিদদের মধ্যে ইমাম শাফিঈর মতে এই পাপে লিপ্ত ব্যক্তিদ্বয়কে হত্যা করা ওয়াজিব, তারা বিবাহিত হোক কি অবিবাহিত। ইমাম শাবী, যুহরী, মালেক ও আহমাদ ইবনে হাম্বলের মতে, এদেরকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা (রজম) করতে হবে। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব, আতা, হাসান বসরী, ইবরাহীম নাখঈ, সুফিয়ান সাওরী ও আওযাঈর মতে এরা অবিবাহিত হলে প্রত্যেককে এক শত বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন দিতে হবে, আর বিবাহিত হলে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করতে হবে। ইমাম আবু হানীফার মতে এই অপরাধের কোন শান্তি নির্ধারিত নেই। এর জন্য তাযীর রয়েছে। বিচার বিভাগ এদের জন্য কোন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারে। ইমাম শাফিঈরও একটি কথা থেকে এই মতের সমর্থন পাওয়া যায়।
স্ত্রীর বাহ্যদ্বারেও স্বামীর এই কাজ সম্পূর্ণ হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর পশ্চাদ্বারে যৌনতৃপ্তি লাভ করে সে অভিশপ্ত” (আবু দাউদ)। “যে ব্যক্তি হায়েয অবস্থায় স্ত্রীসহবাস করে কিংবা স্ত্রীর পশ্চাদ্বারে যৌনতৃপ্তি লাভ করে অথবা কোন গণৎকারের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে, সে মুহাম্মাদ ﷺ -এর উপর নাযিলকৃত বিধানের প্রতি কুফরী করে" (তিরমিযী)। “যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর পশ্চাদ্বারে সঙ্গম করে, আল্লাহ তার দিকে রহমাতের দৃষ্টিতে তাকাবেনও না” (ইবনে মাজা, মুসনাদে আহমাদ)।

পশুর সাথে যেনা
পশুর সাথে যৌনক্রিয়াকে কোন কোন ফিকহবিদ যেনার মধ্যে গণ্য করেন এবং এ ধরনের অপরাধীকে যেনার শাস্তি দেয়ার পক্ষে মত করেন। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা, মালেক, শাফিঈ, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ও যুফার (র) বলেন, এটা যেনা নয়। অতএব এই কাজে লিপ্ত অপরাধীকে যেনার শাস্তি দেয়া যাবে না। তাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে।

ভিনদেশী নাগরিক যেনা করলে
যে ব্যক্তি অন্য দেশ থেকে ইসলামী রাষ্ট্রের অনুমতি নিয়ে এখানে এসেছে, সে যদি এখানে যেনায় লিপ্ত হয়, তবে ইমাম আবু ইউসুফের মতে তাকেও যেনার শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা ও মুহাম্মাদের মতে তাকে যেনার শাস্তি দেয়া যাবে না।

বিচার বিভাগ শাস্তির নির্দেশ দিবে
ইসলামী আইন রাষ্ট্রীয় সংস্থা ছাড়া অপর কোন ব্যক্তি বা সংগঠনকে যেনার শাস্তিসহ অন্য যে কোন শাস্তি কার্যকর করার অধিকার বা এখতিয়ার দেয় না। তোমরা বেত্রাঘাত করো (فاجلدوا) বলে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন বিভাগ ও বিচারক মণ্ডলীকেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাতের সকল ফিক্হবিদ ঐক্যমত প্রকাশ করেছেন। বিচার বিভাগ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তদন্তের ভিত্তিতে অপরাধীর কি ধরনের শাস্তি হবে তার রায় প্রদান করবে এবং প্রশাসন তা কার্যকর করবে। ইসলামী শরীআত কোন ব্যক্তিকে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়ার অধিকার দেয় না। শান্তি কার্যকর করার পর অপরাধী মারা গেলে তার সাথে ব্যবহার যেনার শাস্তি কার্যকর করার পর অপরাধী মারা গেলে তার সাথে পুরাপুরিভাবে একজন মুসলমানের মত ব্যবহার করতে হবে। তার কাফন-দাফন করতে হবে এবং তার জানাযাও পড়তে হবে। তাকে সসম্মানে মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করতে হবে এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। তাকে খারাপভাবে স্মরণ করা কারো পক্ষে জায়েয নয়। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বলেন, “রজম করার ফলে মায়েয আসলামী যখন মারা গেলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ তার সম্পর্কে খুব ভালো মন্তব্য করলেন এবং নিজেই তার জানাযা পড়ালেন” (বুখারী)। বুরাইদা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ “তোমরা মায়েয ইবনে মালেকের জন্য মাগফিরতের দোয়া করো। সে এমন তওবা করেছে যে, তা যদি সমস্ত উম্মাতের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হয়, তবে তা সকলের জন্যই যথেষ্ট হবে (মুসলিম)।
যুহায়না গোত্রের গামেদ উপ-শাখার এক মহিলা যখন রজম করার পর মারা গেলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই তার জানাযা পড়ালেন। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা) তাকে খারাপ ইঙ্গিতে স্মরণ করলে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ “খালিদ! থামো!! যেই মহান সত্তার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ! গামেদিয়া এমন তওবা করেছে যে, তা যদি কোন কর আদায়কারী উৎপীড়কও করতো তবে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হতো।” ইমরান ইবনে হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত। গামেদিয়ার জানাযা পড়ার প্রাক্কালে হযরত উমার (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এখন কি এই যেনাকারী মেয়েলোকটির জানাযা পড়া হবে? তখন নবী ﷺ বললেনঃ “হ্যাঁ, মেয়েলোকটি এমন তওবা করেছে যে, তা যদি গোটা মদীনাবাসীর মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হয়, তবে তা তাদের সকলের জন্য যথেষ্ট হবে (মুসলিম)।
এক ব্যক্তিকে শরাব পানের অপরাধে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। তখন কেউ বলে উঠলো, আল্লাহ তোমাকে লজ্জিত ও অপমানিত করুন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ “না, এরূপ বলো না। তার বিরুদ্ধে শয়তানকে সাহায্য করো না” (বুখারী)। অপর বর্ণনায় আছে, “এরূপ বলো না, বরং এরূপ বলোঃ হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করো, হে আল্লাহ! তাকে দয়া করো” (আবু দাউদ)। এই হচ্ছে ইসলামী আইনের শাস্তি ও দণ্ড আইনের অন্তর্নিহিত ভাবধারা। ইসলাম কাউকে শত্রুতার ভাবধারা নিয়ে শাস্তি দেয় না, বরং কল্যাণের ভাবধারা নিয়েই শাস্তি দেয়। অথচ তথাকথিত সভ্য আইনের অধীনে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলে কেউ তার লাশ তুলতেও রাজী হয় না। কারো মুখে তার সম্পর্কে ভালো উক্তিও শোনা যায় না। এই হীনতা ও সংকীর্ণতা কেবল আধুনিক সভ্যতারই দান (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)