আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

৯- কুরবানী,জবাই ও শিকারের বিধান

হাদীস নং: ৬৫১
- কুরবানী,জবাই ও শিকারের বিধান
যে মাছ পানির মধ্যে মারা যায়।
৬৫১। সাঈদ আল-জারী ইবনুল জার (রাহঃ) বলেন, আমি ইবনে উমার (রাযিঃ)-র কাছে এমন মাছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, যাকে অন্য মাছে হত্যা করেছে অথবা ঠাণ্ডার প্রকোপে মারা গেছে। তিনি বলেন, তা খেতে কোন দোষ নেই। রাবী বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযিঃ) ও অনুরূপ কথা বলতেন।
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরাও এই মত গ্রহণ করেছি। গরম অথবা ঠাণ্ডার প্রকোপে যদি কোন মাছ মারা যায় অথবা অন্য মাছের আক্রমণে নিহত হয়, তবে তা খেতে কোন দোষ নেই। আর যে মাছ নিজে নিজে মারা যায়, অতঃপর ভেসে পানির উপরিভাগে আসে তা খাওয়া মাকরূহ। এ ছাড়া আর সব মাছ খাওয়া জায়েয।**
كتاب الضحايا وما يجزئ منها
بَابُ: السَّمَكِ يَمُوتُ فِي الْمَاءِ
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، أَخْبَرَنَا زَيْدُ بْنُ أَسْلَمَ، عَنْ سَعِيدٍ الْجَارِيِّ بْنِ الْجَارِ، قَالَ: سَأَلْتُ ابْنَ عُمَرَ عَنِ الْحِيتَانِ يَقْتُلُ بَعْضُهَا بَعْضًا، وَيَمُوتُ صَرَدًا وَفِي أَصْلِ ابْنِ الصَّوَّافِ: وَيَمُوتُ بَرْدًا، قَالَ: «لَيْسَ بِهِ بَأْسٌ» ، قَالَ: وَكَانَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ يَقُولُ مِثْلَ ذَلِكَ، قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا نَأْخُذُ، إِذَا مَاتَتِ الْحِيتَانُ مِنْ حَرٍّ أَوْ بَرْدٍ أَوْ قَتْلِ بَعْضِهَا بَعْضًا، فَلا بَأْسَ بِأَكْلِهَا، فَأَمَّا إِذَا مَاتَتْ مِيتَةَ نَفْسِهَا فَطَفَتْ فَهَذَا يُكْرَهُ مِنَ السَّمَكِ، فَأَمَّا سِوَى ذَلِكَ، فَلا بَأْسَ بِهِ

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

** মাটির বুকে যেমন হাজারো রকমের প্রাণী রয়েছে, তেমনি পানির জগতেও রয়েছে অসংখ্য প্রাণী। দিন দিন সমুদ্র বিজ্ঞানের যতোই উন্নতি হচ্ছে এ সম্পর্কে আমরা ততোই নতুন নতুন তথ্য জানতে পারছি। পানির জগতে বসবাসকারী প্রাণীসমূহ খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ আলেমদের বিভিন্ন মত রয়েছে। ফিক্বিদগণের সর্বাধিক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মতে, পানির জগতের যাবতীয় প্রাণী খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা জায়েয। অপর এক দল ফিকহবিদের মতে, নির্দিষ্ট কতিপয় প্রাণী ছাড়া আর সবই খাওয়া হালাল। আর হানাফী মাযহাবের ফিকহবিদদের মতে, পানির জগতের সকল প্রকারের মাছ খাওয়া হালাল। এছাড়া আর সব প্রাণীই হারাম। আরেক দল ফিকহবিদের মতে, স্থলভাগের যেসব প্রাণী খাওয়া হারাম, পানির জগতের ঐ জাতীয় প্রাণীগুলো ছাড়া আর সবই খাওয়া হালাল। কুরআন মজীদের আয়াতে 'বাহর' (সমুদ্র) শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সাগর-মহাসাগর, নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ইত্যাদি সর্বপ্রকার জলাশয় এর অন্তর্ভুক্ত। এসম্পর্কে কয়েকজন প্রসিদ্ধ তাফসীরকারের অভিমত এখানে উল্লেখ করা হলোঃ
আল্লামা সাইয়েদ মাহমূদ আলূসী (র) লিখেছেন, ইবনে আব্বাস (রা), ইবনে উমার (রা) এবং কাতাদার মতে সমুদ্রের শিকার বলতে পানিতে বসবাসকারী যেসব প্রাণী শিকার করা হয় এবং পরে মারা যায় তা বুঝানো হয়েছে। আর “সমুদ্রের খাদ্য" বলতে সমুদ্র যেসব প্রাণী মৃত অবস্থায় (উপরিভাগে) নিক্ষেপ করে তা বুঝানো হয়েছে। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব, ইবনে জারীর, মুজাহিদ ও ইবনে আব্বাস (রা)-র অপর মত অনুযায়ী প্রথমটির অর্থ সমুদ্রের তাজা খাবার, আর দ্বিতীয়টির অর্থ লবণ (তাফসীরে রূহুল মাআনী, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৩০)।
আল্লামা ফাখরুদ্দীন রাযী (শাফিঈ) বলেন, শিকার শব্দের অর্থ যেসব প্রাণী শিকার করা হয়। পানির জগতের যেসব প্রাণী শিকার করা হয় তা তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। (১) মাছ এবং এই শ্রেণীভুক্ত যাবতীয় প্রাণী, তা খাওয়া হালাল। (২) ব্যাঙ এবং এই শ্রেণীভুক্ত যাবতীয় প্রাণী, তা খাওয়া হারাম। (২) উল্লেখিত দুই প্রকার প্রাণীর বাইরে যেসব প্রাণী রয়েছে তার হারাম বা হালাল হওয়া সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইমাম আবু হানীফার মতে তা হারাম। ইবনে আবু লাইলা এবং অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ আলেমের মতে তা খাওয়া হালাল। সমুদ্র শব্দের অর্থ নদী-নালা ইত্যাদির যাবতীয় পানি। সুমদ্রের শিকার বলতে যেসব প্রাণী কেবল পানিতেই বসবাস করে তাকে বুঝায়। কিন্তু যেসব প্রাণী কিছুক্ষণ স্থলভাগে এবং কিছুক্ষণ জলভাগে বসবাস করে তা স্থলভাগের শিকার হিসাবেই গণ্য হবে। অতএব কাছীম, কাকড়া, উড়োক মাছ, ব্যাঙ, পানির পাখি ইত্যাদি স্থলভাগের শিকার হিসাবে গণ্য হবে (তাফসীরে কাবীর, ১২শ খণ্ড, পৃ. ৯৭-৯৮)।
ইমাম কুরতবী (র) বলেন, ইমাম আবু হানীফা (র) বলেছেন, যাবতীয় প্রকারের মাছ খাওয়া যাবে, এছাড়া পানিতে বসবাসকারী অন্য কোন প্রাণী খাওয়া জায়েয নয়। ইমাম মালেক, শাফিঈ, ইবনে আবু লায়লা, আওযাঈ এবং আসজাঈর বর্ণনা অনুযায়ী সুফিয়ান সাওরী ও জমহূরের মতে পানির জগতের যাবতীয় প্রাণী খাওয়া হালাল, তা মাছ হোক বা অন্য কোন প্রাণী, তা শিকারের মাধ্যমে হস্তগত হোক অথবা মৃত অবস্থায় পাওয়া যাক। কিন্তু ইমাম মালেক সামুদ্রিক শূকর (দেখতে সম্পূর্ণ মাছের মতো) খাওয়া মাকরূহ মনে করছেন এই নামের কারণে, তবে হারাম মনে করতেন না। ইমাম শাফিঈর মতে, সামুদ্রিক শূকর খাওয়ায় কোন দোষ নেই। লাইছ বলেন, সমুদ্রের মৃতজীব খেতে কোন দোষ নেই। ইমাম আবু হানীফা ও শাফিঈর মতে ব্যাঙ এবং এ জাতীয় প্রাণী খাওয়া হারাম, কিন্তু ইমাম মালেকের মতে জায়েয। ইমাম শাফিঈর মতে ডলফিল, উড়োক পাখি ও কুমীর খাওয়া হারাম।
আতা ইবনে আবু রবাহ (র)-কে উভচর প্রাণী (ইবনুল মা) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, তা কি স্থলভাগের শিকার হিসাবে গণ্য হবে না জলভাগের শিকার? তিনি জওয়াবে বলেন, তা অধিকাংশ সময় যেখানে বসবাস করে এবং যেখানে বাচ্চা দেয় সেখানকার প্রাণী হিসাবে গণ্য হবে। ইমাম আবু হানীফারও এই মত। উভচর প্রাণী সম্পর্কে সঠিক কথা হচ্ছে, তা স্থলভাগের প্রাণী হিসাবে গণ্য হবে। ইবনুল আরাবীর মতে তা হারাম। কেননা এগুলোর হালাল হওয়া বা হারাম হওয়া সম্পর্কে উভয় দিকের দলীল রয়েছে। অতএব সতর্কতার খাতিরে হারাম হওয়ার দলীলই অগ্রাধিকার পাবে (আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩১৮-২০)।
আবু বাকর আল-জাসসাস (হানাফী) বলেন, আমাদের মাযহাবের বিশেষজ্ঞ আলেমগণ বলেছেন, لا يؤكل من حيوان الماء الا السمك (মাছ ছাড়া পানির জগতের অন্য কোন প্রাণী খাওয়া যাবে না)। সুফিয়ান সাওরীরও এই মত। ইবনে আবু লায়লা বলেন, ব্যাঙ, সামুদ্রিক সাপ ইত্যাদি পানির যে কোন প্রাণী খাওয়ায় দোষ নেই। মালেক ইবনে আনাসেরও এই মত। ইমাম আওযাঈ বলেন, সমুদ্রের যাবতীয় শিকার খাওয়া হালাল। লাইছ ইবনে সাদ বলেন, সমুদ্রের মৃতঞ্জীব, সামুদ্রিক কুকুর ও সামুদ্রিক ঘোড়া খাওয়ায় কোন দোষ নেই। কিন্তু সামুদ্রিক শূকর খাওয়া যাবে না। ইমাম শাফিঈর মতে পানির জগতে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণীই হালাল। এগুলোকে কাবু করাই হচ্ছে যবেহ করা (অস্ত্র দিয়ে গলা কাটার প্রয়োজন নাই)। সামুদ্রিক শূকর খাওয়াও দোষের ব্যাপার নয়।
যেসব বিশেষজ্ঞ আলেম পানির জগতের যাবতীয় প্রাণী খাওয়া হালাল বলেছেন তারা “তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার হালাল করা হলো" আয়াতকে নিজেদের মতের সপক্ষে দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু (এই তাফসীরকারের মতে) উল্লেখিত আয়াত তাদের এই মতের সমর্থন করে না। কেননা আয়াতটি কেবল হজ্জের উদ্দেশ্যে ইহরামধারীদের জন্য সমুদ্রের শিকার বৈধ করেছে মাত্র। তা খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করার দিকে এ আয়াত ইঙ্গিত করে না। অনন্তর যেসব বিশেষজ্ঞ আলেম পানির জগতের যাবতীয় প্রাণী খাওয়া হালাল বলেন, তাদের এমত মহানবী ﷺ -এর নিম্নোক্ত হাদীসের মাধ্যমে বাতিল প্রমাণিত হয়ঃ “আমাদের জন্য দুই প্রকারের মৃতজীব হালাল করা হয়েছেঃ মাছ ও টিড্ডি”। অতএব এই দুই প্রকারের মৃতজীবকে ব্যতিক্রম করা হয়ছে। এর মাধ্যমে অন্যান্য মৃতজীব হারাম প্রমাণিত হয়। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “তোমাদের জন্য মৃতজীব হারাম করা হয়েছে" (বাকারাঃ ১৭৩; নাহলঃ ১১৫) এবং “কিন্তু যদি মৃতজীব হয় তা হারাম” (আনআমঃ ১৪৪)। সামুদ্রিক শূকরও হারাম। কেননা কুরআন মজীদে তা হারাম করা হয়েছে।
হযরত উছমান (রা)-র পুত্র আবদুর রহমান বলেন, “এক ডাক্তার মহানবী ﷺ এর কাছে ঔষধের কথা উল্লেখ করে। সে তাঁকে আরো জানায় যে, ব্যাঙ দিয়েও ঔষদ তৈরি হয়। মহানবী ﷺ তা নিষেধ করেন”। অতএব ব্যাঙ হচ্ছে পানির প্রাণী। তা খাওয়া এবং কোন কাজে লাগানো জায়েয হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তা হত্যা করতে নিষেধ করতেন না। এ হাদীসের মাধ্যমে ব্যাঙ খাওয়া যখন হারাম প্রমাণিত হয়, তখন এর দ্বারা পানির জগতের যাবতীয় প্রাণী (মাছ ছাড়া) খাওয়া হারাম প্রমাণিত হয়। কেননা এ দু'টি প্রাণীর মধ্যে (জলজ প্রাণী হওয়ার ব্যাপারে) কেউ কোনরূপ পার্থক্য করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। আবু হুরায়রা (রা)-র সূত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর যে হাদীস (সমুদ্রের পানি পাক এবং এর মৃতজীব হালাল) বর্ণিত হয়েছে তা জলভাগের সব প্রাণী হালাল হওয়ার পক্ষে চূড়ান্ত দলীল হিসাবে গ্রহণ করা যায় না। কারণ এ হাদীসের একজন রাবী সাঈদ ইবনে সালামা অপরিচিত ব্যক্তি (আহকামুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ৪৭৯-৮০)।
আবু বাকর আল-জাসসাস (র) জমহূরের দলীল— কুরআনের আয়াতের জওয়াবে যে কথা বলেছেন তা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ উল্লিখিত আয়াতে যদি সমুদ্রের বুকে শুধু শিকারকার্যকেই হালাল করা হয়ে থাকে এবং শিকারকৃত প্রাণী খাওয়া হালাল না করা হয়, তবে এ শিকারকার্য হালাল করার কোন যৌক্তিকতা নেই। তাছাড়া আয়াতেই তো পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে, “সমুদ্রের খাদ্য এবং “তা তোমাদের ও ভ্রমণকারীদের পাথেয়”। দ্বিতীয়ত, তিনি আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের জওয়াবে যা বলেছেন তা খুব একটা শক্তিশালী বক্তব্য নয়। কারণ হানাফী আলেমদের মতেই কোন যঈফ হাদীস একাধিক সূত্রে বর্ণিত হলে তা আর যঈফের পর্যায়ে থাকে না এবং তা দলীল হিসাবে গ্রহণ করা যায়। আবু হুরায়রা (রা) ছাড়াও উল্লিখিত হাদীসটি আবু বুরদা (রা), জাবের (রা) ও ফিরাসী (রা)-র সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। জাস্সাস তার তাফসীরেই ঐ সূত্রগুলো উল্লেখ করেছেন। অনন্তর এ হাদীসে যে বক্তব্য রয়েছে তার সমর্থনে আরো একাধিক হাদীস বিদ্যমান রয়েছে। অতএব একথা স্বীকার করতে কোন দোষ নেই যে, এক্ষেত্রে আমাদের হানাফী মাযহাবের যুক্তি-প্রমাণের তুলনায় জমহূরের দলীল-প্রমাণ অধিক শক্তিশালী ।

মরে ভেসে ওঠা মাছ
মরে পানির উপরিভাগে ভেসে ওঠা মাছকে বলা হয় তাফী (الطافى)। আমাদের হানাফী মাযহাবের বিশেষজ্ঞ আলেমগণ বলেছেন, এ জাতীয় মাছ খাওয়া মাকরূহ। কিন্তু ইমাম মালেক, শাফিঈ, আহমাদ, আসহাবে যাওয়াহির ও জমহূরের মতে তাফী খাওয়া জায়েয, এতে মাকরূহ কিছু নেই । হযরত আলী (রা), জাবের (রা), তাউস, ইবনে সীরীন ও জাবের ইবনে যায়েদ (র) তাফী খাওয়া মাকরূহ বলেছেন। কিন্তু হযরত আলী (রা)-র জায়েয সম্পর্কিত মতও বর্ণিত আছে এবং এটাই সঠিক। মরে পানির উপরিভাগে ভেসে আসা মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রেও হানাফী মাযহাবের যুক্তি-প্রমাণের তুলনায় জমহূরের দলীল অধিক শক্তিশালী।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আবু বাকর (রা) বলেছেন, “তাফী খাওয়া হালাল, যে খেতে চায় তা খেতে পারে। তিনি আরো বলেন, “আমি আবু বাকর (রা) সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি পানির উপর মরে ভেসে উঠা মাছ খেয়েছেন"। একবার আবু আইউব আনসারী (রা) সমুদ্র ভ্রমণে গেলেন। তার সংগীরা পানির উপরিভাগে মরে ভেসে উঠা মাছ পেলেন এবং তা খাওয়া সম্পর্কে তার কাছে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বলেন, “তা খাও এবং আমাকেও দাও”। জাবালা ইবনে আতিয়া (র) বলেন, আবু তালহা (রা)-র সঙ্গীরা পানির উপর ভাসমান মরা মাছ পেলেন। তারা এগুলো খাওয়া সম্পর্কে তার কাছে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বলেন, “আমাকেও তা থেকে উপহার দাও" (ইমাম কুরতুবীর আহকামুল কুরআন, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩১৮-২০)।
নাফে (র) বলেন, আবু হুরায়রা (রা)-র পুত্র আবদুর রহমান (র) আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা)-র কাছে এসে বলেন, সমুদ্র প্রচুর মাছ তীরে নিক্ষেপ করেছে। আমরা কি তা খেতে পারি? তিনি বলেন, “তোমরা তা খেও না"। অতঃপর ইবনে উমার (রা) বাড়িতে গিয়ে কুরআন শরীফ হাতে নিলেন এবং সূরা মাইদা পাঠ করতে করতে “তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার এবং তার খাদ্য হালাল করা হলো.........." আয়াতে পৌঁছলেন। আয়াত পাঠশেষে তিনি আমাকে বলেন, “যাও এবং তাকে বলো, সে যেন তা খায়। কেননা তা খাদ্য" (তাফসীরে ইবনে জারীর তাবারী, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৪৩)।
আবু হুরায়রা (রা) বলেন, আমি যখন বাহরাইন গেলাম, সেখানকার লোকেরা সমুদ্র কর্তৃক নিক্ষিপ্ত মাছ সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করলো। তাদেরকে আমি তা খাওয়ার অনুমতি দিলাম। অতঃপর আমি (মদীনায়) উমার (রা)-র কাছে ফিরে এসে বিষয়টি তাকে জানালাম। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেনঃ “তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার হালাল করা হলো"। অতএব 'সমুদ্রের শিকার' হচ্ছে 'যা শিকার করা হয়' এবং সমুদ্রের খাদ্য 'যা সে উদগীরণ করে' (ফাতহুল বারী, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৬১৪)।
হাম্বলী মাযহাবের বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ আল-মুগনীতে লেখা আছেঃ আবু বাকর (রা) ও আবু আইউব আনসারী (রা) তাফী খাওয়া হালাল বলেছেন। ইমাম শাফিঈ, আতা, মাকহূল, সুফিয়ান সাওরী ও ইবরাহীম নাখঈ এই মত গ্রহণ করেছেন। অপরদিকে জাবের (রা), তাঊস, ইবনে সীরীন, জাবের ইবনে যায়েদ ও হানাফী মতাবলম্বীগণ তাফী খাওয়া মাকরূহ বলেছেন (ঐ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৫৭২)।
হানাফী আলেমগণ নিম্নোক্ত হাদীসের ভিত্তিতে তাফী খাওয়া মাকরূহ বলেনঃ জাবের (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “সমুদ্র যা উদগীরণ করে অথবা তা থেকে যা নিক্ষিপ্ত হয় তা খাও। আর যা সমুদ্রে মারা যায়, অতঃপর পানির উপর ভেসে ওঠে তা খেও না।" কিন্তু এ হাদীসের সনদ সহীহ নয়। ইমাম আবু দাঊদ বলেন, এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর বাণী নয়, বরং জাবের (রা)-র নিজের বক্তব্য। ইমাম দারু কুতনী বলেন, এ হাদীসের এক রাবী আবদুল আযীয ইবনে উবায়দুল্লাহ হাদীস শাস্ত্রে দুর্বল এবং তার বর্ণিত হাদীস দলীল হিসাবে গ্রহণের অযোগ্য। হাদীসটি সুফিয়ান সাওরী থেকে মারফু ও মাওকুফ উভয় সূত্রেই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু মাওকূফ সূত্রটিই সঠিক । আইউব সুখতিয়ানী, উবায়দুল্লহ ইবনে আমর ইবনে জুরাইজ, যুহাইর, হাম্মাদ ইবেন সালামা প্রমুখ রাবীগণ এটাকে মাওকূফ সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইসমাঈল ইবনে উমাইয়া ও ইবনে আবু যেব আবুয-যুবায়রের সূত্রে এ হাদীসটি মারফূ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তা সহীহ নয় (তাফসীরে কুরতুবী, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩১৮-১৯)। তাছাড়া হযরত জাবের (রা) নিজেই তাফী খেয়েছেন বলে তিনি বর্ণনা করেছেন। জায়শুল খাবাত-এর যুদ্ধে তারা সমুদ্রের তীরে বিরাটকায় মরা তিমি মাছ (العنبرة) পান। এক মাস ধরে তিনশো সৈনিক তা খেয়ে শেষ করতে পারেনি। তারা মদীনায় ফিরে এসে এ ঘটনা রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর কাছে বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “তা খাদ্য, তা আল্লাহ তোমাদের জন্য পাঠিয়েছেন। তোমাদের কাছে তা অবশিষ্ট থাকলে আমাদেরও খেতে দাও"। জাবের (রা) বলেন, আমরা তা রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর কাছে পাঠালাম এবং তিনি তা খেলেন (বুখারী, আবু দাউদ ও অন্যান্য) (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান