আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

২- নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ২৭২
- নামাযের অধ্যায়
কুরআনের সিজদাসমূহ।
২৭২। আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার (রাহঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাযিঃ)-কে সূরা হজ্জে দু'টি সিজদা করতে দেখেছেন।

ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, উমার (রাযিঃ) ও তার পুত্র আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে দু'টি সিজদা বর্ণিত আছে। অপরদিকে ইবনে আব্বাস (রাযিঃ)-র মতে, সূরা হজ্জের প্রথমদিকে একটিমাত্র সিজদা আছে। আমরা ও ইমাম আবু হানীফা এই শেষোক্ত মত গ্রহণ করেছি।**
أبواب الصلاة
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ دِينَارٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، «أَنَّهُ رَآهُ» سَجَدَ فِي سُورَةِ الْحَجِّ سَجْدَتَيْنِ "، قَالَ مُحَمَّدٌ: رُوِيَ هَذَا عَنْ عُمَرَ، وَابْنِ عُمَرَ وَكَانَ ابْنُ عَبَّاسٍ لا يَرَى فِي سُورَةِ الْحَجِّ إِلا سَجْدَةً وَاحِدَةً: الأُولَى، وَبِهَذَا نَأْخُذُ، وَهُوَ قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ، رَحِمَهُ اللَّهُ

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

** কুরআন মজীদের কতিপয় সূরায় এমন কতগুলো আয়াত রয়েছে যা তিলাওয়াত করলে বা যার তিলাওয়াত শুনলে সিজদা দিতে হয়। এগুলো হচ্ছেঃ সূরা আরাফের সর্বশেষ আয়াত, রাদ ১৫ নং আয়াত, নাহল ৪৯ নং আয়াত, ইসরা ১০৭-১০৯ আয়াত, আলিফ-লাম-মীম সাজদা ১৫ নং আয়াত, সাদ ২০ নং আয়াত, হা-মীম সাজদা ৩৭-৩৮ নং আয়াত, নাম শেষ আয়াত, ইনশিকাক ২৯ নং আয়াত এবং আলাক শেষ আয়াত ।
ইমাম আহমাদ ও শাফিঈর মতে সিজদার সংখ্যা ১৫। তাদের মতে সূরা হজ্জে দুইটি সিজদা রয়েছে। ইমাম আবু হানীফার মতে সিজদার সংখ্যা ১৪। তার মতে সূরা হজ্জে সিজদা মাত্র একটি (১৮ নং আয়াত)। ইমাম মালেকের মতে এর সংখ্যা ১১। তার মতে সূরা নাম, ইনশিকাক ও আলাক-এ কোন সিজদা নেই। আবু হানীফা ও মালেকের মতে সূরা সাদ-এর সিজদা বাধ্যতামূলক। কিন্তু শাফিঈ ও আহমাদের মতে এটা কৃতজ্ঞতার সিজদা, তিলাওয়াতের সিজদা নয়।
তিলাওয়াতের সিজদা করা ওয়াজিব কিনা এ বিষয়ে মতভেদ আছে। হযরত উমার (রা)-র মতে তিলাওয়াতের সিজদা বাধ্যতামূলক নয়, ঐচ্ছিক। বর্ণিত আছে যে, তিনি মিম্বারে জুমুআর খোতবায় সিজদার আয়াত পাঠ করলেন, অতঃপর নিচে নেমে এসে সিজদা করলেন। পরবর্তী জুমুআর খোতবায়ও তিনি একই আয়াত পাঠ করলেন। লোকজন সিজদার জন্য উদ্যোগী হলে তিনি বলেন, এটা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়নি। আমরা ইচ্ছা করলে সিজদা নাও করতে পারি। অতএব তিনিও সিজদা করেননি এবং উপস্থিত লোকেরাও করেনি। ইমাম শাফিঈ ও আহমাদ এই মত পোষণ করেন (তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৭৫; বুখারী, ১০১১ নং হাদীস)।
ইমাম মালেক ও জমহূরের মতে তিলাওয়াতের সিজাদ করা সুন্নাত। ইমাম আবু হানীফা, মুহাম্মাদ ও আবু ইউসুফের মতে এই সিজদা ওয়াজিব। ইমামদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ মতের সমর্থনে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন। ইমাম আবু হানীফার মতে, তিলাওয়াতের সিজদা করা পাঠক ও শ্রোতা উভয়ের উপরই ওয়াজিব, শ্রোতা চাই ইচ্ছা করে শুনুক অথবা অনিচ্ছায় তার কানে গিয়ে আয়াতের শব্দ পৌঁছুক। অপরাপর ইমামের মতে যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে তিলাওয়াত শুনে কেবল তার উপর সিজদা করা সুন্নাত হিসাবে ধার্য হয়। কিন্তু ইমাম শাফিঈর মতে, শ্রোতার সিজদা করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে সে যদি সিজদা করে তা উত্তম।

তিলাওয়াতের সিজদার জন্য উযুর প্রয়োজনীয়তা
তিলাওয়াতের সিজদা আদায়ের ক্ষেত্রে জমহূর (Majority) আলেমগণ নামায আদায় করার শর্তের অনুরূপ শর্ত আরোপ করেছেন। অর্থাৎ তিলাওয়াতের সিজদা আদায় করার জন্য নামাযের সিজদার ন্যায় কিবলামুখী হতে হবে, উযু থাকতে হবে, মাথা জমীনে রাখতে হবে ইত্যাদি। তাদের মতে বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করা জায়েয নয়। কিন্তু তিলাওয়াতের সিজদার অধ্যায়ে যতোগুলো হাদীস উল্লিখিত হয়েছে তাতে জমহূরের এ মতের অর্থাৎ উযু ছাড়া তিলাওয়াতের সিজদা করা জায়েয নয়, এর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই, প্রকাশ্যেও নেই, ইশারা-ইঙ্গিতেও নেই। তাছাড়া পূর্ববর্তী যুগের বিশেষজ্ঞদের (উলামায়ে সালাফ) মধ্যে এমন ব্যক্তিত্বও রয়েছেন যারা বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা আদায় করেছেন এবং এর বৈধতার স্বপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। আমরা এই শেষোক্ত মত নিয়েই আলোচনা করবো।
এই সিজদা সম্পর্কে যতো হাদীস এসেছে তা থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ সিজদার আয়াত পাঠ করে নিজে সিজদা করেছেন, তাঁর সাহাবীগণও সিজদা করেছেন এবং তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একথা বলেননি যে, তিলাওয়াতের সিজদার জন্য অবশ্যই উযু করতে হবে বা উযু ছাড়া এই সিজদা আদায় করা জায়েয নয়। অপরদিকে এই অধ্যায়ের বিভিন্ন হাদীস থেকে পরিষ্কারভাবে জানা যায় যে, এই সিজদা বিনা উযুতেও করা হয়েছিল এবং মহানবী ﷺ এর বিরুদ্ধে অসম্মতি জ্ঞাপন করেননি
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেনঃ “কোন ব্যক্তি যখন সিজদার আয়াত পাঠ করে সিজদায় অবনত হয় তখন শয়তান কাঁদতে কাঁদতে তার থেকে পৃথক হয়ে যায়। সে বলে, হায় আফসোস! আদম সন্তানকে সিজদা করার নির্দেশ দেয়া হলে সে সিজদা করে বেহেশতের অধিকারী হয়েছে। আর আমাকে সিজদা করার হুকুম দেয়া হলে আমি তা প্রত্যাখ্যান করে দোযখী হয়েছি” (ইবনে মাজা)। এ হাদীসে তিলাওয়াতের সিজদা করার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়েছে।
আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ মিম্বারের উপর সূরা 'সাদ' পাঠ করলেন । যখন সিজদার আয়াতে পৌছলেন তখন মিম্বার থেকে নেমে এসে সিজদা করলেন এবং লোকজনও তাঁর সাথে সিজদা করলো (আবু দাউদ)।
আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের কুরআন পাঠ করে শুনাতেন। তিনি সিজদার আয়াতে পৌঁছে ‘আল্লাহু আকবার' বলে সিজদায় যেতেন এবং আমরাও তাঁর সাথে সিজদায় যেতাম (আবু দাউদ)। এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং সাহাবাগণ তিলাওয়াতের সিজদা করেছেন। কিন্তু এর কোন বর্ণনা থেকেই প্রমাণিত হয় না যে, মহানবী ﷺ তিলাওয়াতের সিজদার জন্য উযুর নির্দেশ দিয়েছেন।

বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদার হাদীস
ইবনে উমার (রা) বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন নবী ﷺ সিজদার আয়াত পাঠ করলেন। সব লোক সিজদা করলো। এদের মধ্যে আরোহীও ছিলো এবং পদাতিকও ছিলো। আরোহীরা নিজ নিজ হাতের উপর সিজদা করলো (আবু দাউদ)।
ইবনে উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সামনে নামাযের বাইরে সূরা পাঠ করে সিজদা করতেন এবং আমরাও তাঁর সাথে সিজদা করতাম। এমনকি ভীড়ের কারণে আমাদের অনেক লোক জমীনে মাথা রাখার জায়গা পেতো না (আবু দাউদ)।
এ হাদীস দু'টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, কোন কোন ক্ষেত্রে লোকেরা বিনা উযুতেও তিলাওয়াতের সিজদা করেছে। প্রথম হাদীস থেকে জানা যায়, মহানবী ﷺ -এর মক্কা বিজয়ের সময় এ সিজদার ঘটনা ঘটেছে। তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলো হাজার হাজার লোক। এ থেকে আরো জানা যায়, এই সিজদা ছিল নামাযের বাইরে, নামাযের মধ্যে নয়। কেননা হাদীস থেকে জানা যায়, আরোহী লোকেরা বাহনে বসেই সিজদা করেছে। অথচ ভয়ানক পরিস্থিতি ব্যতীত স্বাভাবিক অবস্থায় বাহনের উপর ফরয নামায পড়া জায়েয নয়। এই হাজার হাজার লোকের সবাই নামাযের বাইরে উযুর অবস্থায় ছিলো দাবি করা যায় না। অতএব বলা যায়, এ সময় কতিপয় লোক বিনা উযুতে সিজদা করে থাকবে। এদিক থেকে চিন্তা করলে বলা যায়, বিনা উযুতেও তিলাওয়াতের সিজদা করা জায়েয।
দ্বিতীয় হাদীস থেকে জানা যায়, এই সিজদাও নামাযের বাইরে ছিল এবং লোকের ভিড় এতো অধিক ছিলো যে, মাটিতে কপাল রাখার মতো জায়গাও পাওয়া যায়নি। এক্ষেত্রেও উপস্থিত সব লোক প্রথম থেকেই উযুর অবস্থায় ছিলো তা দাবি করা যায় না। এ হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ থেকে এটা অনুমান করা মোটেই অযৌক্তিক নয় যে, এক্ষেত্রেও কতিপয় লোক বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করে থাকবে।
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নবী ﷺ সূরা নাজমে সিজদা করেছেন এবং তার সাথে মুসলমান, মুশরিক এবং জিন-ইনসান সবাই সিজদা করেছে (বুখারী)।
ইমাম বুখারী এ হাদীসের অনুচ্ছেদে লিখেছেন, মুশরিকরা নাপাক, এদের উযুর কোন অর্থ নেই । ইবনে উমার (রা) বিনা উযুতে সিজদা করতেন (ওয়া কানাবনু উমারা ইয়াসজুদু আলা গাইরি উদূ)। উল্লেখিত হাদীস থেকেও প্রমাণিত হয় যে, এক্ষেত্রেও কতিপয় লোক বিনা উযুতে সিজদা করেছে। অর্থাৎ এ হাদীস থেকেও জানা যায় যে, বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করা জায়েয।
পূর্ববর্তী যুগের আলেমদের (উলামায়ে সালাফ) মতে বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করা জায়েয। পূর্ববর্তীদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা), ইমাম শাবী এবং পরবর্তী যুগের আলেমদের মধ্যে ইমাম বুখারী সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে যে, তাদের মতে বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করা জায়েয। অনেক প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও হাদীসব্যাখ্যাতা তাদের এই মতের উল্লেখ করেছেন। নিম্নে কতিপয় বিশেষজ্ঞের মতামত আমরা উল্লেখ করছি।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী ও হাফেজ ইবনে হাজারের পর্যালোচনা
ইতিপূর্বে আমরা ইবনে উমার (রা) সম্পর্কে ইমাম বুখারীর বক্তব্য উল্লেখ করেছি যে, 'তিনি বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করতেন।' এই মতের পর্যালোচনা করতে গিয়ে আল্লামা আইনী ও ইবনে হাজার বলেছেনঃ
অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও উসাইলীর বর্ণনায় গাইর (غير) শব্দটি নেই। ইবনে উমারের মর্যাদার সাথে এই বর্ণনা সামঞ্জস্যশীল। কেননা ইমাম শাবী ব্যতীত আর কেউই তার এ মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেননি। কিন্তু 'গাইর' শব্দসহ যে বর্ণনাটি এসেছে তাই সহীহ। কেননা ইবনে আবু শায়বা বর্ণনা করেছেন, 'ইবনে উমার (রা) পেশাব করার জন্য সওয়ারী থেকে নামতেন। অতঃপর পেশাব সেরে পুনরায় বাহনে আরোহণ করে সিজদার আয়াত পাঠ করতেন এবং বিনা উযুতেই সিজদা করতেন।' অপরদিকে বায়হাকীর বর্ণনায় রয়েছে, ইবনে উমার (রা) বলেছেন, 'কোন ব্যক্তি যেন পবিত্র অবস্থা ব্যতীত সিজদা না করে।' এ দু'টি বর্ণনার মধ্যে এভাবে সামঞ্জস্য বিধান করা যায় যে, বায়হাকীব বর্ণনা বড়ো ধরনের পবিত্রতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অথবা সুবিধাজনক অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং অপর বর্ণনাটি জরুরী অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য (ফাতহুল বারী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪83)।
এ আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারিঃ (এক) ইবনে উমারের মাযহাব অনুযায়ী বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করা জায়েয। (দুই) তার কাছ থেকে যে বিপরীতমুখী বর্ণনা এসেছে তার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য বলা যায় (ক) বায়হাকীর বর্ণনা বড়ো ধরনের পবিত্রতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, অর্থাৎ জানাবাতের অবস্থায় (যেক্ষেত্রে গোসল করা ফরয) তিলাওয়াতের সিজদা করা জায়েয নয়। আর ইবনে আবু শায়বার বর্ণনা ছোট ধরনের পবিত্রতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ হাদাসে আসগার (যেক্ষেত্রে উযু করা আবশ্যক) অবস্থায় বিনা উযুতে এই সিজদা করা জায়েয। (খ) ইবনে উমারের মতে সুবিধাজনক অবস্থায় এই সিজদা করার জন্য তাহারাত এবং উযু শর্ত (বায়হাকীর বর্ণনা অনুযায়ী)। কিন্তু জরুরী অবস্থায় তার মতে উযু ও পবিত্রতার প্রয়োজন নেই (ইবনে আবু শায়বার বর্ণনা অনুযায়ী)।
ইবনে উমারের সাথে একমত হয়ে ইমাম শাবী বলেন, বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করা যায়। এতে কোন দোষ নেই। শাফিঈ মাহযাবের কতিপয় উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞের ভাষ্য থেকে জানা যায়, তাবিঈ ইবনুল মুসাইয়্যাবের মতে তিলাওয়াতের সিজদার জন্য উযু ও তাহারাত (পবিত্রতা) শর্ত নয়। কেননা তিনি বলেছেন, ঋতুবতী মহিলা যদি সিজদার আয়াত শোনে তবে সে মাথার ইশারায় সিজদা করবে এবং বলবে, আমার মাথা সেই সত্তাকে সিজদা করলো যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আকৃতি দান করেছেন" (ইমাম শারানী, মীযানুল কুবরা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৭৭; রহমাতুল উম্মাহ, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৫৩)। অথচ ঋতুবতী স্ত্রীলোকের উযু ও তাহারাতের অবকাশ নেই।

হাদীস বাখ্যাকারদের মতে ইমাম বুখারীর মাযহাব
ইমাম বুখারীর মতে বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করা জাযেয় কি নাজায়েয তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ সম্পর্কে ইবনে হাজার আসকালানী (র) বলেন, ইবনে বাত্তাল ইমাম বুখারীর তরজমাতুল বাব সম্পর্কে আপত্তি তুলে বলেন, ইমাম বুখারীর উদ্দেশ্য যদি ইবনে উমারের মতের স্বপক্ষে মুশরিকদের সিজদাকে দলীল হিসাবে পেশ করা হয়ে থাকে তাহলে এটা সম্ভব নয়। কেননা মুশরিকদের এই সিজদা ইবাদত হিসাবে ছিলো না, বরং ছিলো শয়তানী নির্দেশনারই ফল। আর যদি তিনি এর দ্বারা ইবনে উমারের মত প্রত্যাখ্যান করতে চেয়ে থাকেন তাহলে এটাই সত্যের বেশী কাছাকাছি।
ইবনে বাত্তালের মতে ইমাম বুখারীর মাযহাব সুস্পষ্ট নয়। কিন্তু ইবনে রশীদ একদিকে তার এ মতের জবাব দিয়ে ইমাম বুখারীর মাযহাবকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন এবং অপরদিকে তরজমাতুল বাবের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্দ্ধারণ করেছেন। ইবনে হাজার তার বক্তব্য এভাবে তুলে ধরেছেনঃ
ইবনে রশীদ ইবনে বাত্তালের আপত্তির জবাবে বলেছেন, ইমাম বুখারী এখানে সিজদার বিধিবদ্ধ মর্যাদা দেওয়ার জন্য এবং তা শক্তিশালী করার জন্য মুশরিকদের সিজদার উল্লেখ করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে, মুশরিকরা সিজদার জন্য আদিষ্ট না হওয়া সত্ত্বেও সিজদা করেছে এবং সাহাবীও (ইবনে আব্বাস) এটাকে সিজদা বলে উল্লেখ করেছেন। অতএব সিজদা দেয়ার অধিকারী মুসলমানদের জন্য উত্তমরূপেই এটা জায়েয হওয়া উচিত যে, তারা যে কোন অবস্থায় সিজদা করবে। বুখারীর তর্জমাতুল বাব এবং ইবনে উমারের আছারের মধ্যে এভাবেও সামঞ্জস্য বিধান করা যায় যে, তিলাওয়াত শুনার সময় উপস্থিত সব লোকই যে উযু অবস্থায় থাকবে এটা স্বাভাবিক নয়। কেননা তারা এজন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে আসেনি। অতএব উপস্থিত লোকদের মধ্যে অনেকে সিজদা পরিত্যক্ত হওয়ার আশংকায় বিনা উযুতে সিজদা করে থাকবে এবং নবী ﷺ ও একাজের অনুমোদন দিয়ে থাকবেন। আর এটাকে অসুবিধাজনক পরিস্থিতিতে বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করা জায়েয হওয়ার পক্ষে দলীল হিসাবে গ্রহণ করা যায়। হাদীসের মতনে (মূল পাঠে) আছে যে, মহানবী ﷺ -এর সাথে মুসলিম-মুশরিক, জিন, ইনসান সবাই সিজদা করেছে-এই বক্তব্য উল্লেখিত মতকে আরো শক্তিশালী করে। ইবনে আব্বাস (রা) সবার জন্য সিজদা শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অথচ তাদের মধ্যে এমন লোকও ছিল যাদের উযু ঠিক ছিলো না। অতএব একথা জোর দিয়েই বলা যায় যে, যার উযু নেই সেও এই সিজদা করতে পারে” (ফাতহুল বারী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪৪৩)।
ইবনে রশীদের এই জবাব থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, ইমাম বুখারী তরজমাতুল বাব সংযোজন করে এবং ইবনে উমারের 'আছার' সংকলন করে এ কথাই প্রমাণ করতে চাচ্ছেন যে, বিনা উযুতেও তিলাওয়াতের সিজদা করা জায়েয এবং এটাই তার মাযহাব। ইবনে আব্বাসের বর্ণিত হাদীসও তিনি তার এই মতের সমর্থনে নিয়ে এসেছেন।

আনোয়ার শাহ কাশমিরীর অভিমত
দেওবন্দ মাদ্রাসার অন্যতম শিক্ষক এবং ভারত উপমহাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ মওলানা সাইয়েদ আনোয়ার শাহ কাশমিরী (র) বলেন, “তিলাওয়াতের সিজদা আদায় করার জন্য ইমাম শাবী ও ইমাম বুখারীর মতে উযু শর্ত নয়। ইমাম বুখারী এ মতের সমর্থনে ইবনে উমার (রা)-র এই আছার নকল করেছেন যে, তিনি বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করতেন” (শাহ সাহেবের বক্তৃতায়ালার সংকলন 'উরফুশ শাযী', প্রথম খণ্ড, পৃ. ৮)। তিনি তার দরসে তিরমিযীতেও একথা বলেছেন যে, ইমাম শাবী ও ইমাম বুখারী উভয়ে ইবনে উমার (রা)-র মতো বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করা জাযেয় হওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।
তিনি তার (বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ) ফায়দুল বারী কিতাবের ২য় খণ্ডের ৩৯১ পৃষ্ঠায় বলেন, ইবনে উমার (রা) হয়তো বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করার নীতি অবলম্বন করেছেন। সালাফদের মধ্যে ইমাম শাবীও এই মত গ্রহণ করেছেন।.... ইবনে উমারের আছারের বিভিন্ন জবাব দেয়া যেতে পারে। (এক) তার এ মাযহাব অন্য সাহাবীরা অনুসরণ করেননি। (দুই) টীকায় গাইর (ব্যতীত) শব্দটির উল্লেখ নাই। সুতরাং আর কোন সমস্যাই থাকে না। (তিন) যদি তিনি বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করার পন্থা বেছে নিয়ে থাকেন তাহলে বলা যায়, এটা হলো মৌখিক ইবাদত, দৈহিক ইবাদত নয় (ইন্নাহা ইবাদাতুন আলাল লিসান লা আলাল জাসাদ)। মৌখিক ইবাদত যিকিরের অন্তর্ভুক্ত। এর জন্য উযুর প্রয়োজন নেই। তাৎপর্যের দিক থেকে নামাযের সিজদার তুলনায় এটা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ।
শাহ সাহেবের আলোচনায়ও দেখা যায়, ইমাম শাবী ও ইমাম বুখারীর মত হচ্ছে বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করা জায়েয। এই সিজদার জন্য উযু শর্ত নয়। ইমাম বুখারী তার মতকে শক্তিশালী করার জন্যই ইবনে উমারের কর্মনীতি তরজমাতুল বাবে সংযোজন করেছেন।

সায়্যিদ আবুল আলা মওদূদীর অভিমত
মওলানা সায়্যিদ আবুল আলা মওদূদী (র)-এর মতে বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করা জায়েয। এই সিজদা সম্পর্কে তিনি বলেন, “কুরআন মজীদে চৌদ্দটি স্থান রয়েছে যেখানে সিজদার আয়াত এসেছে। এই আয়াতগুলোতে সিজদা বিধিবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু তা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (র) তিলাওয়াতের সিজদা ওয়াজিব বলেছেন। অপরাপর বিশেষজ্ঞগণ এটাকে সুন্নাত বলেছেন। অনেক সময় নবী ﷺ বড়ো বড়ো জনসামাবেশে কুরআন পাঠ করতেন। এতে যখন সিজদার আয়াত এসে যেতো তখন তিনি নিজেও সিজদায় লুটিয়ে পড়তেন, আর যে ব্যক্তি যেখানে থাকতো সে সেখানেই সিজদায় পড়ে যেতো। এমনকি যদি কেউ সিজদা করার জন্য জায়গা না পেতো তাহলে সে তার সামনের ব্যক্তির পিঠের উপর মাথা রেখে দিতো। হাদীসে এও এসেছে যে, তিনি মক্কা বিজয়ের সময় কুরআন পাঠ করলেন এবং তাতে সিজদার আয়াত এলে যে ব্যক্তি জমিনের উপর দাঁড়িয়েছিল সে জমিনে সিজদা করলো, আর যারা ঘোড়া ও উটের পিঠে সওয়ার ছিল তারা নিজেদের সওয়ারীর উপরই সিজদায় ঝুঁকে পড়লো। কখনো কখনো তিনি খুতবায় সিজদার আয়াত পাঠ করেছেন, অতঃপর মিম্বার থেকে নেমে এসে সিজদা করেছেন এবং পুনরায় মিম্বারে উঠে খুতবা দিয়েছেন।”
“এই সিজদা আদায়ের জন্য জমহূর আলেমগণ নামাযে আরোপিত শর্তসমূহ আরোপ করেছেন । অর্থাৎ উযু থাকতে হবে, কিবলামুখী হতে হবে, নামাযের অনুরূপ সিজদা দেয়ার জন্য জমিনে মাথা রাখতে হবে। কিন্তু তিলাওয়াতের সিজদার অধ্যায়ে আমরা যতো হাদীস পেয়েছি তাতে এসব শর্তের স্বপক্ষে কোন দলীল মওজুদ নেই। এসব হাদীস থেকে এটা জানা যায়, যে ব্যক্তি যেখানে যে অবস্থায়ই থাকুক সে সিজদার আয়াত শুনামাত্র সিজদায় ঝুঁকে যাবে, চাই উযু থাক বা না থাক, কিবলামুখী হওয়া সম্ভব হোক বা না হোক, জমিনে মাথা রাখার সুযোগ থাক বা না থাক। সালাফে সালেহীনের মধ্যেও আমরা এমন ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাই যাদের কর্মপন্থা এরূপ ছিল। ইমাম বুখারী (র) আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) সম্পর্কে লিখেছেন যে, তিনি বিনা উযুতে তিলাওয়াতের সিজদা করতেন। আবদুর রহমান ইবনুস সুলামী (রা) সম্পর্কে ফাতহুল বারী গ্রন্থে লেখা আছে, তিনি রাস্তায় চলতে চলতে কুরআন মজীদ পাঠ করতেন। আর যদি কোথাও সিজদার আয়াত এসে যেতো অমনি সাথে সাথে মাথা নত করে দিতেন,চাই উযু থাক বা না থাক, কিবলামুখী হোক বা না হোক। এসব কারণে আমরা মনে করি, যদিও জমহূরের অভিমতের মধ্যেই অধিক সতর্কর্তা রয়েছে, কিন্তু যদি কোন ব্যক্তি জমহূরের মতের পরিপন্থী কাজ করে তবে তাকে তিরস্কার করা যায় না। কেননা জমহূরের মতের সমর্থনে কোন প্রমাণিত সুন্নাহ (হাদীস) বিদ্যমান নেই। আর সালাফে সালেহীনের মধ্যেও এমন লোক পাওয়া যাচ্ছে যাদের কর্মনীতি জমহূরের মতের পরিপন্থী ছিল” (তাফহীমুল কুরআন, ১১শ সংস্করণ, ২য় খণ্ড, সূরা আরাফ, টীকা নম্বর ১৫৭) (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান