শরহু মাআ’নিল আছার- ইমাম ত্বহাবী রহঃ

৬. হজ্বের অধ্যায়

হাদীস নং: ৩৫১৩
আন্তর্জাতিক নং: ৩৫১৭
হজ্বের অধ্যায়
মীকাত, ইহরাম ব্যতীত যে স্থান অতিক্রম করা জায়েয নয়
৩৫১৩-১৭। ইউনুস (রাহঃ) ......... ইব্ন উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ মদীনাবাসীরা ‘যুল হুলাইফা’ থেকে শামবাসীরা ‘জুহফা’ থেকে নাজদবাসীরা ‘কারণ’ থেকে ইহরাম বাঁধবে। আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, আমার নিকট একথাটি পৌঁছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, এবং ই্য়ামানবাসীরা ‘ইয়লামলাম’ থেকে ইহরাম বাঁধবে।

ইব্ন মারযূক (রাহঃ) ও আলী ইব্ন শায়বা (রাহঃ) ......... ইব্ন উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনাবসীদের জন্য ‘যুল হুলাইফা’ শাম (সিরিয়া) বাসীদের জন্য ‘জুহফা’ নাজদবাসীদের জন্য ‘কারণ’ ও ইয়ামানবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম’ (নামক স্থানকে) মীকাত নির্ধারণ করেছেন।

ইউনুস (রাহঃ) ......... ইব্ন উমর (রাযিঃ) সূত্রে নবী করীম (ﷺ) থেকে অনুরূপ রিওয়ায়াত করেছেন। অপরাপর আলিমগণ এ বিষয়ে তাদের বিরোধিতা করে বলেছেনঃ বরং ইরাকবাসীদের মীকাত হলো ‘যাত ইরক’। তাদের জন্য এই মীকাত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অনুরূপভাবে নির্ধারণ করেছেন। যেমনি ভাবে অন্য সমস্ত এলাকাবাসীর জন্য মীকাত নির্ধারণ করেছেন। তাঁরা এ বিষয়ে নিন্মোক্ত হাদীস উল্লেখ করেছেন ঃ
كتاب مناسك الحج
17- 3513 - مَا حَدَّثَنَا يُونُسُ قَالَ: أنا ابْنُ وَهْبٍ أَنَّ مَالِكًا حَدَّثَهُ عَنْ نَافِعٍ عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يُهِلُّ أَهْلُ الْمَدِينَةِ مِنْ ذِي الْحُلَيْفَةِ وَأَهْلُ الشَّامِ مِنَ الْجُحْفَةِ وَأَهْلُ نَجْدٍ مِنْ قَرْنٍ» قَالَ عَبْدُ اللهِ: وَبَلَغَنِي أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يُهِلُّ أَهْلُ الْيَمَنِ مِنْ يَلَمْلَمَ»

حَدَّثَنَا ابْنُ مَرْزُوقٍ قَالَ: ثنا وَهْبٌ قَالَ: ثنا شُعْبَةُ ح

وَحَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ شَيْبَةَ قَالَ: ثنا أَبُو نُعَيْمٍ قَالَ: ثنا سُفْيَانُ قَالَ: ثنا شُعْبَةُ، عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ دِينَارٍ، عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

وَقَالَ سُفْيَانُ، عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ دِينَارٍ قَالَ: سَمِعْتُ ابْنَ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا يَقُولُ: «وَقَّتَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَهْلِ الْمَدِينَةِ ذَا الْحُلَيْفَةِ، وَلِأَهْلِ الشَّامِ الْجُحْفَةَ، وَلِأَهْلِ نَجْدٍ قَرْنَ، وَلِأَهْلِ الْيَمَنِ يَلَمْلَمَ» .

حَدَّثَنَا يُونُسُ , قَالَ: أنا ابْنُ وَهْبٍ أَنَّ مَالِكًا أَخْبَرَهُ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ دِينَارٍ , عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَحْوَهُ. وَخَالَفَهُمْ فِي ذَلِكَ آخَرُونَ، فَقَالُوا: بَلْ مِيقَاتُ أَهْلِ الْعِرَاقِ ذَاتُ عِرْقٍ، وَقَّتَ ذَلِكَ لَهُمْ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمَا وَقَّتَ سَائِرَ الْمَوَاقِيتِ لِأَهْلِهَا. وَذَكَرُوا فِي ذَلِكَ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

মীকাত, ইহরাম ও তালবিয়া প্রসঙ্গ

আল্লাহ্ তা'আলা কাবা শরীফকে ঈমানদারদের কেবলা এবং নিজের সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ ঘর বানিয়েছেন। আর আগেই যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, যেসব লোক সেখান পর্যন্ত পৌছার সামর্থ্য রাখে, তাদের উপর জীবনে একবার সেখানে উপস্থিত হওয়া এবং হজ্ব করা ফরয করে দিয়েছেন। এর সাথে এ উপস্থিতি ও হজ্বের জন্য কিছু অপরিহার্য আদাব ও নিয়ম-নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে একটি নিয়ম এই যে, আল্লাহর ঘরের হজ্বের জন্য যে সেখানে উপস্থিত হবে, সে দৈনন্দিনের সাধারণ পরিধেয় কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ কোন পোশাক পরিধান করে উপস্থিত হবে না; বরং এমন দরিদ্রের মত লেবাস নিয়ে হাজির হবে, যা মুর্দার কাফনের সাথে সামঞ্জস্য রাখে এবং আখেরাতে হাশরের ময়দানের উপস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। জামা, পায়জামা, কটি, শেরওয়ানী, কোট ইত্যাদি কিছুই গায়ে থাকবে না। কেবল একটি লুঙ্গি পরনে থাকবে, আর একটি চাদর শরীরের উপরিভাগে ফেলে রাখবে। মাথাও খোলা থাকবে, পায়ে মোজা; বরং এমন জুতাও থাকতে পারবে না- যা দ্বারা পা সম্পূর্ণ ঢেকে যায়। (অবশ্য মহিলাদের বেলায় তাদের পর্দার খাতিরে সেলাই করা কাপড় পরিধান, মাথা ঢাকা ও পায়ে মোজা ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে।) এ ধরনের আরও কিছু বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে, যেগুলোর উদ্দেশ্য এই যে, বান্দা সেখানে যেন এমন আকৃতি ও অবস্থা নিয়ে উপস্থিত হয়, যার দ্বারা তার অক্ষমতা, দীনতা-হীনতা এবং দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের প্রতি তার অনাসক্তি প্রকাশ পায়।

তবে বান্দাদের দুর্বলতার প্রতি লক্ষ্য রাখতে গিয়ে তাদের উপর এ নির্দেশ আরোপ করা হয়নি যে, তারা নিজেদের বাড়ী থেকেই ইহরাম বেধে এসব নিয়ম পালন করতে করতে যাত্রা শুরু করবে। যদি এমন নির্দেশ দেওয়া হত, তাহলে আল্লাহর বান্দাদের জন্য সমস্যা হয়ে যেত। কিছুদিন পূর্বেও অনেক দেশের হাজীগণ মাসকে মাস সফর করার পর মক্কা শরীফে গিয়ে পৌছতেন। বর্তমানেও কোন কোন দেশের হাজীরা কয়েক সপ্তাহের স্থলপথের ও জলপথের সফর করে সেখানে পৌঁছে থাকেন। এ কথা স্পষ্ট যে, এ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইহরামের বাধ্যবাধকতা রক্ষা করে চলা অধিকাংশ লোকের জন্য বিরাট কঠিন বিষয় হয়ে যেত। এ জন্য বিভিন্ন পথে আগত হাজীদের জন্য মক্কা শরীফের কাছে বিভিন্ন দিকে কিছু স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এবং নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, হজ্ব অথবা উমরা পালনের জন্য আগমনকারীরা যখন এসব স্থানে পৌঁছবে, তখন 'বায়তুল্লাহ' ও 'পবিত্র নগরী' এর আদব রক্ষার্থে সেখান থেকেই ইহরামধারী হয়ে যাবে। বিভিন্ন দিকের এ নির্দিষ্ট স্থানগুলোকে 'মীকাত' বলা হয়- যার বিস্তারিত পরিচয় সামনে আসবে।

এ কথাটিও বুঝে নিতে হবে যে, ইহরাম বাঁধার অর্থ কেবল ইহরামের কাপড় পরিধান করা নয়; বরং ইহরামের কাপড় পরিধান করে প্রথমে দু'রাকআত ইহরামের নামায পড়তে হয়। তারপর উঁচু গলায় তালবিয়া পাঠ করতে হয়:

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ

এ তালবিয়া পাঠ করার পর মানুষ মুহরিম হয়ে যায় এবং এর দ্বারাই হজ্বের কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। আর এর দ্বারাই ইহরামজনিত সকল বাধ্যবাধকতা তার উপর আরোপিত হয়, যেভাবে তাকবীরে তাহরীমা বলার পর নামাযের কাজ শুরু হয়ে যায় এবং নামাযের সকল বাধ্যবাধকতা আরোপিত হয়।

এ ভূমিকার পর এবার মীকাত সম্পর্কে আলোচনা:

কোন কোন হাদীসে কেবল চারটি মীকাতের উল্লেখ রয়েছে। (১) যুল হুলায়ফা, (২) জুহফা, (৩) কারনুল মানাযিল, (৪) ইয়ালামলাম। আর হযরত জাবের বর্ণিত হাদীসে পঞ্চম মীকাত হিসাবে 'যাতে ইরক' এরও উল্লেখ রয়েছে এবং এটাকে ইরাকবাসীদের মীকাত বলা হয়েছে। কোন রেওয়ায়াতে জুহফাকে শামবাসীদের মীকাত বলা হয়েছে, আর কোন বর্ণনায় এটাকে অন্য পথে আগমনকারীদের মীকাত বলা হয়েছে- যার অর্থ বাহ্যত এই যে, মদীনাবাসীরাও যদি অন্য পথে (অর্থাৎ, জুহফার পথ ধরে) মক্কা শরীফ যায়, তাহলে তারা জুহফা থেকেও ইহরাম বাঁধতে পারে। আর তাদের ছাড়া অন্য এলাকার যেসব লোক যেমন, শামবাসীরা যদি জুহফার দিক থেকে আসে, তাহলে তারাও জুহফা থেকেই ইহরাম বাঁধবে। কোন কোন হাদীস ব্যাখ্যাতা অন্য পথে আগমনকারী দ্বারা শামবাসীদেরকেই উদ্দেশ্য করেছেন। এ অর্থ গ্রহণ করলে রেওয়ায়াতগুলোর মধ্যে কেবল ভাষা ও শব্দের পার্থক্য থাকবে। যাহোক, এ পাঁচটি স্থান হচ্ছে নির্ধারিত ও সর্বসম্মত মীকাত। যেসব এলাকার জন্য এগুলোকে মীকাত নির্ধারণ করা হয়েছিল, এগুলো মক্কা আগমনকারীদের পথে পড়ত। এসব স্থানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এই:

যুল হুলায়ফা: এটা মদীনাবাসীদের মীকাত। মদীনা শরীফ থেকে মক্কা মুকাররামা যাওয়ার পথে মাত্র ৫/৬ মাইলের মাথায় পড়ে। এটা মক্কা শরীফ থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী মীকাত। এখান থেকে মক্কা শরীফ প্রায় ২০০ মাইল; বরং আজকালকার পথে প্রায় ২৫০ মাইল।

যেহেতু মদীনাবাসীর দ্বীনের সাথে বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে, এজন্য তাদের মীকাতও এত দূরত্বে নির্ধারণ করা হয়েছে। কেননা, দ্বীনের ক্ষেত্রে যার মর্যাদা যত বেশী তাকে কষ্টও তত বেশী করতে হয়।

জুহফা: এটা শাম ইত্যাদি পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা থেকে আগত লোকদের মীকাত। এটা বর্তমানে 'রাবেগ'-এর নিকটবর্তী একটি জনপদ ছিল। বর্তমানে এ নামের কোন জনপদ নেই। তবে এতটুকু জানা যায় যে, এর অবস্থান বাবেগের কাছেই ছিল, যা মক্কা শরীফ থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে পশ্চিম দিকে সমুদ্র তীরের কাছে অবস্থিত।

কারনুল মানাযিল: এটা নজদ অঞ্চলের দিক থেকে আগমনকারীদের মীকাত। মক্কা শরীফ থেকে প্রায় ৩০/৩৫ মাইল পূর্ব দিকে নজদগামী রাস্তার উপর এটি একটি ছোট পাহাড়।

যাতে ইরক: এটা ইরাক থেকে আগমনকারীদের মীকাত। মক্কা শরীফ থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে ইরাকগামী রাস্তার উপর অবস্থিত। এর দূরত্ব মক্কা শরীফ থেকে প্রায় ৫০ মাইলের মত।

ইয়ালামলাম: এটা ইয়ামানের দিক থেকে আগমনকারী লোকদের মীকাত। এটা তিহামার পাহাড়সমূহের মধ্যে একটি প্রসিদ্ধ পাহাড়- যা মক্কা শরীফ থেকে প্রায় ৪০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে ইয়ামান থেকে মক্কাগামী রাস্তায় পড়ে।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ পাঁচটি স্থানকে এগুলোর অধিবাসীদের জন্য এবং অন্যান্য এলাকার ঐসব লোকদের জন্য- যারা হজ্ব অথবা উমরার উদ্দেশ্যে এসব স্থান অতিক্রম করে আসবে, তাদের জন্য মীকাত নির্ধারণ করেছেন। উম্মতের ফকীহদের এ কথার উপর এজমা ও ঐকমত্য রয়েছে যে, যে ব্যক্তি হজ্ব অথবা উমরার জন্য এসব স্থানের যে কোন একটি দিয়ে আসবে, তার জন্য এটা জরুরী যে, সে ইহরাম বেঁধে এ স্থান থেকে সামনে অগ্রসর হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.):
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)