মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

৩১- সাহাবায়ে কিরামের রাঃ মানাকিব ও ফাযায়েল

হাদীস নং: ৬১০২
- সাহাবায়ে কিরামের রাঃ মানাকিব ও ফাযায়েল
তৃতীয় অনুচ্ছেদ -আলী ইবনু আবু ত্বালিব (রাঃ)-এর মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য
৬১০২। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) আমাকে বলিয়াছেনঃ তোমার মধ্যে ঈসা (আঃ) -এর সাদৃশ্য রহিয়াছে। ইহুদীরা তাঁহাকে এমনভাবে হিংসা করে যে, তাহার মায়ের উপর অপবাদ রটাইয়া ছাড়ে। পক্ষান্তরে নাসারাগণ তাঁহাকে মহব্বত করিতে যাইয়া তাঁহাকে এমন স্থানে পৌঁছাইয়া দেয়, যাহা তাঁহার জন্য শোভনীয় নয়। অতঃপর আলী (রাঃ) বলিলেন, আমার ব্যাপারে দুই দল ধ্বংস হইবে। (একদল) অত্যধিক প্রেমিক, যাহারা আমার প্রশংসায় এমন সব গুণাবলী বলিবে, যাহা আমার মধ্যে নাই। আর (দ্বিতীয়) হিংসুকের দল, যাহারা আমার প্রতি হিংসার বশীভূত হইয়া আমার নামে মিথ্যা অপবাদ রটাইবে। —আহমদ
كتاب المناقب
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فِيكَ مَثَلٌ مِنْ عِيسَى أَبْغَضَتْهُ الْيَهُودُ حَتَّى بَهَتُوا أُمَّهُ وَأَحَبَّتْهُ النَّصَارَى حَتَّى أَنْزَلُوهُ بِالْمَنْزِلَةِ الَّتِي لَيْسَتْ لَهُ» . ثُمَّ قَالَ: يَهْلِكُ فِيَّ رَجُلَانِ: مُحِبٌّ مُفْرِطٌ يُقَرِّظُنِي بِمَا لَيْسَ فِيَّ وَمُبْغِضٌ يَحْمِلُهُ شَنَآنِي عَلَى أَنْ يَبْهَتَنِي. رَوَاهُ أَحْمَدُ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. এই হাদীসে হযরত আলীর ব্যাপারে উম্মতের মধ্যে দুইটি চরমপন্থী দলের প্রতি ইংগিত করা হইয়াছে— (১) শিয়া ও রাফেয়ী—যাহারা মহব্বতের আতিশয্যে তাঁহাকে নিয়া অতিশয় বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়। (২) খারেজী সম্প্রদায়—যাহারা তাঁহাকে দুর্নাম করিতে কোন কসুর করে নাই।

২. এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যা কিছু বলেছিলেন এবং এর ভিত্তিতে হযরত আলী রাযি. যা বলেছেন, এর বহিঃপ্রকাশ তাঁর খেলাফতকালেই হয়ে গিয়েছে। খারেজী ফেরকা তার বিরোধিতা ও বিদ্বেষে এ পর্যন্ত চলে গিয়েছে যে, তারা তাঁকে দ্বীন ধ্বংসকারী কাফের ও হত্যাযোগ্য অপরাধী সাব্যস্ত করেছে। আর তাদেরই এক হতভাগা আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম তাঁকে শহীদ করে দিয়েছে এবং নিজের এ জঘন্য অপকর্মকে সে 'জেহাদ ফী সাবীলিল্লাহ' ও জান্নাতে প্রবেশের ওসীলা মনে করেছে। অপরদিকে তাঁর ভালবাসার দাবীদার একটি এমন গোষ্ঠীও সৃষ্টি হয়ে গেল, যারা তাঁকে আল্লাহর আসনে পৌছিয়ে দিল। তাছাড়া এমন কিছু লোকও তৈরী হয়ে গেল, যারা বলতে শুরু করল যে, নবুওয়াত ও রেসালতের যোগ্য তিনিই ছিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার অভিপ্রায় এটাই ছিল যে, তাঁকেই তিনি নবী ও রাসূল বানাবেন এবং জিবরাঈল (আ.) কে ওহী দিয়ে তাঁর কাছেই প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু ভুলক্রমে তিনি ওহী নিয়ে মুহাম্মদ (ﷺ) এর নিকট পৌছে গেলেন। এছাড়া এমন লোকও সৃষ্টি হয়ে গেল, যারা বলে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর 'ওলী' এবং তাঁর পরবর্তী সময়ের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত ইমাম ও খলীফা ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ন্যায় মাসুম ও নিষ্পাপ ছিলেন। তাঁর আনুগত্য ওয়াজিব ও অপরিহার্য ছিল। তিনি মান-মর্যাদায় অন্যান্য সকল নবী-রাসূল থেকে উত্তম ও অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন। তাছাড়া সৃষ্টি জগতের নিয়ন্ত্রণ ও ইলমে গায়েবের ন্যায় খোদায়ী ছিফাত ও গুণাবলীরও তিনি ধারক ছিলেন।

হযরত আলী রাযি. এর বেলায় বাড়াবাড়িতে লিপ্ত এসব লোক বিভিন্ন ফেরকা ও দল উপদলে বিভক্ত। ধর্ম ও ধর্মীয় ফেরকাসমূহের ইতিহাস সম্পর্কে যেসব কিতাবাদি লিখা হয়েছে, এগুলোর অধ্যয়ন দ্বারা জানা যায় যে, এসব ফেরকার সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি পৌছে যায়।

এসব ফেরকার মধ্যে অধিকাংশ হল এমন ফেরকা, যেগুলোর আলোচনা কেবল কিতাবে পাওয়া যায়। আমাদের এ পৃথিবীতে যতটুকু আমাদের জানা আছে, বর্তমানে কোথাও তাদের অস্তিত্ব নেই। যেসব ফেরকার বর্তমানে অস্তিত্ব রয়েছে, এদের মধ্যে একটি বড় সংখ্যা হচ্ছে ইসনা আশারিয়াদের, এদের আরেকটি নাম ইমামিয়্যাও। বর্তমানে অধিকাংশ দেশ ও অঞ্চলে এ ফেরকাকেই 'শিয়া' বলা হয়। এ ফেরকাটি হযরত আলী মুরতাযা রাযি.-এর পর তাঁর বংশধরদের মধ্যে এগার ব্যক্তিকে তাঁরই ন্যায় আল্লাহ্ তা'আলা এবং রাসূল (ﷺ) এর পক্ষ থেকে নির্বাচিত ইমাম ও শাসক এবং তাঁরই ন্যায় মাসুম ও আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী এবং পূর্ববর্তী নবী রাসূলদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হওয়ার আকীদা পোষণ করে। এ ফেরকার আকীদা বিশ্বাসের বিস্তারিত বিবরণ ও স্বরূপ হযরত শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ)-এর অতুলনীয় ফারসী কিতাব 'তুহফায়ে ইসনা আশারিয়া' অধ্যয়নের দ্বারা জেনে নেওয়া যেতে পারে। উর্দুভাষী পাঠকগণ এ বিষয়ের উপর ইমামে আহলে সুন্নত হযরত মাওলানা আব্দুশ শাকুর ফারুকী (রহ)-এর লিখিত কিতাব এবং এ অধম সংকলকের 'ইরানী বিপ্লব, ইমাম খোমেনী ও শিয়া মতবাদ' অধ্যয়নের দ্বারাও এ ফেরকার পরিচিতি লাভ করতে পারবেন।
২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান