মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)
২৯- সৃষ্টির সূচনা ও কিয়ামত পরবর্তী বর্ণনা
হাদীস নং: ৫৫৭৩
- সৃষ্টির সূচনা ও কিয়ামত পরবর্তী বর্ণনা
প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৭৩। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন : যখন কিয়ামত সংঘটিত হইবে, তখন মানুষ পরস্পরে সমবেত অবস্থায় উদ্বেলিত ও উৎকণ্ঠিত হইয়া পড়িবে। তাই তাহারা সকলে হযরত আদম (আঃ)-এর কাছে যাইয়া বলিবে, আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট শাফা'আত করুন। তিনি বলিবেন, আমি এই কাজের উপযুক্ত নই; বরং তোমরা ইবরাহীমের কাছে যাও। তিনি আল্লাহর খলীল। তাই তাহারা হযরত ইবরাহীমের কাছে যাইবে। তিনি বলিবেন, আমি এই কাজের উপযুক্ত নই; বরং তোমরা মুসার কাছে যাও। কারণ তিনি কালীমুল্লাহ্। এইবার তাহারা হযরত মুসার নিকট যাইবে। তিনি বলিবেন, আমি এই কাজের উপযুক্ত নই; বরং তোমরা ঈসার কাছে যাও। কারণ, তিনি আল্লাহর রূহ্ ও কালেমা। তখন তাহারা হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাছে যাইবে। তিনিও বলিবেন, আমি এই কাজের উপযুক্ত নই। তোমরা বরং হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর কাছে যাও। তখন তাহারা সকলে আমার নিকট আসিবে। তখন আমি বলিব, আমিই এই কাজের জন্য। এইবার আমি আমার রবের কাছে অনুমতির প্রার্থনা করিব। আমাকে অনুমতি দেওয়া হইবে।
এই সময় আমাকে প্রশংসা ও স্তুতির এমনসব বাণী ইলহাম করা হইবে, যাহা এখন আমার জানা নাই। আমি ঐ সমস্ত প্রশংসা দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করিব এবং তাহার উদ্দেশ্যে সজদায় পড়িয়া যাইব। তখন বলা হইবে, হে মুহাম্মাদ। মাথা উঠাও। বল, তোমার বক্তব্য শুনা হইবে। প্রার্থনা কর, যাহা চাহিবে তাহা দেওয়া হইবে। আর শাফাআত কর, কবুল করা হইবে। তখন আমি বলিব হে রবব। আমার উম্মত, আমার উম্মত। (অর্থাৎ, আমার উম্মতের উপর রহম করুন, আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন।) বলা হইবে, যাও, যাহাদের অন্তরে যবের দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাহাদিগকে দোযখ হইতে বাহির করিয়া আন। তখন আমি গিয়া তাহাই করিব। অতঃপর ফিরিয়া আসিব এবং ঐ প্রশংসা বাণী দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করিব, তারপর সজদায় পড়িয়া যাইব। তখন বলা হইবে, হে মুহাম্মাদ। মাথা উঠাও। বল, তোমার বক্তব্য শুনা হইবে। চাও, যাহা চাহিবে তাহা দেওয়া হইবে। আর শাফা'আত কর, কবুল করা হইবে। তখন আমি বলিব, হে আমার প্রভু! আমার উম্মত, আমার উম্মত। তখন (আমাকে) বলা হইবে, যাও, যাহাদের অন্তরে এক অণু বা সরিষা পরিমাণ ঈমান আছে, তাহাদিগকে দোযখ হইতে বাহির করিয়া আন। সুতরাং আমি গিয়া তাহাই করিব। তারপর আবার ফিরিয়া আসিব এবং উক্ত প্রশংসা বাণী দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করিব এবং সজদায় পড়িয়া যাইব। তখন আমাকে বলা হইবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, তোমার কথা শুনা হইবে। প্রার্থনা কর, যাহা চাহিবে তাহা দেওয়া হইবে এবং সুপারিশ কর, কবুল করা হইবে। তখন আমি বলিব, আয় রব। আমার উম্মত, আমার উম্মত। তখন আমাকে বলা হইবে, যাও, যাহাদের অন্তরে ক্ষুদ্রাণুক্ষুদ্র পরিমাণ ঈমান আছে, তাহাদের সকলকেই জাহান্নাম হইতে বাহির করাইয়া আন। তখন আমি যাইয়া তাহাই করিব। নবী (ছাঃ) বলেন, অতঃপর আমি চতুর্থবার ফিরিয়া আসিব এবং ঐ সমস্ত প্রশংসা বাণী দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করিব এবং সজদায় পড়িয়া যাইব। তখন বলা হইবে, হে মুহাম্মাদ মাথা উঠাও এবং বল, তোমার কথা শুনা হইবে। চাও, যাহা চাহিবে তাহা দেওয়া হইবে। সুপারিশ কর, তোমার শাফা'আত কবুল করা হইবে। আমি বলিব, হে রব! যাহারা শুধু 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্' বলিয়াছে, আমাকে তাহাদের জন্যও শাফাআত করিবার অনুমতি দিন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা বলিবেন: আমার ইজ্জত ও জালাল এবং আমার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের কসম করিয়া বলিতেছি ; যাহারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলিয়াছে, আমি নিজেই তাহাদেরকে দোযখ হইতে বাহির করিব। —মোত্তাঃ
এই সময় আমাকে প্রশংসা ও স্তুতির এমনসব বাণী ইলহাম করা হইবে, যাহা এখন আমার জানা নাই। আমি ঐ সমস্ত প্রশংসা দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করিব এবং তাহার উদ্দেশ্যে সজদায় পড়িয়া যাইব। তখন বলা হইবে, হে মুহাম্মাদ। মাথা উঠাও। বল, তোমার বক্তব্য শুনা হইবে। প্রার্থনা কর, যাহা চাহিবে তাহা দেওয়া হইবে। আর শাফাআত কর, কবুল করা হইবে। তখন আমি বলিব হে রবব। আমার উম্মত, আমার উম্মত। (অর্থাৎ, আমার উম্মতের উপর রহম করুন, আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন।) বলা হইবে, যাও, যাহাদের অন্তরে যবের দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাহাদিগকে দোযখ হইতে বাহির করিয়া আন। তখন আমি গিয়া তাহাই করিব। অতঃপর ফিরিয়া আসিব এবং ঐ প্রশংসা বাণী দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করিব, তারপর সজদায় পড়িয়া যাইব। তখন বলা হইবে, হে মুহাম্মাদ। মাথা উঠাও। বল, তোমার বক্তব্য শুনা হইবে। চাও, যাহা চাহিবে তাহা দেওয়া হইবে। আর শাফা'আত কর, কবুল করা হইবে। তখন আমি বলিব, হে আমার প্রভু! আমার উম্মত, আমার উম্মত। তখন (আমাকে) বলা হইবে, যাও, যাহাদের অন্তরে এক অণু বা সরিষা পরিমাণ ঈমান আছে, তাহাদিগকে দোযখ হইতে বাহির করিয়া আন। সুতরাং আমি গিয়া তাহাই করিব। তারপর আবার ফিরিয়া আসিব এবং উক্ত প্রশংসা বাণী দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করিব এবং সজদায় পড়িয়া যাইব। তখন আমাকে বলা হইবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, তোমার কথা শুনা হইবে। প্রার্থনা কর, যাহা চাহিবে তাহা দেওয়া হইবে এবং সুপারিশ কর, কবুল করা হইবে। তখন আমি বলিব, আয় রব। আমার উম্মত, আমার উম্মত। তখন আমাকে বলা হইবে, যাও, যাহাদের অন্তরে ক্ষুদ্রাণুক্ষুদ্র পরিমাণ ঈমান আছে, তাহাদের সকলকেই জাহান্নাম হইতে বাহির করাইয়া আন। তখন আমি যাইয়া তাহাই করিব। নবী (ছাঃ) বলেন, অতঃপর আমি চতুর্থবার ফিরিয়া আসিব এবং ঐ সমস্ত প্রশংসা বাণী দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করিব এবং সজদায় পড়িয়া যাইব। তখন বলা হইবে, হে মুহাম্মাদ মাথা উঠাও এবং বল, তোমার কথা শুনা হইবে। চাও, যাহা চাহিবে তাহা দেওয়া হইবে। সুপারিশ কর, তোমার শাফা'আত কবুল করা হইবে। আমি বলিব, হে রব! যাহারা শুধু 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্' বলিয়াছে, আমাকে তাহাদের জন্যও শাফাআত করিবার অনুমতি দিন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা বলিবেন: আমার ইজ্জত ও জালাল এবং আমার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের কসম করিয়া বলিতেছি ; যাহারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলিয়াছে, আমি নিজেই তাহাদেরকে দোযখ হইতে বাহির করিব। —মোত্তাঃ
كتاب أحوال القيامة وبدء الخلق
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ مَاجَ النَّاسُ بَعْضُهُمْ فِي بَعْضٍ فَيَأْتُونَ آدم فَيَقُولُونَ: اشفع لنا إِلَى رَبِّكَ فَيَقُولُ: لَسْتُ لَهَا وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِإِبْرَاهِيمَ فَإِنَّهُ خَلِيلُ الرَّحْمَنِ فَيَأْتُونَ إِبْرَاهِيمَ فَيَقُولُ لَسْتُ لَهَا وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِمُوسَى فَإِنَّهُ كَلِيمُ الله فَيَأْتُونَ مُوسَى فَيَقُولُ لَسْتُ لَهَا وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِعِيسَى فَإِنَّهُ رُوحُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ فَيَأْتُونَ عِيسَى فَيَقُولُ لَسْتُ لَهَا وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِمُحَمَّدٍ فَيَأْتُونِّي فَأَقُولُ أَنَا لَهَا فَأَسْتَأْذِنُ عَلَى رَبِّي فَيُؤْذَنُ لِي وَيُلْهِمُنِي مَحَامِدَ أَحْمَدُهُ بِهَا لَا تَحْضُرُنِي الْآنَ فَأَحْمَدُهُ بِتِلْكَ الْمَحَامِدِ وَأَخِرُّ لَهُ سَاجِدًا فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَقُلْ تُسْمَعْ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تشفع فَأَقُول يارب أُمَّتِي أُمَّتِي فَيُقَالُ انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ شَعِيرَةٍ مِنْ إِيمَانٍ فَأَنْطَلِقُ فأفعل ثمَّ أَعُود فأحمده بِتِلْكَ المحامدوأخر لَهُ سَاجِدًا فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَقُلْ تُسْمَعْ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَقُولُ يارب أُمَّتِي أُمَّتِي فَيُقَالُ انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ أَوْ خَرْدَلَةٍ مِنْ إِيمَانٍ فَأَنْطَلِقُ فَأَفْعَلُ ثُمَّ أَعُودُ فَأَحْمَدُهُ بِتِلْكَ المحامدوأخر لَهُ سَاجِدًا فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَقُلْ تُسْمَعْ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَقُولُ يارب أُمَّتِي أُمَّتِي فَيُقَالُ انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ أَدْنَى أَدْنَى أَدْنَى مِثْقَالِ حَبَّةِ من خَرْدَلَةٍ مِنْ إِيمَانٍ فَأَخْرِجْهُ مِنَ النَّارِ فَأَنْطَلِقُ فأفعل ثمَّ أَعُود الرَّابِعَة فأحمده بِتِلْكَ المحامدوأخر لَهُ سَاجِدًا فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَقُلْ تُسْمَعْ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَقُولُ يارب ائْذَنْ لِي فِيمَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ قَالَ لَيْسَ ذَلِكَ لَكَ وَلَكِنْ وَعِزَّتِي وَجَلَالِي وَكِبْرِيَائِي وَعَظَمَتِي لَأُخْرِجَنَّ مِنْهَا مَنْ قَالَ لَا إِلَه إِلَّا الله . مُتَّفق عَلَيْهِ
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীসের কতিপয় বিষয়ের ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে-
(১) বার্লির দানা বা সরিষার দানা পরিমাণ বা তার চেয়ে অনেক কম পরিমাণ ঈমান থাকার যে উল্লেখ হাদীসে করা হয়েছে তার অর্থ হল ঈমানের নূরের বিশেষ পর্যায়। এ ঈমানের এ অবস্থা আমরা উপলব্ধি করতে না পারলেও আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তা অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন এবং আল্লাহর অনুমতি সহকারে ঈমানের এসব পর্যায়ের অধিকারীদেরকে দোযখ থেকে বের করবেন।
২) হাদীসের শেষাংশে একথা বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর উম্মতের (জন্য তিনবার শাফা'আত করার পর চতুর্থবার আল্লাহর দরবারে আবেদন করবেন যে, যারা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছিল তাদেরকে দোযখ থেকে বের করার অনুমতি তাকে প্রদান করা হোক। তার অর্থ হলো, যারা তওহীদের দাওয়াত কবুল করেছিল এবং ঈমান গ্রহণ করেছিল, কিন্তু দোযখ থেকে নাযাত লাভ এবং জান্নাতে যাওয়ার জন্য কোন আমল করেনি। অর্থাৎ যারা সামান্য ঈমান এবং তওহীদের এতেকাদের অধিকারী হবেন, কিন্তু সৎকর্ম শূন্য হবেন, নবী করীম (ﷺ) তাদেরকেও দোযখ থেকে বের করার জন্য আল্লাহ তা'আলার অনুমতি প্রার্থনা করবেন। বুখারী এবং মুসলিম শরীফে উল্লিখিত এবং আবু সাঈদ খুদরী (রা)-এর বর্ণিত হাদীসে সম্ভবতঃ এ শ্রেণীর লোক সম্পর্কে বলা হয়েছে: لم يعملوا خيراً قط তারা কোন সময় কোন নেক আমল করেনি। আল্লাহ্ তার নবী (ﷺ)-কে বলবেন- ليس ذالك لك অর্থাৎ তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার বিষয়টি আপনার জন্য রাখিনি। অর্থাৎ এ কাজ আপনার জন্য নয় বরং এটা আপনার ইযযত, জালাল শ্রেষ্ঠত্ব এবং فعال لما يريد শব্দের শানের জন্য সমীচীন এবং আমি স্বয়ং নিজে তা করব। আমি মনে করি যারা ঈমান আনার পর মোটেই আমল করেনি তাদেরকে দোযখ থেকে বের করা নবীর জন্য সমীচীন নয় বরং তাদেরকে ক্ষমা করার ব্যাপারটি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত।
(৩) আলোচ্য হাদীসে বিষয়টি কিঞ্চিৎ সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। হাশরের দিন লোকজন আদম (আ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার পর এবং ইবরাহীম (আ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার পূর্বে নূহ (আ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে বুখারী এবং মুসলিম শরীফের অপর এক রেওয়ায়েতে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু আলোচ্য হাদীসে নূহ (আ)-এর নাম উল্লেখিত হয়নি। এ হাদীসে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উম্মতের শাফা'আতের বিষয় উল্লেখিত হয়েছে। অথচ অনুমিত হয় যে, তিনি সর্বপ্রথম আহলে মাহশরদের হিসাব এবং ফয়সালার জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করেছেন যা 'শাফা'আতে কুবরা' হিসেবে আখ্যায়িত। হিসাব এবং ফায়সালার পরিণতি হিসেবে যখন তাঁর উম্মতের মন্দ আমলকারীগণকে দোযখের দিকে পরিচালিত হবে তখন তিনি তাদেরকে দোযখ থেকে বের করার জন্য আল্লাহর নিকট শাফা'আত করবেন।
(৪) কিয়ামতের দিন লোকজন শাফা'আতকারীদের যে অনুসন্ধান করবেন তার প্রয়োজনীয়তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের মনে সৃষ্টি করবেন এবং তারা প্রথম আদম (আ)-এর নিকট গমন করবেন। অতঃপর তার উপদেশ মোতাবেক নূহ (আ)-এর নিকট, নূহ (আ)-এর নির্দেশক্রমে ইবরাহীম (আ), অনুরূপভাবে মূসা (আ) এবং ঈসা (আ)-এর নিকট লোকজন যাবে। এসব আল্লাহর তরফ থেকে হবে এবং এজন্য হবে যে, যাতে লোকজন বাস্তবতা জানতে সক্ষম হয় যে, মাকামে মাহমূদ এবং শাফা'আতের (কুবরা) বিরাট মর্যাদা একমাত্র আখেরী নবীর জন্য নির্দিষ্ট। মোটকথা হাশরবাসীদের নিকট রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুমহান মর্যাদা প্রকাশ করার জন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এসব করা হবে।
(১) বার্লির দানা বা সরিষার দানা পরিমাণ বা তার চেয়ে অনেক কম পরিমাণ ঈমান থাকার যে উল্লেখ হাদীসে করা হয়েছে তার অর্থ হল ঈমানের নূরের বিশেষ পর্যায়। এ ঈমানের এ অবস্থা আমরা উপলব্ধি করতে না পারলেও আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তা অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন এবং আল্লাহর অনুমতি সহকারে ঈমানের এসব পর্যায়ের অধিকারীদেরকে দোযখ থেকে বের করবেন।
২) হাদীসের শেষাংশে একথা বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর উম্মতের (জন্য তিনবার শাফা'আত করার পর চতুর্থবার আল্লাহর দরবারে আবেদন করবেন যে, যারা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছিল তাদেরকে দোযখ থেকে বের করার অনুমতি তাকে প্রদান করা হোক। তার অর্থ হলো, যারা তওহীদের দাওয়াত কবুল করেছিল এবং ঈমান গ্রহণ করেছিল, কিন্তু দোযখ থেকে নাযাত লাভ এবং জান্নাতে যাওয়ার জন্য কোন আমল করেনি। অর্থাৎ যারা সামান্য ঈমান এবং তওহীদের এতেকাদের অধিকারী হবেন, কিন্তু সৎকর্ম শূন্য হবেন, নবী করীম (ﷺ) তাদেরকেও দোযখ থেকে বের করার জন্য আল্লাহ তা'আলার অনুমতি প্রার্থনা করবেন। বুখারী এবং মুসলিম শরীফে উল্লিখিত এবং আবু সাঈদ খুদরী (রা)-এর বর্ণিত হাদীসে সম্ভবতঃ এ শ্রেণীর লোক সম্পর্কে বলা হয়েছে: لم يعملوا خيراً قط তারা কোন সময় কোন নেক আমল করেনি। আল্লাহ্ তার নবী (ﷺ)-কে বলবেন- ليس ذالك لك অর্থাৎ তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার বিষয়টি আপনার জন্য রাখিনি। অর্থাৎ এ কাজ আপনার জন্য নয় বরং এটা আপনার ইযযত, জালাল শ্রেষ্ঠত্ব এবং فعال لما يريد শব্দের শানের জন্য সমীচীন এবং আমি স্বয়ং নিজে তা করব। আমি মনে করি যারা ঈমান আনার পর মোটেই আমল করেনি তাদেরকে দোযখ থেকে বের করা নবীর জন্য সমীচীন নয় বরং তাদেরকে ক্ষমা করার ব্যাপারটি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত।
(৩) আলোচ্য হাদীসে বিষয়টি কিঞ্চিৎ সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। হাশরের দিন লোকজন আদম (আ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার পর এবং ইবরাহীম (আ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার পূর্বে নূহ (আ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে বুখারী এবং মুসলিম শরীফের অপর এক রেওয়ায়েতে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু আলোচ্য হাদীসে নূহ (আ)-এর নাম উল্লেখিত হয়নি। এ হাদীসে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উম্মতের শাফা'আতের বিষয় উল্লেখিত হয়েছে। অথচ অনুমিত হয় যে, তিনি সর্বপ্রথম আহলে মাহশরদের হিসাব এবং ফয়সালার জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করেছেন যা 'শাফা'আতে কুবরা' হিসেবে আখ্যায়িত। হিসাব এবং ফায়সালার পরিণতি হিসেবে যখন তাঁর উম্মতের মন্দ আমলকারীগণকে দোযখের দিকে পরিচালিত হবে তখন তিনি তাদেরকে দোযখ থেকে বের করার জন্য আল্লাহর নিকট শাফা'আত করবেন।
(৪) কিয়ামতের দিন লোকজন শাফা'আতকারীদের যে অনুসন্ধান করবেন তার প্রয়োজনীয়তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের মনে সৃষ্টি করবেন এবং তারা প্রথম আদম (আ)-এর নিকট গমন করবেন। অতঃপর তার উপদেশ মোতাবেক নূহ (আ)-এর নিকট, নূহ (আ)-এর নির্দেশক্রমে ইবরাহীম (আ), অনুরূপভাবে মূসা (আ) এবং ঈসা (আ)-এর নিকট লোকজন যাবে। এসব আল্লাহর তরফ থেকে হবে এবং এজন্য হবে যে, যাতে লোকজন বাস্তবতা জানতে সক্ষম হয় যে, মাকামে মাহমূদ এবং শাফা'আতের (কুবরা) বিরাট মর্যাদা একমাত্র আখেরী নবীর জন্য নির্দিষ্ট। মোটকথা হাশরবাসীদের নিকট রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুমহান মর্যাদা প্রকাশ করার জন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এসব করা হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)