মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

২৭- নম্রতা ও যুহদের অধ্যায়

হাদীস নং: ৫২২৭
- নম্রতা ও যুহদের অধ্যায়
তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৫২২৭। হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) তাঁহাকে (শাসক নিযুক্ত করিয়া) ইয়ামান পাঠাইলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) তাঁহাকে নসীহত ও উপদেশ দিতে দিতে তাঁহার সঙ্গে বাহির হইলেন। এই সময় মুয়া'য ছিলেন সওয়ারীতে আর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) চলিলেন পদব্রজে, সওয়ারী হইতে নীচে। (উপদেশাবলী হইতে) অবসর হইয়া তিনি বলিলেনঃ হে মুয়া'য! সম্ভবতঃ এই বৎসরের পর তুমি আর আমার সাক্ষাৎ পাইবে না। এমনও হইতে পারে তুমি আমার মসজিদ ও আমার কবরের পার্শ্ব দিয়া অতিক্রম করিবে। এতদ্‌বণে হযরত মুয়ায রাসূলুল্লাহর বিচ্ছেদ চিন্তায় ভারাক্রান্ত হইয়া কাঁদিতে লাগিলেন। অতঃপর তিনি মদীনার দিকে তাকাইলেন এবং উহাকে সম্মুখে রাখিয়া বলিলেনঃ নিশ্চয় ঐ সমস্ত লোকেরাই আমার নিকটতম যাহারা খোদাভীরু, পরহেজগার। চাই তাহারা যে কেহই হউক এবং যে কোথাও থাকুক না কেন? —উপরোক্ত হাদীস চারটি ইমাম আহমদ রেওয়ায়ত করিয়াছেন।
كتاب الرقاق
وَعَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: لَمَّا بَعَثَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الْيَمَنِ خَرَجَ مَعَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُوصِيهِ وَمُعَاذٌ رَاكِبٌ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَمْشِي تَحْتَ رَاحِلَتِهِ فَلَمَّا فَرَغَ قَالَ: يَا مُعَاذُ إِنَّكَ عَسَى أَنْ لَا تَلْقَانِي بَعْدَ عَامِي هَذَا وَلَعَلَّكَ أَنْ تَمُرَّ بِمَسْجِدِي هَذَا وَقَبْرِي فَبَكَى مُعَاذٌ جَشَعًا لِفِرَاقِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ الْتَفَتَ فَأَقْبَلَ بِوَجْهِهِ نَحْوَ الْمَدِينَةِ فَقَالَ: «إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِيَ الْمُتَّقُونَ مَنْ كَانُوا وَحَيْثُ كَانُوا» رَوَى الْأَحَادِيث الْأَرْبَعَة أَحْمد

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. হুযূর (ﷺ) উক্ত বাক্যটি মদীনার দিকে মুখ করিয়া বলার মধ্যে সম্ভবতঃ এই ইংগিত রহিয়াছে যে, মদীনা হইতে তাকওয়া ও পরহেজগারীর যে শিক্ষালাভ করিয়াছ উহাই অনুসরণযোগ্য এবং গুরুত্ব পাওয়ার অধিকারী। আমি তো আর চিরকাল থাকিব না, এই সত্যকে ধৈর্য সহকারে গ্রহণ করিয়া নেওয়া উম্মতের কর্তব্য।

২. আল্লাহর ভয় ও তাকওয়া মান-মর্যাদা ও আল্লাহর রাসূলের নৈকট্যের সঠিক মাপকাঠি। যার মনে আল্লাহর ভয় রয়েছে, যে জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর হুকুম মুতাবিক করার চেষ্টা করে, হালাল-হারামের পার্থক্য করে এবং কোন কাজ করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন আর কোন কাজ করলে তিনি অসন্তুষ্ট হবেন, এ খেয়াল সদা-সর্বদা নিজের মনের মধ্যে রাখে, সে দুনিয়ার যে কোন প্রান্তে থাকুক না কেন এবং তার গোত্র-বংশ, ভাষা ও বর্ণ যাই হোক না কেন, সে আল্লাহর রাসূলের নিকটবর্তী। সে দুনিয়ার যিন্দেগীতে প্রকৃতপক্ষে রাসূলের জামাআতে শামিল এবং আখিরাতের জীবনেও রাসূল ও সকল মুত্তাকী পরহেযগারের সংগে থাকবে। যার মনে তাকওয়া নেই এবং যে আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালন করে না, সম্পর্কের দিক দিয়ে সে নবী করীম ﷺ-এর নিকটে থাকলে বা সে নবী করীম ﷺ-এর গোত্রের লোক হলে কিংবা নবী ﷺ-এর ভাষায় কথা বললেও সে তাঁর নিকটবর্তী নয়, তাঁর জামাআতভুক্ত নয়। তাই ইয়েমেনের আবূ হুরায়রা (রা), ইরানের সালমান ফারসী (রা), আবিসিনিয়ার বিলাল (রা) এবং রোমের মুসায়্যিব (রা) আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর নিকটবর্তী এবং তাঁর জামাআতভুক্ত ছিলেন। পক্ষান্তরে আবূ জাহল, আবূ লাহাব বংশ ও ভাষার দিক থেকে রাসূলের নিকটবর্তী হলেও তারা রাসূল ﷺ থেকে অনেক দূরে ছিল, মতবাদ ও আদর্শের দুনিয়ায় স্থান-কাল ও বংশ মর্যাদার কোন স্থান নেই। আসমানী মতবাদ ও আদর্শে বিশ্বাসী সকল মানুষ এক উম্মত ও এক জামাআতভুক্ত; আর রাসূল ﷺ তার নেতা। তাই নবীর বিচ্ছেদ ব্যাথায় কাতর মু'আয (রা)-কে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য নবী করীম ﷺ বলেছেন, দুনিয়া ও আখিরাতের সকল সৎব্যক্তির ন্যায় তিনি সুদূর ইয়েমেনে থাকলেও নবীর দলে শামিল থাকবেন। তাঁর দুঃখ করার কোন কারণ নেই।

মদীনার দিকে নবী করীম ﷺ কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন, তার কারণ কারও জানা নেই। এক্ষেত্রে দুটো সম্ভাবনা হতে পারে।

এক: মু'আয (রা)-এর চোখে পানি দেখে সম্ভবত তাঁর চোখেও পানি এসেছিল।

দুই: বিশ্বস্ত সহচর মু'আয (রা)-কে দূরদেশে প্রেরণ করার মুহূর্তে নবীজীর চোখে হয়তো পানি এসেছিল। মু'আয (রা) তা দেখলে হয়ত তিনি আরো কাঁদবেন, তাই তিনি তাঁর দৃষ্টি মদীনার দিকে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। ভাব ও মহব্বতের দুনিয়ায় এ ধরনের ঘটনা বিরল নয়।

মু'আয (রা) তাঁর যানবাহনের উপর সওয়ার ছিলেন। আর নবীজী পায়ে হেঁটে তাঁর সাথে চলছিলেন। মু'আয (রা) নবী করীম ﷺ-এর হুকুমে তা করেছিলেন বলে আমাদের ধারণা। নবী করীম ﷺ এ উদাহরণের দ্বারা উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, অধীনস্থদেরকে এরূপ করতে দিলে পদস্থ ব্যক্তির মর্যাদার কোন ক্ষতি হয় না, বরং তাতে পদস্থ ব্যক্তির মহব্বত ও মহানুভবতার প্রকাশ ঘটে। নায়েবে রাসূলের আসনে যারা সমাসীন, তারা তা অনুসরণ করলে খুবই কল্যাণকর ফল পাওয়া যাবে। এ হাদীসে বর্ণিত যাবতীয় বিষয়ের উপর যাতে আমল করতে পারি তার তাওফীক আল্লাহ আমাদের দান করুন। আমীন।
২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান