মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

২০- জিহাদের বিধানাবলী অধ্যায়

হাদীস নং: ৩৯২২
- জিহাদের বিধানাবলী অধ্যায়
২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯২২। হযরত আবু কাতাদাহ্ (রাঃ) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর নিয়ম ছিল, যখন তিনি সফরে যাইতেন এবং রাত্রের শেষাংশে বিশ্রাম করিতেন, ডান কাতে শয়ন করিতেন। আর যখন ভোর হওয়ার পূর্ব-মুহূর্তে বিশ্রাম করিতেন, তখন স্বীয় ডান হাত (কনুইকে যমীনে রাখিয়া) খাড়া করিয়া রাখিতেন। অতঃপর হাতলীর উপর মাথা রাখিতেন। —মুসলিম
كتاب الجهاد
الْفَصْل الثَّالِث
عَن أبي قتادةَ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا كَانَ فِي سَفَرٍ فَعَرَّسَ بِلَيْلٍ اضْطَجَعَ عَلَى يَمِينِهِ وَإِذَا عَرَّسَ قُبَيْلَ الصُّبْحِ نَصَبَ ذِرَاعَهُ وَوَضَعَ رَأْسَهُ عَلَى كَفِّهِ. رَوَاهُ مُسلم

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটিতে সফর অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশ্রাম গ্রহণের নিয়ম বর্ণিত হয়েছে। তিনি সাধারণত রাতের বেলা সফর করতেন। কিন্তু সে সফর পুরোটা রাত হতো না; বরং কিছু সময় বিশ্রামও নিতেন। কেননা শরীরেরও হক আছে। তাকে বিশ্রাম দেওয়া দরকার। একটানা নির্ঘুম সফর করতে থাকলে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে সফর অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর শরীরের হক তো নষ্ট হয়ই। কাজেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরকালে যাত্রাবিরতি দিয়ে রাতের কিছুক্ষণ বিশ্রামও করতেন। কখনও রাতের বেশ খানিকটা সময় বাকি থাকতেই বিশ্রাম গ্রহণ করতেন আবার কখনও বিশ্রাম নিতেন রাতের শেষদিকে। দুই সময়ে তাঁর বিশ্রাম নেওয়ার ভঙ্গি হতো দু'রকম। প্রথম অবস্থা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে-

إِذَا كَانَ فِي سَفَرٍ فَعَرَّسَ بِلَيْلٍ اضْطَجَعَ عَلَى يَمِينِهِ (যখন সফরে থাকতেন আর এ অবস্থায় রাতের বেলা বিশ্রাম করতেন, তখন ডান কাতে শুইতেন)। রাতের বেলা বিশ্রাম করতেন মানে রাতের বেশ খানিকটা সময় বাকি থাকতে বিশ্রাম নিতেন। তখন তিনি ডান কাতে শুইতেন। ডান কাতে শুইলে হৃৎপিণ্ড ঝুলে থাকে। কারণ হৃৎপিণ্ডের অবস্থান বুকের বামদিকে। তা ঝুলে থাকলে ঘুমের গভীরতা হয় মাঝামাঝি পর্যায়ের। পরিপূর্ণ শোওয়ার কারণে ঘুম গভীর হতো বটে, কিন্তু ডান কাতে শোওয়ার কারণে এত বেশি গভীর হতো না যে, কোনওরকম আওয়াজ বা সময়ের পরিবর্তন সত্ত্বেও ঘুম ভাঙবে না। ঘুম তো ভাঙ্গা দরকার। কারণ সামনে ফজরের নামায রয়েছে। আর তাহাজ্জুদ পড়লে তো আরেকটু আগেই উঠতে হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো বটেই, এমনকি সাধারণ আল্লাহওয়ালাগণও দুনিয়ার আরাম-আয়েশ অপেক্ষা ইবাদত-বন্দেগীকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তাদের ভয়-ঘুম অতিরিক্ত গভীর হয়ে গেলে না-জানি ফজরের নামায ছুটে যায়। সে কারণেই তারা শোওয়ার এমন ভঙ্গি গ্রহণ করেন, যাতে ঘুম সহজেই ভাঙ্গে। উলামায়ে কেরাম বলেন, ডান কাতে শোওয়ার দ্বারা মূলত এটাই উদ্দেশ্য।

আর দ্বিতীয় অবস্থা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, وَإِذَا عَرَّسَ قُبَيْلَ الصُّبْحِ نَصَبَ ذِرَاعَهُ وَوَضَعَ رَأْسَهُ عَلَى كَفِّهِ (আর যখন ভোরের আগে আগে বিশ্রাম করতেন, তখন বাহু খাড়া করে হাতের তালুর উপর মাথা রাখতেন)। এটা হতো ডান বাহুতে। তাঁর যেহেতু ডান কাতে শোওয়া অভ্যাস ছিল, তাই আধাআধি এ শোওয়ায়ও তিনি সেই অভ্যাস রক্ষা করতেন। ভোরের আগের বিশ্রামে তিনি পুরোপুরি না শুয়ে এভাবে শুইতেন ঘুম হালকা রাখার জন্য। কেননা সময় যথেষ্ট কম হওয়ায় গভীর ঘুমের সুযোগ ছিল না। গভীরভাবে ঘুমালে ফজরের নামায ছুটে যাওয়া কিংবা মুস্তাহাব ওয়াক্ত চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তা যাতে না হয়, তাই সংক্ষিপ্ত বিশ্রামের লক্ষ্যেই তিনি এভাবে বাহু খাড়া করে হাতের চেটোর উপর মাথা রেখে ঘুমাতেন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. রাতে বিশ্রামের লম্বা সময় থাকলে ডান কাতে শোওয়া মুস্তাহাব।

খ. ফজর হওয়ার আগ মুহূর্তে বিশ্রাম নিলে পুরোপুরি না শোওয়াই ভালো। আধো শোওয়াতেই ক্ষান্ত হওয়া উচিত। অর্থাৎ ডান বাহু খাড়া করে হাতের তালুতে মাথা রেখে বিশ্রাম নেওয়া চাই।

গ. একজন মুমিন ব্যক্তির ইবাদত-বন্দেগীই হওয়া উচিত জীবনের আসল লক্ষ্যবস্তু।

ঘ. বাড়িতে থাকা অবস্থায় তো বটেই, সফরে থাকাকালেও নামায সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত, যাতে কোনওমতেই তা কাযা না হয়ে যায়।

ঙ. ঘুমানোর কালে এমন কোনও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে নামাযের আগে ঘুম ভেঙে যায়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান