মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

২০- জিহাদের বিধানাবলী অধ্যায়

হাদীস নং: ৩৯১৪
- জিহাদের বিধানাবলী অধ্যায়
২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯১৪। হযরত আবু সা'লাবা খোশানী (রাঃ) বর্ণনা করেন, সফরের সময় লোকেরা যখন কোন জায়গায় অবস্থান করিবার জন্য অবতরণ করিত, তখন তাহারা গিরিপথে এবং উপত্যকায় বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান করিত। ইহাতে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলিলেনঃ গিরিপথে এবং উপত্যকায় এইরূপে তোমাদের বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়া মূলত শয়তানের কাজ। (বর্ণনাকারী বলেন,) ইহার পর হইতে লোকেরা যখনই কোন জায়গায় অবস্থান করিত, তখন তাহারা পরস্পর এমনভাবে মিলিয়ামিশিয়া অবস্থান করিত যে, একখানা কাপড় তাহাদের উপর ছড়াইয়া দিলে সকলকেই আচ্ছাদিত করিতে পারিত। –আবু দাউদ
كتاب الجهاد
وَعَن أبي ثعلبَةَ الخُشَنيِّ قَالَ: كَانَ النَّاسُ إِذَا نَزَلُوا مَنْزِلًا تَفَرَّقُوا فِي الشِّعَابِ وَالْأَوْدِيَةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ تَفَرُّقَكُمْ فِي هَذِهِ الشِّعَابِ وَالْأَوْدِيَةِ إِنَّمَا ذَلِكُمْ مِنَ الشَّيْطَانِ» . فَلَمْ يَنْزِلُوا بَعْدَ ذَلِكَ مَنْزِلًا إِلَّا انْضَمَّ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ حَتَّى يُقَالَ: لَوْ بُسِطَ عَلَيْهِمْ ثوبٌ لعمَّهم. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলোচ্য হাদীছটিতে সফরের সময় যাত্রাবিরতিকালীন একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব বর্ণিত হয়েছে। হাদীছটিতে জানানো হয়েছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরে থাকতেন আর কোথাও যাত্রাবিরতি দিয়ে বিশ্রাম নিতে চাইতেন, তখন সঙ্গীগণ পৃথকভাবে যে যার মতো করে সুবিধাজনক একেকটা জায়গা বেছে নিতেন। বিশেষ করে বড় বড় ছায়াদার গাছ দেখে তার নিচে চলে যেতেন এবং সেখানে বিশ্রাম গ্রহণ করতেন। অর্থাৎ তারা এক জায়গায় থাকতেন না; বরং বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়তেন। এতে করে বিভিন্ন অনিষ্টের আশঙ্কা থাকত। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে সাবধান করে দিয়ে বলেন-

إِنَّ تَفَرُّقَكُمْ فِي هَذِهِ الشِّعَابِ وَالْأَوْدِيَةِ إِنَّمَا ذَلِكُمْ مِنَ الشَّيْطَانِ (গিরিপথ ও উপত্যকাসমূহে তোমাদের বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়াটা শয়তানের পক্ষ থেকেই হয়)। الشِّعَابُ শব্দটি شِعْبٌ এর বহুবচন। এর অর্থ পাহাড়ি পথ। الْأَوْدِيةُ শব্দটি وَادِي এর বহুবচন। এর অর্থ উপত্যকা। অর্থাৎ দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী খোলা জায়গা। তো নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বোঝাচ্ছিলেন, তোমরা যে পাহাড়ের পথ ও উপত্যকায় বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়, এটা মূলত শয়তানের প্ররোচনায়ই করে থাক। শয়তান তোমাদের অমঙ্গল চায়। বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ার দ্বারা সে অমঙ্গলের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ একা একা এক জায়গায় অবস্থান করলে চোর-ডাকাত বা শত্রুর কবলে পড়ার ভয় থাকে। সংঘবদ্ধ থাকা অবস্থায় সে ভয় থাকে না। কাজেই তোমরা এভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে না; বরং সংঘবদ্ধভাবে থাকবে। এর পর থেকে তারা তাই করতেন। হযরত আবূ ছা'লাবা রাযি. বলেন-

فَلَمْ يَنْزِلُوا بَعْدَ ذَلِكَ مَنْزِلًا إِلَّا انْضَمَّ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ

(এরপর তারা কোনও মঞ্জিলে যাত্রাবিরতি দিলে পরস্পর মিলেমিশে থাকত)। বলাবাহুল্য, তাদের সকলের এক জায়গায় একাট্টা হয়ে থাকা সহজ ছিল না। মরুভূমির সে দেশে বট বা অশ্বত্থ গাছের মতো বড় বড় গাছ তো হয় না। সাধারণত কাঁটাদার বাবলা গাছই হয়ে থাকে। সেসব গাছ বড় হলেও তা কতটুকুই বা হয়? তার ছায়াও বা কতটুকু জায়গায় ছড়ায়? কিন্তু তা সত্ত্বেও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ মানতে তারা কোনওরূপ দ্বিধাবোধ করেননি। তাঁরা সাহাবায়ে কেরাম। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ মানাটাই ছিল তাদের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তা মানার জন্য সবরকম ত্যাগ স্বীকার করতে তারা প্রস্তুত ছিলেন। ফলে যাত্রাবিরতিতে তাঁরা অল্প জায়গার মধ্যেই ঠাসাঠাসি করে অবস্থান করতেন। কতটা গাদাগাদি হয়ে থাকতেন, তা এ হাদীছটির শেষবাক্য দ্বারা বোঝা যায়

حَتَّى يُقَالَ: لَوْ بُسِطَ عَلَيْهِمْ ثَوْبٌ لَعَمَّهُمْ তারা এতটা গাদাগাদি হয়ে থাকতেন যে, বলা হতো, তাদের উপর একটা কাপড় ছড়িয়ে দিলে তারা সকলে তাতে ঢাকা পড়ে যেত।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. যাত্রীদল কোথাও যাত্রাবিরতি দিলে সকলের কাছাকাছি স্থানে অবস্থান করা উচিত।

খ. যাত্রাবিরতিকালে নিজেদের জানমালের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

গ. শয়তান মানুষের জানমালের ক্ষতি করার তৎপরতায় লেগে থাকে। তাকে সে সুযোগ দিতে নেই।

ঘ. সংঘবদ্ধ থাকাটা জানমালের নিরাপত্তার পক্ষে সহায়ক।

ঙ. সফরে বা বাড়িতে সর্বত্রই সংঘবদ্ধ থাকার দ্বারা পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা লাভ সহজ হয়।

চ. আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ তো বটেই, অভিভাবক ও গুরুজনের আদেশও গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা উচিত।

ছ. সফরকালে আমীরের আদেশ পালনে যত্নবান থাকতে হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান