মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

২০- জিহাদের বিধানাবলী অধ্যায়

হাদীস নং: ৩৮৯৮
২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৮৯৮। হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রাঃ) বলেন, একবার কোন এক সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি (তাহার দুর্বল সওয়ারীর) আরোহী অবস্থায় সেইখানে আসিল এবং উহাকে ডানে বামে ঘুরাইতে লাগিল। (তাহার অবস্থা দেখিয়া হুযূর [ছাঃ] বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে, লোকটির সওয়ারী খুবই ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে এবং তাহার নিজের পাথেয়ও শেষ হইয়া গিয়াছে।) তখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সঙ্গীদিগকে লক্ষ্য করিয়া) বলিলেন: তোমাদের যাহার কাছেই একটির অতিরিক্ত সওয়ারী আছে, সে যেন উহা ঐ ব্যক্তিকে দিয়া দেয়, যাহার কাছে সওয়ারী নাই। আর যাহার কাছে অতিরিক্ত খানাপিনা আছে, সেও যেন উহা ঐ ব্যক্তিকে প্রদান করে যাহার কাছে খাদ্যদ্রব্য নাই। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর হুযুর (ছাঃ) বিভিন্ন প্রকারের মালের কথা এইভাবে উল্লেখ করিতে লাগিলেন যে, আমাদের ধারণা হইল, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিসের উপর আমাদের কাহারও কোন অধিকার নাই। মুসলিম
وَعَن أبي سعيد الْخُدْرِيّ قَالَ: بَيْنَمَا نَحْنُ فِي سَفَرٍ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذ جَاءَهُ رَجُلٌ عَلَى رَاحِلَةٍ فَجَعَلَ يَضْرِبُ يَمِينًا وَشِمَالًا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ كَانَ مَعَهُ فَضْلُ ظَهْرٌ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لَا ظَهْرَ لَهُ وَمَنْ كَانَ لَهُ فَضْلُ زَادٍ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لَا زَادَ لَهُ» قَالَ: فَذَكَرَ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ حَتَّى رَأَيْنَا أَنَّهُ لَا حَقَّ لأحدٍ منا فِي فضل. رَوَاهُ مُسلم

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হযরত আবূ সা‘ঈদ খুদরী রাযি. কোনও এক সফরের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন যে, কোনও এক ব্যক্তি নিজ বাহনে চড়ে সকলের সামনে হাজির হয় এবং ডানে-বামে চোখ ঘুরাতে থাকে। তিনি বলেছেন-
فَجَعَلَ يَصْرِفُ بَصَرَهُ يَمِيْنًا وَشِمَالًا (সে ডানে-বামে তার দৃষ্টি ঘোরাতে থাকল)। অর্থাৎ বাহনে চড়ে আসলেও সে মূলত অভাবগ্রস্ত ছিল। তাই সে চারদিকে চোখ বুলিয়ে কে তাকে সাহায্য করতে পারে তা বুঝতে চাচ্ছিল। সে মুখে কিছুই চাচ্ছিল না, কিন্তু ভাবভঙ্গি দ্বারা বোঝাচ্ছিল সে যথার্থই অভাবগ্রস্ত। উপস্থিত সকলে তা বুঝতেও পারছিল। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকে হুকুম করেন-
مَنْ كَانَ مَعَهُ فَضْلُ ظَهْرٍ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لَا ظَهْرَ لَهُ، وَمَنْ كَانَ لَهُ فَضْلٌ مِنْ زَادٍ، فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لَا زَادَ لَهُ (যার কাছে অতিরিক্ত বাহন আছে সে যেন তা যার বাহন নেই তাকে দিয়ে দেয়। যার অতিরিক্ত রসদ আছে সে যেন যার রসদ নেই তাকে তা দিয়ে দেয়)। অর্থাৎ অতিরিক্তটা নিজের কাছে রেখে না দিয়ে যার নেই তাকে যেন দিয়ে দেয়। কেননা নিজের কাছে রাখার কোনও ফায়দা নেই। একসময় তা ফুরিয়ে যাবে। পক্ষান্তরে যার নেই তাকে দিলে তা আল্লাহর কাছে চলে যাবে। সেখানে তা স্থায়ী সম্পদরূপে সঞ্চিত থাকবে এবং বহুগুণে বেড়ে যাবে। সুতরাং এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
يَا ابْنَ آدَمَ، إِنَّكَ أَنْ تَبْذُلَ الْفَضْلَ خَيْرٌ لَكَ، وَأَنْ تُمْسِكَهُ شَرٌّ لَكَ
‘হে আদম সন্তান! তোমার অতিরিক্ত সম্পদ (সৎপথে) খরচ করাটা তোমার পক্ষে ভালো আর তা আটকে রাখা তোমার পক্ষে মন্দ'।(সহীহ মুসলিম : ১০৩৬; জামে তিরমিযী: ২৩৪৩; মুসনাদে আহমাদ: ৮৭৪৩; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৭৬২৫; বায়হাকী, আস্ সুনানুল কুবরা: ৭৭৮১; শু'আবুল ঈমান: ৩১১৪)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিরিক্ত বাহন, অতিরিক্ত রসদ এবং এমনিভাবে অতিরিক্ত অন্যান্য মালের কথা একের পর এক বলতে থাকলেন। তাতে করে সাহাবায়ে কেরামের কী অনুভূতি হয়েছিল, হযরত আবূ সা‘ঈদ খুদরী রাযি. তা এই বলে ব্যক্ত করেন যে-
فَذَكَرَ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ مَا ذَكَرَ حَتَّى رَأَيْنَا أَنَّهُ لَا حَقَّ لِأَحَدٍ مِنَّا فِي فَضْلٍ (এভাবে তিনি বিভিন্ন প্রকার মালের কথা উল্লেখ করতে থাকেন। তাতে আমাদের মনে হল আমাদের কারওই অতিরিক্ত মালে কোনও অধিকার নেই)। অর্থাৎ প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত যে মাল থাকে, তা নিজের কাছে রেখে দেওয়ার কোনও অধিকার নেই। যার প্রয়োজন আছে, তাকে তা দিয়ে দিতে হবে। তাতে সে মাল যাই হোক। খাদ্য হোক, পানি হোক, পোশাক হোক, বাহন হোক, টাকা-পয়সা হোক কিংবা ব্যবহারের অন্য কোনও সামগ্রী হোক।

অতিরিক্ত মালে কোনও অধিকার না থাকার দ্বারা বাহ্যত বোঝা যায় নিজের কাছে তা রাখা জায়েয নয়; অভাবগ্রস্তকে দিয়ে দেওয়া ফরয। কেউ কেউ বলেন, এটা যাকাত ফরয হওয়ার আগের কথা। তখন অতিরিক্ত মাল নিজের কাছে রাখা জায়েয ছিল না। পরে যাকাতের বিধান নাযিল হওয়ার দ্বারা তা রহিত হয়ে যায়। এখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ নিজের কাছে রেখে দেওয়া জায়েয। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তা থেকেও গরীব-দুঃখীকে দেওয়া ফরয হয়ে যায়। তাই এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ فِي الْمَالِ لَحَقًّا سِوَى الزَّكَاةِ
‘নিশ্চয়ই সম্পদে যাকাত ছাড়াও হক আছে।’(জামে' তিরমিযী: ৬৫৯; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৫৯২)

কারও কারও মতে অতিরিক্ত মালে অধিকার না থাকার দ্বারা তা গরীব-দুঃখীকে দিয়ে দেওয়া ফরয বা ওয়াজিব বলে বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। বরং বোঝানো উদ্দেশ্য তা জমা না রেখে দান-খয়রাত করাই বাঞ্ছনীয়। জমা করা অপেক্ষা তাতে দান-খয়রাতকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া চাই। এটা করা যদিও ফরয বা ওয়াজিব নয়, তথাপি আখিরাতের সঞ্চয় বাড়ানোর লক্ষ্যে এটাই অগ্রাধিকারযোগ্য। সারকথা এর দ্বারা গুরুত্বের সঙ্গে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ ও দান-খয়রাতের প্রতি উৎসাহিত করা উদ্দেশ্য।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. সফরকালে বাড়তি সম্পদ দ্বারা সফরসঙ্গীদের সাহায্য-সহযোগিতা করা চাই।

খ. সফরকালে দলনেতার উচিত সচ্ছলদেরকে অভাবগ্রস্তদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শনে উৎসাহ দেওয়া।

গ. কারও যদি নিতান্তই ঠেকা দেখা দেয় এবং অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়ার দরকার হয়, তবে সে ক্ষেত্রে মুখে না চেয়ে হাবভাব দিয়ে বোঝানোই শ্রেয়।

ঘ. যে ব্যক্তি সফরে থাকে, তাকে যাকাতের অর্থ দ্বারাও সাহায্য করা যায়, যদিও বাড়িতে তার অর্থ-সম্পদ থাকে।

ঙ. সওয়ালকারী যদি ভালো পোশাক পরিহিত থাকে বা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে আসে, তবুও তাকে খালিহাতে ফেরানো ঠিক নয়। কেননা বাস্তবিকপক্ষেই সে অভাবগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মিশকাতুল মাসাবীহ - হাদীস নং ৩৮৯৮ | মুসলিম বাংলা