মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

২০- জিহাদের বিধানাবলী অধ্যায়

হাদীস নং: ৩৮৯২
- জিহাদের বিধানাবলী অধ্যায়
২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৮৯২। হযরত কা'ব ইবনে মালেক (রাঃ) হইতে বর্ণিত যে, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তবুকের যুদ্ধে বৃহস্পতিবারে রওয়ানা করিয়াছিলেন। আর তিনি বৃহস্পতিবার দিন সফরে বাহির হওয়া পছন্দ করিতেন। —বুখারী
كتاب الجهاد
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ: الْفَصْل الأول
عَن كَعْب بْنِ مَالِكٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَرَجَ يَوْمَ الْخَمِيسِ فِي غَزْوَةِ تَبُوكَ وَكَانَ يُحِبُّ أَنْ يَخْرُجَ يَوْمَ الْخَمِيسِ. رَوَاهُ البُخَارِيّ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. বৃহস্পতিবার মুবারক দিন। কেননা, বান্দার সপ্তাহের আমল এই দিনই আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হয়। আর হুযূর (ﷺ)-এর সফর ইত্যাদি আল্লাহর জন্যই হইত। সুতরাং সেই দিনই তাঁহার আমল আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হউক, এই আশায় উক্ত দিনে তিনি সফরে বাহির হইতেন।

২. তাবুক মদীনা মুনাউওয়ারা থেকে উত্তর দিকে প্রায় ৮০০ মাইল দূরে অবস্থিত। এলাকাটি ছিল তখনকার পরাশক্তি রোম সাম্রাজ্যের অধীন। হিজরী ৯ম সনের রজব মাসে এখানে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ পেলেন রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস মদীনা মুনাউওয়ারায় এক জোরদার হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনকি সে শাম ও আরবের সীমান্ত এলাকায় এক বিশাল বাহিনীও মোতায়েন করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিরাক্লিয়াসের আক্রমণের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই সামনে অগ্রসর হয়ে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন। সুতরাং তিনি সকল মুসলিমকে এ যুদ্ধে শরীক হওয়ার হুকুম দিলেন। এটাই ছিল সর্বপ্রথম যুদ্ধ, যা তখনকার আরবভূমির বাইরে অনুষ্ঠিত হয় এবং তাও সেকালের শ্রেষ্ঠ পরাশক্তির বিরুদ্ধে। কাজেই মুসলিমদের পক্ষে এটা ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা। দীর্ঘ ১০ বছর উপর্যুপরি যুদ্ধ শেষে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল। আবার সময়টা ছিল প্রচণ্ড গরমের। ছিল দুর্গম মরুভূমির পথ। যুদ্ধের রসদ, বাহন সবকিছুই ছিল নিতান্ত নগণ্য। যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সেই বৃহত্তম শক্তির রণকৌশল সম্পর্কেও মুসলিমদের জানাশোনা ছিল না। সবদিক থেকেই ছিল কঠিন সংকট ও সীমাবদ্ধতা। তাই এ যুদ্ধের অপর নাম গাযওয়াতুল উসরা বা সংকট ও সমস্যাসংকুল যুদ্ধ। কিন্তু তা সত্ত্বেও শাহাদাতের প্রেরণায় উজ্জীবিত সাহাবীগণ দলে দলে এ যুদ্ধে নাম লেখালেন। যথাসাধ্য প্রস্তুতি শেষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৩০ হাজার সাহাবীর এক বাহিনী নিয়ে তাবুকের উদ্দেশে বের হয়ে পড়লেন। আল্লাহ তা'আলা হিরাক্লিয়াস ও তার বাহিনীর উপর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দুঃসাহসিক অভিযানের এমন প্রভাব ফেললেন যে, তারা কালবিলম্ব না করে ফেরত চলে গেল। ফলে যুদ্ধ আর হলো না। তবে যুদ্ধ না হলেও এ অভিযানে ইসলাম ও মুসলিম বাহিনীর বিজয় ঠিকই অর্জিত হলো। কেননা একে তো সেকালের বৃহত্তম শক্তির উপর ইসলামী শক্তির প্রভাব পড়েছিল এবং তারা ইসলাম ও তার অনুসারীদের আমলে নিতে বাধ্য হয়েছিল। দ্বিতীয়ত তাদের ফিরে যাওয়ায় আশপাশের ক্ষুদ্র রাজন্যবর্গ ক্রমবর্ধমান ইসলামী শক্তির গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল। তাই তারা কালবিলম্ব না করে তাবুকে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং তাঁর সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করে। এ যুদ্ধটিই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ।

হাদীছটিতে বলা হয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃহস্পতিবার যুদ্ধের সফরে বের হওয়া পছন্দ করতেন এবং তিনি তাবুকের যুদ্ধে বৃহস্পতিবারই বের হয়েছিলেন। আরবীতে বৃহস্পতিবারকে يَوْمُ الْخَمِيسِ বলা হয়। এর শাব্দিক অর্থ পঞ্চম দিন। বৃহস্পতিবারকে পঞ্চম দিন বলার কারণ শুক্র ও শনিবারকে যথাক্রমে বলা হয় ইয়াওমুল জুমু'আ ও ইয়াওমুস সাব্‌ত। তারপর রোববারকে সপ্তাহের প্রথম দিন ধরে এর নাম দেওয়া হয়েছে ইয়াওমুল আহাদ অর্থাৎ প্রথম দিন। সে হিসেবে পঞ্চম দিন হয় বৃহস্পতিবার।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃহস্পতিবারে বের হওয়া পছন্দ করতেন সম্ভবত এ কারণে যে, এক রেওয়ায়েতে আছে, এ উম্মতের জন্য বৃহস্পতিবারের ভোর বেলায় বরকত রাখা হয়েছে। সম্ভবত সে বরকত লাভের উদ্দেশ্যেই তিনি এদিন ভোর বেলায় বের হতেন।

যদিও তিনি বৃহস্পতিবারে বের হওয়া পছন্দ করতেন এবং অধিকাংশ সফর তিনি বৃহস্পতিবারেই করতেন, কিন্তু তার মানে এ নয় যে, অন্য কোনওদিন বের হওয়া যাবে না। কেননা তিনি কোনও কোনও সফর অন্য দিনেও করেছেন। আলোচ্য হাদীছটির ভেতরেও সেদিকে ইঙ্গিত রয়েছে। কেননা বলা হয়েছে, তিনি বৃহস্পতিবার ছাড়া কমই বের হতেন। বোঝা যাচ্ছে কখনও কখনও অন্যদিনও বের হতেন। কাজেই অন্যদিন বের হওয়াটাও নিঃসন্দেহে জায়েয। এমনকি তা মাকরূহও নয়। হাঁ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু বৃহস্পতিবারে বের হওয়া পছন্দ করতেন, সে হিসেবে অন্য দিনের তুলনায় এদিন সফর করাটা অবশ্যই উত্তম।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. দিন হিসেবে সকল দিন সমান হলেও বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য একদিন অপেক্ষা অন্য দিন উত্তম হতে পারে।

খ. সফরের জন্য বৃহস্পতিবারকে বেছে নেওয়া উত্তম।
২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান