মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

২০- জিহাদের বিধানাবলী অধ্যায়

হাদীস নং: ৩৮০৪
প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮০৪। হযরত মাসরূক (রঃ) বলেন, আমরা হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) -কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলামঃ وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ ربِّهم يُرزقون অর্থ: "যাহারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত (শহীদ) হইয়াছে, তোমরা তাহাদিগকে মৃত ধারণা করিও না; বরং তাহারা জীবিত। তাহারা তাহাদের প্রভুর নিকট হইতে রিযক (খাদ্য) পাইয়া থাকেন।” উত্তরে ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলিলেন, আমরা এ বিষয়ে (রাসুলুল্লাহ্ [ছাঃ])-কে জিজ্ঞাসা করিয়া ছিলাম, তিনি বলিয়াছেন তাহাদের (অর্থাৎ, শহীদদের) রূহসমূহ সবুজ বর্ণের পাখীর প্রতিকৃতির মধ্যে রক্ষিত হয় এবং তাহাদের জন্য আল্লাহর আরশের নীচে ফানুস ঝুলাইয়া দেওয়া হয়। অতঃপর তাহারা জান্নাতে যথেচ্ছা বিচরণ করে (এবং জান্নাতের নেয়ামত উপভোগ করে)। পরে আবার ঐ সমস্ত ফানুসের দিকে ফিরিয়া আসে। অতঃপর তাহাদের রব তাহাদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি করত তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের কোন বস্তুর আকাঙ্ক্ষা আছে কি? উত্তরে তাহারা বলে, আমরা আর কি জিনিসেরই বা আকাঙ্ক্ষা করিব? অথচ আমরা জান্নাতের যথায় ইচ্ছা তথায় বিচরণ করিতেছি। আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদিগকে এইভাবে তিনবার জিজ্ঞাসা করেন, যখন তাহারা দেখে যে, বার বার তাহাদিগকে একই কথা জিজ্ঞাসা করা হইতেছে, তখন তাহারা বলে, হে আমাদের পরওয়ারদেগার! আমরা চাহিতেছি যে, আমাদের রূহ্ (আত্মা)-গুলিকে পুনরায় আমাদের দেহের ভিতরে ফিরাইয়া দেওয়া হউক, যেন আমরা পুনরায় আপনার রাস্তায় জেহাদ করিয়া আবার শাহাদত লাভ করিতে পারি। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা যখন দেখেন যে, তাহাদের কোন জিনিসের আকাঙ্ক্ষা বা প্রয়োজন নাই, তখন তাহাদের সাথে এই প্রসংগ ত্যাগ করেন। —মুসলিম
وَعَنْ مَسْرُوقٍ قَالَ: سَأَلْنَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ مسعودٍ عَنْ هَذِهِ الْآيَةِ: (وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ ربِّهم يُرزقون)

الْآيَةَ قَالَ: إِنَّا قَدْ سَأَلْنَا عَنْ ذَلِكَ فَقَالَ: أَرْوَاحُهُمْ فِي أَجْوَافِ طَيْرٍ خُضْرٍ لَهَا قَنَادِيلُ مُعَلَّقَةٌ بِالْعَرْشِ تَسْرَحُ مِنَ الْجَنَّةِ حَيْثُ شَاءَتْ ثُمَّ تَأْوِي إِلَى تِلْكَ الْقَنَادِيلِ فَاطَّلَعَ إِلَيْهِمْ رَبُّهُمُ اطِّلَاعَةً فَقَالَ: هَلْ تَشْتَهُونَ شَيْئًا؟ قَالُوا: أَيَّ شَيْءٍ نَشْتَهِي وَنَحْنُ نَسْرَحُ مِنَ الْجنَّة حيثُ شِئْنَا ففعلَ ذلكَ بهِمْ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ فَلَمَّا رَأَوْا أَنَّهُمْ لَنْ يُتْرَكُوا مِنْ أَنْ يَسْأَلُوا قَالُوا: يَا رَبُّ نُرِيدُ أَنْ تُرَدَّ أَرْوَاحُنَا فِي أَجْسَادِنَا حَتَّى نُقْتَلَ فِي سبيلِكَ مرَّةً أُخرى فَلَمَّا رَأَى أَنْ لَيْسَ لَهُمْ حَاجَةٌ تُرِكُوا . رَوَاهُ مُسلم

হাদীসের ব্যাখ্যা:

কেহ কেহ মনে করেন, মানুষের আত্মাকে পাখীর দেহের মধ্যে প্রবেশ করান তাহার জন্য অপমান বৈ কিছুই নহে। কাজেই শহীদদের জন্য ইহাতে সম্মান হইতে পারে না। ইহার উত্তরে বলা হয় যে, যেই জিনিসের মধ্যে ঐ সব আত্মাকে রাখা হইবে তাহা দুনিয়ার পাখীর দেহ নহে; বরং ঐ বস্তুটির আকৃতিই হইবে পাখীর ন্যায় যাহা দেখিতে মনে হইবে পাখী। আবার পাখীর ভিতরে ঢুকানোর অর্থ তাহাকে কয়েদ করাও নহে; বরং উহা দুনিয়াতে যেমন, আমরা পালকী, গাড়ী, বিমান ইত্যাদিতে আরোহণ করিয়া বিচরণ করি সেই মত বাহন। আর তাহাদিগকে পাখীর আকৃতিতে রাখার উদ্দেশ্য হইল, যেন তাহাদিগকে পায়ে হাঁটিবার প্রয়োজন না হয়। মোটকথা, ঐ জিনিসটির গঠন আকৃতি হইবে পাখীর ন্যায়; কিন্তু স্বভাব ও গুণাবলীতে উহা পাখী নহে। অন্য আরেক হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে যে, জান্নাতীরা সর্বশেষ ও সর্বোত্তম নেয়ামত হিসাবে আল্লাহর দীদার লাভ করার আকাঙ্ক্ষা করিবে। কিন্তু এই হাদীসে দেখা যায়, তাহারা পুনরায় দুনিয়াতে ফিরিয়া আসিবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করিবে। ইহার জওয়াবে বলা হয় যে, সর্বশেষ বিচারের পরই আল্লাহর সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা হইবে, তাহার আগে নহে। এই হাদীসে কিয়ামতের আগে আলমে বরযখের কথাই বলা হইয়াছে। সুতরাং ইহা হইতে বুঝা যায় যে, আলমে বরযখে থাকা অবস্থায় তাহারা জান্নাতের যে সমস্ত নেয়ামত ভোগ করিবে, উহার তুলনায় আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া আরও উত্তম নেয়ামত মনে করিবে।
টীকাঃ কোন কোন সম্প্রদায় এই হাদীস হইতে ইসলাম ধর্মেও বিবর্তনবাদ বা পুনর্জন্মবাদ-এর স্বীকৃতি আছে বলিয়া ধারণা করে; কিন্তু এই ধরনের ধারণা সম্পূর্ণ অমূলক ও ভিত্তিহীন। কারণ, পুনর্জন্মবাদের স্বরূপ হইল, পরকাল বলিতে আলাদা কোন জীবন নাই; বরং এই দুনিয়ার জীবনেই মানুষ নিজ নিজ কর্মফল ভোগ করিবার জন্য বার বার জন্মে আবার জন্মান্তরে নূতন জন্ম লাভ করিতে থাকে। অথচ উক্ত হাদীসে শুধু এতটুকু প্রমাণিত হয় যে, আলমে বরযখের (মধ্যবর্তী জগতের) অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের মধ্যে শহীদানের আত্মা অস্থায়ীভাবে পাখীর প্রতিকৃতি ধারণ করিয়া জান্নাতের নেয়ামত ভোগ করিতে থাকিবে। অবশ্য কিয়ামত দিবসে পরকালের স্থায়ী জীবনের জন্য নিজ আকৃতিতে সকলের সহিত তাহাদেরও পুনরুত্থান ঘটিবে, সুতরাং এই পৃথিবীর মধ্যে বিবর্তন ঘটার মতবাদ সমর্থনের সহিত উক্ত হাদীসের কোন সম্পর্ক নাই।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান