মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

৫- নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ৫৮০
- নামাযের অধ্যায়
তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৫৮০। হযরত আবু দারদা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমার বন্ধু (রাসূলুল্লাহ সাঃ) আমাকে উপদেশ দিয়েছেন যে, তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে বা কাউকেও অংশীদার বানাবে না। যদিও বা তোমাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয় বা আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আর স্বেচ্ছায় কোন ফরজ নামায পরিত্যাগ করবে না। যে তা করবে তার উপর হতে (ইসলাম প্রদত্ত) নিরাপত্তা উঠে যাবে। আর মদ পান করবে না। কেননা তাই হল যাবতীয় মন্দের চাবিকাঠি। -ইবনে মাযা
كتاب الصلاة
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَن أبي الدَّرْدَاء قَالَ: أَوْصَانِي خَلِيلِي أَنْ لَا تُشْرِكَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَإِنْ قُطِّعْتَ وَحُرِّقْتَ وَلَا تَتْرُكْ صَلَاةً مَكْتُوبَة مُتَعَمدا فَمن تَركهَا مُتَعَمدا فقد بَرِئت مِنْهُ الذِّمَّةُ وَلَا تَشْرَبِ الْخَمْرَ فَإِنَّهَا مِفْتَاحُ كل شَرّ. رَوَاهُ ابْن مَاجَه

হাদীসের ব্যাখ্যা:

প্রত্যেক রাষ্ট্রে যেমনিভাবে প্রজা সাধারণের কতিপয় অধিকার রয়েছে। তারা বিদ্রোহের মত কোন গুরুতর অপরাধ করা পর্যন্ত ন্যায্য অধিকার ভোগ করবে, একইভাবে মহান আল্লাহ্ তা'আলা নিজ দয়ায় সকল মু'মিন-মুসলিমের জন্য কতিপয় বিশেষ নি'আমত দানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। (যার বহিঃপ্রকাশ আখিরাতে হবে।) আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ হযরত আবু দারদা (রা) কে লক্ষ্য করে বলেছেন, স্বেচ্ছায় সালাত বর্জন কেবল অন্যান্য পাপের মত একটি পাপ মাত্র নয় বরং তা এক ধরনের ঘোরতর বিদ্রোহ। যার ফলে সালাত বর্জনকারী আল্লাহর যাবতীয় নি'আমত প্রাপ্তির অধিকার হারিয়ে ফেলে এবং আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে।

একই বিষয়ের উপর অন্য একটি হাদীস ও হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। উক্ত হাদীসেও রাসূলুল্লাহ ﷺ সালাত সম্পর্কে প্রায় অনুরূপ শব্দ ব্যবহার জোর তাগিদ দিয়েছেন। তবে উক্ত হাদীসের শেষ কথা এরূপ-"যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সালাত বর্জন করবে সে দীন থেকে বেরিয়ে যাবে।" (তাবারানী, আততারগীব ওয়াত তারহীব)

এসব হাদীসে সালাত বর্জনকে কুফর অথবা দীন থেকে বহিস্কারের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে তার কারণ সম্ভবত এই, সালাত ঈমানের এমনই একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন এবং ইসলামের বিশেষ প্রতীক, যা বর্জনের দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে, সালাত বর্জনকারীর সাথে আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল ﷺ-এর কোন সম্পর্ক নেই এবং সে নিজেকে ইসলাম থেকে গুটিয়ে নিয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর জীবদ্দশায় একথা ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করা যায় না যে, এক ব্যক্তি মু'মিন মুসলিম অথচ সে সালাত বর্জন করবে। এজন্য সে সময় কারো সালাত বর্জন একথারই প্রকাশ্য প্রমাণ ছিল যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মুসলমান নয়। এখানে বিশিষ্ট তাবিঈ আবদুল্লাহ্ ইবনে শাফীক (র) সাহাবা কিরাম সম্পর্কে যে বাণী প্রদান করেছেন তা উল্লেখের বিশেষ দাবি রাখে। তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবীগণ সালাত ব্যতীত কোন কাজ বর্জন করাকে কুফরী মনে করতেন না। (মিশকাত: বরাতে তিরমিযী)

এই অধমের মতে, এর মর্ম হল, সাহাবা কিরাম দীনের অপরাপর রুকন ও আমল যেমন সাওম, হজ্জ, যাকাত, জিহাদ, এমনিভাবে আখলাক ও লেন-দেন সম্পর্কীয় বিষয়ে অসতর্কতাকে পাপের কাজ মনে করতেন। তবে সালাত যেহেতু ঈমানের অনিবার্য দাবি ও আমলী প্রমাণ এবং দীনের অন্যতম প্রতীক তাই তা বর্জন করাকে দীনের অন্যতম প্রতীকতা বর্জন করাকে দীনের সাথে সম্পর্ক হীনতা ও বেরিয়ে যাবার লক্ষণ বলে মনে করতেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

উল্লিখিত হাদীসসমূহের আলোকে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র) এবং অপরাপর প্রাজ্ঞ আলিমের মতে, সালাত বর্জন করলে মানুষ নির্ঘাত কাফির ও মুরতাদ হয়ে যায় এবং ইসলামের সাথে তার আদৌ সম্পর্ক থাকেনা। এমনকি সে যদি ঐ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তবে তার জানাযা নেই এবং মুসলিম গোরস্তানে তার দাফনও হবে না। মোটকথা, তার অবস্থা মুরতাদ ব্যক্তির অনুরূপ হবে। এসকল মহান ব্যক্তিবর্গের মতে, কোন মুসলমাননের সালাত বর্জন প্রকারান্তরে কোন বা ক্রুশের সামনে সিজদা করা অথবা আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল ﷺ-এর শানে বে-আদবীর শামিল। এতে মানুষ কাফির হয়ে যায় চাই তার বিশ্বাসে কোন পরিবর্তন আসুক আর নাই আসুক। অপরাপর ইমামগণের মতে, সালাত বর্জন যদিও কুফরী কাজ, ইসলামে যার স্থান নেই। তবে কোন হতভাগ্য লোক যদি অচেতনভাবে সালাত বর্জন করে কিন্তু অন্তরে সালাতের অস্বীকৃতি ভাব না জন্মে এবং বিশ্বাসে কোনরূপ পরিবর্তন না ঘটে, সে দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। কিন্তু পুরোপুরি অমুসলিম বলে গণ্য হবে না এবং তার উপর হদ্দের বিধানও কার্যকর হবে না। উল্লিখিত হাদীসের ব্যাখ্যায় এই সকল আলিম অভিমত দেন যে, সালাত বর্জনকে যে কুফর বলা হয়েছে তার উদ্দেশ্য হল, কাজটি কুফরীর শামিল। এর ভয়াবহ শাস্তির কথা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার জন্য এ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন ক্ষতিকর আহার্যের ব্যাপারে বলা হয় এ হচ্ছে বিষ পানের শামিল।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মিশকাতুল মাসাবীহ - হাদীস নং ৫৮০ | মুসলিম বাংলা