মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

২- ঈমানের অধ্যায়

হাদীস নং: ১৩১
- ঈমানের অধ্যায়
৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কবরের আযাব
১৩১। হযরত বারা' ইবনে আযেব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, (কবরে) মু'মিন বান্দার নিকট দুইজন ফিরিশতা এসে তাকে উঠিয়ে বসান। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার প্রতিপালক কে? সে বলে, আমার প্রতিপালক আল্লাহ। তারপর জিজ্ঞেস করেন, তোমার দীন কি? সে বলে, আমার দীন ইসলাম। তারপর জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি প্রেরিত হয়েছিলেন, তিনি কে? সে বলে, তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)। তখন ফিরিশতাদ্বয় তাকে বলেন, তুমি তা কিভাবে বুঝতে পারলে? সে বলে, আমি আল্লাহর কিতাব পড়ে দেখে তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাঁকে মেনে নিয়েছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, এটাই হল আল্লাহ পাকের এ কালামের মর্ম। يثبت الله الَّذين آمنُوا بالْقَوْل الثَّابِت "যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদেরকে কালেমায় শাহাদাতের উপর মজবুত রাখেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, অতঃপর আসমানের দিক থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা করেন, “আমার বান্দা সত্য বলেছে; সুতরাং তার জন্য বেহেশতের একটি বিছানা বিছিয়ে দাও এবং তার জন্য বেহেশতের একটি দরজা খুলে দাও; সুতরাং তার জন্য একটি দরজা খুলে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন যে, এর ফলে তার নিকট বেহেশতের স্নিগ্ধ হাওয়া এবং বেহেশতের সুগন্ধি আসতে থাকে। আর বেহেশতের সেই দরজা হয় দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত সুপ্রশস্ত।
অপর দিকে কাফিরের মৃত্যুর বিষয় উত্থাপন করে তিনি বললেন, তারও রূহকে তার দেহের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করানো হয়। অতঃপর দুইজন ফিরিশতা এসে তাকে উঠিয়ে বসান এবং জিজ্ঞেস করেন, তোমার প্রভু কে? তখন সে বলতে থাকে যে, হায় হায়! আমি তো তা জানি না। পুনরায় ফিরিশতাদ্বয় জিজ্ঞেস করেন, তোমার দীন কি? সে বলে, হায় হায়! আমি তো কিছুই জানি না। সে উত্তরে বলে, হায়! হায়! আমি তো কিছুই জানি না। এরপর ফিরিশতারা জিজ্ঞেস করেন, এই ব্যক্তি কে, যাকে তোমাদের মধ্যে প্রেরণ করা হয়েছিল? সে বলবে, হায়! হায়! আমি তো কিছুই জানি না। অতঃপর আসমানের দিক হতে একজন ঘোষক ঘোষণা করেন, সে মিথ্যা বলেছে; সুতরাং তার জন্য দোযখ হতে একটি (আগুনের) শয্যা এনে দাও এবং তাকে দোযখের পোশাক পরিয়ে দাও। আর তার জন্য তার কবরের সাথে দোযখের একটি দরজা খুলে দাও। রাসূলে পাক (ﷺ) বললেন; সুতরাং তার প্রতি দোযখের উত্তাপ ও উত্তপ্ত হাওয়া বয়ে আসতে থাকে। তিনি বললেন, এছাড়া তার প্রতি তার কবরকে এমন সংকীর্ণ করে দেওয়া হয়, যাতে তার একদিকের পাঁজর অপরদিকের পাঁজরের মধ্যে ঢুকে যায়। তারপর তার জন্য একজন অন্ধ ও বধির ফিরিশতাকে মোতায়েন করা হয়। তিনি একটি লোহার হাতুড়ী নিয়ে আসেন। সেই হাতুড়ি দ্বারা কোন পাহাড়ে আঘাত করা হলে অবশ্যই তা মাটি হয়ে যায়। উক্ত ফিরিশতা তাকে এমনভাবে আঘাত করতে থাকেন, যাতে সে বিকট চীৎকার করে উঠে, যা মানুষ ও জ্বীন ব্যতীত মাশরেক হতে মাগরেব পর্যন্ত সমগ্র মাখলুকই শুনতে পায়। সাথে সাথে সে কবরের মাটির সাথে মিলিয়ে যায়; আবার তাকে জীবিত করা হয়। (এভাবে একাধারে তার উপর শাস্তি চলতে থাকে)। -আহমদ, আবু দাউদ
كتاب الإيمان
باب إثبات عذاب القبر - الفصل الثاني
عَن الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «وَيَأْتِيهِ مَلَكَانِ فَيُجْلِسَانِهِ فَيَقُولَانِ لَهُ مَنْ رَبُّكَ فَيَقُولُ رَبِّيَ اللَّهُ فَيَقُولَانِ لَهُ مَا دِينُكَ فَيَقُولُ ديني الْإِسْلَام فَيَقُولَانِ لَهُ مَا هَذَا الرَّجُلُ الَّذِي بُعِثَ فِيكُمْ قَالَ فَيَقُول هُوَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَقُولَانِ وَمَا يُدْرِيكَ فَيَقُولُ قَرَأْتُ كِتَابَ اللَّهِ فَآمَنْتُ بِهِ وَصَدَّقْتُ زَاد فِي حَدِيث جرير فَذَلِك قَول الله عز وَجل (يثبت الله الَّذين آمنُوا بالْقَوْل الثَّابِت) الْآيَة ثمَّ اتفقَا قَالَ فينادي مُنَاد من السَّمَاء أَن قد صدق عَبدِي فأفرشوه مِنَ الْجَنَّةِ وَافْتَحُوا لَهُ بَابًا إِلَى الْجَنَّةِ وألبسوه من الْجنَّة قَالَ فيأتيه من روحها وطيبها قَالَ وَيفتح لَهُ فِيهَا مد بَصَره قَالَ وَإِن الْكَافِر فَذكر مَوته قَالَ وتعاد رُوحُهُ فِي جَسَدِهِ وَيَأْتِيهِ مَلَكَانِ فَيُجْلِسَانِهِ فَيَقُولَانِ لَهُ مَنْ رَبُّكَ فَيَقُولُ هَاهْ هَاهْ لَا أَدْرِي فَيَقُولَانِ لَهُ مَا دِينُكَ فَيَقُولُ هَاهْ هَاهْ لَا أَدْرِي فَيَقُولَانِ مَا هَذَا الرَّجُلُ الَّذِي بُعِثَ فِيكُمْ فَيَقُولُ هَاهْ هَاهْ لَا أَدْرِي فَيُنَادِي مُنَادٍ مِنَ السَّمَاءِ أَنَّ كَذَبَ فَأَفْرِشُوهُ مِنَ النَّارِ وَأَلْبِسُوهُ مِنَ النَّارِ وَافْتَحُوا لَهُ بَابًا إِلَى النَّارِ قَالَ فَيَأْتِيهِ مِنْ حَرِّهَا وَسَمُومِهَا قَالَ وَيُضَيَّقُ عَلَيْهِ قَبْرُهُ حَتَّى تَخْتَلِفَ فِيهِ أَضْلَاعُهُ ثمَّ يقيض لَهُ أعمى أبكم مَعَهُ مِرْزَبَّةٌ مِنْ حَدِيدٍ لَوْ ضُرِبَ بِهَا جبل لصار تُرَابا قَالَ فَيَضْرِبُهُ بِهَا ضَرْبَةً يَسْمَعُهَا مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمغْرب إِلَّا الثقلَيْن فَيصير تُرَابا قَالَ ثمَّ تُعَاد فِيهِ الرّوح» . رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. উক্ত হাদীসের আলোকে এখন প্রশ্ন হল কবরের যিন্দেগী বলতে কি বুঝায়? বা যাকে কবরের মধ্যে দাফন করা হয় না, যার মৃতদেহকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয় বা শ্মশানে জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং দেহ ভস্মকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয়া হয় তাকে কি করে কবরের যিন্দেগীর বর্ণিত শাস্তি বা পুরস্কার দেয়া হবে?

কবরের আযাব সম্পর্কে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সে সম্পর্কে ব্যাখ্যাকারীগণ বলেন: কবরের আযাবের অর্থ, আলমে বারযাখের আযাব। মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত বিশাল যিন্দেগীকে বারযাখের যিন্দেগী বলা হয়। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তার উল্লেখ রয়েছে। সূরা 'আল-মুমিনুন'-এ বারযাখের যিন্দেগী সম্পর্কে বলা হয়েছে,

وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ -

"তাদের (মৃত ব্যক্তিদের) সামনে রয়েছে বারযাখ যা তাদেরকে পুনরত্থিত করা পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে।" (সূরা 'আল-মুমিনুন' - ১০০)
অর্থাৎ আল্লাহ্ মৃত ব্যক্তি ও দুনিয়ার মধ্যে এক পর্দা টেনে দেন-যার ফলে সে দুনিয়ার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে পারে না এবং কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করতে থাকে।

আলমে বারযাখের প্রমাণ সূরা ইয়াসীনেও রয়েছে। সত্যকথা বলার কারণে এক মুমিনকে তার জাতির লোকেরা হত্যা করে। মৃত্যুর পর আল্লাহ্ তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেন। বেহেশত লাভের পর তিনি তার জাতির জন্য মঙ্গল কামনা করতে থাকেন। বলা হয়েছে,
قِيلَ ادْخُلِ الْجَنَّةَ ۖ قَالَ يَا لَيْتَ قَوْمِي يَعْلَمُونَ (26) بِمَا غَفَرَ لِي رَبِّي وَجَعَلَنِي مِنَ الْمُكْرَمِينَ (27)

"তাকে বলা হলো, জান্নাতে প্রবেশ করো, সে বলে উঠলো হায়! আমার সম্প্রদায় যদি জানতে পারতো। (২৬) কিরূপ আমার প্রতিপালক আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিত করেছেন। (২৭)" (সূরা ইয়াসীন - ২৬-২৭)
মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত আছে। তোমাদের মধ্যে যার মৃত্যু হোক না কেন তাকে সকাল-সন্ধ্যা তার শেষ বাসস্থান দেখানো হয়। সে জান্নাতী কিংবা জাহান্নামী হোক তাকে বলা হয় কিয়ামতের দিন আল্লাহ কর্তৃক তোমার পুনরুত্থানের এ বাসস্থান হবে তোমার।
কিয়ামত অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তি আলমে বারযাখে অবস্থান করবে। তাই তার দেহ পানিতে ভাসুক বা মাটিতে নষ্ট হোক বা জ্বালানো হোক, তাতে কিছু আসে যায় না। সেখানে রূহ হয় শাস্তি, নয় আরাম উপভোগ করবে। মৃত্যুর সাথে সাথে যে সাওয়াল-জাওয়াব হয় তা আলমে বারযাখে হয়ে থাকে। মৃত ব্যক্তির রূহকে সাওয়াল করার জন্য আল্লাহ আলমে বারযাখে কবরের অবস্থা সৃষ্টি করতে পারেন। এবং সাময়িকভাবে রূহকে দেহের ভেতর রাখতে পারেন বা রূহ মনে করতে পারে যে, সে দেহের মধ্যে রয়েছে। দেহ ছাড়া রূহ কিভাবে সুখ-শান্তি অনুভব করবে তা 'স্বপ্ন' থেকে সহজে বুঝা যায়।
স্বপ্নে আমাদের রূহ দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ায় এবং আমাদের দেহ বিছানায় পড়ে থাকে। আলমে বারযাখে যে শাস্তি বা আরাম দেয়া হবে তা স্বপ্নের মত অনুভবের পর্যায়ে থাকবে না, বরং তা হবে বাস্তব। নেক লোকের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হবে এবং মন্দলোকের জন্য জাহান্নামের দরজা খুলে দেয়া হবে।

২. হাদীছে যে আয়াতটি উল্লেখ করা হয়েছে তা দ্বারা বোঝা যায়, যারা সুদৃঢ় কথা অর্থাৎ কালেমায়ে তায়্যিবার উপর ঈমান আনবে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দুনিয়ায়ও দীনের উপর মজবুত রাখবেন অর্থাৎ প্রকৃত ঈমানদার কোনও পরিস্থিতিতেই বিভ্রান্তির শিকার হবে না। বিপথগামিতার কোনও ডাকে তারা সাড়া দেবে না। এমনিভাবে কবর ও হাশর তথা আখিরাতের প্রতিটি ঘাঁটিতে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে অবিচল রাখবেন। কবরের প্রশ্ন ও হাশরের ময়দানের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, কোনও অবস্থায়ই তারা দিশেহারা হবে না। আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদেরকে সাহায্য করবেন। কবর আখিরাতের প্রথম ঘাঁটি। এখানে যে ব্যক্তি মুনকার নাকীরের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে, কবর তার জন্য জান্নাতের টুকরায় পরিণত হবে। এখানে যে শান্তি পেয়ে যাবে, পরবর্তী সকল ঘাঁটি তার জন্য আসান হয়ে যাবে। বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা তা বোঝা যায়। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে ওই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে শামিল রাখুন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কবরের সাওয়াল-জাওয়াব সত্য। এতে বিশ্বাস রাখা জরুরি।

খ. কবরে মুনকার-নাকীরের প্রশ্নের যাতে সঠিক উত্তর দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যে আমাদের কর্তব্য কালেমায়ে তায়্যিবার প্রতি অবিচল ঈমান রাখা এবং এর দাবি অনুযায়ী শরী'আত মোতাবেক জীবনযাপন করা। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাওফীক দিন।
১. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.) ২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান