আল জামিউল কাবীর- ইমাম তিরমিযী রহঃ

৪১. নবীজী ﷺ থেকে বর্ণিত ইলমের অধ্যায়

হাদীস নং: ২৬৮৫
আন্তর্জাতিক নং: ২৬৮৫
নবীজী ﷺ থেকে বর্ণিত ইলমের অধ্যায়
ইবাদতের উপর ফিকহের (দ্বীনী ইলমের) ফযীলত।
২৬৮৫. মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল আ’লা (রাহঃ) ..... আবু উমামা আল-বাহিলী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এর নিকট দুই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হল- একজন আবেদ আর একজন আলিম। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বললেনঃ একজন আবেদের উপর একজন আলিমের ফযীলত তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম ব্যক্তির তুলনায় আমার ফযীলতের ন্যায়।

এরপর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) আরো বললেনঃ আল্লাহ্ তাআলা নিজে এবং তাঁর ফিরিশতাগণ, আসমান ও যমীনের সব অধিবাসী এমনকি গর্তের পিপীলিকা ও (পানির) মাছ পর্যন্ত মানুষকে কল্যাণপ্রসূ শিক্ষকের (আলিমের) জন্য অবশ্যই দুআ করে থাকেন।

এই হাদীসটি হাসান-গারীব-সহীহ। ইমাম তিরমিযী (রাহঃ) বলেনঃ আবু আম্মার হুসাইন ইবনে হুরায়ছ খুযাঈ (রাহঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, ফুযায়াল ইবনে ইয়ায বলেছেনঃ একজন আমলদার শিক্ষক আলিমকে আকাশ রাজ্যে মহান বলে আখ্যায়িত করা হয়।
أبواب العلم عن رسول الله صلى الله عليه وسلم
باب مَا جَاءَ فِي فَضْلِ الْفِقْهِ عَلَى الْعِبَادَةِ
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الأَعْلَى الصَّنْعَانِيُّ، حَدَّثَنَا سَلَمَةُ بْنُ رَجَاءٍ، حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ بْنُ جَمِيلٍ، حَدَّثَنَا الْقَاسِمُ أَبُو عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ أَبِي أُمَامَةَ الْبَاهِلِيِّ، قَالَ ذُكِرَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَجُلاَنِ أَحَدُهُمَا عَابِدٌ وَالآخَرُ عَالِمٌ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " فَضْلُ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِي عَلَى أَدْنَاكُمْ " . ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " إِنَّ اللَّهَ وَمَلاَئِكَتَهُ وَأَهْلَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ حَتَّى النَّمْلَةَ فِي جُحْرِهَا وَحَتَّى الْحُوتَ لَيُصَلُّونَ عَلَى مُعَلِّمِ النَّاسِ الْخَيْرَ " . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيبٌ . قَالَ سَمِعْتُ أَبَا عَمَّارٍ الْحُسَيْنَ بْنَ حُرَيْثٍ الْخُزَاعِيَّ يَقُولُ سَمِعْتُ الْفُضَيْلَ بْنَ عِيَاضٍ يَقُولُ عَالِمٌ عَامِلٌ مُعَلِّمٌ يُدْعَى كَبِيرًا فِي مَلَكُوتِ السَّمَوَاتِ .

হাদীসের ব্যাখ্যা:

উপরোক্ত হাদীসে 'ইলম', 'তালিবীনে ইলম', 'উলামা', ও 'মু'আল্লিমীন'-এর অসাধারণ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। এর মুদ্দাকথা ও রহস্য এই যে, এ ইলম আল্লাহ্ তা'আলার নাযিলকৃত হিদায়াতের আলো, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে এসেছে। আর দুনিয়া থেকে তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর আনীত ওহীর ইলম (যা কুরআন মজীদে রয়েছে) উম্মতের জন্য তাঁর নবুওতীর অস্তিত্বের স্থলবর্তী। আর এটা বহনকারী উলামা ও উস্তাদবৃন্দ জীবন্ত মানুষের আকৃতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্থলবর্তী। তাঁরা নবী তো নন, তবে নবীগণের উত্তরাধীকারী হিসাবে নবুওতের কাজ সামলে রেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাজই আঞ্জাম দিচ্ছেন তাঁর সাহায্যকারী ও সহায়ক শক্তি হিসাবে। এ বৈশিষ্ট্যই তাঁদেরকে সেই স্থানে ও তাঁর সাহায্যকারী ও সহায়ক শক্তি হিসাবে। এ বৈশিষ্ট্যই তাঁদেরকে সেই স্থানে ও মর্যাদায় উপনীত করে আল্লাহর অসাধারণ দানের যোগ্য করেছে। তবে শর্ত হচ্ছে, ইলমে দীন অন্বেষণ ও অর্জন এবং পঠন-পাঠন কেবল আল্লাহর জন্য এবং আখিরাতের পুরস্কারের জন্য হতে হবে। আল্লাহ না করুন যদি পার্থিব উদ্দেশ্য হয়, তবে তা নিকৃষ্টতম গুনাহ। বিশুদ্ধ হাদীসের স্পষ্ট বর্ণনানুযায়ী এ জাতীয় লোকদের ঠিকানা জাহান্নাম। আল্লাহ্ আমাদের রক্ষা করুন।

একটি জরুরি ব্যাখ্যা

এ ধারাবাহিকতায় এখানে একটি বিষয়ের ব্যাখ্যা আবশ্যক। আমাদের এ যুগে দীনী মাদ্রাসা ও দারুল উলূমগুলোর আকৃতিতে দীনী ইলম শিক্ষা করার যে পদ্ধতি চালু রয়েছে এ প্রেক্ষিতে যখন আমাদের দীনী মাহফিলসমূহে তালিব ইলম শব্দ বলা হয়, তখন মস্তিষ্ক এই দীনী মাদ্রাসাসমূহে শিক্ষাগ্রহণকারী তালিব ইলমদের প্রতিই ধাবিত হয়। এভাবে দীনের 'আলিম' অথবা দীনের 'মু'আল্লিম' শব্দ শুনে মস্তিষ্ক পরিভাষা ও সাধারণে পরিচিত উলামা ও দীনী মাদ্রাসাসমূহে অধ্যাপনাকারী শিক্ষকদের প্রতি ধাবিত হয়। এরপর এর স্বাভাবিক পরিণাম এই যে, উপরে উল্লেখিত হাদীসসমূহে, এভাবে এ অনুচ্ছেদের অন্যান্য হাদীসসমূহে দীনী ইলম অন্বেষণ ও অর্জন কিংবা ইলমে দীনের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকমণ্ডলীর যে সব মর্যাদা ও প্রশংসা বর্ণিত হয়েছে, আর তাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে আগমনকারী যে সব অসাধারণ নি'আমতরাজির সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, সে গুলোর প্রয়োগস্থল এই মাদ্রাসাগুলোরই শিক্ষা ধারাবাহিকতা-এর ছাত্র ও শিক্ষকমণ্ডলীকে মনে করা হয়। অথচ যেমন প্রথমে উল্লিখিত হয়েছে, নবীযুগে, এরপর সাহাবা কিরাম বরং তাবিঈনের যুগেও এ জাতীয় কোন পঠন-পাঠনের ধারাবাহিকতা ছিল না। না মাদ্রাসা ও দারুল উলূম ছিল, না কিতাব পাঠকারী ও পাঠদানকারী ছাত্র ও শিক্ষকমণ্ডলীর কোন শ্রেণী ছিল। বরং শুরুতে কিতাবের অস্তিত্ব ছিল না। কেবল সাহচর্য ও শ্রবণই পঠন-পাঠনের অবলম্বন ছিল। সাহাবা কিরাম (রা) (তাঁদের প্রথম শ্রেণীর আলিম ও ফকীহগণ যেমন- খুলাফায়ে রাশিদীন, মু'আয ইবনে জাবাল (রা), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), উবাই ইবনে কা'ব (রা), যায়দ ইবনে সাবিত (রা)) প্রমুখও যা কিছু অর্জন করেছিলেন কেবল সাহচর্য ও শ্রবণের মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন। এরপর সাহাবা কিরাম থেকে তাবিঈন, তাঁদের থেকে আলিম ও ফকীহগণ যে ইলম অর্জন করেছিলেন তা অনুরূপ সাহচর্য ও শ্রবণ মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন। নিঃসন্দেহে সেই সব ব্যক্তিত্ব এ হাদীসগুলোর সুসংবাদের প্রাথমিক প্রয়োগস্থল ছিলেন।

লিখক বলেন, আজও আল্লাহর যে সব বান্দা কোন অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে যেমন, সাহচর্য ও শ্রবণের মাধ্যমে নিষ্ঠার সাথে দীন শিখতে ও শিক্ষা দিতে ব্যবস্থাপনা করেন, নিঃসন্দেহে তাঁরাও এ সব হাদীসের প্রয়োগস্থল। আর সন্দেহাতীতভাবে তাঁদের জন্যেও এ সব সুসংবাদ প্রযোজ্য। বরং ভাষাগত ও সাধারণে পরিচিত ছাত্র ও শিক্ষক মণ্ডলীর ওপর তাঁদের এক প্রকার মর্যাদা ও প্রাধান্য অর্জিত। কারণ আমাদের বর্তমান মাদ্রাসা ও দারুল উলূম গুলোতে পাঠকারী ও পাঠদানকারী ছাত্র ও শিক্ষকমণ্ডলীর সামনে এই ইলম অন্বেষণ ও শিক্ষার কতক পার্থিব লাভও থাকতে পারে। (এ হিসাবে কেবল আল্লাহই জানেন আমাদের ভাইদের কি অবস্থা?) কিন্তু যে ব্যক্তি সংশোধন ও ওয়াজের মাহফিলে অথবা কোন দীনী হালকায় নিজের সংশোধন ও দীন শিক্ষার উদ্দেশ্যে শরীক হয় অথবা দীন শিক্ষাকারী ও শিক্ষাদানকারী কোন জামাআতের সাথে এই উদ্দেশ্যে কিছু সময় কাটায়, স্পষ্টত সে এ থেকে কোন পার্থিব লাভের আশা করতে পারে না। এজন্য তার এ অনানুষ্ঠানিক 'ছাত্রত্ব' 'শিক্ষকত্ব' ধান্ধা ছাড়া কেবল আল্লাহ্ এবং আখিরাতের জন্যই হয়ে থাকে। আল্লাহর নিকট এরূপ কাজের কদর ও মূল্যায়ন হয়ে থাকে, যা কেবল আল্লাহর জন্য হয়।

এ অক্ষম এ যুগেই আল্লাহর এরূপ বান্দা দেখেছে, তাদের মধ্যে এরূপ বহু লোকও পেয়েছে যাদের নিকট থেকে আমাদের মত ব্যক্তি (যাদেরকে দুনিয়াবাসী আলিম, ফাযিল মনে করে) প্রকৃত দীনের পাঠ নিতে পারে।

এখানে এ ব্যাখ্যা এজন্য আবশ্যক মনে করছি যে, আমাদের এ যুগে আলিম মু'আল্লিম ও তালিবে ইলম-এর প্রয়োগস্থল হিসাবে উপরে উল্লিখিত ভুল উপলদ্ধি ব্যাপক। যদিও অজ্ঞাতসারে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান