আল জামিউল কাবীর- ইমাম তিরমিযী রহঃ

৩৭. কিয়ামত-মৃত্যুপরবর্তী জগতের বিবরণ

হাদীস নং: ২৪৭৬
আন্তর্জাতিক নং: ২৪৭৬
কিয়ামত-মৃত্যুপরবর্তী জগতের বিবরণ
শিরোনামবিহীন পরিচ্ছেদ।
২৪৭৯. হান্নাদ (রাহঃ) ..... আলী ইবনে আবু তালিব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে একদিন মসজিদে বসা ছিলাম। এমন সময় মুসআব ইবনে উমায়র এলেন। তাঁর গাঁয়ে চামড়ার তালি লাগানো একটি চাদর ছাড়া কিছুই ছিল না। তিনি একদিন যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনে ছিলেন আর বর্তমানে যে অবস্থায় তিনি রয়েছেন সেজন্য তাকে দেখে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কেঁদে দিলেন। তারপর তিনি বললেনঃ সেদিন কেমন হবে যেদিন তোমাদের একজন সকালে এক জোড়া কাপড় পরবে এবং বিকালে পরবে আরেক জোড়া, তার সামনে (খাদ্যের) একটা পেয়ালা রাখা হবে আরেকটি তোলা হবে। কা‘বা ঘরকে যেভাবে গিলাফ দিয়ে আবৃত রাখা হয় সেভাবে তোমরা তোমাদের ঘর আবৃত করবে।

সাহাবীরা বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজকের তুলনায় সেদিন আমরা ভাল থাকব। কারণ আমরা ইবাদতের জন্য অবসর পাব এবং জীবিকার চিন্তা থেকে মুক্ত থাকব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ না, সে দিনের তুলনায় তোমরা আজ অনেক ভাল আছ।
أبواب صفة القيامة والرقائق والورع عن رسول الله صلى الله عليه وسلم
بَابٌ
حَدَّثَنَا هَنَّادٌ، حَدَّثَنَا يُونُسُ بْنُ بُكَيْرٍ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ، حَدَّثَنِي يَزِيدُ بْنُ زِيَادٍ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ كَعْبٍ الْقُرَظِيِّ، حَدَّثَنِي مَنْ، سَمِعَ عَلِيَّ بْنَ أَبِي طَالِبٍ، يَقُولُ إِنَّا لَجُلُوسٌ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي الْمَسْجِدِ إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا مُصْعَبُ بْنُ عُمَيْرٍ مَا عَلَيْهِ إِلاَّ بُرْدَةٌ لَهُ مَرْقُوعَةٌ بِفَرْوٍ فَلَمَّا رَآهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَكَى لِلَّذِي كَانَ فِيهِ مِنَ النِّعْمَةِ وَالَّذِي هُوَ الْيَوْمَ فِيهِ ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " كَيْفَ بِكُمْ إِذَا غَدَا أَحَدُكُمْ فِي حُلَّةٍ وَرَاحَ فِي حُلَّةٍ وَوُضِعَتْ بَيْنَ يَدَيْهِ صَحْفَةٌ وَرُفِعَتْ أُخْرَى وَسَتَرْتُمْ بُيُوتَكُمْ كَمَا تُسْتَرُ الْكَعْبَةُ " . قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ نَحْنُ يَوْمَئِذٍ خَيْرٌ مِنَّا الْيَوْمَ نَتَفَرَّغُ لِلْعِبَادَةِ وَنُكْفَى الْمُؤْنَةَ . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " لأَنْتُمُ الْيَوْمَ خَيْرٌ مِنْكُمْ يَوْمَئِذٍ " . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ . وَيَزِيدُ بْنُ زِيَادٍ هُوَ ابْنُ مَيْسَرَةَ وَهُوَ مَدَنِيٌّ وَقَدْ رَوَى عَنْهُ مَالِكُ بْنُ أَنَسٍ وَغَيْرُ وَاحِدٍ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ وَيَزِيدُ بْنُ زِيَادٍ الدِّمَشْقِيُّ الَّذِي رَوَى عَنِ الزُّهْرِيِّ رَوَى عَنْهُ وَكِيعٌ وَمَرْوَانُ بْنُ مُعَاوِيَةَ وَيَزِيدُ بْنُ أَبِي زِيَادٍ كُوفِيٌّ رَوَى عَنْهُ سُفْيَانُ وَشُعْبَةُ وَابْنُ عُيَيْنَةَ وَغَيْرُ وَاحِدٍ مِنَ الأَئِمَّةِ .

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

(আবু ঈসা বলেন) হাদীসটি হাসান।

এ ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদ হলেন ইবনে মায়সারা, মাদীনী। মালিক ইবনে আনাস (রাহঃ) সহ বিশেষজ্ঞ আলিমগণ তার বরাতে হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন, আর যিনি যুহরী থেকে রিওয়ায়াত করেছেন এবং তার থেকে ওয়াকী‘ ও মারওয়ান ইবনে মুআবিয়া (রাহঃ) হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন তিনি হলেন ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদ দিমাশকী। অপর পক্ষে সুফিয়ান, শু‘বা, ইবনে উয়াইনা প্রমুখ হাদীস বিশেষজ্ঞ ইমামগণ যার থেকে রিওয়ায়াত করেছেন ইনি হলেন ইয়াযীদ ইবনে আবু যিয়াদ কুফী।

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হাদীসের বর্ণনাকারী মুহাম্মদ ইবনে কাঁব কুরাযী (রহ) একজন তাবিঈ ছিলেন। কুরআনের ইলম, যোগ্যতা ও তাকওয়া হিসাবে আপন স্তরে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিলেন। তিনি সেই বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করেননি যিনি হযরত আলী মুরতাযা (রা)-এর বরাতে এ ঘটনা তাকে শুনিয়ে ছিলেন। কিন্তু এভাবে তাঁর বর্ণনা করা এ কথায় প্রমাণ বহন করে যে, তাঁর নিকট সেই বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য।

সাহাবা কিরামের মধ্যে মুস'আব ইবনে উমাইরের এ বিশেষ মর্যাদা ও ইতিহাস ছিল, তিনি খুবই বিলাসী এক সরদার পুত্র দিলেন। তাঁর পরিবার মক্কার সম্পদশালী পরিবার ছিল। আর তিনি স্বীয় ঘরে অতিশয় প্রাচুর্যে প্রতিপালিত হয়ে ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাঁর জীবন ছিল জাঁক-জমকপূর্ণ। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায় এবং আলোচ্য হাদীসে বর্ণিত অবস্থায় এসে পৌছেন। এক ছেড়া জীর্ণ চাদরই শরীরে ছিল। স্থানে স্থানে তাতে চামড়ার টুকরা তালিযুক্তও ছিল। তাঁকে এ অবস্থা ও আকৃতিতে দেখে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চক্ষুদ্বয়ের সামনে তাঁর জাঁক-জমক ও প্রাচুর্যময় জীবনের চিত্র ভেসে উঠে। এতে তাঁর ক্রন্দন আসে।

এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবা কিরামকে এক গুরুত্বপূর্ণ সত্য সম্বন্ধে জ্ঞাত করার জন্যে তাঁদেরকে বললেন, এক সময় আসবে যখন তোমাদের নিকট অর্থাৎ আমার উম্মতের নিকট বিলাসিতা ও প্রাচুর্যের উপকরণের আধিক্য হবে। এক ব্যক্তি সকাল বেলা এক জোড়া কাপড় পরে বের হবে আর সন্ধ্যাবেলা অন্য জোড়া। এভাবে, দস্তর খানায় রকমারী খাদ্য থাকবে। (বল!) তোমাদের কি ধারণা, সে সময় তোমাদের কি হবে? কতক লোক নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সেই সময় ও সেই দিন তো খুবই উত্তম হবে। আমরা প্রাচুর্য ও কেবল অবসরই পাব। সুতরাং আল্লাহর ইবাদত করে থাকব। তিনি বললেন, তোমাদের এ ধারণা সঠিক নয়। আজ তোমরা যে অবস্থায় আছ, ভবিষ্যতে আগমণকারী জাঁক-জমক ও প্রাচুর্যের অবস্থা থেকে অনেক উত্তম।

ঘটনা এই ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এ সত্য বর্ণনা করে ছিলেন তখন তো অদৃশ্যের ওপর ঈমান আনার ন্যায়ই তাতে বিশ্বাস স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রথমে বনী উমাইয়্যা ও বনী আব্বাসের শাসনকালে এবং পরবর্তীকালে অন্যান্য অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রীয় যুগে ও বর্তমানে মুসলিম রাষ্ট্র সমূহে আল্লাহ্ তা'আলা যাদেরকে সীমাহীন বিলাসিতা ও প্রাচুর্যের উপকরণ দিয়েছেন, এ সত্য চাক্ষুস দেখা যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটা এবং এজাতীয় সব ভবিষ্যতবাণী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মু'জিযা ও তাঁর নবুওতের প্রমাণ সমূহের অন্তর্ভুক্ত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান