আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ
৪৭- সৃষ্টি জগতের সূচনা
হাদীস নং: ৩০৪৫
আন্তর্জাতিক নং: ৩২৭৪ - ৩২৭৫
- সৃষ্টি জগতের সূচনা
১৯৯৩. ইবলীস ও তার বাহিনীর বর্ণনা।
৩০৪৫। আবু মা‘মার (রাহঃ) .... আবু সাঈদ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, নামায আদায়ের সময় তোমাদের কারো সম্মুখ দিয়ে যখন কেউ চলাচল করবে তখন সে তাকে অবশ্যই বাঁধা দিবে। সে যদি অমান্য করে তবে আবারো তাকে বাঁধা দিবে। এরপরও যদি সে অমান্য করে তবে অবশ্যই তার সাথে লড়াই করবে। কেননা সে শয়তান।
উসমান ইবনে হাইসাম (রাহঃ) .... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে রমযানের যাকাত (সাদ্কায়ে ফিতরের) হেফাজতের দায়িত্ব প্রদান করলেন। এরপর আমার নিকট এক আগন্তুক আসল। সে তার দু’হাতের কোষ ভরে খাদ্যশস্য গ্রহণ করতে লাগল। তখন আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং বললাম, আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)- এর নিকট নিয়ে যাব। তখন সে একটি হাদীস উল্লেখ করল এবং বলল, যখন তুমি বিছানায় শুতে যাবে, তখন আয়াতুল কুরসী পড়বে। তাহলে সর্বদা আল্লাহর পক্ষ হতে তোমার জন্য একজন হেফাজতকারী থাকবে এবং ভোর হওয়া পর্যন্ত তোমার কাছে শয়তান আসতে পারবে না। তখন নবী (ﷺ) বললেন, সে তোমাকে সত্য বলেছে, অথচ সে মিথ্যাবাদী এবং শয়তান ছিল।
উসমান ইবনে হাইসাম (রাহঃ) .... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে রমযানের যাকাত (সাদ্কায়ে ফিতরের) হেফাজতের দায়িত্ব প্রদান করলেন। এরপর আমার নিকট এক আগন্তুক আসল। সে তার দু’হাতের কোষ ভরে খাদ্যশস্য গ্রহণ করতে লাগল। তখন আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং বললাম, আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)- এর নিকট নিয়ে যাব। তখন সে একটি হাদীস উল্লেখ করল এবং বলল, যখন তুমি বিছানায় শুতে যাবে, তখন আয়াতুল কুরসী পড়বে। তাহলে সর্বদা আল্লাহর পক্ষ হতে তোমার জন্য একজন হেফাজতকারী থাকবে এবং ভোর হওয়া পর্যন্ত তোমার কাছে শয়তান আসতে পারবে না। তখন নবী (ﷺ) বললেন, সে তোমাকে সত্য বলেছে, অথচ সে মিথ্যাবাদী এবং শয়তান ছিল।
كتاب بدء الخلق
باب صِفَةِ إِبْلِيسَ وَجُنُودِهِ
حَدَّثَنَا أَبُو مَعْمَرٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ، حَدَّثَنَا يُونُسُ، عَنْ حُمَيْدِ بْنِ هِلاَلٍ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ، قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " إِذَا مَرَّ بَيْنَ يَدَىْ أَحَدِكُمْ شَىْءٌ وَهُوَ يُصَلِّي فَلْيَمْنَعْهُ، فَإِنْ أَبَى فَلْيَمْنَعْهُ، فَإِنْ أَبَى فَلْيُقَاتِلْهُ، فَإِنَّمَا هُوَ شَيْطَانٌ ".
وَقَالَ عُثْمَانُ بْنُ الْهَيْثَمِ حَدَّثَنَا عَوْفٌ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ وَكَّلَنِي رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِحِفْظِ زَكَاةِ رَمَضَانَ، فَأَتَانِي آتٍ، فَجَعَلَ يَحْثُو مِنَ الطَّعَامِ، فَأَخَذْتُهُ فَقُلْتُ لأَرْفَعَنَّكَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم. فَذَكَرَ الْحَدِيثَ فَقَالَ إِذَا أَوَيْتَ إِلَى فِرَاشِكَ فَاقْرَأْ آيَةَ الْكُرْسِيِّ لَنْ يَزَالَ عَلَيْكَ مِنَ اللَّهِ حَافِظٌ، وَلاَ يَقْرَبُكَ شَيْطَانٌ حَتَّى تُصْبِحَ. فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " صَدَقَكَ وَهْوَ كَذُوبٌ، ذَاكَ شَيْطَانٌ ".
وَقَالَ عُثْمَانُ بْنُ الْهَيْثَمِ حَدَّثَنَا عَوْفٌ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ وَكَّلَنِي رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِحِفْظِ زَكَاةِ رَمَضَانَ، فَأَتَانِي آتٍ، فَجَعَلَ يَحْثُو مِنَ الطَّعَامِ، فَأَخَذْتُهُ فَقُلْتُ لأَرْفَعَنَّكَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم. فَذَكَرَ الْحَدِيثَ فَقَالَ إِذَا أَوَيْتَ إِلَى فِرَاشِكَ فَاقْرَأْ آيَةَ الْكُرْسِيِّ لَنْ يَزَالَ عَلَيْكَ مِنَ اللَّهِ حَافِظٌ، وَلاَ يَقْرَبُكَ شَيْطَانٌ حَتَّى تُصْبِحَ. فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " صَدَقَكَ وَهْوَ كَذُوبٌ، ذَاكَ شَيْطَانٌ ".
হাদীসের ব্যাখ্যা:
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশিষ্ট সাহাবী ও তাঁর অত্যন্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি। তিনি বিভিন্ন সময় তাঁর প্রতি বিভিন্ন দায়িত্বভার অর্পণ করেছেন। আলোচ্য হাদীছটি দ্বারা জানা যায়, তাঁর প্রতি রমাযানের যাকাত অর্থাৎ ফিতরার মালামাল সংরক্ষণের দায়িত্ব অর্পিত ছিল। আরও জানা যায়, সে মাল ছিল খাদ্যশস্য। তিনি তাঁর এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছিলেন। এ অবস্থায় এক রাতে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি সে খাদ্য থেকে দু'হাত ভরে নিয়ে যাচ্ছিল। হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. তাকে ধরে ফেললেন এবং ভয় দেখালেন যে, তাকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে উপস্থিত করবেন, যাতে লুকিয়ে খাদ্যবস্তু নিয়ে যাওয়ার অপরাধে তিনি তাকে শাস্তিদান করেন। তাতে সে লোকটি তার আর্থিক দুর্দশার কথা জানাল এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে কী কষ্টের সঙ্গে দিন কাটাচ্ছে তাও বলল। হযরত আবূ হুরায়রা রাযি, খুব নরম মনের মানুষ ছিলেন। তার কষ্টের কথা শুনে তাঁর খুব দয়া হলো। তিনি বলেন- فَخَلَّيْتُ عَنْهُ (ফলে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম)। প্রশ্ন হয়, তিনি তাকে ছেড়ে দেন কীভাবে, যখন ফিতরার মাল রক্ষণাবেক্ষণ করাই ছিল তাঁর দায়িত্ব? চোরকে ছেড়ে দিলে তো দায়িত্বে অবহেলা হয়ে যায়। এর উত্তর হলো, হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. একজন মুজতাহিদ (সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম গভীর জ্ঞানসম্পন্ন আলেম) ছিলেন। তিনি এ ক্ষেত্রে ইজতিহাদ (চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ) করেছেন। তিনি চিন্তা করেছেন, এ লোকটা নিতান্তই গরিব। যাকাত-ফিতরার মালামাল তো এরকম গরিবদের জন্যই। এটা তাদেরই হক। কাজেই তাকে ছেড়ে দিলে গুনাহ হবে না এবং ছেড়ে দেওয়াটা তাঁর দায়িত্ব পালনে অবহেলা বলেও গণ্য হবে না।
পরদিন ভোরবেলা হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. যখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হলেন, তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন- يا أبا هُرَيْرَةَ، مَا فَعَلَ أَسِيرُكَ الْبَارِحَةَ؟ (হে আবূ হুরায়রা! গেল রাতে তোমার বন্দি কী করল)? এ প্রশ্ন দ্বারা বোঝা যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর মাধ্যমে রাতের পুরো ঘটনা জানতে পেরেছিলেন। তা না হলে তিনি কীভাবে বললেন হযরত আবূ হুরায়রা রাতের বেলা একজনকে বন্দি করেছিলেন? বস্তুত এটা ছিল তাঁর মু'জিযা (অলৌকিকত্ব)। ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তিনি ঘটনার বিবরণ জানতে পারতেন। এটাও তাঁর নবুওয়াতের সত্যতার এক দলীল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিজ্ঞাসার উত্তরে হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. রাতে যা-কিছু ঘটেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ পেশ করলেন। তা শোনার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- أَمَا إِنَّهُ قَدْ كَذَبَكَ وَسَيَعُودُ (শোনা হে সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। সে আবার আসবে)। এর দ্বারা বোঝা যায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জানতে পেরেছিলেন সেকে। সে যে একজন জিন এবং সে খাদ্য চুরি করার জন্য আবারও আসবে, এটা তাঁকে জানানো হয়েছিল। কাজেই সে আর আসবে না বলে যে ওয়াদা করেছে, তা সম্পূর্ণই মিথ্যা।
বাস্তবে তা-ই হলো। সে আবারও আসল। এবারও ধরা পড়ার পর সে একই অজুহাত দেখাল। এবারও তার কথায় হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর মায়া লাগল এবং তাকে ছেড়ে দিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানালেন সে আবারও আসবে। ঠিকই তৃতীয়বারও সে আসল। এবার হযরত আবূ হুরায়রা রাযি, তাকে শক্ত করে ধরলেন। তার কথায় নরম হলেন না। সে যখন দেখল এবার ছাড়া পাওয়া সহজ নয়, তখন ভিন্ন পথ ধরল। তার জানা আছে সাহাবায়ে কেরামের ইলমের পিপাসা বড়ই তীব্র। আমলের আগ্রহও তাদের অদম্য। বিশেষত হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর জ্ঞানপিপাসা যে কত বেশি, তা কারওই অজানা ছিল না। তাই এ পথেই সে তাঁর হাত থেকে মুক্তিলাভের চেষ্টা করল। সে হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-কে বিশেষ উপকারী ইলমের প্রলোভন দিল। বলল-
دَعْنِي فَإني أعَلِّمُكَ كَلِمَاتِ يَنْفَعُكَ اللَّهُ بِهَا (আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে এমন কিছু কথা শেখাব, যা দ্বারা আল্লাহ তোমাকে উপকৃত করবেন)। كلمات শব্দটি হয় এর বহুবচন। এর অর্থ একটি শব্দ। এ হিসেবে অর্থ হয় আমি তোমাকে কয়েকটি শব্দ শেখাব। তার মানে সে যে কথাগুলো শেখাবে তা পরিমাণে অল্প ও পড়া সহজ। কিন্তু তার উপকার অনেক বেশি। কাজেই হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. তার কথায় খুব আগ্রহ বোধ করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তা কী? সে বলল-
إِذَا أَوَيْتَ إِلَى فِرَاشِكَ فَاقْرَأْ آيَةَ الْكُرْسِيِّ (তুমি যখন তোমার বিছানায় যাবে, তখন আয়াতুল কুরসী পড়বে)। অর্থাৎ ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী পড়ে নেবে। তা পড়লে কী উপকার হবে? সে বলল- فَإِنَّكَ لَنْ يَزَالَ عَلَيْكَ من الله حَافظ وَلَا يقربنك شَيْطَانٌ حَتَّى تُصْبِحَ আল্লাহর পক্ষ হতে তোমার জন্য একজন হেফাজতকারী নিযুক্ত থাকবে এবং ভোর পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না)। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ফিরিশতা দ্বারা সুরক্ষা পাওয়া এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা লাভ হওয়া কত বড়ই না উপকার। একজন মুমিন ব্যক্তি শয়তানের অনিষ্ট থেকে তো রক্ষা পেতেই চাইবে। আল্লাহ তা'আলাও শয়তানের অনিষ্ট থেকে বান্দাকে আত্মরক্ষার বিভিন্ন উপায় শিক্ষা দিয়েছেন।
শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সে মানুষের দীন-দুনিয়া সব বরবাদ করতে চায়। প্রকৃত মুমিন ব্যক্তির কাছে তার থেকে সুরক্ষা পাওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই সে সুরক্ষা যদি ফিরিশতার দ্বারা সাধিত হয় , তবে তা কত বড়ই না সৌভাগ্যের কথা।
কাজেই লোকটি যখন হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-কে শয়তানের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা শেখালেন এবং সেজন্য আয়াতুল কুরসী পড়ার পরামর্শ দিলেন, তখন তিনি খুবই খুশি হলেন। সুতরাং এবারও তাকে ছেড়ে দিলেন। পরদিন ভোরবেলা তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। এদিনও তিনি তাঁকে বন্দির বৃত্তান্ত জিজ্ঞেস করলেন। হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. সবটা খুলে বললেন। তিনি মন্তব্য করলেন-
মিথ্যুকও কখনও কখনও সত্য বলে
أَمَا إِنَّهُ قَدْ صَدَقَكَ وَهُوَ كَذُوبٌ (শোনো! সে তোমাকে সত্য বলেছে বটে, কিন্তু সে একজন ঘোর মিথ্যুক)। খুবই সারগর্ভ মন্তব্য। কেবল এতটুকু বলে ক্ষান্ত হলেন না যে, সে সত্য বলেছে। এমনিতে এতটুকু বললেই যথেষ্ট হতো। কারণ এতটুকু কথা হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর জানার প্রয়োজন ছিল। সে যা বলেছে তা সত্য কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে তার কথাকে আমলের অংশ বানানো সমীচীন ছিল না। কোনও বিষয়ে আমল করতে হলে তার শর'ঈ ভিত্তি থাকা জরুরি। সে ভিত্তি কেবল কুরআনে কারীম ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছই হতে পারে। কাজেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বললেন সে সত্য বলেছে, তখন হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর যা জানা দরকার ছিল তা জানা হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিরিক্ত বলে দিলেন- وَهُوَ كَذُوبٌ (কিন্তু সে একজন ঘোর মিথ্যুক)। অর্থাৎ স্বভাবগতভাবেই সে মিথ্যুক। মিথ্যা বলাই তার কাজ। সর্বদা যে মিথ্যা বলে, তার কথায় সহজে বিশ্বাস করতে নেই। যাচাই-বাছাই করা জরুরি। অন্যথায় বিভ্রান্তিতে পড়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। তবে এই যে কথাটি সে বলেছে তা সত্য। তুমি এর উপর আমল করতে পার।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ মন্তব্য খুবই ইনসাফপূর্ণ। এটা তো সত্যই যে, ঘোর মিথ্যুকও কখনও কখনও সত্য বলে। তাই মিথ্যুক হওয়ার কারণে তার সব কথাই উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। মিথ্যুক হওয়ার কারণে তার সত্যটাও যদি উড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে তা তার প্রতি অন্যায় আচরণ হবে। তাছাড়া যাকে লক্ষ্য করে সে কথাটি বলা হয়েছে, সেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হয়তো এ কথার ভেতর তার কোনও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মিথ্যুক হওয়ার কারণে সে কথাটি গ্রহণ না করায় ওই কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে। আবার যদি কেবল কথাটির তসদিক করা হয় আর সে যে মিথ্যুক এ সম্পর্কে সতর্ক করা না হয়, তবে তার মিথ্যার ফাঁদে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই দরকার উভয় দিক রক্ষা করা। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এ মন্তব্য দ্বারা সেটাই করেছেন।
জিনদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
এতটুকু কথা তো পরিষ্কার হয়ে গেল। বাকি কৌতূহল থেকে গেল যে, ওই লোকটা কে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিশেষে সে কৌতূহলও মিটিয়ে দিলেন। তিনি বললেন- تعلم من تخاطب مُنْذُ ثَلَاث لَيَال» . يَا أَبَا هُرَيْرَة قَالَ لَا قَالَ: «ذَاك شَيْطَان» (তুমি কি জান হে আবূ হুরায়রা, তিন রাত যাবৎ তুমি কার সঙ্গে কথা বলছিলে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, সে এক শয়তান)। অর্থাৎ সে শয়তানদের একজন। শয়তান হলো দুষ্ট জিন। জিন জাতি আগুনের তৈরি। তারা যে-কোনও আকৃতি ধারণ করতে পারে। মানুষের বেশে তারা মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও করে, যেমন আলোচ্য হাদীছ দ্বারা জানা যাচ্ছে। বিভিন্ন হাদীছে তাদের মানুষ, সাপ, কুকুর প্রভৃতি আকৃতিতে দেখতে পাওয়ার কথা বর্ণিত আছে।
জিন আগুনের দ্বারা সৃষ্ট এক সূক্ষ্ম প্রাণী। বিশেষ কোনও জীবের আকৃতি ধারণ না করলে মানুষ তাদের দেখতে পারে না। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ لَا یَفۡتِنَنَّکُمُ الشَّیۡطٰنُ کَمَاۤ اَخۡرَجَ اَبَوَیۡکُمۡ مِّنَ الۡجَنَّۃِ یَنۡزِعُ عَنۡہُمَا لِبَاسَہُمَا لِیُرِیَہُمَا سَوۡاٰتِہِمَا ؕ اِنَّہٗ یَرٰىکُمۡ ہُوَ وَقَبِیۡلُہٗ مِنۡ حَیۡثُ لَا تَرَوۡنَہُمۡ ؕ اِنَّا جَعَلۡنَا الشَّیٰطِیۡنَ اَوۡلِیَآءَ لِلَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ
হে আদমের সন্তান-সন্ততিগণ! শয়তান যেন কিছুতেই তোমাদেরকে প্রতারিত করতে না পারে, যেমন সে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল। সে তাদেরকে তাদের পরস্পরের লজ্জাস্থান দেখানোর উদ্দেশ্যে তাদের দেহ থেকে তাদের পোশাক অপসারণ করিয়েছিল। সে ও তার দল এমন স্থান থেকে তোমাদেরকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। যারা ঈমান আনে না, আমি শয়তানকে তাদের বন্ধু বানিয়ে দিয়েছি। (সূরা আ'রাফ, আয়াত ২৭)
আমরা যেহেতু শয়তানদের দেখতে পাই না, অন্যদিকে তারা আমাদের দেখতে পায়, এ অবস্থায় তাদের প্রতারণার ফাঁদে আমাদের পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। সে কারণেই এ আয়াত আমাদের সতর্ক করেছে, যেন আমরা তাদের দ্বারা প্রতারিত না হই। মালিক ইবন দীনার রহ. বলেন, যে শত্রু তোমাকে দেখে অথচ তুমি তাকে দেখ না, তার থেকে বাঁচার জন্য সংগ্রামটাও কঠিনই করতে হবে।
তবে আশার কথা এই যে, আল্লাহ তা'আলা সর্বশক্তিমান। তাঁর শক্তির বিপরীতে শয়তানের শক্তি-ক্ষমতা গণ্য করার মতো কিছু নয়। তাই যুন্নুন মিসরী রহ. বলেন, যদিও তুমি শয়তানকে দেখ না আর সে তোমাকে দেখে, তাতে ভয়ের কিছু নেই। কেননা আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখেন, কিন্তু সে আল্লাহকে দেখতে পায় না। সুতরাং তার প্রতারণা থেকে বাঁচার জন্য তুমি আল্লাহর সাহায্য গ্রহণ করো। তাঁর সাহায্যের বিপরীতে শয়তানের কূটকৌশল নিতান্তই দুর্বল।
জিনরা যে আগুনের সৃষ্টি, সে সম্পর্কে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে-
وَ خَلَقَ الْجَانَّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ
আর জিনদেরকে সৃষ্টি করেছেন আগুনের শিখা দ্বারা। সূরা জিন, আয়াত ১৫
অপরদিকে ফিরিশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর দ্বারা। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
خُلِقَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُورٍ، وَخُلِقَ الْجَانُ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ، وَخُلِقَ آدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُمْ
ফিরিশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর দ্বারা। জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে আগুনের শিখা দ্বারা। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে যা দ্বারা, তা তোমাদের বলা হয়েছে (অর্থাৎ মাটি দ্বারা)। সহীহ মুসলিম। ২৯৯৬
জিনদের মধ্যে ভালো-মন্দ দু'রকমই আছে। তাদের মধ্যে অনেক মুসলিমও আছে, যারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাঁকে শেষনবী বলে বিশ্বাস করেছে। কুরআন মাজীদে তাদের ঈমান আনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে যে-
قُلۡ اُوۡحِیَ اِلَیَّ اَنَّہُ اسۡتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الۡجِنِّ فَقَالُوۡۤا اِنَّا سَمِعۡنَا قُرۡاٰنًا عَجَبًا یَّہۡدِیۡۤ اِلَی الرُّشۡدِ فَاٰمَنَّا بِہٖ
'(হে রাসূল!) বলে দাও, আমার কাছে ওহী এসেছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগ সহকারে (কুরআন) শুনেছে অতঃপর (নিজ সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে) বলেছে, আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, যা সঠিক পথপ্রদর্শন করে। সুতরাং আমরা তার প্রতি ঈমান এনেছি।' (সূরা জিন, আয়াত ১. ২)
অপর এক আয়াতে ইরশাদ-
وَّاَنَّا مِنَّا الصّٰلِحُوۡنَ وَمِنَّا دُوۡنَ ذٰلِکَ ؕ کُنَّا طَرَآئِقَ قِدَدًا
এবং আমাদের মধ্যে কতক নেককার এবং কতক সেরকম নয়। আর আমরা বিভিন্ন পথের অনুসারী ছিলাম। (সূরা জিন, আয়াত ১১)
আরও ইরশাদ-
وَّاَنَّا مِنَّا الۡمُسۡلِمُوۡنَ وَمِنَّا الۡقٰسِطُوۡنَ ؕ فَمَنۡ اَسۡلَمَ فَاُولٰٓئِکَ تَحَرَّوۡا رَشَدًا وَاَمَّا الۡقٰسِطُوۡنَ فَکَانُوۡا لِجَہَنَّمَ حَطَبًا
'এবং আমাদের মধ্যে কতক তো মুসলিম হয়ে গেছে এবং আমাদের মধ্যে কতক (এখনও) জালিম। যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারা হিদায়াতের পথ খুঁজে নিয়েছে। বাকি থাকল জালিমগণ, তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন।' (সূরা জিন, আয়াত ১৪, ১৫)
আলোচ্য হাদীছ দ্বারা জানা যায়, জিনদেরও ঘরসংসার আছে। তাদের পানাহারেরও প্রয়োজন হয়। তাদের কেউ কেউ মানুষের অর্থসম্পদ চুরি করে থাকে কিংবা না বলে নিয়ে যায়। যেমন আলোচ্য হাদীছে যে জিনটির কথা বর্ণিত হয়েছে, সে অনুমতি ছাড়া ফিতরার খাদ্যবস্তু নিয়ে যাচ্ছিল।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. আয়াতুল কুরসী পড়ার দ্বারা শয়তানের ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষা হয়।
খ. শয়তান হলো দুষ্ট জিন। তারা নানাভাবে মানুষের ক্ষতি করে থাকে।
গ. জিনদের প্রকৃত রূপ মানুষ দেখতে পায় না বটে, কিন্তু তারা যখন মানুষ বা অন্য কারও আকৃতি ধারণ করে, তখন তাদেরকে মানুষ দেখতে পারে।
ঘ. জিন জাতি নেককার মানুষকে ভয় পায়, যেমন আলোচ্য হাদীছে বর্ণিত জিনটি হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-কে ভয় করছিল।
৪. জিন শয়তানেরাও সত্য জানতে ও বুঝতে পারে। মানুষের মতো তাদের মধ্যেও যারা সত্য অস্বীকার করে, তারা জেনেবুঝেই অস্বীকার করে।
চ. জিনদেরও পানাহার করার প্রয়োজন হয়।
৪. মিথ্যুকরাও কখনও কখনও সত্য কথা বলে থাকে। তাই তাদের সব কথা প্রত্যাখ্যান না করে যাচাই-বাছাই করে দেখা উচিত।
ছ. জ্ঞানের কথা অমুসলিম বা অসৎ লোকের কাছ থেকেও শোনা যেতে পারে, তবে তা গ্রহণ করার জন্য শরীয়তের মানদণ্ডে বিচার-বিশ্লেষণ করে নিতে হবে।
পরদিন ভোরবেলা হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. যখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হলেন, তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন- يا أبا هُرَيْرَةَ، مَا فَعَلَ أَسِيرُكَ الْبَارِحَةَ؟ (হে আবূ হুরায়রা! গেল রাতে তোমার বন্দি কী করল)? এ প্রশ্ন দ্বারা বোঝা যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর মাধ্যমে রাতের পুরো ঘটনা জানতে পেরেছিলেন। তা না হলে তিনি কীভাবে বললেন হযরত আবূ হুরায়রা রাতের বেলা একজনকে বন্দি করেছিলেন? বস্তুত এটা ছিল তাঁর মু'জিযা (অলৌকিকত্ব)। ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তিনি ঘটনার বিবরণ জানতে পারতেন। এটাও তাঁর নবুওয়াতের সত্যতার এক দলীল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিজ্ঞাসার উত্তরে হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. রাতে যা-কিছু ঘটেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ পেশ করলেন। তা শোনার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- أَمَا إِنَّهُ قَدْ كَذَبَكَ وَسَيَعُودُ (শোনা হে সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। সে আবার আসবে)। এর দ্বারা বোঝা যায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে জানতে পেরেছিলেন সেকে। সে যে একজন জিন এবং সে খাদ্য চুরি করার জন্য আবারও আসবে, এটা তাঁকে জানানো হয়েছিল। কাজেই সে আর আসবে না বলে যে ওয়াদা করেছে, তা সম্পূর্ণই মিথ্যা।
বাস্তবে তা-ই হলো। সে আবারও আসল। এবারও ধরা পড়ার পর সে একই অজুহাত দেখাল। এবারও তার কথায় হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর মায়া লাগল এবং তাকে ছেড়ে দিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানালেন সে আবারও আসবে। ঠিকই তৃতীয়বারও সে আসল। এবার হযরত আবূ হুরায়রা রাযি, তাকে শক্ত করে ধরলেন। তার কথায় নরম হলেন না। সে যখন দেখল এবার ছাড়া পাওয়া সহজ নয়, তখন ভিন্ন পথ ধরল। তার জানা আছে সাহাবায়ে কেরামের ইলমের পিপাসা বড়ই তীব্র। আমলের আগ্রহও তাদের অদম্য। বিশেষত হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর জ্ঞানপিপাসা যে কত বেশি, তা কারওই অজানা ছিল না। তাই এ পথেই সে তাঁর হাত থেকে মুক্তিলাভের চেষ্টা করল। সে হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-কে বিশেষ উপকারী ইলমের প্রলোভন দিল। বলল-
دَعْنِي فَإني أعَلِّمُكَ كَلِمَاتِ يَنْفَعُكَ اللَّهُ بِهَا (আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে এমন কিছু কথা শেখাব, যা দ্বারা আল্লাহ তোমাকে উপকৃত করবেন)। كلمات শব্দটি হয় এর বহুবচন। এর অর্থ একটি শব্দ। এ হিসেবে অর্থ হয় আমি তোমাকে কয়েকটি শব্দ শেখাব। তার মানে সে যে কথাগুলো শেখাবে তা পরিমাণে অল্প ও পড়া সহজ। কিন্তু তার উপকার অনেক বেশি। কাজেই হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. তার কথায় খুব আগ্রহ বোধ করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তা কী? সে বলল-
إِذَا أَوَيْتَ إِلَى فِرَاشِكَ فَاقْرَأْ آيَةَ الْكُرْسِيِّ (তুমি যখন তোমার বিছানায় যাবে, তখন আয়াতুল কুরসী পড়বে)। অর্থাৎ ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী পড়ে নেবে। তা পড়লে কী উপকার হবে? সে বলল- فَإِنَّكَ لَنْ يَزَالَ عَلَيْكَ من الله حَافظ وَلَا يقربنك شَيْطَانٌ حَتَّى تُصْبِحَ আল্লাহর পক্ষ হতে তোমার জন্য একজন হেফাজতকারী নিযুক্ত থাকবে এবং ভোর পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না)। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ফিরিশতা দ্বারা সুরক্ষা পাওয়া এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা লাভ হওয়া কত বড়ই না উপকার। একজন মুমিন ব্যক্তি শয়তানের অনিষ্ট থেকে তো রক্ষা পেতেই চাইবে। আল্লাহ তা'আলাও শয়তানের অনিষ্ট থেকে বান্দাকে আত্মরক্ষার বিভিন্ন উপায় শিক্ষা দিয়েছেন।
শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সে মানুষের দীন-দুনিয়া সব বরবাদ করতে চায়। প্রকৃত মুমিন ব্যক্তির কাছে তার থেকে সুরক্ষা পাওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই সে সুরক্ষা যদি ফিরিশতার দ্বারা সাধিত হয় , তবে তা কত বড়ই না সৌভাগ্যের কথা।
কাজেই লোকটি যখন হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-কে শয়তানের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা শেখালেন এবং সেজন্য আয়াতুল কুরসী পড়ার পরামর্শ দিলেন, তখন তিনি খুবই খুশি হলেন। সুতরাং এবারও তাকে ছেড়ে দিলেন। পরদিন ভোরবেলা তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। এদিনও তিনি তাঁকে বন্দির বৃত্তান্ত জিজ্ঞেস করলেন। হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. সবটা খুলে বললেন। তিনি মন্তব্য করলেন-
মিথ্যুকও কখনও কখনও সত্য বলে
أَمَا إِنَّهُ قَدْ صَدَقَكَ وَهُوَ كَذُوبٌ (শোনো! সে তোমাকে সত্য বলেছে বটে, কিন্তু সে একজন ঘোর মিথ্যুক)। খুবই সারগর্ভ মন্তব্য। কেবল এতটুকু বলে ক্ষান্ত হলেন না যে, সে সত্য বলেছে। এমনিতে এতটুকু বললেই যথেষ্ট হতো। কারণ এতটুকু কথা হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর জানার প্রয়োজন ছিল। সে যা বলেছে তা সত্য কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে তার কথাকে আমলের অংশ বানানো সমীচীন ছিল না। কোনও বিষয়ে আমল করতে হলে তার শর'ঈ ভিত্তি থাকা জরুরি। সে ভিত্তি কেবল কুরআনে কারীম ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছই হতে পারে। কাজেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বললেন সে সত্য বলেছে, তখন হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর যা জানা দরকার ছিল তা জানা হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিরিক্ত বলে দিলেন- وَهُوَ كَذُوبٌ (কিন্তু সে একজন ঘোর মিথ্যুক)। অর্থাৎ স্বভাবগতভাবেই সে মিথ্যুক। মিথ্যা বলাই তার কাজ। সর্বদা যে মিথ্যা বলে, তার কথায় সহজে বিশ্বাস করতে নেই। যাচাই-বাছাই করা জরুরি। অন্যথায় বিভ্রান্তিতে পড়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। তবে এই যে কথাটি সে বলেছে তা সত্য। তুমি এর উপর আমল করতে পার।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ মন্তব্য খুবই ইনসাফপূর্ণ। এটা তো সত্যই যে, ঘোর মিথ্যুকও কখনও কখনও সত্য বলে। তাই মিথ্যুক হওয়ার কারণে তার সব কথাই উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। মিথ্যুক হওয়ার কারণে তার সত্যটাও যদি উড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে তা তার প্রতি অন্যায় আচরণ হবে। তাছাড়া যাকে লক্ষ্য করে সে কথাটি বলা হয়েছে, সেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হয়তো এ কথার ভেতর তার কোনও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মিথ্যুক হওয়ার কারণে সে কথাটি গ্রহণ না করায় ওই কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে। আবার যদি কেবল কথাটির তসদিক করা হয় আর সে যে মিথ্যুক এ সম্পর্কে সতর্ক করা না হয়, তবে তার মিথ্যার ফাঁদে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই দরকার উভয় দিক রক্ষা করা। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এ মন্তব্য দ্বারা সেটাই করেছেন।
জিনদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
এতটুকু কথা তো পরিষ্কার হয়ে গেল। বাকি কৌতূহল থেকে গেল যে, ওই লোকটা কে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিশেষে সে কৌতূহলও মিটিয়ে দিলেন। তিনি বললেন- تعلم من تخاطب مُنْذُ ثَلَاث لَيَال» . يَا أَبَا هُرَيْرَة قَالَ لَا قَالَ: «ذَاك شَيْطَان» (তুমি কি জান হে আবূ হুরায়রা, তিন রাত যাবৎ তুমি কার সঙ্গে কথা বলছিলে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, সে এক শয়তান)। অর্থাৎ সে শয়তানদের একজন। শয়তান হলো দুষ্ট জিন। জিন জাতি আগুনের তৈরি। তারা যে-কোনও আকৃতি ধারণ করতে পারে। মানুষের বেশে তারা মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও করে, যেমন আলোচ্য হাদীছ দ্বারা জানা যাচ্ছে। বিভিন্ন হাদীছে তাদের মানুষ, সাপ, কুকুর প্রভৃতি আকৃতিতে দেখতে পাওয়ার কথা বর্ণিত আছে।
জিন আগুনের দ্বারা সৃষ্ট এক সূক্ষ্ম প্রাণী। বিশেষ কোনও জীবের আকৃতি ধারণ না করলে মানুষ তাদের দেখতে পারে না। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ لَا یَفۡتِنَنَّکُمُ الشَّیۡطٰنُ کَمَاۤ اَخۡرَجَ اَبَوَیۡکُمۡ مِّنَ الۡجَنَّۃِ یَنۡزِعُ عَنۡہُمَا لِبَاسَہُمَا لِیُرِیَہُمَا سَوۡاٰتِہِمَا ؕ اِنَّہٗ یَرٰىکُمۡ ہُوَ وَقَبِیۡلُہٗ مِنۡ حَیۡثُ لَا تَرَوۡنَہُمۡ ؕ اِنَّا جَعَلۡنَا الشَّیٰطِیۡنَ اَوۡلِیَآءَ لِلَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ
হে আদমের সন্তান-সন্ততিগণ! শয়তান যেন কিছুতেই তোমাদেরকে প্রতারিত করতে না পারে, যেমন সে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল। সে তাদেরকে তাদের পরস্পরের লজ্জাস্থান দেখানোর উদ্দেশ্যে তাদের দেহ থেকে তাদের পোশাক অপসারণ করিয়েছিল। সে ও তার দল এমন স্থান থেকে তোমাদেরকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। যারা ঈমান আনে না, আমি শয়তানকে তাদের বন্ধু বানিয়ে দিয়েছি। (সূরা আ'রাফ, আয়াত ২৭)
আমরা যেহেতু শয়তানদের দেখতে পাই না, অন্যদিকে তারা আমাদের দেখতে পায়, এ অবস্থায় তাদের প্রতারণার ফাঁদে আমাদের পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। সে কারণেই এ আয়াত আমাদের সতর্ক করেছে, যেন আমরা তাদের দ্বারা প্রতারিত না হই। মালিক ইবন দীনার রহ. বলেন, যে শত্রু তোমাকে দেখে অথচ তুমি তাকে দেখ না, তার থেকে বাঁচার জন্য সংগ্রামটাও কঠিনই করতে হবে।
তবে আশার কথা এই যে, আল্লাহ তা'আলা সর্বশক্তিমান। তাঁর শক্তির বিপরীতে শয়তানের শক্তি-ক্ষমতা গণ্য করার মতো কিছু নয়। তাই যুন্নুন মিসরী রহ. বলেন, যদিও তুমি শয়তানকে দেখ না আর সে তোমাকে দেখে, তাতে ভয়ের কিছু নেই। কেননা আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখেন, কিন্তু সে আল্লাহকে দেখতে পায় না। সুতরাং তার প্রতারণা থেকে বাঁচার জন্য তুমি আল্লাহর সাহায্য গ্রহণ করো। তাঁর সাহায্যের বিপরীতে শয়তানের কূটকৌশল নিতান্তই দুর্বল।
জিনরা যে আগুনের সৃষ্টি, সে সম্পর্কে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে-
وَ خَلَقَ الْجَانَّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ
আর জিনদেরকে সৃষ্টি করেছেন আগুনের শিখা দ্বারা। সূরা জিন, আয়াত ১৫
অপরদিকে ফিরিশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর দ্বারা। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
خُلِقَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُورٍ، وَخُلِقَ الْجَانُ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ، وَخُلِقَ آدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُمْ
ফিরিশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর দ্বারা। জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে আগুনের শিখা দ্বারা। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে যা দ্বারা, তা তোমাদের বলা হয়েছে (অর্থাৎ মাটি দ্বারা)। সহীহ মুসলিম। ২৯৯৬
জিনদের মধ্যে ভালো-মন্দ দু'রকমই আছে। তাদের মধ্যে অনেক মুসলিমও আছে, যারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাঁকে শেষনবী বলে বিশ্বাস করেছে। কুরআন মাজীদে তাদের ঈমান আনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে যে-
قُلۡ اُوۡحِیَ اِلَیَّ اَنَّہُ اسۡتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الۡجِنِّ فَقَالُوۡۤا اِنَّا سَمِعۡنَا قُرۡاٰنًا عَجَبًا یَّہۡدِیۡۤ اِلَی الرُّشۡدِ فَاٰمَنَّا بِہٖ
'(হে রাসূল!) বলে দাও, আমার কাছে ওহী এসেছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগ সহকারে (কুরআন) শুনেছে অতঃপর (নিজ সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে) বলেছে, আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, যা সঠিক পথপ্রদর্শন করে। সুতরাং আমরা তার প্রতি ঈমান এনেছি।' (সূরা জিন, আয়াত ১. ২)
অপর এক আয়াতে ইরশাদ-
وَّاَنَّا مِنَّا الصّٰلِحُوۡنَ وَمِنَّا دُوۡنَ ذٰلِکَ ؕ کُنَّا طَرَآئِقَ قِدَدًا
এবং আমাদের মধ্যে কতক নেককার এবং কতক সেরকম নয়। আর আমরা বিভিন্ন পথের অনুসারী ছিলাম। (সূরা জিন, আয়াত ১১)
আরও ইরশাদ-
وَّاَنَّا مِنَّا الۡمُسۡلِمُوۡنَ وَمِنَّا الۡقٰسِطُوۡنَ ؕ فَمَنۡ اَسۡلَمَ فَاُولٰٓئِکَ تَحَرَّوۡا رَشَدًا وَاَمَّا الۡقٰسِطُوۡنَ فَکَانُوۡا لِجَہَنَّمَ حَطَبًا
'এবং আমাদের মধ্যে কতক তো মুসলিম হয়ে গেছে এবং আমাদের মধ্যে কতক (এখনও) জালিম। যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারা হিদায়াতের পথ খুঁজে নিয়েছে। বাকি থাকল জালিমগণ, তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন।' (সূরা জিন, আয়াত ১৪, ১৫)
আলোচ্য হাদীছ দ্বারা জানা যায়, জিনদেরও ঘরসংসার আছে। তাদের পানাহারেরও প্রয়োজন হয়। তাদের কেউ কেউ মানুষের অর্থসম্পদ চুরি করে থাকে কিংবা না বলে নিয়ে যায়। যেমন আলোচ্য হাদীছে যে জিনটির কথা বর্ণিত হয়েছে, সে অনুমতি ছাড়া ফিতরার খাদ্যবস্তু নিয়ে যাচ্ছিল।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. আয়াতুল কুরসী পড়ার দ্বারা শয়তানের ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষা হয়।
খ. শয়তান হলো দুষ্ট জিন। তারা নানাভাবে মানুষের ক্ষতি করে থাকে।
গ. জিনদের প্রকৃত রূপ মানুষ দেখতে পায় না বটে, কিন্তু তারা যখন মানুষ বা অন্য কারও আকৃতি ধারণ করে, তখন তাদেরকে মানুষ দেখতে পারে।
ঘ. জিন জাতি নেককার মানুষকে ভয় পায়, যেমন আলোচ্য হাদীছে বর্ণিত জিনটি হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-কে ভয় করছিল।
৪. জিন শয়তানেরাও সত্য জানতে ও বুঝতে পারে। মানুষের মতো তাদের মধ্যেও যারা সত্য অস্বীকার করে, তারা জেনেবুঝেই অস্বীকার করে।
চ. জিনদেরও পানাহার করার প্রয়োজন হয়।
৪. মিথ্যুকরাও কখনও কখনও সত্য কথা বলে থাকে। তাই তাদের সব কথা প্রত্যাখ্যান না করে যাচাই-বাছাই করে দেখা উচিত।
ছ. জ্ঞানের কথা অমুসলিম বা অসৎ লোকের কাছ থেকেও শোনা যেতে পারে, তবে তা গ্রহণ করার জন্য শরীয়তের মানদণ্ডে বিচার-বিশ্লেষণ করে নিতে হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
বর্ণনাকারী: