কিতাবুস সুনান- ইমাম ইবনে মাজা রহঃ

৩৪. ফিতনাসমূহ ও কিয়ামতপূর্ব আলামতের বর্ণনা

হাদীস নং: ৩৯৮৬
আন্তর্জাতিক নং: ৩৯৮৬
ফিতনাসমূহ ও কিয়ামতপূর্ব আলামতের বর্ণনা
ইসলামের সূচনা অল্প সংখ্যক লোকের দ্বারা
৩৯৮৬। আব্দুর রহমান ইব্‌ন ইবরাহীম, ইয়াকূব ইব্‌ন হুমায়দ ইব্‌ন কাসিব ও সুওয়াইদ ইব্‌ন সাঈদ (রাহঃ)...... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ অল্প সংখ্যক লোকের দ্বারাই ইসলামের সূচনা হয়েছে। অচিরেই তা অল্প সংখ্যকের মাঝে ফিরে যাবে। সুতরাং এ অল্প সংখ্যকদের জন্যই শুভ সংবাদ।
كتاب الفتن
بَاب بَدَأَ الْإِسْلَامُ غَرِيبًا
حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، وَيَعْقُوبُ بْنُ حُمَيْدِ بْنِ كَاسِبٍ، وَسُوَيْدُ بْنُ سَعِيدٍ، قَالُوا حَدَّثَنَا مَرْوَانُ بْنُ مُعَاوِيَةَ الْفَزَارِيُّ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ كَيْسَانَ، عَنْ أَبِي حَازِمٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ‏ "‏ بَدَأَ الإِسْلاَمُ غَرِيبًا وَسَيَعُودُ غَرِيبًا فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ ‏"‏ ‏.‏

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আমাদের উর্দু ভাষায় তো নিঃস্ব ও দরিদ্র ব্যক্তিকে গরীব বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এ শব্দের প্রকৃত অর্থ এরূপ বিদেশী যার কোন সিনাক্ত ও পরিচয়কারী নেই।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই বাণীর মোটকথা এই- যখন ইসলামের দাওয়াতের সূচনা হয়েছিল আর আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশে তিনি মক্কাবাসীর সামনে ইসলাম পেশ করেছিলেন, তখন এর শিক্ষা, এর আকাইদ, এর আমলসমূহ ও এর জীবনপদ্ধতি মানুষের জন্য সম্পূর্ণ অপরিচিত ও অভিনব ছিল। এমন অপরিচিত বিদেশীর ন্যায় ছিল যার কোন পরিচয়কারী ও জিজ্ঞাসাকারী নেই। এরপর ক্রমান্বয়ে এ অবস্থা পরিবর্তীত হতে থাকে। মানুষ ইসলামের সাথে পরিচিত হতে থাকে এবং এর সাথে মিশতে থাকে। এমনকি এক সময় এল যে, প্রথমে মদীনা মনাওয়ারায় লোকজন সমষ্টিগতভাবে এটা বক্ষে ধারণ করেন।

এরপর রাতারাতি প্রায় গোটা আরব উপদ্বীপবাসী এটা গ্রহণ করেন। তারপর দুনিয়ার অন্যান্য দেশও এটাকে স্বাগতম জানায় এবং এটা ব্যাপক আকারে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। তবে যেভাবে উপরেও বলা হয়েছে, আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর প্রতিভাত করা হয়েছিল যে, যেভাবে পূর্ববর্তী উম্মতের মধ্যে স্খলন এসেছিল, তাঁর উম্মতেও অনুরূপভাবে স্খলন আসবে। আর অধিকাংশ লোক রুসূম, প্রথা ও ভুল রীতি নীতি গ্রহণ করবে। পক্ষান্তরে প্রকৃত ইসলাম-যার দাওআত ও শিক্ষা তিনি দিয়েছিলেন তা নগণ্য সংখ্যক লোকদের মধ্যে চালু থাকবে।

এভাবে ইসলাম স্বীয় প্রাথমিক যুগের ন্যায় অপরিচিত বিদেশীর মত হয়ে যাবে। তাই আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে সেই পরিবর্তনের সংবাদ দিয়েছেন। এতদসঙ্গে তিনি বলেন, উম্মতের এই সাধারণ বিপর্যয়ের সময় সঠিক ইসলামের ওপর অবস্থানকারী যে সব উম্মত সেই ফাসাদের সময় নষ্ট হওয়া উম্মতকে সঠিক ইসলামে নিয়ে আসার চেষ্টা করবে তাদেরকে মুবারকবাদ। আলোচ্য হাদীস শরীফে এরূপ ভক্ত খাদিমদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'غرباء' উপাধী দিয়েছেন।

নিঃসন্দেহে আমাদের এ যুগে মুসলমান পরিচয়ধারী উম্মতের যে অবস্থা তার ওপর আলোচ্য হাদীস পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত। উম্মতের অধিক সংখ্যক লোক দীনের মৌলিক শিক্ষাবলি থেকে অনবিহিত। কবর পূজার ন্যায় সুস্পষ্ট শিরকে জড়িত। আর নামায ও যাকাতের ন্যায় মৌলিক স্তম্ভসমূহ পরিত্যাগকারী। দিন বা রাতের লেন-দেন, ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদিতে হালাল ও হারামের কোন ভয় নেই। মিথ্যা মুকাদ্দমা ও মিথ্যা সাক্ষীর ন্যায় লা'নতযোগ্য গুনাহসমূহ থেকে কেবল আল্লাহ্ ও রাসূলের নির্দেশের প্রেক্ষিতে বেঁচে থাকা ব্যক্তি খুবই কম রয়েছে। উলামা ও দরবেশদের বিরাট অংশের মধ্যে আত্ম পূজা, ধন ও মর্যাদার আসক্তি জন্ম লাভকারী অনিষ্ট দেখা যেতে পারে, যা ইয়াহুদী ও নাসারাদের আলিম উলামাদের মধ্যে সৃষ্ট হয়েছিল, যে কারণে তাদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে লা'নত হয়েছিল।

এরূপ সাধারণ ফাসাদের সময় যে সব সৌভাগ্যবান ব্যক্তি প্রকৃত ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হিদায়াত ও সুন্নাতের সাথে সম্পৃক্ত থাকে এবং উম্মতের সংশোধনের চিন্তা ও চেষ্টায় অংশ গ্রহণ করে, তারা মুহাম্মদী সেনাদলের সিপাহী। আলোচ্য হাদীসে তাদেরকেই 'غرباء' বলা হয়েছে। আর নবুওতী ভাষায় তাদেরকে সাবাশ ও মুবারকবাদ জানানো হয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলা এই অক্ষম লেখককে এবং এর পাঠকদেরকেও তাওফীক দিন যেন তারা নিজেদের এই দলে অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা করে।
اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِنْهُمْ وَاحْشُرْنَا فِي زُمْرَتِهِم
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)