মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ২১৪
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাযি.
২১৪. কায়েস ইবনে আবী হাযেম তাবেয়ী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসকে বলতে শুনেছি আরবদের মধ্যে আমিই প্রথম ব্যক্তি, যে আল্লাহর পথে (ইসলামের শত্রুদের প্রতি) তীর নিক্ষেপ করেছে। আমি আমাকে ও আমার সাথীদেরকে এ অবস্থায় দেখেছি যে, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে (ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধ করতাম এ অবস্থায় যে, আমাদের খাদ্য সামগ্রী বলতে বাবুলের গোটা ও এর পাতা ছাড়া অন্য কিছুই ছিল না। (এসব খাওয়ার ফলে) আমাদের পায়খানা হত ছাগলের পায়খানার মত- বড়ির ন্যায়। এখন বনী আসাদের লোকেরা আমাকে নিয়ে তিরস্কার করছে ইসলামের ব্যাপারে, তাহলে তো আমি বিফল হয়ে গেলাম এবং আমার সাধনা ব্যর্থ হয়ে গেল। (ঘটনা এই ছিল যে,) বনু আসাদের লোকেরা হযরত উমর রাযি.-এর নিকট অভিযোগ করেছিল যে, সা'দ ঠিকমত নামায পড়ায় না। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ قَيْسِ ابْنِ أَبِىْ حَازِمٍ قَالَ: سَمِعْتُ سَعْدَ بْنِ أَبِىْ وَقَّاصٍ يَقُولُ: «وَاللهِ إِنِّي لَأَوَّلُ رَجُلٍ مِنَ الْعَرَبِ، رَمَى بِسَهْمٍ فِي سَبِيلِ اللهِ، وَرَأَيْتُنَا نَغْزُو مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَمَا لَنَا طَعَامٌ إِلَّا الْحُبْلَةُ وَوَرَقُ السَّمُرُ، وَإِنَّ كَانَ أَحَدُنَا لَيَضَعُ كَمَا تَضَعُ الشَّاةُ مَالَهُ خِلْطٌ» ثُمَّ أَصْبَحَتْ بَنُو أَسَدٍ تُعَزِّرُنِي عَلَى الْاِسْلَامِ، لَقَدْ خِبْتُ، إِذًا وَضَلَّ عَمَلِي، وَكَانُوْا وَشَواَبِهِ اِلَى عُمَرَ ، وَقَالُوْا: لَا يُحْسِنُ يُصَلِّىْ. (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হযরত উমর রাযি. আপন খেলাফতকালে হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাযি.-কে কূফার শাসক বানিয়েছিলেন। রীতি অনুযায়ী তিনিই নামাযের ইমামতও করতেন। হযরত যুবায়ের ইবনে আওয়ামের পরদাদার নাম ছিল আসাদ। এ কারণে হযরত যুবায়েরের খান্দানকে 'বনু আসাদ' বলা হত। এ খান্দানের কিছু লোক হযরত উমর রাযি.-এর খেদমতে অভিযোগ পেশ করল যে, সা'দ নামায ঠিকমত পড়ান না। হযরত উমর রাযি. এ ব্যাপারে হযরত সা'দকে লিখলেন যে, তোমার ব্যাপারে এ অভিযোগ করা হয়েছে। যখন একথা হযরত সা'দ রাযি.-এর কাছে পৌঁছল, তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হলেন এবং ঐ কথা বললেন- যা কায়েস ইবনে হাযেমের বর্ণনায় উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, আমিই প্রথম ব্যক্তি, যে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে তীরান্দাজী করেছে। ঘটনা এই যে, হিজরতের আগের বছর সাহাবায়ে কেরামের একটি দল যার মধ্যে হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসও ছিলেন- হুযুর (ﷺ) জেহাদের জন্য পাঠালেন। এ যুদ্ধেই হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাযি. তীরান্দাজী করেছিলেন। ইসলামী জেহাদের ইতিহাসে এটা ছিল প্রথম তীরান্দাজীর ঘটনা। এ ঘটনারই বরাত দিয়ে হযরত সা'দ বলেছেন যে, আল্লাহর তাওফীকে দ্বীনের পথে সর্বপ্রথম আমিই তীর নিক্ষেপ করেছিলাম। সামনে হযরত সা'দ রাযি. নিজের ও প্রথম যুগের মু'মিন সাথীদের ত্যাগ তিতিক্ষা ও আত্মত্যাগের অবস্থা বর্ণনা করেছেন যে, আমরা এমন নিঃস্ব অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে থেকে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতাম যে, আমাদের কাছে মনুষ্য খাবার জাতীয় কোন জিনিস থাকত না। আমরা বাবুল গাছের গোটা ও এর পাতাগুলোকে খাবার হিসাবে ব্যবহার করতাম। (যে গুলো প্রকৃতপক্ষে জঙ্গলে বিচরণকারী ছাগলপাল খেয়ে থাকে।) এ কারণেই আমাদের পায়খানাও হত ছাগলের পায়খানার মত। নিজের এ অবস্থা বর্ণনা করার পর হযরত সা'দ মনের দুঃখে বলেছেন যে, এখন বনী আসাদের কিছু লোক আমাকে নিয়ে তিরস্কার করছে ইসলামের ব্যাপারে। তাদের কথা যদি সঠিক হয়, তাহলে তো আমি ব্যর্থ হয়ে গেলাম এবং জীবনের সব সাধনা বিফলে গেল।

যদিও অভিযোগকারীগণ হযরত উমর রাযি.-এর নিকট হযরত সা'দের ঠিকমত নামায না পড়ানোর অভিযোগই করেছিল। কিন্তু নামায যেহেতু ইসলামের প্রধান রুকন এবং ইসলামের দেহের জন্য প্রাণতুল্য, এ জন্য হযরত সা'দ সুন্দরভাবে নামায না পড়ানোর অভিযোগকে ইসলামে তার অপূর্ণতার অভিযোগ বলে ধরে নিলেন।

তাই বললেন : تعزرنى على الاسلام সামনে এ রেওয়ায়াতেই রয়েছে যে, হযরত সা'দ হযরত উমর রাযি.-কে অভিযোগের উত্তরে লিখলেন যে, আমি ঐভাবেই নামায পড়াই, যেভাবে হুযুর (ﷺ)-কে নামায পড়াতে দেখেছি। আমি প্রথম দু রাকাআতে কেরাআত দীর্ঘ করি, আর পরের দু' রাকআতে সংক্ষিপ্ত কেরাআত পড়ি। হযরত উমর রাযি. উত্তরে তাঁকে লিখলেন যে, আমারও তোমার ব্যাপারে এ ধারণাই ছিল। মর্ম এই যে, আমি এ অভিযোগকে নিজে সঠিক মনে করি নাই, কিন্তু রীতি ও বিধান অনুযায়ী এটা জরুরী মনে করেছি যে, তোমাকে এর অবগতি দিয়ে দেই এবং প্রকৃত অবস্থা জেনে নেই। তারপর হযরত উমর রাযি. বনু আসাদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দিলেন।

এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, আল্লাহর কোন বান্দা যদি প্রয়োজন মনে করে, তাহলে তার অতীতের ইসলামী খেদমত ও এ পথে তার সাধনা ও মুজাহাদার কথা বর্ণনা করতে পারে, এটা অহংকার ও আত্মা প্রশংসার অন্তর্ভুক্ত হবে না- শরী‘আতে যার প্রতি নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

হযরত সা'দ রাযি. সম্পর্কে এ কথাগুলোও উল্লেখ করার মত- যা বিশুদ্ধ হাদীস ও রেওয়ায়াতে বিক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:
একটি এই যে, তিনি নিজে বর্ণনা করেন, "আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঈমান ও ইসলামের দাওয়াতে সাড়া দানকারী তৃতীয় ব্যক্তি, আমার পূর্বে কেবল দু'জন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।" তিনি তখন ১৭ বছরের যুবক ছিলেন। তাঁর মা তাঁর উপর চরম পর্যায়ের চাপ প্রয়োগ করল যে, তিনি যেন বাপ দাদার মুশরেকী ধর্মাচার ছেড়ে এই নতুন ধর্ম (ইসলাম) গ্রহণ না করেন। হযরত সা'দ রাযি. যখন তার কথা মানতে রাজী হলেন না, তখন সে কসম খেয়ে বসল যে, যে পর্যন্ত তুমি আমার কথা মানবে না, সে পর্যন্ত আমি কিছুই পাহানার করব না। একথা অনুযায়ী সে কাজও শুরু করে দিল, কয়েকদিন পর্যন্ত কিছুই খেল না এবং কিছুই পান করল না। এর মধ্যে তিনবার বেহুঁশও হয়ে গেল। হযরত সা'দ তাকে মানাবার চেষ্টা তো করেই যাচ্ছিলেন। কিন্তু ইসলাম ত্যাগ করতে রাজী হলেন না। মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় এসেছে যে,

وَاِنۡ جَاہَدٰکَ عَلٰۤی اَنۡ تُشۡرِکَ بِیۡ مَا لَیۡسَ لَکَ بِہٖ عِلۡمٌ ۙ فَلَا تُطِعۡہُمَا وَصَاحِبۡہُمَا فِی الدُّنۡیَا مَعۡرُوۡفًا

এ ক্ষেত্রেই এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল।
(অর্থাৎ, তোমার পিতামাতা যদি এমন কাউকে (প্রভুত্বে) আমার সমকক্ষ সাব্যস্ত করার জন্য তোমাকে চাপ দেয়, যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তাদের কথা মানবে না। তবে দুনিয়ার জীবনে তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করে যাবে।)

হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাযি. এর এ ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মত যে, তিনি হযরত উসমান রাযি.-এর শাহাদতের পর হযরত আলী রাযি.-এর হাতে বায়আত তো গ্রহণ করে নিয়েছিলেন, কিন্তু এই নৃসংশ শাহাদতের ফলে যখন পরম্পর নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ ও মারামারির মত ফিতনা শুরু হয়ে গেল, তখন হযরত সা'দ রাযি. নিজেকে এ থেকে পৃথক ও সম্পূর্ণ দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। তাই দেখা গেছে যে, হযরত আলী রাযি. অথবা তাঁর বিশেষ বন্ধুদের মধ্য থেকে কেউ যখন তাঁকে তাদের সাথে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বলেছেন, তখন তিনি উত্তর দিয়েছেন, আমাকে এমন তরবারী এনে দাও যে, আমি যদি এর দ্বারা কাফেরের উপর আক্রমণ করি, তাহলে এ তরবারী তাকে হত্যা করে ফেলবে, আর যদি কোন মু'মিনের উপর আঘাত করি, তাহলে এর কোন প্রতিক্রিয়া হবে না।" তারপর এ গৃহযুদ্ধ ও মারামারি থেকে কেবল ক্ষ্যান্তই থাকেননি; বরং মদীনার জনবসতি থেকে দূরে ওয়াসীয়ে আকীকে তাঁর যে ভূমি ছিল, এতে তিনি বাড়ী তৈরী করে নিলেন এবং পরিবারের সবাইকে নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করলেন। তিনি চাইতেন যে, পরস্পর যুদ্ধ বিগ্রহের সংবাদও যেন তাঁর কানে না পৌছে।

ইসলামী ইতিহাসের ব্যাপারে অভিজ্ঞ প্রতিটি ব্যক্তি জানে যে, ইরাক ও সমগ্র পারস্যদেশ তাঁর নেতৃত্বেই বিজিত হয়েছিল। অধিক গ্রহণযোগ্য মতানুসারে তিনি হযরত মু'আবিয়া রাযি.-এর রাজত্বকালে ৫৫ হিজরীতে নিজের ওয়াদীয়ে আকীকের বাড়ীতেই ইন্তিকাল করেন। সেখান থেকে জানাযা মদীনা মুনাওয়ারা আনা হয় এবং জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়। এ কথাও স্বীকৃতি সত্য যে, আশারা মুবাশশারার মধ্যে সবার শেষে যিনি ইন্তিকাল করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস। رضى الله عنه وارضاء
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ২১৪ | মুসলিম বাংলা