মা'আরিফুল হাদীস
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হাদীস নং: ১৭৩
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হযরত উসমান যিন্নুরাইন রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
১৭৩. হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, মুসলমানদের সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি সস্ত্রীক হাবশার দিকে হিজরত করে যান, তিনি হচ্ছেন হযরত উসমান ইবনে আফফান রাযি.। তিনি তাঁর স্ত্রী (হযরত রুকাইয়া)-কে সাথে নিয়ে হাবশার দিকে রওয়ানা হন। (তারপর দীর্ঘ দিন পর্যন্ত) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁদের কোন সংবাদ পাননি। তাই তিনি সংবাদ জানার জন্য বাইরে যেতেন এবং অপেক্ষায় থাকতেন। এরই মধ্যে এক কুরাইশী মহিলা হাবশা থেকে মক্কায় আসল। তিনি তার কাছে তাঁদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন, সে বলল, হে আবুল কাসেম। আমি তাঁদের দু'জনকে দেখেছি। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কি অবস্থায় দেখেছ? মহিলা বলল, আমি উসমানকে দেখলাম যে, তিনি (আপনার কন্যা) রুকাইয়াকে একটি ধীরগতির হিমারের উপর সওয়ার করিয়ে দিয়ে নিজে পেছনে থেকে পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আল্লাহ তাঁদের উভয়ের সাথে থাকুন (এবং তাঁদের হেফাযত করুন।) তারপর তিনি বললেন, হযরত লূত আ. এর পর উসমানই প্রথম ব্যক্তি, যিনি নিজের স্ত্রীকে নিয়ে আল্লাহর দিকে হিজরত করেছেন। -তাবরানী, বায়হাকী, ইবনে আসাকির
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ أَنَسٍ أَنَّ أَوَّلَ مَنْ هَاجَرَ مِنْ الْمُسْلِمِينَ إلَى الْحَبَشَةِ بِأَهْلِه عُثْمَانُ بْنِ عَفَّانَ فَخَرَجَ وَخَرَجَ مَعَه بِابْنِةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ و سَلَّم فَاحْتَبَسَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ و سَلَّم خَبَرُهُمَا فَجَعَل يَخْرُج يَتَوَكَّف الْأَخْبَارَ فَقَدِمْتْ امْرَأَةٌ مِنْ قُرَيْشٍ مِنْ أَرْضِ الْحَبَشَةِ فَسَأَلَهَا فَقَالَت: يَا أَبَا الْقَاسِمِ! رَأَيْتُهُمَا قَالَ عَلَى أَيِّ حَالٍ رَأَيْتُهُمَا؟ قَالَتْ : رَأَيْتهُ وَقَد حَمَلَهَا عَلَى حِمَارٍ مِنْ هَذِه لدَّبَّابَةِ وَهُوَ يَسُوقُ بِهَا يَمْشِيْ خَلْفَهَا فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ و سَلَّم صَحِبَهُمَا اللَّهُ إنْ كَانَ عُثْمَانُ بْنِ عَفَّانَ لأَوَّلَ مَنْ هَاجَرَ إلَى اللَّهِ بِأَهْلِهِ بَعْدَ لُوطٍ (رَوَاهُ الطَّبَرَانِيُّ فِي الْكَبِير و الْبَيْهَقِيّ و ابْنُ عَسَاكِرَ)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
হাদীস, সীরাত ও ইতিহাসের বিভিন্ন রিওয়ায়াতের আলোকে এ কথা সুবিদিত ও স্বীকৃত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রথমা স্ত্রী উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা রাযি.-এর গর্ভ থেকে (বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী দুই বা তিনজন পুত্রসন্তান ছাড়া, যারা শৈশবেই ইন্তিকাল করেছিলেন।) চার জন কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন। (১) হযরত যয়নব, (২) হযরত রুকাইয়্যা, (৩) হযরত উম্মে কুলসুম ও (৪) হযরত ফাতেমা রাযি.। হযরত যয়নব- যিনি সবার বড় ছিলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে আবুল আস ইবনে রবীর নিকট বিয়ে দিয়েছিলেন এবং তিনি তারই সাথে থাকেন। হযরত রুকাইয়্যা ও হযরত উম্মে কুলসুমের বিয়ে হুযুর (ﷺ)-এর চাচা আবু লাহাবের দু'পুত্র উতবা ও উতাইবার সাথে ঠিক হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু শশুরালয়ে যাওয়ার আগেই আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মে জামীলের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর তাওহীদের দাওয়াতের চরম বিরোধিতা এবং তাঁকে কষ্ট দেওয়ার উপর সূরা লাহাব নাযিল হল, যার মধ্যে স্বামী স্ত্রী দু'জনের অশুভ পরিণতির কথা আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হল। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আবু লাহাব ও তার স্ত্রী তাদের দু'পুত্র উতবা ও উতাইবার উপর চাপ সৃষ্টি করল যে, রুকাইয়্যা ও উম্মে কুলসুমের সাথে তোমাদের আত্মীয়তার যে সম্পর্ক হয়েছে, এটা ছিন্ন করে দাও। ফলে তারা তাই করল। প্রকৃতপক্ষে এটা আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে ব্যবস্থা ছিল যে, এ পবিত্রা কন্যাগণ যেন এ অপবিত্র পরিবারে না যায়। اِنَّ رَبِّیۡ لَطِیۡفٌ لِّمَا یَشَآء তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ দু'জনের মধ্যে বড় বোন রুকাইয়্যার বিয়ে আল্লাহর নির্দেশে হযরত উসমানের সাথে দিয়ে দিলেন- যিনি ইসলামের দাওয়াতের প্রাথমিক যুগেই ঈমান গ্রহণ করে হুযুর (ﷺ)-এর বিশেষ সাহাবী ও বন্ধুদের মধ্যে শামিল হয়ে গিয়েছিলেন।
একথা সবার জানা যে, তাওহীদের দাওয়াতের প্রাথমিক যুগে মক্কার দুষ্ট, জালেম ও পাষাণ হৃদয় মুশরিকদের পক্ষ থেকে ইসলাম গ্রহণকারীদের উপর কি ধরনের জুলুম-অত্যাচার চলছিল। হুযুর (ﷺ)-এর জানা ছিল যে, হাবশা তথা আবিসিনিয়ার বাদশাহ- যিনি ঈসায়ী দ্বীনের অনুসারী একজন নেক দিল ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। তাই আশা করা যায় যে, সেখানে যেই যাবে, সেই নিরাপদ ও শান্তিতে থাকতে পারবে। এ জন্য তিনি নিজের সাথীদেরকে পরামর্শ দিলেন যে, যারা যেতে পারে, তারা উপস্থিত সময়ে যেন হাবশায় চলে যায়। নির্দেশ অনুযায়ী কয়েকজন সাহাবী এর ইচ্ছা করে নিলেন। তাদের মধ্যে হাবশায় হিজরতকারী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন হযরত উসমান রাযি.। তিনি হুযুর (ﷺ)-এর পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর কন্যা ও নিজ স্ত্রী হযরত রুকাইয়্যাকেও সাথে নিয়ে হাবশায় হিজরত করলেন। তারপর হযরত আনাসের এ হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী অনেক দিন পর্যন্ত তাঁদের কোন খোঁজ-খবর পাওয়া যায়নি, যে কারণে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি চেষ্টা করছিলেন যে, কোনভাবে যদি তাঁদের অবস্থা জানা যায়। অনেক দিন পর কুরাইশদের এক মহিলা হাবশা থেকে মক্কায় আসল। হুযুর (ﷺ) তার নিকট হযরত উসমান রাযি. ও রুকাইয়্যার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন। সে বলল, আমি তাঁদের দু'জনকে দেখেছি। তিনি এবার জিজ্ঞাসা করলেন যে, কি অবস্থায় দেখেছ? সে উত্তরে বলল, আমি তাঁদেরকে এ অবস্থায় দেখেছি যে, উসমান রাযি. তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাকে একটি ধীরগতির হিমারের (১) উপর সাওয়ার করিয়ে দিয়ে নিজে তাঁর পেছনে হেঁটে যাচ্ছে। (সংকলকের ধারণা যে, হিমারটিকে এ কারণে আস্তে চালানো হচ্ছিল, যাতে হযরত রুকাইয়্যার কোন কষ্ট না হয়। ঐ কুরাইশী মহিলার নিকট থেকে এ অবস্থা জেনে হুযুর (ﷺ) স্বস্তিবোধ করলেন এবং দু‘আ করলেনঃ صحبهما الله (তাঁদের উভয়কে আল্লাহর রহমত সঙ্গ ও হেফাযত দান করুক।) এর সাথে তিনি এ কথাও বললেন যে, আল্লাহর পয়গাম্বর হযরত লূত আ. এর পর হযরত উসমানই প্রথম ব্যক্তি, যিনি নিজের জীবন সঙ্গীনিকে সাথে নিয়ে আল্লাহর দিকে হিজরত করেছেন, নিজের জন্মভূমি, বাড়ী ঘর ও আপন আত্মীয় স্বজনকে ছেড়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেছেন। ঐ যুগে মক্কা থেকে হিজরত করে হাবশায় যাওয়া কত কঠিন মুজাহাদা ছিল, বর্তমানে এর কল্পনাও করা যায় না।
এখানে একথাটিও উল্লেখ করে দেওয়া সমীচীন যে, ইসলামে এটা প্রথম হিজরত ছিল, যার কথাও হাদীসে বলা হয়েছে। এ হিজরতকারী কাফেলায় কয়েকজন মাত্র লোক ছিলেন। এরপর একটি বড় কাফেলা ও মক্কা থেকে হাবশায় হিজরত করে। এসব লোক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত হাবশায় অবস্থান করেন। হযরত উসমান রাযি. কয়েক বছর সেখানে থাকার পর মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু তিনি এমন সময় এসে পৌঁছলেন যে, হুযুর (ﷺ) এরই মধ্যে মদীনায় হিজরত করে চলে গেছেন। হযরত উসমান রাযি. তখন নিজের স্ত্রী হযরত রুকাইয়্যা ও এক পুত্র (আব্দুল্লাহকে সাথে নিয়ে যিনি হাবশায় জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলেন। এভাবে তিনি যুলহিজরাতাইন (অর্থাৎ, দু'বার হিজরতকারী) হলেন। খুলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে এ মর্যাদা তিনিই অর্জন করেছেন। رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَأَرْضَاهُ
মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে বদর যুদ্ধ সামনে আসে। এ সময় হযরত রুকাইয়্যা রাযি. অসুস্থ হয়ে পড়লেন। যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং সাহাবায়ে কেরাম বদরযুদ্ধের জন্য রওয়ানা হচ্ছিলেন, তখন হযরত উসমান রাযি.ও তাঁদের সাথে যেতে চাইলেন। হুযুর (ﷺ) তাঁকে বললেন যে, তুমি রুকাইয়্যার সেবা শুশ্রূষার জন্য এখানেই থেকে যাও, আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে ঐ প্রতিদানই দিবেন, যা যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদেরকে দেওয়া হবে এবং গণীমতেও তোমার ঐ অংশ থাকবে, যা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদরা পাবে। হযরত উসমান রাযি. হুযুর (ﷺ)- এর এ নির্দেশের কারণে বদরযুদ্ধের জন্য যেতে পারেননি, তিনি হযরত রুকাইয়্যার সেবা যত্নের কাজে ব্যস্ত থাকলেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও তকদীরের ফায়সালা যে, তিনি আর সুস্থ হলেন না। হুযুর (ﷺ)-এর মদীনায় ফিরে আসার পূর্বেই তাঁর ওফাত হয়ে গেল। যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর হুযুর (ﷺ) বিষয়টি জানলেন। রুকাইয়্যার মত কলিজার টুকরাকে হারিয়ে তাঁর অন্তরে যে আঘাত আসার ছিল তাই হল। আর হযরত উসমানের যে অবস্থা হল, সে অবস্থা সামনের হাদীস থেকে জানা যাবে।
টিকা: (১) হাদীসে 'হিমার' শব্দ এসেছে। সংকলক অনুবাদে এবং এখানে ব্যাখ্যায়ও এ শব্দ লিখাই উত্তম মনে করেছে। উর্দু ও বাংলায় হিমার শব্দের তরজমায় গাধা শব্দ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, আরবদেশের হিমার আমাদের দেশের গাধা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা ঘোড়ার চেয়ে ছোট ঘোড়ার মতই সাওয়ারীর একটি পশু। হুযুর (ﷺ)ও এ জাতীয় হিমারে সাওয়ার হয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।
একথা সবার জানা যে, তাওহীদের দাওয়াতের প্রাথমিক যুগে মক্কার দুষ্ট, জালেম ও পাষাণ হৃদয় মুশরিকদের পক্ষ থেকে ইসলাম গ্রহণকারীদের উপর কি ধরনের জুলুম-অত্যাচার চলছিল। হুযুর (ﷺ)-এর জানা ছিল যে, হাবশা তথা আবিসিনিয়ার বাদশাহ- যিনি ঈসায়ী দ্বীনের অনুসারী একজন নেক দিল ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। তাই আশা করা যায় যে, সেখানে যেই যাবে, সেই নিরাপদ ও শান্তিতে থাকতে পারবে। এ জন্য তিনি নিজের সাথীদেরকে পরামর্শ দিলেন যে, যারা যেতে পারে, তারা উপস্থিত সময়ে যেন হাবশায় চলে যায়। নির্দেশ অনুযায়ী কয়েকজন সাহাবী এর ইচ্ছা করে নিলেন। তাদের মধ্যে হাবশায় হিজরতকারী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন হযরত উসমান রাযি.। তিনি হুযুর (ﷺ)-এর পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর কন্যা ও নিজ স্ত্রী হযরত রুকাইয়্যাকেও সাথে নিয়ে হাবশায় হিজরত করলেন। তারপর হযরত আনাসের এ হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী অনেক দিন পর্যন্ত তাঁদের কোন খোঁজ-খবর পাওয়া যায়নি, যে কারণে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি চেষ্টা করছিলেন যে, কোনভাবে যদি তাঁদের অবস্থা জানা যায়। অনেক দিন পর কুরাইশদের এক মহিলা হাবশা থেকে মক্কায় আসল। হুযুর (ﷺ) তার নিকট হযরত উসমান রাযি. ও রুকাইয়্যার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন। সে বলল, আমি তাঁদের দু'জনকে দেখেছি। তিনি এবার জিজ্ঞাসা করলেন যে, কি অবস্থায় দেখেছ? সে উত্তরে বলল, আমি তাঁদেরকে এ অবস্থায় দেখেছি যে, উসমান রাযি. তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাকে একটি ধীরগতির হিমারের (১) উপর সাওয়ার করিয়ে দিয়ে নিজে তাঁর পেছনে হেঁটে যাচ্ছে। (সংকলকের ধারণা যে, হিমারটিকে এ কারণে আস্তে চালানো হচ্ছিল, যাতে হযরত রুকাইয়্যার কোন কষ্ট না হয়। ঐ কুরাইশী মহিলার নিকট থেকে এ অবস্থা জেনে হুযুর (ﷺ) স্বস্তিবোধ করলেন এবং দু‘আ করলেনঃ صحبهما الله (তাঁদের উভয়কে আল্লাহর রহমত সঙ্গ ও হেফাযত দান করুক।) এর সাথে তিনি এ কথাও বললেন যে, আল্লাহর পয়গাম্বর হযরত লূত আ. এর পর হযরত উসমানই প্রথম ব্যক্তি, যিনি নিজের জীবন সঙ্গীনিকে সাথে নিয়ে আল্লাহর দিকে হিজরত করেছেন, নিজের জন্মভূমি, বাড়ী ঘর ও আপন আত্মীয় স্বজনকে ছেড়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেছেন। ঐ যুগে মক্কা থেকে হিজরত করে হাবশায় যাওয়া কত কঠিন মুজাহাদা ছিল, বর্তমানে এর কল্পনাও করা যায় না।
এখানে একথাটিও উল্লেখ করে দেওয়া সমীচীন যে, ইসলামে এটা প্রথম হিজরত ছিল, যার কথাও হাদীসে বলা হয়েছে। এ হিজরতকারী কাফেলায় কয়েকজন মাত্র লোক ছিলেন। এরপর একটি বড় কাফেলা ও মক্কা থেকে হাবশায় হিজরত করে। এসব লোক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত হাবশায় অবস্থান করেন। হযরত উসমান রাযি. কয়েক বছর সেখানে থাকার পর মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু তিনি এমন সময় এসে পৌঁছলেন যে, হুযুর (ﷺ) এরই মধ্যে মদীনায় হিজরত করে চলে গেছেন। হযরত উসমান রাযি. তখন নিজের স্ত্রী হযরত রুকাইয়্যা ও এক পুত্র (আব্দুল্লাহকে সাথে নিয়ে যিনি হাবশায় জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলেন। এভাবে তিনি যুলহিজরাতাইন (অর্থাৎ, দু'বার হিজরতকারী) হলেন। খুলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে এ মর্যাদা তিনিই অর্জন করেছেন। رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَأَرْضَاهُ
মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে বদর যুদ্ধ সামনে আসে। এ সময় হযরত রুকাইয়্যা রাযি. অসুস্থ হয়ে পড়লেন। যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং সাহাবায়ে কেরাম বদরযুদ্ধের জন্য রওয়ানা হচ্ছিলেন, তখন হযরত উসমান রাযি.ও তাঁদের সাথে যেতে চাইলেন। হুযুর (ﷺ) তাঁকে বললেন যে, তুমি রুকাইয়্যার সেবা শুশ্রূষার জন্য এখানেই থেকে যাও, আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে ঐ প্রতিদানই দিবেন, যা যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদেরকে দেওয়া হবে এবং গণীমতেও তোমার ঐ অংশ থাকবে, যা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদরা পাবে। হযরত উসমান রাযি. হুযুর (ﷺ)- এর এ নির্দেশের কারণে বদরযুদ্ধের জন্য যেতে পারেননি, তিনি হযরত রুকাইয়্যার সেবা যত্নের কাজে ব্যস্ত থাকলেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও তকদীরের ফায়সালা যে, তিনি আর সুস্থ হলেন না। হুযুর (ﷺ)-এর মদীনায় ফিরে আসার পূর্বেই তাঁর ওফাত হয়ে গেল। যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর হুযুর (ﷺ) বিষয়টি জানলেন। রুকাইয়্যার মত কলিজার টুকরাকে হারিয়ে তাঁর অন্তরে যে আঘাত আসার ছিল তাই হল। আর হযরত উসমানের যে অবস্থা হল, সে অবস্থা সামনের হাদীস থেকে জানা যাবে।
টিকা: (১) হাদীসে 'হিমার' শব্দ এসেছে। সংকলক অনুবাদে এবং এখানে ব্যাখ্যায়ও এ শব্দ লিখাই উত্তম মনে করেছে। উর্দু ও বাংলায় হিমার শব্দের তরজমায় গাধা শব্দ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, আরবদেশের হিমার আমাদের দেশের গাধা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা ঘোড়ার চেয়ে ছোট ঘোড়ার মতই সাওয়ারীর একটি পশু। হুযুর (ﷺ)ও এ জাতীয় হিমারে সাওয়ার হয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)