মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ১৬২
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হযরত উসমান যিন্নুরাইন রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
১৬২. হযরত আব্দুর রহমান ইবনে খাব্বাব রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম- যখন তিনি (মিম্বরের উপর তাশরীফ রেখে) তাবুক যুদ্ধে সাহায্য করার জন্য লোকদেরকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। এমন সময় হযরত উসমান রাযি. দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার যিম্মায় একশ' উট-গদি ও পালানসহ। (অর্থাৎ, আমি এ জেহাদে একশ' উট পেশ করব সম্পূর্ণ সামানসহ।) তারপর তিনি আবার উৎসাহ দিলেন। এবারও হযরত উসমান রাযি. দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ। আমি (অতিরিক্ত আরো) দু'শ উট দান করব গদি ও পালানসহ। তারপর আবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুদ্ধে সাহায্য করার জন্য উৎসাহ প্রদান করলেন। এবারও হযরত উসমান রাযি. দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, আমি (অতিরিক্ত আরো) তিনশ উট দান করব গদি ও পালানসহ। বর্ণনাকারী বলেন, আমি দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মিম্বর থেকে নেমে আসছেন এবং বলছেন: مَا عَلَى عُثْمَانَ مَا عَمِلَ بَعْدَ هَذِهِ (অর্থাৎ, উসমান রাযি. তাঁর এ আমল ও আর্থিক কুরবানীর পর যাই করুক, তাঁর কোন ক্ষতি হবে না। কথাটি তিনি দু'বার বললেন। -তিরমিযী
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ خَبَّابٍ، قَالَ: شَهِدْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَحُثُّ عَلَى تَجْهِيْزِ جَيْشِ العُسْرَةِ فَقَامَ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ عَلَيَّ مِائَةُ بَعِيرٍ بِأَحْلاَسِهَا وَأَقْتَابِهَا فِي سَبِيلِ اللهِ، ثُمَّ حَضَّ عَلَى الجَيْشِ فَقَامَ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ عَلَيَّ مِائَتَا بَعِيرٍ بِأَحْلاَسِهَا وَأَقْتَابِهَا فِي سَبِيلِ اللهِ، ثُمَّ حَضَّ عَلَى الجَيْشِ فَقَامَ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ عَلَيَّ ثَلاَثُ مِائَةِ بَعِيرٍ بِأَحْلاَسِهَا وَأَقْتَابِهَا فِي سَبِيلِ اللهِ، فَأَنَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْزِلُ عَنِ الْمِنْبَرِ وَهُوَ يَقُولُ: مَا عَلَى عُثْمَانَ مَا عَمِلَ بَعْدَ هَذِهِ، مَا عَلَى عُثْمَانَ مَا عَمِلَ بَعْدَ هَذِهِ. (رواه الترمذى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

মক্কা বিজয়ের আগের বছর ৯ম হিজরীতে কিছু সংবাদের ভিত্তিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক বিরাট বাহিনীসহ সিরিয়ার দিকে অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলেন। এ সফর তাবুক পর্যন্ত হল, যা ঐ সময় সিরিয়ার সীমান্তের ভিতরে ছিল। সেখানে তাদের অবস্থান প্রায় বিশ দিন থাকল। যে উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্তের এ সফর করা হয়েছিল, সেটা আল্লাহ্ তা'আলার অনুগ্রহ ও সাহায্যে যুদ্ধ বিগ্রহ ছাড়াই কেবল তাবুক পর্যন্ত গমন ও সেখানে বিশ দিন অবস্থানের দ্বারাই পূর্ণ হয়ে গেল। তাই সেখান থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। এ কারণে এ অভিযান তাবুক অভিযান নামে পরিচিত হয়ে গেল। হাদীসে এ অভিযানকে جيش العسرة (কষ্টের অভিযান) বলা হয়েছে। عسرة শব্দের অর্থ হচ্ছে কষ্ট ও ক্লেশ। এ সফরটি এমন সময় করা হয়েছিল যে, মদীনা মুনাওয়ারা ও এর আশেপাশে তখন দুর্ভিক্ষ ও ফসল কম উৎপন্ন হওয়ার কারণে খুব অভাব চলছিল, মৌসুমও ছিল প্রচণ্ড গরমের, সৈন্যদের সংখ্যাও ঐ সময়ের হিসাবে খুবই নগণ্য ছিল। (বিভিন্ন বর্ণনায় ত্রিশ হাজার বলা হয়েছে।) বাহন অর্থাৎ, উট ও ঘোড়া খুবই কম ছিল। পাথেয় অর্থাৎ, পানাহার সামগ্রীও সৈন্য সংখ্যা হিসাবে অত্যন্ত কম ছিল। এসব কারণে এ যুদ্ধাভিযানকে جيش العسرة (কষ্টকর অভিযান) বলা হয়েছে।

এই অসাধারণ পরিস্থিতির কারণে হুযুর (ﷺ) এ যুদ্ধের জন্য লোকদেরকে জান-মালের কুরবানী দেওয়ার জন্য এভাবে উৎসাহ দিলেন, যা অন্যান্য যুদ্ধের ব্যাপারে তাঁর সাধারণ রীতি ছিল না। হযরত উসমান রাযি. এ অভিযানের সৈন্যদের সাহায্য-সহযোগিতায় সবচেয়ে বেশী অংশ নিয়েছেন। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে খাব্বাব রাযি.-এর এ বর্ণনা থেকে জানা গিয়েছে যে, হুযুর (ﷺ)-এর উৎসাহদানে তিনি ছয়শ' উট সামানপত্রসহ পেশ করেন। হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ অন্য কিছু রিওয়ায়াতের ভিত্তিতে লিখেছেন যে, এই ছয়শ' উট ছাড়া তিনি আরো সাড়ে তিনশ উটও দিয়েছিলেন। এ হিসাবে তার পেশকৃত উটের সংখ্যা সাড়ে নয়শ হয়ে যায়। তাছাড়া তিনি পঞ্চাশটি ঘোড়াও পেশ করেছিলেন। সামনের হাদীস থেকে জানা যাবে যে, উট ও ঘোড়া ছাড়া হযরত উসমান রাযি. এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রাও নিয়ে এসে হুযুর (ﷺ)-এর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। হুযুর (ﷺ) হযরত উসমান রাযি.-এর এসব দান গ্রহণ করে আম মজলিসে এ সুসংবাদ শোনালেন এবং বার বার বললেন : مَا عَلَى عُثْمَانَ مَا عَمِلَ بَعْدَ هَذِهِ (ভাবার্থ এই যে, জান্নাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য উসমানের এ আর্থিক কুরবানী যথেষ্ট।) যখন ঐসব অবস্থার কল্পনা করা হয়, যেগুলোর কারণে এ অভিযানকে جيش العسرة বলা হয়েছে, তখন হযরত উসমানের এ আর্থিক কুরবানীর মূল্য অনেক বেড়ে যায়। رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَأَرْضَاهُ (তাবুক যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ সীরাত ও ইতিহাসের কিতাবসমূহে দেখে নেওয়া যেতে পারে।)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ১৬২ | মুসলিম বাংলা