মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ১২৩
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
ওফাত ও ওফাতপূর্ব অসুস্থতা
১২৩. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাতকালীন অসুস্থতার সময় একদিন হযরত আলী রাযি. তাঁর নিকট থেকে বের হয়ে আসলে লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, হে হাসানের পিতা। আজ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর অবস্থা কি? তিনি বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! আজ অবস্থা অনেকটা ভাল। এমন সময় হযরত আব্বাস রাযি. তাঁর হাত ধরে বললেন, আল্লাহর কসম! তিন দিন পরই তোমরা লাঠির গোলাম (অর্থাৎ, অন্যের উপর নির্ভরশীল ও অন্যের অধীন হয়ে যাবে। আমার মনে হচ্ছে যে, তিনি এ অসুস্থতার মধ্যেই ওফাত পেয়ে যাবেন। মৃত্যুর নিকটবর্তী সময়ে আব্দুল মুত্তালিবের বংশধরদের চেহারায় যে চিহ্ন ফুঠে উঠে, সেটা আমি ভালভাবেই চিনি। (এ চিহ্ন ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমার ধারণা যে, তাঁর সময় শেষ হয়ে এসেছে।) তাই তুমি আমার সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট চল। আমরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করব যে, (আপনার পর) এ কাজ (অর্থাৎ, খেলাফতের কাজ) কার কাছে থাকবে?
যদি আমাদের খান্দানের মধ্যে থাকে, তাহলে সেটা আমরা জেনে নিতে পারব। আর যদি আমাদের ছাড়া অন্য কারো উপর অর্পিত হয়, তাহলে সেটাও আমরা জেনে নিতে পারব, আর তিনি আমাদের ব্যাপারে কোন ওসিয়্যত করে দিবেন। হযরত আলী রাযি. উত্তর দিলেন, আমরা যদি তাঁর কাছে খেলাফতের প্রার্থনা করি আর তিনি না বলে দেন, (অর্থাৎ, আমাদেরকে খেলাফত অর্পণ না করার সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন,) তাহলে আল্লাহর কসম। লোকেরা আমাদেরকে খেলাফত দান করবে না। তাই আল্লাহর কসম! আমি তাঁর নিকট খেলাফতের প্রার্থনা করব না। -বুখারী
کتاب المناقب والفضائل
عَنِ عَبْدِ اللَّهِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: أَنَّ عَلِيَّ بْنَ أَبِي طَالِبٍ خَرَجَ مِنْ عِنْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي وَجَعِهِ الَّذِي تُوُفِّيَ فِيهِ، فَقَالَ النَّاسُ: يَا أَبَا حَسَنٍ، " كَيْفَ أَصْبَحَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟، فَقَالَ: أَصْبَحَ بِحَمْدِ اللَّهِ بَارِئًا "، فَأَخَذَ بِيَدِهِ عَبَّاسُ بْنُ عَبْدِ المُطَّلِبِ فَقَالَ لَهُ: أَنْتَ وَاللَّهِ بَعْدَ ثَلاَثٍ عَبْدُ العَصَا، وَإِنِّي وَاللَّهِ لَأَرَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَوْفَ يُتَوَفَّى مِنْ وَجَعِهِ هَذَا، إِنِّي لَأَعْرِفُ وُجُوهَ بَنِي عَبْدِ المُطَّلِبِ عِنْدَ المَوْتِ، اذْهَبْ بِنَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلْنَسْأَلْهُ فِيمَنْ هَذَا الأَمْرُ، إِنْ كَانَ فِينَا عَلِمْنَا ذَلِكَ، وَإِنْ كَانَ فِي غَيْرِنَا عَلِمْنَاهُ، فَأَوْصَى بِنَا، فَقَالَ عَلِيٌّ: إِنَّا وَاللَّهِ لَئِنْ سَأَلْنَاهَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَمَنَعَنَاهَا لاَ يُعْطِينَاهَا النَّاسُ بَعْدَهُ، وَإِنِّي وَاللَّهِ لاَ أَسْأَلُهَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. (رواه البخارى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

একথা তো হাদীসের বিষয়বস্তু থেকেই বুঝা যায় যে, এখানে যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, সেটা হুযুর (ﷺ)-এর মৃত্যুকালীন অসুস্থতার শেষ দিনগুলোর ঘটনা। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহঃ) 'ফতহুল বারী'তে এ হাদীসের ব্যাখ্যায় মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের বরাতে লিখেছেন যে, ইমাম যুহরী যিনি এ হাদীসের রাবী তিনি বলেন যে, এটা ঠিক ঐ দিনের সকালের ঘটনা, যেদিন দুপুরে হুযুর (ﷺ) ওফাত বরণ করেন।

একথাও হাদীস থেকেই জানা যায় যে, যে দিনের ঘটনা এখানে বর্ণিত হয়েছে, সেদিন সকালবেলা হুযুর (ﷺ)-এর অবস্থা বাহ্যত এমন ভাল ছিল যে, হযরত আলী রাযি.- যিনি হুযুর (ﷺ)-এর শুশ্রূষাকারীদের অন্যতম ছিলেন- নিজের অনুভূতি ও অনুমান অনুযায়ী আল্লাহ্ তা'আলার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার সাথে তাঁর ব্যাপারে নিজের নিশ্চিন্ত হওয়ার কথা ব্যক্ত করেছিলেন এবং অন্যদেরকেও নিশ্চিন্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর (এবং স্বয়ং হুযুর (ﷺ)-এরও চাচা) হযরত আব্বাস রাযি.-এর বিপরীত হুযুর (ﷺ)-এর চেহারায় ঐসব লক্ষণ অনুভব করে ফেলেছিলেন, যার দ্বারা তাঁর অনুমান; বরং বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল যে, তিনি তাড়াতাড়ি এ ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া থেকে চিরস্থায়ী আখেরাতের দিকে যাত্রা করবেন। এরই ভিত্তিতে তিনি হযরত আলী রাযি.-কে (যিনি হুযুর (ﷺ)-এর চাচাত ভাই হওয়া ছাড়া জামাতাও ছিলেন।) ঐ কথা বললেন, যা হাদীসে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং হযরত আলী রাযি. ঐ উত্তর দিলেন, যা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আমাদের যুগের ঐসব লোক, যারা খেলাফতে নবুওয়াতকেও বাদশাহী ও রাজত্বই মনে করে, হযরত আলী রাযি.-এর এ উত্তর ও কর্মধারা থেকে তাদের সন্দেহ হতে পারে যে, তাঁর অন্তরে বাদশাহী ও রাজত্বের লোভ ছিল। (যেমন কোন বাস্তবতাজ্ঞান বিবর্জিত মানুষ এটা প্রকাশও করেছে।) কিন্তু বাস্তব সত্য এই যে, খেলাফতে নবুওয়াত দুনিয়াবী বাদশাহী ও রাজত্ব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। (এ দু'টির মধ্যে ঠিক এমনই পার্থক্য, যেমন পার্থক্য দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যে।) খেলাফতে নবুওয়াতের অর্থ এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সত্য দ্বীনের দাওয়াত ও প্রচার, উম্মতের শিক্ষা ও আত্মিক পরিচর্যা, সত্যের বাণীকে সমুচ্চে ধারণ, জেহাদ, আত্মত্যাগ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার যে কাজ আল্লাহর ওহীর নির্দেশনায় নবী ও রাসূল হিসাবে যে নিয়ম ও পদ্ধতিতে এবং যেসব নৈতিক বিধিমালার অনুসরণের সাথে আনজাম দিয়ে যাচ্ছিলেন, ঐ কাজই তাঁর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসাবে, ঐ পদ্ধতি ও নীতি অনুসরণে কিতাব ও সুন্নত এবং উসওয়ায়ে নববীর দিকনির্দেশনায় আনজাম দেওয়া হবে। এটাকেই খেলাফতে নবুওয়াত ও খেলাফতে রাশেদা বলে। তাই একথা সুস্পষ্ট যে, এটা দুনিয়াবী রাজত্বের ন্যায় ফুলের পালঙ্ক নয়; বরং কাটায় ভরা বিছানা। এর লোভ ও আকাঙ্ক্ষা ঐ বান্দার জন্য- যে আশা করে যে, আল্লাহর সাহায্য ও তাওফীকে সে এর হক আদায় করতে পারবে, কখনো নিন্দনীয় জিনিস নয়; বরং উঁচু পর্যায়ের সৌভাগ্য।

হযরত আলী রাযি.-এর প্রত্যাশা ছিল যে, যদি এ কাজের জন্য আমার নাম আসে এবং এ মহান দায়িত্ব আমাকে অর্পণ করা হয়, তাহলে আল্লাহর তাওফীকে ইনশাআল্লাহ্ যথাযথভাবে এ খেদমত আঞ্জাম দিতে পারব। এ জন্য এর ভাবনা ও আব্দার একটি উঁচু দরজার সৌভাগ্যের আবেদন ছিল। বস্তুত অনাদিকালে নির্ধারিত ক্রমিক অনুসারে যখন তিন খলীফার পর তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চতুর্থ খলীফা নির্বাচিত হন, তখন তিনি কিতাব ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অনুসৃত রীতি অনুসরণের সাথে খেলাফতের কাজ আনজাম দেন। কিন্তু যেহেতু তাঁর সমগ্র খেলাফতকাল ফেতনার যুগ ছিল, (যার মধ্যে উম্মত হযরত উসমান রাযি.-এর নির্মম শাহাদতের অশুভপরিণতির শিকার হয়ে গিয়েছিল।) এ জন্য তাঁর পুরা সময়কাল এবং সকল শক্তি ও যোগ্যতা ফেতনার আগুন নিভানোর কাজে ব্যয়িত হয়েছিল। তাই নিবিষ্ঠচিত্তে গঠনমূলক কোন কাজ করার সুযোগই তিনি পাননি।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ১২৩ | মুসলিম বাংলা