মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ১১৮
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
ওফাত ও ওফাতপূর্ব অসুস্থতা

মেশকাত শরীফ প্রণেতা রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর ফাযায়েল ও মর্যাদা, জন্ম, নবুওয়াত লাভ, ওহীর সূচনা ও তাঁর অনুপম চরিত্র বৈশিষ্ট্যের অধ্যায়সমূহের ধারাটি ওফাত পর্বের মাধ্যমে শেষ করেছেন- যার মধ্যে হুযুর (ﷺ)-এর ওফাত ও মৃত্যুপূর্ব অসুস্থতা সম্পর্কে বেশকিছু হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। এরই অনুসরণে এখানেও হুযুর (ﷺ)-এর ওফাত ও ওফাতপূর্ব অসুস্থতা সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করে এ ধারার সমাপ্তি টানা হচ্ছে।

আগেই এ বিষয়টি উল্লেখ করে দেওয়া সমীচীন মনে হচ্ছে যে, হুযুর (ﷺ)-এর ওফাতের ব্যাপারে এ কথার উপর তো মুহাদ্দেসীনে কেরাম, সীরাতবিদ ও ঐতিহাসিকগণ একমত যে, ওফাতের দিনটি ছিল ১১ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার। কিন্তু তারিখের ব্যাপারে জন্ম তারিখের মতই বিভিন্ন বর্ণনা ও বক্তব্য রয়েছে। আমি যতটুকু অধ্যয়ন ও গবেষণা করেছি, হাদীসের কোন কিতাবে এমন কোন বর্ণনা নেই, যার মধ্যে হুযুর (ﷺ)-এর ওফাতের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাস ও সীরাতের কিতাবসমূহে তিনটি তারিখের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রবিউল আউয়ালের ১, ২ ও ১২ তারিখ। আর জন্ম তারিখের মত ওফাতের তারিখও ১২ই রবিউল আউয়ালই অধিক প্রসিদ্ধ। কিন্তু কোন কোন গবেষক আলেম লিখেছেন যে, ওফাতের তারিখ ১২ই রবিউল আউয়াল ধরা কোনভাবেই সঠিক হতে পারে না। কেননা, একথা স্বীকৃত ও বিশুদ্ধ রিওয়ায়াত দ্বারা প্রমাণিত যে, ওফাতের প্রায় পৌনে তিন মাস পূর্বে তিনি যে হজ্ব করেছিলেন অর্থাৎ, বিদায় হজ্ব, তখন ৯ই যিলহজ্ব ছিল শুক্রবার। আর এ কথাও স্বীকৃত ও বিশুদ্ধ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত যে, হুযুর (ﷺ)-এর ওফাত সোমবার দিন হয়েছিল। তাই ৯ই যিলহজ্ব শুক্রবার হলে ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার কোনভাবেই হতে পারে না। যিলহজ্ব, মহররম ও সফর তিনও মাসকে চাই ৩০-৩০ দিন ধরা হোক অথবা ২৯-২৯ দিন অথবা কোন মাসকে ২৯ আর কোন মাসকে ৩০ দিন ধরা হোক, এর কোন অবস্থাতেই ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার হতে পারে না। হ্যাঁ, যদি তিনটি মাসকেই ২৯ দিনের ধরা হয়, (যা খুবই অসম্ভব।)

তাহলে রবিউল আউয়ালের প্রথম সোমবারে ২ তারিখ হবে। আর যদি একটি মাসকে ৩০ দিনের এবং অপর দুইটি মাসকে ২৯ দিনের ধরা হয়, (যা অনেক সময় হয়ে থাকে।) তাহলে রবিউল আউয়ালের প্রথম সোমবার ১লা তারিখ হবে। এসব বাস্তবতাকে সামনে রেখে ১লা রবিউল আউয়ালের বর্ণনাকেই অধিক যুক্তিযুক্ত মনে করতে হবে।
এখন প্রথমে হুযুর (ﷺ)-এর ঐ জাতীয় কিছু বাণী উল্লেখ করা হবে, যেগুলোর মধ্যে তিনি ইঙ্গিতে অথবা স্পষ্টরূপে সাহাবায়ে কেরামকে নিজের ওফাত নিকটবর্তী হওয়ার অবগতি দান করেছিলেন। তাছাড়া ঐ জাতীয় কিছু হাদীসও বর্ণনা করা হবে, যেগুলোর মধ্যে মৃত্যুশয্যার কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। সবশেষে ঐসব হাদীস আনা হবে, যেগুলোর মধ্যে হৃদয়বিদারক মৃত্যুর বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলা এসব হাদীসকে এ অধম সংকলকের জন্য এবং পাঠকদের জন্য হেদায়াত ও সৌভাগ্য লাভের ওসীলা বানিয়ে দিন এবং এগুলোর বরকতে জীবনের সুন্দর পরিসমাপ্তি নসীব করুন।
১১৮. হযরত উকবা ইবনে আমের রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উহুদ যুদ্ধের শহীদদের উপর আট বছর পর জানাযার নামায পড়লেন, তিনি যেন এ সময় জীবিত ও মৃত সবাইকে বিদায় জানাচ্ছিলেন। তারপর তিনি মসজিদের মিম্বরে তাশরীফ আনলেন (এবং সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে বললেন,) আমি তোমাদের আগে দলপতি হিসাবে যাচ্ছি এবং আমি তোমাদের ব্যাপারে সাক্ষ্যদানকারী হব। আর তোমাদের সাথে আমার সাক্ষাতস্থল হবে হাউযে কাউসার। আমি এখান থেকেই হাউযে কাউসার দেখতে পাচ্ছি। আমাকে পৃথিবীর ভাণ্ডারসমূহের চাবি প্রদান করা হয়েছে। আমি তোমাদের ব্যাপারে এ আশংকা করছি না যে, তোমরা আমার পরে শিরকে লিপ্ত হয়ে যাবে, কিন্তু আমার আশংকা যে, তোমরা দুনিয়ামুখী হয়ে যাবে। -বুখারী, মুসলিম
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ، قَالَ: صَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى قَتْلَى أُحُدٍ بَعْدَ ثَمَانِي سِنِينَ، كَالْمُوَدِّعِ لِلْأَحْيَاءِ وَالأَمْوَاتِ، ثُمَّ طَلَعَ المِنْبَرَ فَقَالَ: «إِنِّي بَيْنَ أَيْدِيكُمْ فَرَطٌ، وَأَنَا عَلَيْكُمْ شَهِيدٌ، وَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الحَوْضُ، وَإِنِّي لَأَنْظُرُ إِلَيْهِ مِنْ مَقَامِي هَذَا، وَإِنِّي لَسْتُ أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا، وَلَكِنِّي أَخْشَى عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا أَنْ تَنَافَسُوهَا فِيْهَ» (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

ঘটনা এই যে, উহুদযুদ্ধে যেসব সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন, (যাদের মধ্যে হুযূর (ﷺ)-এর প্রিয় ও সম্মানিত চাচা হযরত হামযা রাযি.ও ছিলেন।) তাঁদের জানাযার নামায পড়া হয়নি; বরং জানাযা ছাড়াই দাফন করা হয়েছিল। এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, যখন আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে হুযুর (ﷺ)-কে আভাস দেওয়া হল যে, আপনার আখেরাতের সফর নিকটবর্তী হয়ে এসেছে, তখন একদিন তিনি উহুদের শহীদদের কবরস্থানে গেলেন এবং তাঁদের উপর জানাযার নামায পড়লেন। বুখারী শরীফের জানাযা অধ্যায়ে এ হাদীসেরই বর্ণনা রয়েছে: صَلَّى عَلَى أَهْلِ أُحُدٍ صَلاَتَهُ عَلَى المَيِّتِ এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, হুযুর (ﷺ) আট বছর পূর্বে শাহাদত বরণকারী ও দাফন হয়ে যাওয়া সাহাবীদের উপর ঐভাবে নামায পড়লেন, যেভাবে মৃত ব্যক্তির জানাযা পড়া হয়। সামনে হাদীসের রাবী উকবা ইবনে আমেরের শব্দমালা এই: كَالْمُوَدِّعِ لِلأَحْيَاءِ وَالأَمْوَات মর্ম এই যে, এ নামাযে হুযুর (ﷺ)-এর অবস্থা ঐ ছিল, যা জীবিত-মৃত সবাইকে বিদায়দানকারী কোন ব্যক্তির হয়ে থাকে।

সামনে হাদীসে বলা হয়েছে যে, তারপর সেখান থেকে তিনি মসজিদে নববীতে তাশরীফ আনলেন। (সম্ভবতঃ নামাযের সময় ছিল এবং লোকেরা মসজিদে জামাআতের সাথে নামায আদায় করার জন্য সমবেত ছিল। তিনি মিম্বরে তাশরীফ আনলেন এবং বিশেষ গুরুত্বের সাথে এ কয়েকটি কথা বললেন। প্রথম কথা এই যে. আমি তোমাদের পর্বে আখেরাতের জগতের দিকে 'ফারাত' এর ন্যায় যাচ্ছি। আরবের রীতি ছিল যে, যখন কোন দিকে যাত্রা করত, তখন একজন বুদ্ধিমান ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি সামনের মনযিলের দিকে পর্বেই রওয়ানা হয়ে যেত, যেন কাফেলার পূর্বে মনযিলে পৌঁছে কাফেলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করে নিত, তাকেই ফারাত' বলা হত। এ বাণীতে হুযুর (ﷺ) নিজের আখেরাতের সফর সন্নিকটবর্তী হওয়ার দিকে ইশারা করার সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরামকে সান্ত্বনা দিলেন যে, তোমাদের পূর্বে আমার চলে যাওয়া তোমাদের জন্য কল্যাণের কারণ হবে। আমি আগে গিয়ে তোমাদের জন্য তাই করব, যা একজন 'ফারাত' (তথা অগ্রবর্তী যাত্রী) করে থাকে এবং যেভাবে কাফেলা রওয়ানা হওয়ার পর নির্ধারিত মনযিলে পৌঁছে অগ্রবর্তী দল নেতার সাথে মিলিত হয়ে যায়, তোমরাও আমার সাথে এসে মিলে যাবে। সামনে তিনি বলেছেন, আমি তোমাদের ব্যাপারে সাক্ষ্যদান করব যে, তোমরা ঈমান এনেছিলে, তোমরা আমার অনুসরণ করেছিলে এবং দ্বীনের পথে আমার সাথী হয়েছিলে। সামনে বলেছেন, সেখানে হাউযে কাউসারে আমার সাথে সাক্ষাত হবে। তিনি একথাও বলেছেন যে, ঐ হাউযে কাউসার। আমি এখন আমার নিজ স্থান থেকে দেখতে পাচ্ছি। (আল্লাহ্ তা'আলা সকল পর্দা উঠিয়ে দিয়ে আখেরাতের হাউযে কাউসার আমার সামনে করে দিয়েছেন।) এর সাথে তিনি একথাও বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এ দুনিয়ার ভাণ্ডারসমূহের চাবি আমাকে প্রদান করা হয়েছে। (এটা ছিল সুসংবাদ যে, পৃথিবীর ভাণ্ডার সমূহের চাবি এ উম্মতকে প্রদান করার সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে। (আর বাস্তবে সাহাবীদের যুগেই এটা বাস্তবায়িত হয়ে গিয়েছে।)

এ ভাষণের শেষে তিনি বললেন যে, আমার তো এ আশংকা নেই যে, তোমরা আবার মুশরিক হয়ে যাবে; কিন্তু এ আশংকা অবশ্যই রয়েছে যে, তোমাদের আকর্ষণ ও চাহিদা দুনিয়ার সুখ-সৌন্দর্য ও আরাম-আয়েশের দিকে হয়ে যাবে। অথচ মু'মিনের জন্য আকর্ষণ ও চাহিদার বস্তু কেবল জান্নাত ও জান্নাতের নেয়ামতসমূহই হওয়া চাই। আল্লাহ্ তা'আলা এগুলোর ব্যাপারেই বলেছেন: وَفِیۡ ذٰلِکَ فَلۡیَتَنَافَسِ الۡمُتَنَافِسُوۡنَ (এ বিষয়েই প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত।)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ১১৮ | মুসলিম বাংলা