মা'আরিফুল হাদীস

কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা সম্পর্কিত অধ্যায়

হাদীস নং: ১৮
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা সম্পর্কিত অধ্যায়
আল্লাহর কিতাবের ন্যায় 'সুন্নাতও' অবশ্য অনুসরণযোগ্য

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর প্রতিভাত করা হয়েছিল যে, খাওয়া দাওয়া করে উদরভর্তি চিন্তাহীন ফিতনাকারী কিছু লোক এক সময় উম্মতের মধ্যে এ গোমরাহী চিন্তাধারা প্রসারের চেষ্টা করবে যে, দীনী দলীল ও অবশ্য অনুসরণীয় কেবল আল্লাহর কিতাব। এছাড়া কোন জিনিস এমনকি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোন শিক্ষা ও হিদায়াতও অবশ্য অনুসরণীয় নয়। এই ফিতনা সম্বন্ধে তিনি উম্মতকে সুস্পষ্ট সংবাদ ও হিদায়াত দান করেছেন।
১৮. হযরত মিকদাম ইবনে মা'দিকারিবা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সাবধান! শুনে রেখ, আমাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে (হিদায়াতের জন্য) কুরআন দেওয়া হয়েছে। আর এর সাথে এর ন্যায় আরো। সাবধান! অতিসত্তর কতক উদরপূর্তি লোক (পয়দা) হবে; যারা নিজেদের জাঁকজমক আসন (অথবা পালং-এর ওপর আরাম করে) লোকজনকে বলবে-ব্যস, এ কুরআনকেই গ্রহণ কর, এতে যা হালাল করা হয়েছে তা হালাল মনে কর। আর যা হারাম করা হয়েছে তা হারাম মনে কর। (অর্থাৎ হালাল ও হারাম কেবল তা-ই যা কুরআনে হালাল বা হারাম বলা হয়েছে। এ ছাড়া কিছু নেই।) সামনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই গোমরাহী চিন্তাধারা বাতিলপূর্বক বলেন, আর বিষয় হচ্ছে, যে সব জিনিস আল্লাহর রাসূল হারাম করেছেন, সেগুলোও এসব জিনিসের ন্যায় হারাম যেগুলো আল্লাহ তা'আলা কুরআনে হারাম করেছেন।
(সুনানে আবূ দাউদ, মুসনাদে দারিমী, ইবনে মাজাহ্)
کتاب الاعتصام بالکتاب والسنۃ
عَنِ الْمِقْدَامِ بْنِ مَعْدِيكَرِبَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَلاَ إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ أَلاَ يُوشِكُ رَجُلٌ شَبْعَانُ عَلَى أَرِيكَتِهِ يَقُولُ عَلَيْكُمْ بِهَذَا الْقُرْآنِ فَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَلاَلٍ فَأَحِلُّوهُ وَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَرَامٍ فَحَرِّمُوهُ وَإِنَّ مَأ حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ كَمَأ حَرَّمَ الله. (رواه ابوداؤد والدارمى وابن ماجه)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এখানে এ কথা বুঝা চাই যে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যে ওহী আসত তার দু'টি পদ্ধতি ছিল। ১. নির্দিষ্ট শব্দাবলি ও রচনার আকৃতিতে। এটাকে 'ওহী মাতলু' বলা হয়। (অর্থাৎ সেই ওহী যা তিলাওয়াত করা হয়) এটা কুরআন মজীদের অবস্থা। ২. সেই ওহী যা তাঁর প্রতি বিষয়-বস্তু সম্বন্ধে ইলকা ও ইল্হাম হত। তিনি সেগুলো তাঁর ভাষায় বলতেন, কিংবা কাজের মাধ্যমে শিক্ষা দিতেন। এটাকে 'ওহী গায়রে মাতলু' বলে। (অর্থাৎ যে ওহী তিলাওয়াত করা হয় না) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাধারণ দীনী দিকনির্দেশ ও বাণীসমূহের গুরুত্ব এটাই। বস্তুত এর ভিত্তি তো আল্লাহর ওহীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর এটা কুরআনের ন্যায়ই অপরিহার্য অনুসরণীয়।

আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর এ বিষয় প্রতিভাত করে ছিলেন যে, তাঁর উম্মতের মধ্যে এরূপ লোক জন্ম লাভ করবে, যারা এ কথা বলে লোকজনকে গোমরাহ ও ইসলামী শরী'আতকে অকেজো করবে যে, দীনের আহকাম কেবল তাই যা কুরআনে রয়েছে। আর যা কুরআনে নেই তা দীনী হুকুমই নয়। আলোচ্য হাদীসে রাসূল্লাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে এ ফিতনা থেকে সাবধান করেছেন। বলেছেন, হিদায়াতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে কুরআন দেওয়া হয়েছে। এতদসাথে এ ছাড়াও ওহী গায়রে মাতলুর মাধ্যমে আহকাম দেওয়া হয়েছে। আর তা কুরআনের ন্যায়ই অপরিহার্য অনুসরণীয়।

প্রকৃত কথা হচ্ছে, যে সব লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীসসমূহকে দীনের দলীল হতে অস্বীকার করে, তারা ইসলামী শরী'আতের পূর্ণ শিকল থেকে স্বাধীন হতে চায়। কুরআন মজীদের ব্যাপার হচ্ছে, তাতে মৌলিক শিক্ষা ও আহ্কাম রয়েছে। এর জন্য সেই প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা যেগুলো ছাড়া এ আহকামের ওপর আমলই করা যেতে পারে না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কার্য কিংবা বাণী সম্পর্কিত হাদীসসমূহ থেকেই জানা যায়। যেমন কুরআন মজীদে নামাযের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু নামায কিভাবে আদায় করা হবে? কোন্ কোন্ সময়ে আদায় করা হবে? এবং কোন্ ওয়াক্তে কত রাকাআত নামায আদায় করা হবে? এটা কুরআনের কোথাও নেই। হাদীসসমূহ থেকেই এসব বিস্তারিত জানা যায়।

এভাবে কুরআন মজীদে যাকাতের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু এটা বলা হয়নি কোন্ হিসাবে যাকাত বের করা হবে। সারা জীবনে একবার দেওয়া হবে অথবা প্রতি বছর, কিংবা প্রতি মাসে দেওয়া হবে? এভাবে কুরআনের অধিকাংশ আহকামের অবস্থা এরূপই। বস্তুত দলীল হওয়ার ব্যাপারে হাদীস অস্বীকারের পরিণতি হচ্ছে গোটা দীনী শৃঙ্খলাকে অস্বীকার করা। এজন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে উম্মতকে বিশেষভাবে সাবধান করেছেন। এ হিসাবে আলোচ্য হাদীস হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জিযা বিশেষ। উম্মতের মধ্যে সেই ফিতনা সৃষ্টি হবে বলে (হাদীস অস্বীকার)-এর সংবাদ দিয়েছেন, যা তাঁর যুগে এবং সাহাবা ও তাবিঈনের যুগে বরং তাবে তাবিঈনের যুগসমূহেও কল্পনা করা যেত না।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ১৮ | মুসলিম বাংলা