মা'আরিফুল হাদীস

মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়

হাদীস নং: ২৩৫
মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়
পানাহারের আদব

আগেই যেমন বলে আসা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য খাদ্য ও পানীয় দ্রব্যাদির হালাল-হারামের বিধানও বর্ণনা করেছেন এবং পানাহারের আদব ও নিয়মাবলীও বলে দিয়েছেন। এসব নিয়মাবলী সভ্যতা, ভদ্রতা ও সুরুচির সাথে সম্পর্কিত অথবা এগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যগত কল্যাণ বিবেচনায় রাখা হয়েছে অথবা এগুলো আল্লাহর যিকর ও শোকর জাতীয় বিষয়। আর এগুলোর মাধ্যমে পানাহারের আমলটিকে যা বাহ্যত নিছক বস্তুগত কাজ ও পশুত্বের চাহিদা রূহানী, নূরানী ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম বানিয়ে নেওয়া যায়।

বিগত তিন কিস্তিতে এ ধারার যেসব হাদীস লিখে আসা হয়েছে, এগুলোর সম্পর্ক খাদ্য ও পানীয় দ্রব্যাদির হালাল-হারাম হওয়ার সাথে ছিল। সামনে ঐসব হাদীস উল্লেখ করা হচ্ছে, যেগুলোর মধ্যে হুযুর (ﷺ) পানাহারের আদব শিক্ষা দিয়েছেন। এসব হাদীসে এমন সব ইঙ্গিত রয়েছে, যেগুলোর দ্বারা জানা যায় যে, এসব হাদীসে পানাহারের যেসব আদব শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, এগুলোর স্তর ও মর্যাদা মুস্তাহাব ও পছন্দনীয় পর্যায়ের। এজন্য যদি এগুলোর উপর আমল করা না হয়, তাহলে এটা কোন গুনাহের কারণ হবে না।

খাওয়ার আগে ও পরে হাত ধোয়া
২৩৫. হযরত সালমান ফারসী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি তাওরাতে পড়েছিলাম যে, খানার পরে হাত ধোয়া বরকতের কারণ হয়ে থাকে। কথাটি আমি নবী করীম (ﷺ) এর সামনে আলোচনা করলে তিনি বললেন: খানার আগে ও পরে হাত মুখ ধোয়া বরকতের কারণ হয়। -তিরমিযী, আবু দাউদ
کتاب المعاشرت والمعاملات
عَنْ سَلْمَانَ قَالَ قَرَأْتُ فِي التَّوْرَاةِ أَنَّ بَرَكَةَ الطَّعَامِ الْوُضُوءُ قَبْلَهُ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: بَرَكَةُ الطَّعَامِ الْوُضُوءُ قَبْلَهُ وَالْوُضُوءُ بَعْدَهُ. (رواه الترمذى وابوداؤد)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

কুরআন পাক থেকে জানা যায় যে, যে শিক্ষা ও উপদেশ পূর্ববর্তী নবীদের মাধ্যমে এসেছিল, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) এর মাধ্যমে এর পূর্ণতা দান করেছেন। যেমন এরশাদ হয়েছে: اليوم أكملت لكم دينكم অর্থাৎ, আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণতা দান করলাম। এর আলোকে হাদীসের মর্ম এই হয় যে, তাওরাতে পানাহারের আদব প্রসঙ্গে কেবল খাওয়ার পর হাত ধোয়াকে বরকতের কারণ বলা হয়েছিল এবং এর প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাধ্যমে খাওয়ার আগেও হাতমুখ ধোয়ার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। আর তিনি বলেছেন যে, এটাও বরকতের কারণ হয়।

বরকত একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ) 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা' গ্রন্থে এ হাদীস এবং খাওয়ার মধ্যে বরকত সংক্রান্ত অন্যান্য কিছু হাদীসের বরাত দিয়ে যা কিছু লিখেছেন, এর সারকথা এই যে, কোন খাবার জিনিসে বরকত হওয়ার অর্থ এটাও হয় যে, খাদ্যের আসল উদ্দেশ্য যা থাকে, সেটা ভালোভাবে অর্জিত হয়, খানা স্বাদ ও তৃপ্তির সাথে খাওয়া হয়, মন পরিতৃপ্ত হয়, অন্তর খুশী হয়, স্বস্তি আসে, অল্প পরিমাণই যথেষ্ট হয়ে যায়। এর দ্বারা ভালো রক্ত, পুষ্টি ইত্যাদি সৃষ্টি হয়ে শরীর গঠন হয়, এর উপকারিতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, এর দ্বারা নফসের অবাধ্যতা ও উদাসীনতা সৃষ্টি হয় না; বরং আল্লাহর শোকর ও আনুগত্যের তাওফীক লাভহয়।

প্রকৃতপক্ষে এসব ঐ বাস্তবতারই লক্ষণ, যাকে হাদীসে বরকত বলা হয়েছে। 'কানযুল উম্মালে' তাবারানীর বরাতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: খাওয়ার পূর্বে ও পরে হাত ধোয়া দারিদ্র বিদূরণকারী ও নবীদের তরীকা। তাছাড়া একথাও স্পষ্ট যে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির দাবীও এটাই যে, হাত ও মুখ যেগুলো খাদ্য গ্রহণের যন্ত্র- এগুলোকে খাওয়ার পূর্বেও ধুয়ে পরিষ্কার করে নেওয়া চাই এবং খাবার শেষেও পরিষ্কার করে নেওয়া চাই।

হযরত সালমান ফারসীর এ হাদীসে; বরং এ ধারার অন্যান্য হাদীসেও হাত মুখ ধোয়ার জন্য 'ওযু' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এর দ্বারা ঐ ওযু উদ্দেশ্য নয়, যা নামাযের জন্য করা হয়; বরং কেবল হাতমুখ ধোয়াই উদ্দেশ্য। অন্যকথায় এভাবেও বলা যায় যে, নামাযের ওযু তো সেটাই, যা সর্বজন বিদিত। আর খাওয়ার ওযু কেবল এই যে, হাত ও মুখ যা খাবার গ্রহণে ব্যবহৃত হয়- এগুলো ধুয়ে নেওয়া হবে এবং ভালোরূপে পরিষ্কার করে নেওয়া হবে। কোন কোন হাদীসে স্পষ্টভাবেও একথা উল্লেখিত হয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান