মা'আরিফুল হাদীস

মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়

হাদীস নং: ২১২
মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়
পানাহারের আদব ও এর বিধি-বিধান
২১২. হযরত জুরাইজ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি 'জায়শুল খাবত'-এর যুদ্ধে শরীক ছিলাম এবং আবু উবায়দা এ যুদ্ধে আমীর নিযুক্ত হয়েছিলেন। (খাদ্য সামগ্রী না থাকার কারণে আমরা এ সফরে) প্রচণ্ড ক্ষুধায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। এ সময় সমুদ্র একটি মরা মাছ নিক্ষেপ করল। (অর্থাৎ, মাছটি পানির জোয়ারে ডাঙ্গায় উঠে এল।) এমন বিরাট মাছ আমরা কখনো দেখিনি। এটাকে আম্বর বলা হত। আমরা সবাই এটা অর্ধ মাস পর্যন্ত খেলাম। তারপর আবূ উবায়দা রাযি.-এর হাঁড়গুলো থেকে একটি হাঁড় (সম্ভবত পাঁজরের হাঁড়) উঠিয়ে ধরলেন। তখন উটের আরোহী এর ভেতর দিয়ে অতিক্রম করে গেল। পরে যখন আমরা মদীনায় আসলাম, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এ ঘটনা বললাম (এবং জিজ্ঞাসা করলাম যে, এটা খাওয়া আমাদের জন্য ঠিক হয়েছে কি না?) তিনি বললেন, খাও, এটা আল্লাহ্ তোমাদেরকে রিযিক হিসাবে দান করেছেন। আর তোমাদের সাথে যদি এর কোন অংশ থেকে থাকে, তাহলে আমাদেরকেও খেতে দাও। জাবের বলেন, আমরা এখান থেকে কিছু অংশ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর খেদমতে পেশ করলাম এবং তিনি তা খেয়ে নিলেন। বুখারী, মুসলিম
کتاب المعاشرت والمعاملات
عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ قَالَ: غَزَوْتُ جَيْشَ الْخَبَطِ وَأُمِّرَ أَبُو عُبَيْدَةَ، فَجُعْنَا جُوعًا شَدِيدًا فَأَلْقَى الْبَحْرُ حُوتًا مَيِّتًا، لَمْ نَرَ مِثْلَهُ، يُقَالُ لَهُ الْعَنْبَرُ، فَأَكَلْنَا مِنْهَا نِصْفَ شَهْرٍ، فَأَخَذَ أَبُو عُبَيْدَةَ عَظْمًا مِنْ عِظَامِهِ فَمَرَّ الرَّاكِبُ تَحْتَهُ. فَلَمَّا قَدِمْنَا ذَكَرْنَا ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: كُلُوا رِزْقًا أَخْرَجَهُ اللَّهُ، أَطْعِمُونَا إِنْ كَانَ مَعَكُمْ. قَالَ: فَأَرْسَلْنَا اِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَكَلَهُ. (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসে যে ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এটা যষ্ঠ হিজরী সনের এক যুদ্ধাভিযানের ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রায় তিনশ মুজাহিদের একটি বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। এর আমীর বানানো হয়েছিল হযরত আবু উবায়দাকে। গোটা বাহিনীর খাবারের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কেবল এক থলে খেজুর আবূ উবায়দাকে দিয়েছিলেন। তখন এতটুকুরই ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছিল। আবূ দাউদ প্রমুখের এ ঘটনার বর্ণনায় রয়েছে যে, আবু উবায়দা রাযি. দৈনিক প্রত্যেক সৈনিককে এখান থেকে কেবল একটি করে খেজুর দিতেন, আর আল্লাহর সৈন্যরা এর উপরই দিন কাটিয়ে দিতেন। স্বয়ং এ সেনাদলের কেউ কেউ বর্ণনা করেছেন যে, আমরা এই একটি খেজুরকে দীর্ঘ সময় মুখে রেখে এভাবে চুষতাম, যেভাবে ছোট্ট শিশুরা চুষে থাকে। আর আমরা এর উপর পানি পান করে নিতাম। এটাই সারা দিনের জন্য যথেষ্ট হয়ে যেত। তারপর এক সময় যখন এ খেজুরগুলো শেষ হয়ে গেল, তখন গাছের পাতা ঝেড়ে সেগুলো পানি দ্বারা ভিজিয়ে খেতে শুরু করলাম। এতে আমাদের মুখ জখম হয়ে গেল এবং ফুলে গেল। এ সেনা অভিযানকে 'জায়গুল খাবত' এর কারণেই বলা হয়। 'খাবত' শব্দের অর্থ গাছ থেকে পাতা ঝাড়া।
আবূ দাউদ প্রমুখের রেওয়ায়তে হযরত জাবেরেরই বর্ণনা রয়েছে যে, এ অবস্থায়ই আমরা সমুদ্র তীরের কাছ দিয়ে চলছিলাম। এ সময় একটি টিলা অথবা পাহাড়ের মত একটি জিনিস আমাদের দৃষ্টিগোচর হল। কাছে গিয়ে দেখলাম যে, এটা সমুদ্রের নিক্ষিপ্ত মাছের ন্যায় এক প্রাণী যা মৃত। হযরত আবু উবায়দার এটা হালাল হওয়ার সম্পর্কে সন্দেহ হল। পরে তিনি চিন্তা করলেন যে, আমরা আল্লাহর কাজে বের হয়েছি এবং আমরা তাঁর রাসূলের প্রেরিত বাহিনী, আমাদের কাছে খাওয়ার কিছু নেই। তাই আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের আহার হিসাবে এটা দান করেছেন। তারপর এ ব্যাপারে তার অন্তর্দৃষ্টি খুলে গেল এবং তিনি সৈন্যদেরকে এটা খাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলেন। বুখারী মুসলিমের এ বর্ণনা অনুযায়ী গোটা বাহিনী এটা অর্ধমাস পর্যন্ত খেয়েছিল। অন্য কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, এটা এক মাস পর্যন্ত খাওয়া হয়েছিল।

সংকলকের দৃষ্টিতে এ উভয় কথার মধ্যে এভাবে সামঞ্জস্য বিধান করা যায় যে, সেনাবাহিনীর অবস্থান অর্ধমাস পর্যন্ত সে এলাকায়ই ছিল, আর এ দিনগুলোতে ঐ মাছই খুব প্রচুর পরিমাণে খাওয়া হচ্ছিল। তারপর যখন সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন হল এবং প্রায় অর্ধমাসে বাহিনী মদীনায় পৌঁছল, এ দিনগুলোতেও এর দ্বারাই কিছু কাজ চলছিল। তাই যেসব বর্ণনায় অর্ধমাস পর্যন্ত খাওয়ার উল্লেখ রয়েছে, এগুলোতে কেবল সফর থেকে ফিরে আসার পূর্বেকার দিনগুলোর কথা বলা হয়েছে- যখন গোটা বাহিনী প্রাচুর্যের সাথে এটা খেয়ে যাচ্ছিল। আর যেসব রেওয়ায়তে এক মাস পর্যন্ত খাওয়ার কথা বলা হয়েছে, এগুলোর মধ্যে প্রত্যাবর্তনের দিনগুলোও অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়েছে। কেননা, এ দিনগুলোতেও এটা খাদ্য হিসাবে কিছু না কিছু ব্যবহার করা হয়েছে।

হাদীসের শেষে এ কথাও বলা হয়েছে যে, মদীনা প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করা হয় এবং সম্ভবত আবু উবায়দা রাযি. এর সংশয়-সন্দেহের কথাও উল্লেখ করা হয়। এটা শুনে তিনি বললেন, كلوا رزقا أخرجه الله إليكم অর্থাৎ, তিনি আশ্বস্ত করলেন যে, এটা আল্লাহ্ তা'আলার বিশেষ দান ও উপঢৌকন ছিল, যা তিনি সাগর থেকে তোমাদের জন্যই বের করে এনেছেন। এমন জিনিস তো খুবই কদর ও শুকরিয়ার সাথে খাওয়া চাই। শেষে তিনি তাদের মন খুশি করার জন্য এবং আল্লাহর এই দানের মর্যাদা প্রকাশের জন্য একথাও বললেন: وأطعمونا إن كان معكم অর্থাৎ, এর কোন অংশ যদি তোমরা সাথে করে এনে থাক, তাহলে আমাদেরকেও খেতে দাও। কথামত তাঁর খেদমতে পেশ করা হল এবং তিনি তা খেয়ে নিলেন।

এ হাদীস দ্বারা একথা জানা গেল যে, সমুদ্রের এত বিরাট মাছ- যা এক আশ্চর্য ও বিরল মাখলুক মনে হচ্ছিল এটা হালাল ও পবিত্র।
হাদীসে রয়েছে যে, এ মাছকে আম্বর বলা হয়। কেউ কেউ বলেন, বিশেষ অঞ্চলের সমুদ্র তীরে যে আম্বর পাওয়া যায়, এটা এ জাতীয় মাছ থেকেই বের হয়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান