মা'আরিফুল হাদীস

মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়

হাদীস নং: ৫১
মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়
গায়রুল্লাহর জন্য সেজদার অবকাশ থাকলে স্ত্রীদেরকে স্বামীকে সেজদা করার হুকুম দেওয়া হত
৫১. হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: আমি যদি কাউকে কোন মাখলুকের জন্য সেজদা করার হুকুম দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে হুকুম করতাম যে, সে যেন তার স্বামীকে সেজদা করে। -তিরমিযী
کتاب المعاشرت والمعاملات
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَوْ كُنْتُ آمُرُ أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ، لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا. (رواه الترمذى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

কোন মাখলুকের উপর অন্য কোন মাখলুকের সর্বাধিক হক ও অধিকার বর্ণনা করতে গিয়ে এর চেয়ে বলিষ্ঠ ও প্রভাবযুক্ত অন্য কোন শিরোনাম হতে পারে না, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই হাদীসে স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার বর্ণনার জন্য অবলম্বন করেছেন। হাদীসটির দাবী ও উদ্দেশ্য এটাই যে, কারো বিবাহ বন্ধনে এসে যাওয়া ও তার স্ত্রীতে পরিণত হয়ে যাওয়ার পর স্ত্রীর উপর আল্লাহর পর সবচেয়ে বড় হক প্রতিষ্ঠিত হয় তার স্বামীর। এজন্য তার উচিত, সে তার আনুগত্য ও সন্তুষ্টি কামনায় কোন ত্রুটি করবে না। তিরমিযী শরীফে এ হাদীসটি হযরত আবু হুরায়রা রাযি.-এর বর্ণনা এ শব্দমালায়ই বর্ণনা করা হয়েছে।

ইমাম আহমদ স্বীয় মুসনাদে এ বিষেয়রই একটি হাদীস হযরত আনাস থেকে নিম্নোক্ত শব্দমালায় বর্ণনা করেছেন:

لا يصلح لبشر أن يسجد لبشر ، ولو صلح أن يسجد لبشر لأمرت المرأة أن تسجد لزوجها من عظم حقه عليها

অর্থাৎ, কোন মানুষের জন্য বৈধ নয় যে, সে অন্য কোন মানুষকে সেজদা করবে। যদি এটা বৈধ হত, তাহলে আমি স্ত্রী লোকদেরকে হুকুম দিতাম যে, সে যেন তার স্বামীকে সেজদা করে, কেননা, স্ত্রীর উপর স্বামীর অনেক অধিকার রয়েছে।

সুনানে ইবনে মাজাহর মধ্যে এরকম একটি বিষয় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবি আউফা রাযি.-এর রেওয়ায়ত থেকে একটি ঘটনা এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিখ্যাত আনসারী সাহাবী হযরত মু'আয ইবনে জাবাল রাযি. একবার সিরিয়া গিয়েছিলেন। তিনি সেখান থেকে যখন ফিরে আসলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে সেজদা করলেন। হুযুর (ﷺ) আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে মু'আয! তুমি এটা কি করছ? মু'আয উত্তর দিলেন, আমি সিরিয়া গিয়েছিলাম। আমি সেখানকার লোকদেরকে দেখলাম যে, তারা তাদের ধর্মীয় নেতা, পাদ্রী ও গোত্রীয় সরদারদেরকে সেজদা করে। তখন আমার মনে ধারণা আসল যে, আমরাও আপনাকে এভাবে সেজদা করব। তিনি বললেন, এমনটি করো না। তারপর বললেন:

فإني لو كنت آمرا أحدا أن يسجد لغير الله لأمرت المرأة أن تسجد لزوجها

অর্থাৎ, আমি যদি কাউকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সৃষ্টিকে সেজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম যে, সে যেন নিজের স্বামীকে সেজদা করে।

আবু দাউদ শরীফে এরই সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরেকটি ঘটনা। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত কায়েস ইবনে সা'দ রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি নিজের ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন: আমি একবার (কুফার সন্নিকটে অবস্থিত প্রাচীন নগরী) 'হিয়ারা' গিয়েছিলাম। সেখানকার লোকদেরকে দেখলাম যে, তারা আদব ও সম্মান হিসাবে নিজেদের সরদারকে সেজদা করে। আমি মনে মনে বললাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বেশী হকদার যে, আমরা তাঁকে সেজদা করব। তারপর যখন সফর থেকে ফিরে তাঁর খেদমতে হাজির হলাম, তখন আমি এ কথাটি নিবেদন করলাম। তিনি তখন আমাকে বললেন-

أَرَأَيْتَ لَوْ مَرَرْتَ بِقَبْرِى أَكُنْتَ تَسْجُدُ لَهُ؟» فَقُلْتُ: لَا فَقَالَ: «لَا تَفْعَلُوا لَو كنت آمُر أحد أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ النِّسَاءَ أَنْ يَسْجُدْنَ لِأَزْوَاجِهِنَّ لِمَا جَعَلَ اللَّهُ لَهُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ حق

অর্থাৎ বল তো, তুমি যদি (আমার মৃত্যুর পর) আমার কবরের পাশ দিয়ে যাও, তাহলে আমার কবরকে কি তুমি সেজদা করবে? আমি বললাম, না, এমন করব না। তখন তিনি বললেন, এমনিভাবে এখনো করো না। তারপর বললেন, আমি যদি কোন ব্যক্তিকে অন্য কাউকে সেজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে মহিলাদেরকে নির্দেশ দিতাম, তারা যেন নিজেদের স্বামীদেরকে সেজদা করে, ঐ অধিকারের কারণে, যা স্বামীদেরকে দিয়েছেন তাদের স্ত্রীদের উপর।

মুসনাদে আহমাদে হযরত আয়েশা রাযি. থেকে আরেকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যে, একটি উট রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে সেজদা করল (অর্থাৎ, সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে এভাবে নত হল যে, দর্শকরা এটাকে সেজদা মনে করে নিল।) উটের এই কাণ্ডদেখে কোন কোন সাহাবী নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উটের মত একটি চতুষ্পদ জন্তু ও গাছ আপনাকে সেজদা করে, তাহলে এটা আমাদের জন্য বেশী শোভনীয় যে, আমরা আপনাকে সেজদা করব। তিনি তখন তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন:

اعبدوا ربكم وأكرموا أخاكم ولو كنت آمر أحدا أن يسجد لأحد لأمرت المرأة أن تسجد لزوجها

অর্থাৎ, তোমরা কেবল তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর, আর তোমাদের ভাইয়ের (অর্থাৎ, আমার) কেবল সম্মান কর। আমি যদি কাউকে অন্য কারো জন্য সেজদার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সেজদা করার জন্য।
এসব হাদীস ও বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার প্রসঙ্গে এই সেজদা সংক্রান্ত হাদীসটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও বিভিন্ন সময়ে বারবার বলেছেন।

সর্বপ্রকার সেজদা কেবল আল্লাহর জন্যই
এসব হাদীস থেকে একথাটিও স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে জানা হয়ে গিয়েছে যে, মুহাম্মদী শরী‘আতে সেজদা কেবল আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত। তিনি ছাড়া অন্য কারো জন্য- এমনকি সৃষ্টিকুল সেরা ও সকল নবীদের সরদার হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-এর জন্যও কোনরূপেই সেজদার অবকাশ নেই। এ বিষয়টিও সুস্পষ্ট যে, হযরত মু'আয অথবা কায়েস ইবনে সা'দ কিংবা অন্য যে সব সাহাবী রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খেদমতে সেজদার ব্যাপারে নিবেদন করেছিলেন, সেটা সেজদায়ে তাহিয়্যার ব্যাপারেই নিবেদন করেছিলেন। (যেটাকে লোকেরা সেজদায়ে তা'জীমীও বলে থাকে।) একথা তো সন্দেহ করেও বলা যায় না যে, এসব সাহাবী ইবাদতের সেজদার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। কেননা, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর ঈমান নিয়ে এসেছে এবং তাঁর তওহীদের আহ্বানকে গ্রহণ করে নিয়েছে, তার অন্তরে এই ওয়াসওয়াসাও আসতে পারে না যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সে ইবাদতের সেজদা করবে। এজন্য মেনে নিতে হবে যে, এসব হাদীসের সম্পর্ক বিশেষ করে সেজদায়ে তাহিয়্যার সাথে। এ জন্য ফকীহগণ পরিষ্কার বলেছেন যে, কোন সৃষ্টির জন্য সেজদায়ে তাহিয়্যা তথা অভিবাদনমূলক অথবা সম্মানসূচক সেজদাও হারাম। অতএব, যেসব লোক নিজেদের পীর-মুর্শিদদেরকে অথবা তাদের ইন্তিকালের পর তাদের মাযারগুলোকে সেজদা করে তারা আর যাই হোক না কেন, মুহাম্মদী শরী‘আত বিদ্রোহী এবং তাদের এ কর্ম দৃশ্যতঃ নিঃসন্দেহে শিরক।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান