মা'আরিফুল হাদীস

রোযা অধ্যায়

হাদীস নং: ৬১
রোযা অধ্যায়
কিতাবুস্ সাওম

তওহীদ ও রেসালতের সাক্ষ্যদানের পর নামায, যাকাত, রোযা ও হজ্ব হচ্ছে ইসলামের মূল উপাদান চতুষ্টয়। এই 'মা'আরিফুল হাদীস' সিরিজের একেবারে শুরুতেই ঐসব হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ পাঁচটি জিনিসকে ইসলামের আরকান ও ভিত্তিমূল বলে অভিহিত করেছেন। এ জিনিসগুলো ইসলামের আরকান ও মূল উপাদান হওয়ার মর্ম- যেমন আগেও উল্লেখ করা হয়েছে- এই যে, ইসলাম আল্লাহর আনুগত্যের যে জীবনধারার নাম, এ জীবন নির্মাণে এবং এর বিকাশ ও ক্রমোন্নয়ণে এ পাঁচটি জিনিসের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে নামায ও যাকাতের যে প্রভাব ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা স্বস্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। রোযার এ প্রভাব ও বৈশিষ্ট্যের আলোচনা স্বয়ং কুরআন মজীদে স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে করা হয়েছে। সূরা বাকারায় রমযানের রোযার ফরযিয়্যতের ঘোষণার সাথেই বলা হয়েছে: لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ অর্থাৎ, এ নির্দেশের উদ্দেশ্য এই যে, তোমাদের মধ্যে যেন তাকওয়া সৃষ্টি হয়।
আল্লাহ তা'আলা মানুষকে আধ্যাত্মিকতা ও পশুত্বের অথবা অন্য শব্দে এভাবে বলুন যে, ফেরেশতা চরিত্র ও পশু চরিত্রের এক সমন্বিত রূপ বানিয়েছেন। তার চরিত্র ও মূল সৃষ্টিতে ঐসব জৈবিক চাহিদাও রয়েছে যেগুলো অন্যান্য পশুদের মধ্যেও থাকে। আর এরই সাথে তার সৃষ্টিতে আধ্যাত্মিকতা ও ফেরেশতা চরিত্রের ঐ নূরানী উপাদানও রয়েছে, যা উর্ধ্ব জগতের পবিত্র সৃষ্টি ফেরেশতাদের বৈশিষ্ট্য। মানুষের সৌভাগ্য ও সফলতা এর উপর নির্ভরশীল যে, তার এ আত্মিক ও ফেরেশতাসুলভ উপাদান যেন পশুসুলভ চরিত্রের উপর বিজয়ী হয়ে থাকে এবং এটাকে যেন একটা সীমা রেখার নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। আর এটা তখনই সম্ভব যখন পশুত্বের দিকটি আত্মিক ও ফেরেশতা শক্তির দিকটির আনুগত্যে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং এর বিরুদ্ধে অবাধ্যতা না করে। রোযার সাধনার বিশেষ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এটাই যে, এর মাধ্যমে মানুষের পশু শক্তিকে আল্লাহর আহকামের অনুসরণ এবং আত্মিক ও ঈমানী দাবীসমূহের তাবেদারীতে অভ্যস্ত করে নেওয়া হবে। যেহেতু এ জিনিসটি নবুওয়াত ও শরী‘আতের বিশেষ উদ্দেশ্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত, এ জন্য পূর্বেকার সকল শরী‘আতেও রোযার বিধান সবসময় ছিল।
কুরআন মজীদে এ উম্মতকে রোযার নির্দেশ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে:

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الصِّیَامُ کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ

হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি হয়।-(সুরা বাকারা)
যাহোক, রোযা যেহেতু মানুষের পশুশক্তিকে তার ফেরেশতা শক্তির অধীনে রাখার এবং আল্লাহর বিধি-বিধানের সামনে নফসের চাহিদা এবং উদর ও যৌন তাড়নার দাবীকে পরাস্ত করার একটি বিশেষ মাধ্যম, এ জন্য পূর্ববর্তী উম্মতসমূহকেও এর হুকুম দেওয়া হয়েছিল।
যদিও রোযার সময়কাল এবং অন্যান্য বিস্তারিত বিধি-বিধানে ঐসব উম্মতের বিশেষ অবস্থা ও প্রয়োজন বিবেচনায় কিছুটা পার্থক্যও ছিল। এ আখেরী উম্মতের জন্য- যার যুগ দুনিয়ার শেষ দিন পর্যন্ত বিস্তৃত বছরে এক মাসের রোযা ফরয করা হয়েছে এবং রোযার সময় শেষ রাত থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রাখা হয়েছে। আর নিঃসন্দেহে এ মেয়াদ ও এ সময়সূচী উপরে উল্লেখিত উদ্দেশ্য লাভের ক্ষেত্রে এ যুগের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ও খুবই ভারসাম্যপূর্ণ। কেননা, এর চেয়ে কম সময়ে সাধনা ও আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যই অর্জিত হয় না। আর মেয়াদকাল যদি এর চেয়ে দীর্ঘ রাখা হত- যেমন, রোযার মধ্যে দিনের সাথে রাতকেও যুক্ত করে দেওয়া হত এবং কেবল সাহরীর সময় পানাহারের অনুমতি দেওয়া হত অথবা বছরে দু' চার মাস একাধারে রোযা রাখার হুকুম দেওয়া হত, তাহলে অধিকাংশ মানুষের জন্য এটা অসহনীয় এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে যেত। যাহোক, শেষ রাত থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় এবং বছরে এক মাসের মুদ্দত এ যুগের সাধারণ মানুষের অবস্থা বিবেচনায় সাধনা ও আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্য সাধনের জন্য খুবই উপযোগী ও ভারসাম্যপূর্ণ।
তারপর রোযার জন্য মাস নির্বাচন করা হয়েছে রমযানকে, যাতে কুরআন নাযিল হয়েছিল এবং যে মাসে অসংখ্য রহমত ও বরকত সমৃদ্ধ একটি রাত (লায়লাতুল ক্বদর) থাকে। এ কথা স্পষ্ট যে, এ বরকতময় মাসটিই এর জন্য সবচেয়ে উপযোগী ছিল। তাছাড়া এ মাসে দিনের বেলার রোযা ছাড়া রাতের বেলায়ও একটি বিশেষ ইবাদতের সাধারণ ও জামা'আতী ব্যবস্থাপনাও রাখা হয়েছে- যা 'তারাবীহ' রূপে উম্মতের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। দিনের রোযার সাথে রাতের তারাবীহের বরকত যুক্ত হয়ে এ মাসের দীপ্তিময়তা ও প্রভাবে ঐ সংযোজন ঘটে, যা নিজেদের দৃষ্টি ও অনুভূতি অনুযায়ী প্রত্যেক ঐ বান্দাই অনুভব করতে পারে, যাদের এসব বিষয়ের সাথে কিছুটা সম্পর্ক ও পরিচয় রয়েছে।
এ সংক্ষিপ্ত ভূমিকার পর এবার রমযান ও রোযা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কিছু হাদীস নিম্নে পাঠ করে নিনঃ

মাহে রমযানের ফযীলত ও বরকত
৬১. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: যখন রমযান মাস আসে, তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে নেওয়া হয়। (অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়।) -বুখারী, মুসলিম
کتاب الصوم
عَنِ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : « إِذَا دَخَلَ رَمَضَانُ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الجَنَّةِ ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ » وفى رواية أَبْوَابُ الرَّحْمَةِ...
(رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

প্রখ্যাত মনীষী হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহঃ) 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা' গ্রন্থে এ হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যা লিখেছেন, এর সারমর্ম হচ্ছে এই যে, আল্লাহর পুণ্যবান ও অনুগত বান্দারা রমযানে যেহেতু আল্লাহর ইবাদত ও পুণ্যকাজে অধিক মনোযোগী ও ব্যস্ত হয়ে যায়। তারা দিনের বেলায় রোযা রেখে যিকির ও তিলাওয়াতে সময় কাটায় এবং রাতের একটা বিরাট অংশ তারাবীহ, তাহাজ্জুদ ও দু‘আ ইস্তিগফারে কাটিয়ে দেয়। আর তাদের ইবাদতের নূর ও বরকতের প্রভাবে সাধারণ মু'মিনদের অন্তরও রমযান শরীফে ইবাদত ও পুণ্যের দিকে বেশী আগ্রহী হয়ে উঠে এবং অনেক গুনাহ থেকে দূরে সরে থাকে। এ অবস্থায় ঈমান ও ইসলামের ভুবনে কল্যাণ ও তাকওয়ার এ ব্যাপক অনুরাগ এবং পুণ্য ও ইবাদতের এ পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যাওয়ার কারণ। এসব মানুষের অন্তরও যাদের মধ্যে সামান্য যোগ্যতাও রয়েছে-আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত হয়ে যায়। তাছাড়া এ মুবারক মাসে সামান্য নেক কাজের মূল্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্যান্য মাসের তুলনায় অনেক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাই এর ফল এই হয় যে, ঐসব লোকদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তান তদেরকে পথভ্রষ্ট করতে অপারগ ও অক্ষম হয়ে যায়।

এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই তিনটি বিষয়ের (অর্থাৎ, জান্নাতের দরজা খুলে যাওয়া, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শয়তানকে বন্দী করে নেওয়ার) সম্পর্ক ঐসব মু'মিনদের সাথে, যারা রমযানে কল্যাণ ও সৌভাগ্য অর্জনের দিকে অগ্রসর হয় এবং রমযানের রহমত ও বরকত থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যকে নিজের কাজ বানিয়ে নেয়। বাকী রইল ঐসব কাফের, খোদাবিমুখ ও উদাসীনতায় অভ্যস্ত লোকেরা, যারা রমযান এবং এর বিধি-বিধান ও বরকতের সাথে কোন সম্পর্কই রাখে না এবং রমযানের আগমনে তাদের জীবনে কোন পরিবর্তনই আসে না। একথা স্পষ্ট যে, এ ধরনের সুসংবাদের তাদের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। তারা যখন নিজেরাই নিজেদেরকে বঞ্চিত করে দিয়েছে এবং বার মাসই শয়তানের আনুগত্য করে নিশ্চিন্তে বসে আছে, তখন আল্লাহর কাছেও তাদের জন্য বঞ্চিত হওয়া ছাড়া আর কি থাকতে পারে?
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান