মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

আল-কুরআন এর ফযীলত, তাফসীর ও শানে নুযূল অধ্যায়

হাদীস নং:
আল-কুরআন এর ফযীলত, তাফসীর ও শানে নুযূল অধ্যায়
পরিচ্ছেদ: আল-কুরআনের ফযীলত ও তা আঁকড়ে ধরা প্রসঙ্গ
৬। উমর ইবন খাত্তাব (রা) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ এই কিতাব (অর্থাৎ আল-কুরআন) এর দ্বারা কোন কোন জাতির উন্নতি দান করেন আবার অন্য কোন জাতির অবনতি দান করেন।
كتاب فضائل القرآن وتفسيره وأسباب نزوله
باب ما جاء في فضل القرآن والاعتصام به
عن عمر بن الخطاب قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان الله يرفع بهذا الكتاب أقواما ويضع به آخرين

হাদীসের ব্যাখ্যা:

কুরআন এক মর্যাদাকর গ্রন্থ। এটা জ্ঞানের উৎস। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত চরিত্রের শিক্ষা। এর ভেতর মানুষের ব্যক্তি ও সমাজগঠন এবং জাতীয় উন্নয়নমূলক সকল জরুরি শিক্ষা রয়েছে। এ গ্রন্থ মানুষের প্রতি মানুষের সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে আগত। তাই এর শিক্ষা সকল ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে। এর শিক্ষা সব রকমে পরিপূর্ণ ও সবদিক থেকে উপযুক্ত ও বাস্তবসম্মত। অন্যদিকে মানুষ আল্লাহ তা'আলার এক সম্মানিত সৃষ্টি। তার সে সম্মান তার অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা ও গুণাবলির বিকাশ দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয়। কোনও সন্দেহ নেই যে, তার বিকাশ কেবল এই গ্রন্থের অনুসরণ দ্বারাই সম্ভব। কাজেই যারা এ কিতাবের প্রতি ঈমান আনবে ও এর বিধানসমূহ যথাযথভাবে পালন করবে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত হবে। আর যারা এ কিতাবের উপর ঈমান আনবে না কিংবা ঈমান আনলেও এর যথাযথ অনুসরণ করবে না, তারা হবে লাঞ্ছিত ও অধঃপতিত। আলোচ্য হাদীছটিতে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إِنَّ اللهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا (আল্লাহ তা'আলা এ কিতাবের মাধ্যমে বহু লোককে উন্নত করেন)। অর্থাৎ যারা এ কিতাবের প্রতি ঈমান আনে ও এর নির্দেশনা অনুসরণ করে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সর্বপ্রকারে উন্নতি দান করেন। তারা জ্ঞানে, কর্মে, নীতি-নৈতিকতায়, শক্তিতে ও মর্যাদায় সবার উপরে চলে যায়। সাহাবায়ে কেরামের ইতিহাস এর সাক্ষী। ঈমান আনার আগে তারা ছিলেন দুনিয়ার সর্বাপেক্ষা অধঃপতিত জাতি। সমগ্র আরব ছিল অজ্ঞতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন। তারা ছিল পৌত্তলিক। তাদের ছিল হাজারও কুসংস্কার। ছিল নানা বংশ-গোত্রে বিভক্ত। পার্শ্ববর্তী পারস্য ও রোমানশক্তির কাছে তারা ছিল অবহেলিত। সবদিক থেকেই তারা ছিল দুর্দশাগ্রস্ত। তারপর যখন কুরআন নাযিল হলো, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে কুরআনের বাণী পৌঁছালেন, আর তারা এর প্রতি ঈমান এনে এর হিদায়াত অনুযায়ী জীবন গঠন করল, তখন তাদের মানবিকতার বিকাশ হলো। তাদের সদগুণসমূহ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছল। তারা ঈমানের বলে বলীয়ান হলেন। তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। যে রোম-পারস্য তাদের অবহেলা করত, তারাই একপর্যায়ে তাদের কাছে হার মানল। তাদের স্বাধীন নর-নারী তো বটেই, তাদের দাস-দাসীরাও জ্ঞান-গরিমায় অকল্পনীয় উচ্চতায় পৌঁছে গেল। একপর্যায়ে তারা বিশ্বের সর্বাপেক্ষা সভ্য, শিক্ষিত ও শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হলেন। এটা কুরআনের অলৌকিকত্ব। কুরআন মানুষের মর্যাদা ও উৎকর্ষের উৎস। এ মহাগ্রন্থের যথাযথ অনুসরণ মানুষকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির অকল্পনীয় স্তরে পৌঁছাতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-

لَقَدْ أَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ كِتَبًا فِيهِ ذِكْرُكُمْ أَفَلَا تَعْقِلُونَ

(পরিশেষে) আমি তোমাদের প্রতি নাযিল করেছি এমন এক কিতাব, যার ভেতর তোমাদের জন্য রয়েছে মর্যাদা। তবুও কি তোমরা বুঝবে না? (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ১০)

বাস্তবিকই কুরআন এক মর্যাদাকর গ্রন্থ। এর অনুসরণ দ্বারা মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। দুনিয়ায়ও এবং আখিরাতেও। ইসলামের সোনালি যুগে বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর যে বিজয়ডঙ্কা বেজেছিল, তা কুরআন মাজীদের অনুসরণেরই সুফল। এ উম্মতের অতি সাধারণ স্তরের মানুষও কুরআনের অনুসরণ দ্বারা অভাবনীয় মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল। জ্ঞানে-গুণে সমৃদ্ধ হয়ে একেকজন গোলামও আপামর মানুষের শিক্ষাগুরু কিংবা সুযোগ্য শাসকের মর্যাদায় বরিত হয়েছিল।

হযরত আব্দুর রহমান ইবন আবযা রাযি.-এর ঘটনা
হযরত উমর রাযি.-এর আমলের কথা। হযরত নাফে' ইবন আব্দুল হারিছ রাযি. ছিলেন মক্কা মুকাররামার গভর্নর। হযরত উমর রাযি. হজ্জের সফরে আসছিলেন। হযরত নাফে' রাযি. উসফান নামক স্থানে এসে তাকে স্বাগত জানান। এ সময় খলীফা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি মক্কায় কাকে আপনার স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে এসেছেন? বললেন, আব্দুর রহমান ইবন আবযাকে। আব্দুর রহমান ছিলেন নাফে' রাযি.-এর গোলাম, যাকে আযাদ করে দেওয়া হয়েছিল। যে গোলামকে আযাদ করা হয় তাকে মাওলা বলা হয়। হযরত উমর রাযি. বললেন, আপনি একজন মাওলাকে ভারপ্রাপ্ত গভর্নর বানিয়ে আসলেন? বলাবাহুল্য, এ কথা বলার দ্বারা আব্দুর রহমানকে তাচ্ছিল্য করা উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তাঁর দৃষ্টি ছিল সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার প্রতি। তিনি সতর্ক ছিলেন যাতে কোনও দুর্বলতার পথ ধরে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও আইন-শৃঙ্খলা বিপন্ন না হয়। মক্কা মুকাররামায় অভিজাত কুরায়শ বংশীয় লোকদের বসবাস। তাই এখানকার শাসনকার্যে এমন সুযোগ্য কোনও ব্যক্তিকেই নিয়োজিত করা দরকার, যার যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকবে। আব্দুর রহমান ইবন আবযা রাযি. একজন আযাদপ্রাপ্ত গোলাম। এখানকার বাসিন্দাদের উপর তার কোনও প্রভাব থাকবে কি? তা না থাকলে তার পক্ষে সাফল্যের সঙ্গে এখানকার শাসনকার্য পরিচালনা সম্ভব হবে না।

যা হোক, হযরত নাফে' ইবন আব্দুল হারিছ রাযি. খলীফার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, আব্দুর রহমান আল্লাহ তা'আলার কিতাব কুরআন মাজীদের একজন কারী অর্থাৎ সে কুরআনের হাফেজ ও আলেম। অর্থাৎ আযাদপ্রাপ্ত গোলাম হলেও যেহেতু সে কুরআন মাজীদের একজন আলেম এবং মানুষ তার এ পরিচয় সম্পর্কে অবগতও, তাই তার পক্ষে এখানকার লোকজনের উপর শাসনকার্য পরিচালনা করা কঠিন হবে না। কেননা কুরআনের আলেম হিসেবে মানুষ তাকে সমীহ করবে এবং তার প্রতি আনুগত্যও প্রদর্শন করবে।

হযরত উমর রাযি. নাফে' রাযি.-এর উত্তরে আশ্বস্ত হয়ে গেলেন। সুতরাং তার সমর্থনে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ শুনিয়ে দিলেন যে-'আল্লাহ তা'আলা এ কিতাবের মাধ্যমে বহু লোকের মর্যাদা উঁচু করেন এবং এর মাধ্যমেই অন্যদের অধঃপতিত করেন'। অর্থাৎ আব্দুর রহমান রাযি. একদার গোলাম হলেও কুরআন মাজীদের প্রতি ঈমান আনা, কুরআন মাজীদের জ্ঞানার্জন করা ও কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবনগঠনের কারণে আজ তার মর্যাদা অনেক উঁচুতে পৌঁছে গেছে। এখন সে স্বাধীন ও অভিজাত শ্রেণিরও শাসক হয়ে গেছে। অতীত গোলামীর হীনতা তার ব্যক্তিত্ব থেকে মুছে গেছে। দাসত্বের পরিচয় তার ব্যক্তিত্বের উৎকর্ষকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। এটা কুরআনের শিক্ষালাভ ও কুরআনের অনুসরণ করার সুফল।

কুরআনের শিক্ষা ও অনুসরণ এভাবেই মানুষকে অধঃপতনের গভীর খাদ থেকে মুক্ত করে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দেয়। এটা এক অনঃস্বীকার্য সত্য। কেবল আব্দুর রহমান ইবন আবযা রাযি.-এরই বিষয় নয়; বরং অতীত জীবনে গোলাম ছিলেন এমন অনেকেই কুরআন মাজীদের শিক্ষাগ্রহণ করার সুবাদে মর্যাদার চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছিলেন। এরকম অনেক বড় বড় ফকীহ, মুহাদ্দিছ ও মুফাসসির ছিলেন, যারা এক কালে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী জীবনে তারা উম্মতের শিক্ষাগুরুরূপে জ্ঞান-বিদ্যার বিস্তারে বিপুল ভূমিকা রেখেছেন। এটা ছিল তাদের কুরআন শিক্ষারই সুফল। তাদের অনেকে দুনিয়ার চারদিকে ইসলামের রাজ্য বিস্তারেও বিশেষ অবদান রেখেছেন। সুযোগ্য শাসকরূপে ইতিহাসে স্থানও করে নিয়েছেন। কুরআনের অনুসরণই এক কালে মুসলিম উম্মাহকে দুনিয়ার সর্বাপেক্ষা সভ্য ও সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী জাতিতে পরিণত করেছিল। রোম-পারস্যসহ দুনিয়ার বড় বড় শক্তি যে তাদের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল, এর একমাত্র কারণ ছিল তাদের কুরআনবাহী হওয়া, কুরআনের পথে চলা।

কুরআন পরিত্যাগ ও মুসলিম উম্মাহর অধঃপতন
আজ মুসলিম উম্মাহর সেই মর্যাদা কোথায়? আজ তারা কেন এতটা নির্জীব? এ হাদীছের মধ্যেই রয়েছে তার উত্তর। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- وَيَضَعُ به آخرین (এবং এর মাধ্যমেই অন্যদের অধঃপতিত করেন)। অর্থাৎ যারা কুরআন মাজীদের প্রতি ঈমান আনবে না কিংবা ঈমান আনলেও এর বিধান মেনে চলবে না, তাদের অধঃপতন ঘটবে, তারা অপদস্থ হবে। ইসলামের শুরু যমানায় কুরআনের প্রতি ঈমান আনার কারণে মুসলিম উম্মাহ শক্তিতে-মর্যাদায় সকলকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অপরদিকে যারা ঈমান আনেনি, তাদের কারও শক্তি ও মর্যাদা খর্ব হয়েছিল এবং কারও সম্পূর্ণ খতমই হয়ে গিয়েছিল। মুসলিমগণ ক্রমশ কুরআনের পথ থেকে দূরে সরতে থাকলে তাদের সেই শক্তি ও মর্যাদারও অবক্ষয় হতে থাকে। আজ না আছে সামাজিকভাবে কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী ব্যক্তিগঠন, আর না আছে জাতীয় পর্যায়ে এর অনুসরণ। এর কুফল আমাদের ভোগও করতে হচ্ছে। সকল ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়ে পড়েছি। বিশ্বমঞ্চে আজ আমাদের কোনও নেতৃত্ব নেই, কর্তৃত্ব নেই। সবদিক থেকেই অন্যের আগ্রাসনের শিকার। আমরা তা মেনেও নিচ্ছি। অধঃপতন এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে যে, এখন নিজেদের শক্তি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যের কৃপাপ্রার্থী হচ্ছি। এবং সেজন্য আমাদের কোনও সংকোচও বোধ হয় না। এই নিদারুণ অধোগতি থেকে মুক্তির উপায় কী? উপায় একটাই- কুরআনের অনুসরণ। আমাদের পূর্বসূরি সাহাবা-তাবি'ঈন কুরআনের ধারক-বাহক হয়েই নিজেদের জীবন আলোকিত করেছিলেন। মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিলেন। আমাদেরও ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনের উন্নতি কেবল সে পথেই সম্ভব।

অধঃপতন মেনে নেওয়া হীনতা, গৌরব উন্নতিতেই
ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনের উন্নতি এমন কোনও বিষয় নয়, যা অবহেলা করা যেতে পারে। পতিত অবস্থা মেনে নেওয়া মনুষ্যত্ব নয়। মানুষকে আল্লাহ তা'আলা অমিত সম্ভাবনা দান করেছেন। মানুষের আছে বহু বিচিত্র প্রতিভা। সদিচ্ছা ও সাধনার দ্বারা মানুষের পক্ষে সে সম্ভাবনার ও সে প্রতিভার বিকাশ ঘটানোও সম্ভব। আর তাতে করে মানুষ লাভ করতে পারে তার সর্বাঙ্গীণ উন্নতি। এভাবে উন্নতি লাভ করতে পারে আখলাক ও নৈতিকতা, সমৃদ্ধ হতে পারে জ্ঞান-বিদ্যার সকল শাখা-প্রশাখা, উৎকর্ষ হতে পারে ভাষা ও সাহিত্যের, শিল্প ও কৃষিকার্যের, শক্তি ও ক্ষমতার এবং জীবন সংশ্লিষ্ট সবকিছুর। এ উম্মতের মধ্যে এক কালে সে উন্নতির সাধনা তো ছিলও। কুরআন ও হাদীছই তাদেরকে সে সাধনার উৎসাহ যুগিয়েছিল।

আলোচ্য এ হাদীছটিও আমাদেরকে সে উৎসাহ জোগায়। এতে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন সম্পর্কে জানাচ্ছেন যে, এ কিতাবের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের উন্নতি সাধন করেন। বোঝা যাচ্ছে উন্নতি এক কাম্যবস্তু। তা অর্জনের চেষ্টা থাকা চাই। আর তা অর্জিত কেবল তাদেরই হতে পারে, যারা কুরআনের পথে চলবে। কাজেই স্থবিরতা ঝেড়ে ফেলে সচল ও বেগবান হতেই হবে। নিজেদেরকে অধঃপতিত জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া প্রশংসনীয় কিছু নয়। আলোচ্য হাদীছ অধঃপতনকে নিন্দা করেছে। কুরআন পাশ কাটিয়ে চললে অধঃপতন ঘটে বলে সতর্ক করেছে। সুতরাং অধঃপতিত অবস্থা নয়; বরং উন্নতিই প্রশংসনীয়। আর তা সাধিত হতে পারে কেবলই কুরআনের যথার্থ অনুসরণ দ্বারা, কুরআনের পথে অদম্য সচলতার দ্বারা।

লক্ষণীয়, হাদীছটিতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা কুরআন দ্বারা অনেককে উন্নত করেন। অর্থাৎ কুরআন মাজীদের অনুসরণ দ্বারা মানুষের যে উন্নতি লাভ হয়, তা হয় আল্লাহ তা'আলারই ইচ্ছায় এবং তাঁরই সাহায্যে। কাজেই উন্নতিকামীদের কর্তব্য উন্নতির যাবতীয় প্রচেষ্টায় আল্লাহ তা'আলার অভিমুখী থাকা। সে অভিমুখিতার একটা দিক তো হলো কুরআন দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়ার পর উন্নতিলাভের জন্য যে ব্যবস্থাগ্রহণ ও চেষ্টা করা হবে তা অবশ্যই শরীয়তসম্মত ও বৈধ পন্থায় হতে হবে। উন্নতির কোনও প্রচেষ্টাই নাজায়েয উপায়ে চালানো যাবে না। আর দ্বিতীয় দিক হলো চেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহ তা'আলার কাছে দুআও করতে হবে। চেষ্টায় সফলতা দেওয়ার বিষয়টা আল্লাহ তা'আলারই হাতে। তাই তাঁর কাছেই তা চেয়ে নিতে হবে।

উন্নতি যেহেতু আল্লাহ তা'আলার দান এবং সে হিসেবে তাঁর নি'আমতও বটে, তাই উন্নতিলাভের যাবতীয় প্রচেষ্টায় লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকবে কেবলই আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি; নিজ মনের চাহিদাপূরণ নয়। মনের চাহিদাপূরণের লক্ষ্যে যে উন্নতি লাভ হয়, তা কখনওই প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনে না; উল্টো তা নানা অনর্থের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই উন্নতিকে সবরকম বিপত্তি থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে শুরুতেই নিয়ত খালেস করে নেওয়া চাই। নিয়ত খালেস থাকলে অর্থাৎ কেবল আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যেই যদি উন্নতিলাভের চেষ্টা চালানো হয়, তবে তা যেমন আখিরাতের জন্য কল্যাণকর হবে, তেমনি দুনিয়ার পক্ষেও তা সর্ববিধ কল্যাণকর সাব্যস্ত হবে।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কুরআন আখিরাতের মুক্তির পাশাপাশি দুনিয়ায়ও উন্নতি ও মর্যাদালাভের নিশ্চয়তা দেয়।

খ. কুরআনের অনুসরণ না করলে আখিরাতের ক্ষতি তো হয়ই, দুনিয়ায় তা অধঃপতনের কারণ হয়।

গ. উন্নত ও মর্যাদাকর জীবন আল্লাহ তা'আলার নি'আমত। কুরআন তা অর্জনের প্রেরণা জোগায়।

ঘ. অধঃপতিত অবস্থায় অভ্যস্ত হওয়া ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থি। তাই এর থেকে মুক্তির উপায় অবলম্বন করা উচিত।

ঙ . উন্নতি ও মর্যাদালাভের যাবতীয় প্রচেষ্টা অবশ্যই বৈধ পন্থায় হওয়া বাঞ্ছনীয়।

চ. জাগতিক উন্নতিলাভের চেষ্টাও সহীহ নিয়ত তথা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে হওয়া কাম্য।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান