মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

নবীগণ (আ) সম্পর্কিত তথ্যাবলী অধ্যায়

হাদীস নং: ৫৩
নবীগণ (আ) সম্পর্কিত তথ্যাবলী অধ্যায়
পরিচ্ছেদ: আল্লাহর নবী মূসার (আ) গুণাগুণ, তাঁর হজ ও সওম প্রসংগ
(৫৩) ইবন 'আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) মদীনায় এসে (হিজরতের পর) দেখলেন, ইয়াহুদীরা আশুরার দিন সওম পালন করছে। তিনি বললেন, এটা কোন দিনে তোমরা সওম পালন করছো? তারা বললো, এটি একটি ভাল দিন। এই দিনে আল্লাহ্ তা'আলা বনী ইসরাইলকে তাদের শত্রুদের কবল থেকে মুক্তি দেন। অতঃপর মুসা (আ) এই দিনে সওম পালন করেন। রাসূল (ﷺ) বলেন, মূসাকে (আ) অনুসরণের ক্ষেত্রে আমি তোমাদের চেয়েও অগ্রগামী। সুতরাং রাসূল (ﷺ) নিজে সেই দিনে সওম পালন করেন এবং অন্যদেরও তা করতে নির্দেশ দেন।
(এই হাদীসের তাখরীজ ১০ম খণ্ডে 'কিতাবুত তাখরীজ'-এ বর্ণিত হয়েছে।)
كتاب أحاديث الأنبياء عليهم وعلى نبينا الصلاة والسلام
باب ما جاء فى صفة نبى الله موسى عليه السلام وحجه وصومه
عن أبن عباس (3) قال قدم رسول الله صلي الله عليه وسلم المدينة فرأى اليهود يصومون يوم عاشوراء، فقال ما هذا اليوم الذى تصومون؟ قالوا هذا يوم صالح، هذا يوم نجى الله فيه بنى اسرائيل من عدوهم، قال فصامه موسى، قال قال رسول الله صلي الله عليه وسلم أنا أحق بموسى منكم فصامه رسول الله صلي الله عليه وسلم وأمر بصومه.

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসের বাহ্যিক শব্দমালায় বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হিজরতের পর মদীনা গিয়েই আশুরার দিন রোযা রাখতে শুরু করেছিলেন। অথচ বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আয়েশারই স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে যে, মক্কার কুরাইশদের মধ্যে ইসলামপূর্ব যুগেও আশুরা দিবসের রোযার প্রচলন ছিল এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হিজরতের পূর্বে মক্কার জীবনেও এ রোযা রাখতেন। তারপর যখন তিনি মদীনায় হিজরত করলেন, তখন এখানে এসে নিজেও রোযা রাখলেন এবং মুসলমানদেরকে এ দিনের রোযা রাখার হুকুম দিলেন।

প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে এই যে, আশুরার দিনটি জাহিলিয়াত যুগে মক্কার কুরাইশদের নিকটও খুবই সম্মানিত দিন ছিল। এ দিনই কা'বা শরীফে নতুন গিলাফ দেওয়া হত এবং কুরাইশের লোকেরা এ দিন রোযা পালন করত। অনুমান এই যে, হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আঃ)-এর কিছু কথা-কাহিনী এ দিনের বেলায় তাদের কাছে সম্ভবত পৌঁছে ছিল। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এ রীতি ছিল যে, কুরাইশের লোকেরা ইব্রাহীম (আঃ)-এর মিল্লাতকে জড়িয়ে যেসব ভাল কাজ করত তিনি এগুলোর মধ্যে তাদের সাথে ঐকমত্য পোষণ করতেন। এ ভিত্তিতেই তিনি হজ্বেও শরীক থাকতেন। অতএব, নিজের এ মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি আশুরার দিন কুরাইশদের সাথে রোযাও রাখতেন; কিন্তু অন্যদেরকে এর নির্দেশ দিতেন না। তারপর তিনি যখন মদীনায় আগমন করলেন এবং এখানকার ইয়াহুদীদেরকেও রোযা রাখতে দেখলেন এবং তাদের মুখে জানতে পারলেন যে, এটা হচ্ছে ঐ পবিত্র ঐতিহাসিক দিন, যে দিন মূসা (আঃ) এবং তার সম্প্রদায়কে আল্লাহ তা'আলা মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরআউন ও তার সৈন্য-সামন্তকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন, তখন তিনি এ দিনের রোযার প্রতি বেশী গুরুত্ব প্রদান করলেন। সাথে সাথে মুসলমানদেরকে সাধারণভাবে হুকুম দিলেন যে, তারাও যেন এ দিন রোযা রাখে। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি এর জন্য এমন তাকীদপূর্ণ হুকুম দিয়েছিলেন, যেমন হুকুম ফরয-ওয়াজিব বিষয়ের জন্য দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন, বুখারী ও মুসলিম শরীফে রুবায়্যি বিনতে মুআওয়িয এবং সালামা ইবনুল আকওয়া রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, একবার আশুরার দিন হুযুর (ﷺ) সকালে মদীনার আশেপাশের আনসারদের বসতি এলাকায় এ খবর পাঠালেন যে, যেসব লোক এখন পর্যন্ত কোন কিছু পানাহার করে নাই তারা যেন আজ রোযা রাখে, আর যারা পানাহার করে নিয়েছে তারাও যেন অবশিষ্ট দিন পানাহার থেকে বিরত থাকে এবং রোযাদারদের মত দিন কাটায়।

এসব হাদীসের ভিত্তিতে অনেক ইমাম ও ফকীহ্ এ কথা বুঝেছেন যে, প্রথমে আশুরার রোযা ফরয ছিল। পরবর্তীতে যখন রমযানের রোযা ফরয হল, তখন আশুরার রোযার ফরযিয়্যত রহিত হয়ে গেল এবং এটা কেবল নফলের পর্যায়ে রয়ে গেল- যার ব্যাপারে হুযূর (ﷺ)-এর এ বাণী এই মাত্র অতিক্রান্ত হয়েছে "আশুরার রোযার ব্যাপারে আমি আশাবাদী যে, আল্লাহ্ তা'আলা এর দ্বারা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন।" আশুরার রোযার ফরয হুকুম রহিত হয়ে যাওয়ার পরও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অভ্যাস এটাই থাকল যে, তিনি রমযানের ফরয রোযার পর নফল রোযাগুলোর মধ্যে এর প্রতিই বেশী গুরুত্ব প্রদান করতেন এবং এরই প্রতি অধিক যত্নশীল ছিলেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান