মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

হত্যা, অপরাধ ও রক্তপাতের বিধান

হাদীস নং: ১৮১
হত্যা, অপরাধ ও রক্তপাতের বিধান
ব্যভিচারের হদ্দ সংক্রান্ত

পরিচ্ছেদ: ব্যভিচার থেকে সতর্ক করা এবং ব্যভিচারীকে ভীতি প্রদর্শন করা, বিশেষত, প্রতিবেশীর স্ত্রী এবং অনুপস্থিত ব্যক্তির স্ত্রীর সাথে যিনা করার বিষয়ে যা বর্ণিত আছে।
১৮১। আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, যিনাকারী যখন যিনা করে তখন সে মু'মিন অবস্থায় যিনা করে না। চোর যখন চুরি করে তখন সে মু'মিন অবস্থায় চুরি করে না। মদপানকারী যখন মদ পান করে তখন সে মু'মিন অবস্থায় মদ পান করে না। অতঃপর তার জন্য তওবার সুযোগ রয়েছে।
(বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ, নাসাঈ, তিরমিযী, ইবন মাজাহ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর (অতঃপর তার জন্য তওবার সুযোগ রয়েছে) ছাড়া হাদীসটির অবশিষ্ট অংশ বর্ণনা করেছেন)
كتاب القتل والجنايات وأحكام الدماء
أبواب حد الزنا

باب ما جاء في التنفير من الزنا ووعيد فاعله لاسيما بحليلة الجار والمغيبة
عن أبى هريرة (4) عن النبى صلى الله عليه وسلم أنه قال لا يزنى الزانى حين يزنى وهو مؤمن (5) ولا يسرق حين يسرق (6) وهو مؤمن، ولا يشرب الخمر (7) حين يشربها وهو مؤمن، والتوبة معروضة بعد (8)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

অন্য বর্ণনায় আরও আছে: ولا يقتل حين يقتل وهو مؤمن "হত্যাকারী হত্যাকাণ্ডের সময় সে মুমিন থাকে না।" ব্যভিচার, শরাবপান, চৌর্যবৃত্তি, লুটপাট, হত্যাকাণ্ড, আমানতের খেয়ানত প্রভৃতি চরম নিন্দনীয় ও ঈমানের পরিপন্থী কাজ। যখনই কোন ব্যক্তি এ ধরনের জঘন্য কাজে লিপ্ত হয় তখন তার অন্তরে ঈমানী নূর থাকে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সে ইসলামের গন্ডী থেকে সম্পূর্ণ বহিষ্কৃত হয়ে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। স্বয়ং ইমাম বুখারী (র) কিতাবুল ঈমানে এ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেন: لا يكون هذا مُؤْمِنًا تاما ولا يكون له نور الايمان "এ ধরনের ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন নয় এবং তার জন্য ঈমানের নূরও নেই।"

ঈমান অন্তরের এক নূর বিশেষ, তা প্রজ্বলিত থাকা অবস্থায় কেউ কখনো কোনরূপ দুর্নীতি, পাপ বা অন্যায় আচরণ করতে পারে না। ঈমানের আলো নিভে যাওয়ার পরই মানুষ এরূপ দুর্নীতিমূলক কাজে লিপ্ত হতে পারে।

হাদীস অধ্যয়নকারীদের একটি নীতিগত বিষয় লক্ষ্য করার প্রয়োজন রয়েছে। যেসব হাদীসে বিশেষ মন্দ আমল এবং বদ-আখলাক সম্পর্কে বলা হয়েছে, যে এ ধরনের অপরাধে লিপ্ত হয় সে ঈমানদার নয় বা মুমিন নয় বা যেসব হাদীসে কোন কোন আখলাকে হাসানা এবং আমলে সালেহ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এ ধরনের আমল বা অভ্যাস ত্যাগকারী সে ঈমানশূন্য, দুর্ভাগা বা মুমিন নয়। সে সব হাদীসের একথা ঘোষণা করা লক্ষ্য নয় যে, উল্লিখিত অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিগণ দীন-ইসলামের সীমা বহির্ভূত, তাদের উপর ইসলামের পরিবর্তে কুফুরীর আইন প্রযোজ্য হবে এবং কিয়ামতের দিন তাদের সাথে কাফিরদের অনুরূপ আচরণ করা হবে। বরং সে ব্যক্তি এরূপ হাকিকী ঈমান থেকে মাহরুম একথা প্রকাশ করাই হল মূল লক্ষ্য। বলা বাহুল্য এ ধরনের হাকিকী ঈমান আল্লাহর নিকট প্রিয়। এটা মুসলমানদের আসল গৌরবও বটে। হাদীসে বর্ণিত অবস্থা বুঝানোর জন্য كاملا বা تاما শব্দ প্রয়োগ করার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ তাতে উদ্দেশ্য বিঘ্নিত হত। প্রত্যেক ভাষায় এ নিয়ম প্রচলিত রয়েছে, যদি কারও মধ্যে কোন বিশেষ গুণের খুব বেশী ত্রুটি লক্ষিত হয়, তাহলে তাকে অস্তিত্বহীন বা নেতিবাচক আখ্যায়িত করা হয়। দাওয়াত প্রদান বা বক্তৃতা ও ভাষণে এ রীতি প্রচলিত রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চুরি, ব্যভিচার প্রভৃতি সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেছেন যে, এসব দুষ্কর্মকারীগণ যখন তারা এ নাপাক কাজ করে তখন তারা মুমিন থাকে না। যদি তিনি বলতেন, সে সময় তাদের ঈমান কামিল থাকে না, তাহলে বাক্যের তেমন কোন ওজন বা গুরুত্ব আরোপ করা যেত না। পূর্ববর্তী একটি হাদীসে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর এমন এক মূল্যবান ইরশাদ উল্লেখিত হয়েছে যা তিনি অধিকাংশ ভাষণে বলতেন:

لا إيمان لمن لا أمانة له
ولا دين لمن لا عهد له

-যার মধ্যে আমানত নেই তার মধ্যে ঈমান নেই এবং যার প্রতিশ্রুতি নেই দীন ইসলামে তার কোন হিস্সা নেই। যদি তার পরিবর্তে তিনি বলতেন, 'যার মধ্যে আমানত নেই, সে কামিল মুমিন নয় এবং যে প্রতিশ্রুতির হেফাযতকারী নয় সে পরিপূর্ণ দীনদার নয়' তাহলে হাদীসে ব্যবহৃত বাক্যের দ্বারা যে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে তা করা যেত না। বলাবাহুল্য এসব হাদীসের আসল লক্ষ্য হল দাওয়াত বা উপদেশ প্রদান এবং এ কাজের জন্য হাদীসের বর্ণিত স্টাইল সবচেয়ে উপযোগী সঠিক এবং সুন্দর।

এসব হাদীস থেকে কুফুরীর ফতোয়া বা ফেকাহ শাস্ত্রের 'কানুনী ফায়সালা' গ্রহণ করা এবং তার ভিত্তিতে এসব অপবাদকারীদেরকে ইসলাম বহির্ভূত ঘোষণা করা (যেরূপ মুতাজিলা এবং খারিজী সম্প্রদায় করে থাকে) হাদীসের মূল লক্ষ্য এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর কালাম ও ভাষণের ধারার সাথে অনভিজ্ঞতার শামিল।' ২

টিকা ২. শেখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র)-এর সম্পর্কিত এক মন্তব্য খুবই উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, হাদীসের মধ্যে যেসব আমল ও অভ্যাসকে ঈমানের জরুরী উপাদান আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং তার শূন্যতাজনিত অবস্থা বুঝানোর জন্য لا إيمان، لا يؤمن জাতীয় শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তার নূন্যতম দরজা হল ওয়াজিব। (কিতাবুল ঈমান)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান