আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৪. অধ্যায়ঃ জানাযা

হাদীস নং: ৫৩৩২
অধ্যায়ঃ জানাযা
এমন কিছু বাক্য পাঠে উদ্বুদ্ধকরণ, যেগুলো সেই ব্যক্তি পড়ে, যার কোন আপনজন মৃত্যুবরণ করেছেন
৫৩৩২. হযরত উম্মে সালমা (র) থেকেই বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি। যে কোন বান্দা কোন মুসিবতে আক্রান্ত হয়, অতঃপর সে বলেঃإِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ اللَّهُمَّ أْجُرْنِي في مُصِيبَتِي، وأَخْلِفْ لي خَيْرًا مِنْها আল্লাহ তা‘আলা তাকে তার মুসিবতে পুরুস্কার দেন এবং তার চেয়ে উৎকৃষ্ট বদল তাকে দান করেন। তিনি বলেন, যখন আবু সালামার মৃত্যু হল, তখন আমি ভাবলাম, আবু সালামার চেয়ে উত্তম মুসলমান আর কে? এ পরিবার সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উদ্দেশ্যে হিজরত করেছে। এরপরও আমি উক্ত দু'আটি পড়লাম। ফলে আল্লাহ আমাকে তাঁর চেয়ে উত্তম মানুষ অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তার বদলস্বরূপ দান করেছেন।
(মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ ও তিরমিযী (র) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী বর্ণিত রিওয়ায়েতের ভাষায় তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যখন তোমাদের কারও উপর কোন মুসিবত এসে পড়ে তখন সে যেন বলেনঃ اللَّهمَّ عندَكَ أحتسِبُ مُصيبتي ، فأْجُرنِي بها وأَبْدِلْنِي بها خَيرًا منها অত:পর যখন আবু সালামা মুমুর্ষু অবস্থায় উপনীত হলেন তখন তিনি বললেন: اللَّهمَّ اخْلُفْنِيْ فِي أَهْلِيْ خيرًا منِّي
হে আল্লাহ আমার পর আমার পরে আমার স্থলাবর্তী আমার চাইতে উত্তম কাউকে করুন ‘’ তারপর যখন আবু সালামার মৃত্যু হল তখন উম্মু সালামা বললেনঃ إنا لله وإنا إليه راجعون ، اللهم عندَك أَحتَسِبُ مُصيبَتي ، فأَجِرْني فيها
আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই তাঁরই পানে আমরা ফিরে যাব। আমার বিপদের প্রতিদান ও সাওয়াব আমি আল্লাহরই কাছে আশা করি। সুতরাং (হে আল্লাহ্।) আমাকে এর প্রতিদান দাও।"
ইবন মাজাহও তিরমিযীর মতই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।)
كتاب الجنائز
التَّرْغِيب فِي كَلِمَات يقولهن من مَاتَ لَهُ ميت
5332- وعنها رَضِي الله عَنْهَا قَالَت سَمِعت رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يَقُول مَا من عبد تصيبه مُصِيبَة فَيَقُول إِنَّا لله وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُون اللَّهُمَّ آجرني فِي مصيبتي واخلف لي خيرا مِنْهَا إِلَّا آجره الله تَعَالَى فِي مصيبته
وأخلف لَهُ خيرا مِنْهَا
قَالَت فَلَمَّا مَاتَ أَبُو سَلمَة قلت أَي الْمُسلمين خير من أبي سَلمَة أول بَيت هَاجر إِلَى رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم ثمَّ إِنِّي قلتهَا فأخلف الله لي خيرا مِنْهُ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم

رَوَاهُ مُسلم وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ وَالتِّرْمِذِيّ وَلَفظه قَالَت قَالَ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم إِذا أصَاب أحدكُم مُصِيبَة فَلْيقل إِنَّا لله وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُون
اللَّهُمَّ عنْدك أحتسب مصيبتي فأجرني بهَا وأبدلني خيرا مِنْهَا فَلَمَّا احْتضرَ أَبُو سَلمَة قَالَ اللَّهُمَّ اخلفني فِي أَهلِي خيرا مني فَلَمَّا قبض قَالَت أم سَلمَة إِنَّا لله وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُون الْبَقَرَة 651 عِنْد الله أحتسب مصيبتي فأجرني فِيهَا
رَوَاهُ ابْن مَاجَه بِنَحْوِ التِّرْمِذِيّ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হাদীছটিতে বর্ণিত দু'আ সম্পর্কে ওয়াদা দেওয়া হয়েছে যে, কোনও বিপদ-আপদে পতিত ব্যক্তি এটি পড়লে আল্লাহ তা'আলা তাকে অবশ্যই প্রতিদান দেবেন এবং সে যা হারাল তার বদলে উত্তম স্থলাভিষিক্ত দান করবেন। বলাবাহুল্য এ ওয়াদা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পক্ষ থেকে নয়; বরং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই দিয়েছেন। কাজেই এ ওয়াদার সত্যতায় কোনও সন্দেহ নেই।

হাদীছটির বর্ণনাকারী হযরত উম্মু সালামা রাযি. বলেন, আবূ সালামার ইন্তিকালের পর এ দু'আটি আমার স্মরণ হল। আমি দু'আটি পড়লাম। কিন্তু এর শেষাংশ বলতে আমার মন প্রস্তুত হচ্ছিল না। মনে মনে ভাবছিলাম, আবূ সালামার চেয়ে ভালো আর কে হতে পারে! তিনি এমন ছিলেন, এমন ছিলেন- এই বলে তাঁর গুণাবলি কল্পনা করছিলাম। তারপরও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু এ দু'আটি পড়তে বলেছেন, তাই তাঁর প্রতি উৎসর্গিতপ্রাণ ও তাঁর কথার উপর গভীর আস্থাবতী সাহাবিয়া উম্মু সালামা রাযি. দু’আটি শেষপর্যন্ত পড়লেন। আল্লাহ তা’আলা সে দু’আ কবুল করলেন। আবূ সালামার স্থানে তিনি (স্বামী হিসেবে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেলেন।

উল্লেখ্য, কারও জীবনে এ জাতীয় ওয়াদার সুফল পাওয়ার বিষয়টি তার ঈমান ও বিশ্বাসের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখে। একটি হাদীছে কুদসীতে ইরশাদ হয়েছে-
أَنَا عِنْدَ ظَنّ عَبْدِي بِي
'আমি আমার সম্পর্কে আমার বান্দার ধারণার কাছে থাকি (অর্থাৎ আমার সম্পর্কে আমার বান্দা যেমন ধারণা করে, আমি তার প্রতি সেরকম আচরণই করে থাকি)’।
(সহীহ বুখারী: ৭৫০৫; সহীহ মুসলিম: ২৬৭৫; জামে' তিরমিযী: ২৩৮৮; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৭৬৮৩; সুনানে ইবন মাজাহ ৩৮২৩; মুসনাদে আহমাদ: ৮১৬৩; সুনানে দারিমী: ২৭৭৩; মুনাদুল বাযযার: ৮৯০৮; সহীহ ইবনে হিব্বান: ৬৩৩; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ৯৭৪)

সুতরাং এ দু'আটি পড়ার সময় মনোযোগ যত গভীর ও বিশ্বাস যত দৃঢ় থাকবে, সুফল পাওয়ার সম্ভাবনাও ততো বেশি থাকবে।

হাদীছটিতে যে-কোনও মসিবতের বেলায়ই এ দু'আটি পড়তে বলা হয়েছে। সে মসিবত শারীরিক হোক, আর্থিক হোক কিংবা হোক মান-সম্মান সম্পর্কিত। এরূপ যে-কোনও বিপদে এ দু'আটি পড়া উচিত। এমনিভাবে সে মসিবত যদি হয় কারও প্রাণবিয়োগ, যেমন পিতা-মাতা, সন্তান, স্বামী, স্ত্রী, ভাইবোন বা যে-কোনও প্রিয়জনের মৃত্যু, তবে মুমিন ব্যক্তিকে গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে অবশ্যই এ দু'আটি পড়তে হবে। হযরত উম্মু সালামা রাযি. এ দু'আটি পড়ে দুনিয়াতেই তার সুফল পেয়েছিলেন। আমরাও যদি তাঁর মতো করে বিপদ-আপদে এ দু'আটি পড়ি, তবে অবশ্যই আমরাও এর সুফল পাব।

এ দু'আটি পড়ার দাবি বিপদে নিজেকে স্থির রাখা ও ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া। কেউ মুখে দু'আটি পড়ল কিন্তু মনে সবর নেই, আচার-আচরণে স্থিরতা নেই এবং নেই আল্লাহর ফয়সালায় আত্মসমর্পণ ও আদব-কায়দার লেহাজ, তবে সে দু'আপাঠ অসার কথামাত্র হয়ে যায়। এরূপ ব্যক্তি দু'আর কী সুফল পেতে পারে? মনে রাখতে হবে, কুরআন-সুন্নাহর দু'আ গভীর অর্থ ও ভাব বহন করে। তার সম্পর্ক বিশ্বাস ও কর্মের সঙ্গে। দু'আর সঙ্গে জীবনপগঠনেরও সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃত অর্থে ইসলামী দু’আসমূহ জীবনগঠনেরই মূলমন্ত্র। তাই দু'আপাঠ দ্বারা জীবনগঠনে অনুপ্রাণিত হওয়া ও আচার-আচরণ পরিশীলিত করে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রাখা অতীব জরুরি। সুন্দর সুফল পাওয়ার বিষয়টা এরই মধ্যে নিহিত। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. যে-কোনও মসিবত প্রকৃত অর্থে বান্দার জন্য আল্লাহ তা'আলার নি'আমত, যেহেতু তা দ্বারা আল্লাহ অভিমুখী হওয়া ও দু'আয় রত হওয়ার সুযোগ মেলে এবং লাভ হয় অশেষ নেকী।

খ. প্রিয়জনকে হারানো ছাড়াও যে-কোনও মসিবতে হাদীছে বর্ণিত দু'আটি পড়তে হবে।

গ. যে-কোনও দু'আ পড়ার সময় সে দু'আ সম্পর্কে হাদীছে যে ওয়াদা আছে তার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা অতীব জরুরি। সে বিশ্বাসের বদৌলতেই হযরত উম্মু সালামা রাযি. দু'আটির সুফল লাভ করেছিলেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব - হাদীস নং ৫৩৩২ | মুসলিম বাংলা