আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৩. অধ্যায়ঃ তাওবা ও যুহদ

হাদীস নং: ৪৯৯৯
অধ্যায়ঃ তাওবা ও যুহদ
দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি ও দুনিয়ার স্বল্পতায় তুষ্ট থাকার জন্য উৎসাহ দান এবং দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা ও তজ্জন্য প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ব্যাপারে সতর্কীকরণ এবং পানাহার ও লেবাস পোষাক ইত্যাদিতে নবী (ﷺ)-এর জীবন-যাপন পদ্ধতি সম্পর্কিত কতিপয় হাদীস
৪৯৯৯. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) একটি চাটাইয়ের উপর ঘুমিয়ে ছিলেন। অতঃপর যখন ঘুম থেকে উঠলেন, তখন তাঁর শরীরের একপাশে চাটাইয়ের দাগ পড়ে ছিল। আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (ﷺ)। যদি আমরা আপনার জন্য একটি নরম বিছানা তৈরি করি, (তবে কি আপনার আপত্তি আছে)? উত্তরে তিনি বলেন, আমার এবং দুনিয়ার কী-ই বা সম্পর্ক? আমার এবং দুনিয়ার উদাহরণ হচ্ছে একান্তই একজন আরোহীর মত, যে কোন গাছের নিচে অবতরণ করল। তারপর তা ত্যাগ করে চলে গেল।
(ইবন মাজাহ ও তিরমিযী (র) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী (র) বলেন: হাদীসটি হাসান সহীহ।
তাবারানী ও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তবে তাঁর বর্ণিত রিওয়ায়েতের ভাষা এরকম। তিনি (আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রা) বলেন, একদা আমি নবী (ﷺ)-এর কাছে গেলাম। তখন তিনি হাম্মাম খানার কামরার মত একটি (ছোট্ট) কামরায় চাটাইয়ের উপর নিদ্রিত ছিলেন। ফলে তাঁর পশ্চিমদেশে চাটাইয়ের দাগ পড়ে গিয়েছিল। এ দেখে আমি কেঁদে ফেললাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবদুল্লাহ! তুমি কাঁদছ কেন? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কিসরা ও কায়সার খায, দীবাজ ও হারীর'* পায়ে মাড়ায়। অথচ আপনি এ চাটাইয়ের উপর শুয়ে আছেন, যার ফলে আপনার পার্শ্বদেশে দাগ পড়ে গেছে। তিনি বললেন, হে আবদুল্লাহ। এজন্য তুমি কেঁদো না। কেননা, তাদের জন্য কেবল এ দুনিয়াই, আর আমাদের জন্য রয়েছে আখিরাত। দুনিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক তো অন্য কিছু নয়। আমার এবং দুনিয়ার দৃষ্টান্ত এমন একজন আরোহীর মত। যে কোন বৃক্ষের নিচে অবতরণ করল। তারপর তা ছেড়ে প্রস্থান করল। (আবূ শায়খ 'কিতাবুস-সাওয়াব'-এ তাবারানীর রিওয়ায়েতের মত একটি রিওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন।
হাদীসটিতে উক্ত كانها بيت تمام বাক্যের জোর অর্থ হচ্ছে গোসলখানার মত সেই কামরাটিতে ছিল কষ্টময় ও গরম।)

*খায- যে কাপড়ের টানা খায নামক সামুদ্রিক প্রাণীর পশম ও পড়েন রেশম থেকে তৈরী হয়।
দীবাজ- যে কাপড়ের টানা ও পড়েন উভয়টি রেশমের তৈরী। অথবা অন্য কোন বুটিদার কাপড়।
হারীর- পাকানো রেশম থেকে তৈরী কাপড়, অথবা যার পড়েন রেশমের তৈরী।
كتاب التوبة والزهد
التَّرْغِيب فِي الزّهْد فِي الدُّنْيَا والاكتفاء مِنْهَا بِالْقَلِيلِ والترهيب من حبها وَالتَّكَاثُر فِيهَا والتنافس وَبَعض مَا جَاءَ فِي عَيْش النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فِي المأكل والملبس وَالْمشْرَب وَنَحْو ذَلِك
4999- وَعَن عبد الله بن مَسْعُود رَضِي الله عَنهُ قَالَ نَام رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم على حَصِير فَقَامَ وَقد أثر فِي جنبه
قُلْنَا يَا رَسُول الله لَو اتخذنا لَك وطاء فَقَالَ مَا لي وللدنيا مَا أَنا فِي الدُّنْيَا إِلَّا كراكب استظل تَحت شَجَرَة ثمَّ رَاح وَتركهَا

رَوَاهُ ابْن مَاجَه وَالتِّرْمِذِيّ وَقَالَ حَدِيث حسن صَحِيح
وَالطَّبَرَانِيّ وَلَفظه قَالَ دخلت على النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وَهُوَ فِي غرفَة كَأَنَّهَا بَيت حمام وَهُوَ نَائِم على حَصِير قد أثر بجنبه فَبَكَيْت فَقَالَ مَا يبكيك يَا عبد الله قلت يَا رَسُول الله كسْرَى وَقَيْصَر يطؤون على الْخَزّ والديباج وَالْحَرِير وَأَنت نَائِم على هَذَا الْحَصِير قد أثر بجنبك قَالَ فَلَا تبك يَا عبد الله فَإِن لَهُم الدُّنْيَا وَلنَا الْآخِرَة وَمَا أَنا وَالدُّنْيَا وَمَا مثلي وَمثل الدُّنْيَا إِلَّا كَمثل رَاكب نزل تَحت شَجَرَة ثمَّ سَار وَتركهَا
وَرَوَاهُ أَبُو الشَّيْخ فِي كتاب الثَّوَاب بِنَحْوِ الطَّبَرَانِيّ
قَوْله كَأَنَّهَا بَيت حمام هُوَ بتَشْديد الْمِيم وَمَعْنَاهُ أَن فِيهَا من الْحر وَالْكرب كَمَا فِي بَيت الْحمام

হাদীসের ব্যাখ্যা:

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দারিদ্র্য ভালোবাসতেন। তিনি স্বেচ্ছায় দারিদ্র্যের জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর খাওয়া-পরা এবং জীবনাচারের সবকিছুই ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। খেজুর পাতার চাটাইয়ে শুইতেন। তাতে তাঁর শরীরে চাটাইয়ের বুননের ছাপ পড়ে যেত, যেমন এ হাদীছে বলা হয়েছে। কখনও তিনি খাটেও শুতেন। কিন্তু তা কেমন খাট? সে খাটের ছাউনী ছিল রশির। তাঁর শরীরে সে রশির দাগ বসে যেত। তাঁর পবিত্র শরীর ছিল অত্যন্ত কোমল। হযরত আনাস রাযি. বলেন-
ما مَسسْتُ شَيْئًا قط را وَلا حَرِيرًا ألين مِنْ كفْ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতের চেয়ে বেশি কোমল কোনওকিছু কখনও স্পর্শ করিনি। না রেশম, না অন্যকিছু।

মানুষ হাত দিয়ে কাজকর্ম করে থাকে। তাই অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় হাত বেশি শক্ত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সে হাতই যখন এমন কোমল ছিল, তখন তাঁর পবিত্র দেহের অন্যান্য অঙ্গ কেমন কোমল ছিল? এমন কোমল শরীরের জন্য তো কোমল বিছানাই দরকার। অথচ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যবহার করতেন শক্ত বিছানা। শরীরের আরামের প্রতি তাঁর কোনও খেয়াল ছিল না। কিন্তু সাহাবীগণ তো তাঁকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। তাঁর শরীরে চাটাইয়ের দাগ কিভাবে তারা মেনে নেবেন? তিনি নিজে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করলেও তাদের পক্ষে তা ছিল অসহনীয়। তাই তারা আরয করলেন-
يا رسول الله، لو اتخذنا لك وطاء (ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা যদি আপনার জন্য একটা বিছানা বানিয়ে দিতাম।)। অর্থাৎ নরম বিছানা বানিয়ে দিতাম, তাতে আপনার একটু আরামবোধ হতো! অপর এক বর্ণনায় আছে-
يَا رَسُولَ اللَّهِ لَوْ كُنتَ أذنتَنَا فَفَرَشنَا لَكَ عَلَيْهِ شَيْئًا بَقِيكَ مِنْهُ
“ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যদি আমাদের অনুমতি দিতেন তবে আপনার জন্য এমন কিছু বিছাতাম, যা আপনাকে এ কষ্ট থেকে বাঁচাত।"

এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- ما لي وللدنيا؟ (দুনিয়ার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?)। অর্থাৎ দুনিয়ার প্রতি আমার কোনও মহব্বত ও ভালোবাসা নেই। দুনিয়াও নয় আমার সঙ্গী। কাজেই আমি দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হব কী কারণে? অথবা এর অর্থ- দুনিয়া ও আমার মধ্যে মিলটা কোথায় যে, আমি তাতে লিপ্ত হয়ে পড়ব? এর সাদামাটা অর্থ এমনও হতে পারে যে, দুনিয়া দিয়ে আমার কোনই প্রয়োজন নেই। কিন্তু তিনি দুনিয়ায় বাস তো করতেন। সে হিসেবে একটা সম্পর্ক ছিলই। তবে সে সম্পর্ক আমাদের মত নয়। তিনি সে সম্পর্কের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন-
ما أنا في الدنيا إلا كراكب استظل تحت شجرة ثم راح وتركها (দুনিয়ায় তো আমি একজন মুসাফিরস্বরূপ, যে কোনও গাছের নিচে ছায়া গ্রহণ করে, তারপর তা ছেড়ে চলে যায়)। অর্থাৎ দুনিয়া স্থায়ীভাবে থাকার জায়গা নয়। এটা আরামের ঠিকানা নয়। এটা তো অতিক্রম করে যাওয়ার নিবাস। এর বাসিন্দা অবিরত এ ঠিকানা পার হয়ে যাচ্ছে। সে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে আখিরাতের দিকে। সুতরাং এ দুনিয়ায় মানুষ হল একজন মুসাফিরের মত। সে পথিমধ্যে কোনও গাছতলায় বিশ্রাম নেয়। রোদের তাপ থেকে বাঁচার জন্য গাছের ছায়ার আশ্রয় গ্রহণ করে। তারপর রোদের তাপ কিছুটা কমে আসলে আবার যাত্রা শুরু করে এবং ক্ষণিকের সে বিশ্রামস্থল ছেড়ে চলে যায়। তো এই যখন দুনিয়ার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের অবস্থা, তখন এই দুনিয়ার আরাম-আয়েশে পড়ে যাওয়া আমার পক্ষে সাজে কি?

প্রকাশ থাকে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথা বলার উদ্দেশ্য দুনিয়া ত্যাগ করা নয়; বরং দুনিয়ার ভালোবাসা ত্যাগ করা। ক্ষণিকের জন্য হলেও গাছের যে ছায়ায় অবস্থান করার প্রয়োজন হয়, সে ছায়াকে তো সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করা চলে না। বরং ছায়া সন্ধান করতে হয়। তা মিলে যাওয়ার পর হেফাজতও করতে হয়। অর্থাৎ কোনওভাবে যাতে তা নষ্ট না হয় এবং বিশ্রামের উপযুক্ত থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হয়। ঠিক তেমনি দুনিয়া আমাদের পক্ষে মুসাফিরখানা হলেও কিছুক্ষণের জন্য উপকারী তো বটে। তাই কিছুক্ষণ যাতে স্বস্তিতে ও নিরুপদ্রবে থাকা যায় সেজন্য একটা স্থান অবশ্যই চাই।

কাজেই দুনিয়ার প্রয়োজনীয় আসবাব-উপকরণ অবশ্যই অর্জন করতে হবে। অর্জিত হওয়ার পর যাতে অযথা নষ্ট না হয় সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। তবে সর্বাবস্থায় জীবনের আসল লক্ষ্যবস্তু হবে আখিরাতের স্থায়ী ঠিকানা। দুনিয়ার আসবাব-উপকরণের সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহার এমনভাবে করতে হবে, যাতে এর দ্বারা সে আসল ঠিকানা হাতছাড়া না হয়; বরং তা অর্জনের পক্ষে সহায়ক হয়।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. এ হাদীছ আমাদেরকে দুনিয়ার প্রেম-ভালোবাসায় লিপ্ত না হওয়ার উৎসাহ যোগায়।

খ. দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতায় লিপ্ত হওয়া প্রকৃত নবীপ্রেমিকের পক্ষে সাজে না।

গ. দুনিয়ায় যতদিন থাকা হয়, ততদিন নিজেকে একজন মুসাফিরের বেশি কিছু ভাবা উচিত নয়।

ঘ. দুনিয়ার এ অস্থায়ী ঠিকানা যখন গাছের ছায়াতুল্য, তখন একে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা চলে না। ক্ষণিকের জন্য হলেও ঈমান ও ইজ্জত নিয়ে থাকার একটা ব্যবস্থা করা চাই।

ঙ. দুনিয়াকে অবশ্যই গাছের ছায়াতুল্য গণ্য করব, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে এর আসবাব-উপকরণ নষ্ট করব না।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান