لَّيْسَ عَلَى الضُّعَفَاءِ وَلَا عَلَى الْمَرْضَىٰ وَلَا عَلَى الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ مَا يُنفِقُونَ حَرَجٌ إِذَا نَصَحُوا لِلَّهِ وَرَسُولِهِ ۚ مَا عَلَى الْمُحْسِنِينَ مِن سَبِيلٍ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
অনুবাদ
দুর্বল লোকদের (জিহাদে না যাওয়াতে) কোনও গুনাহ নেই এবং পীড়িত ও সেই সকল লোকেরও নয়, যাদের কাছে খরচ করার মত কিছু নেই, যদি তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি অকৃত্রিম থাকে। সৎ লোকদের সম্পর্কে কোনও অভিযোগ নেই। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
সুরা আত তাওবাহ্, আয়াত নং: ৯১
তাফসীর
১. যাদের ওপর কোনো গুনাহ বা অপরাধ নেই (প্রকৃত ওযরপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ):
শারীরিক ও আর্থিক অক্ষম ব্যক্তি: রুগ্ন, অন্ধ, শারীরিক দুর্বলতা সম্পন্ন ব্যক্তি এবং যাদের যুদ্ধের প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার বহনের সামর্থ্য নেই, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অন্তরে একনিষ্ঠ আনুগত্য ও নিষ্ঠা বজায় রাখলে তাদের ওপর কোনো গুনাহ বা অভিযোগ নেই।
বাহন না পেয়ে ক্রন্দনরত সাহাবীগণ: সুদীর্ঘ সফর ও তীব্র গরমের মধ্যে জিহাদে অংশগ্রহণের ব্যাকুলতা থাকা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে বাহন না পেয়ে যারা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গিয়েছিলেন, আল্লাহ তাঁদের সম্পূর্ণ জওয়াবদিহিমুক্ত ঘোষণা করেছেন।
সাহাবীদের সহায়তার বিবরণ: পরবর্তীতে মহানবী ﷺ-এর কাছে ৬টি উট এলে তা তাঁদের দেওয়া হয় এবং হযরত উসমান (রাযি.) নিজ খরচে ৩ জনের বাহনের সংস্থান করেন। তবে যাদের জন্য শেষ পর্যন্তও কোনো বাহনের ব্যবস্থা হয়নি, তারা বাধ্য হয়েই বিরত থাকেন এবং আল্লাহ তাঁদের অপারকতা কবুল করে নেন।
২. যাদের ওপর অপরাধ ও শাস্তি ধার্য করা হয়েছে (কপট ও অজুহাতকারী):
সামর্থ্যবান মুনাফিক ও শৈথিল্যকারী: ধন-সম্পদ, সুস্থতা ও সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যারা নানা বাহানায় ঘরে বসে থাকার অনুমতি চেয়েছিল এবং নারীদের মতো পেছনে রয়ে যাওয়াকে পছন্দ করে নিয়েছিল, অপরাধ ও শাস্তি শুধু তাদের ওপরই বর্তায়।
কপটতার পরিণতি: চরম অসহযোগিতা, কুফরী ও শৈথিল্যের কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে মোহর এঁটে দিয়েছেন, ফলে তারা পাপ-পুণ্য ও কল্যাণের মূল মর্ম অনুধাবন করতে পারে না।
৩. আয়াতের মূল নীতি:
মানুষ সাধ্যমতো চেষ্টার পর যদি নিষ্ঠার সাথে বাস্তবেও অপারক হয়ে পড়ে, তবে আল্লাহ তাআলা তাঁর ক্ষমা ও মেহেরবানিতে তা মার্জনা করে দেন। কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বাহানা ও অলসতা দেখানো কঠোর অপরাধ।
তাফসীরে মাআ'রিফুল কুরআন
حَدَّثَنَا مَطَرُ بْنُ الْفَضْلِ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ، حَدَّثَنَا الْعَوَّامُ، حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ أَبُو إِسْمَاعِيلَ السَّكْسَكِيُّ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا بُرْدَةَ، وَاصْطَحَبَ، هُوَ وَيَزِيدُ بْنُ أَبِي كَبْشَةَ فِي سَفَرٍ، فَكَانَ يَزِيدُ يَصُومُ فِي السَّفَرِ فَقَالَ لَهُ أَبُو بُرْدَةَ سَمِعْتُ أَبَا مُوسَى مِرَارًا يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ أَوْ سَافَرَ، كُتِبَ لَهُ مِثْلُ مَا كَانَ يَعْمَلُ مُقِيمًا صَحِيحًا ".
অনুবাদ
হযরত আবু বুরদা ইবনে আবু মুসা (রাযি.) থেকে বর্ণিত যে, তিনি এবং ইয়াযিদ ইবনে আবু কাবশা (রাযি.) সফরে ছিলেন। আর ইয়াযিদ (রাযি.) মুসাফির অবস্থায় রোযা রাখতেন। আবু বুরদা (রাযি.) তাঁকে বললেন, আমি আবু মুসা (আশআরী) (রাযি.)- কে একাধিকবার বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যখন বান্দা রোগাক্রান্ত হয় কিংবা সফর করে, তখন তার জন্য তা-ই লিখিত হয়, যা সে মুকীম অবস্থায় বা সুস্থ অবস্থায় আমল করত।
সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২৯৯৬
ব্যাখ্যা
অক্ষমতার সময়েও নিয়মিত আমলের পূর্ণ সাওয়াব: কোনো ব্যক্তি সুস্থ ও মুকীম (স্বাভাবিকভাবে নিজ এলাকায় অবস্থানরত) থাকা অবস্থায় যেসব নেক আমলে অভ্যস্ত থাকে, পরবর্তীতে অসুস্থতা কিংবা সফরের কারণে তা পালন করতে না পারলেও আল্লাহ তা'আলা তার সাওয়াব বন্ধ করেন না। বান্দার এই ওযরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেন এবং অপারগতার কারণে আমল করতে না পারা সত্ত্বেও সুস্থ বা বাড়িতে থাকা অবস্থায় আমল করলে যে সাওয়াব পাওয়া যেত, নিজ দয়ায় ঠিক সমপরিমাণ সাওয়াব আমলনামায় লিখে দেন। যেমন—সুস্থ অবস্থায় জামা‘আতে নামায পড়ে সাতাশ গুণ সাওয়াব পাওয়ার অভ্যাস থাকলে, অসুস্থতাজনিত কারণে ঘরে একাকী নামায পড়লেও তাকে জামা‘আতে নামাযের সমপরিমাণ সাওয়াব দেওয়া হয়।
সুস্থতা ও অবসরের মূল্যায়ন: সুস্থ-সবল থাকা এবং সফরে বের হওয়ার প্রয়োজন ছাড়া বাড়িতে শান্তিতে থাকতে পারা আল্লাহর অনেক বড় নি'আমত। রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মতকে সুস্থ ও মুকীম অবস্থায় নেক আমলে যত্নবান হতে উৎসাহিত করেছেন, যাতে পরবর্তীতে সফর বা অসুস্থতার সময়েও তারা সাওয়াব থেকে বঞ্চিত না হয়।
গাফিলতি ও সুযোগ হারানোর ক্ষতি: যে ব্যক্তি সুস্থ ও মুকীম অবস্থায় সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ইবাদত-বন্দেগী না করে অলসতা করে, সে চরম দুর্ভাগা। কারণ সে সুস্থ অবস্থায়ও নেক কাজ থেকে বঞ্চিত রইল এবং পরবর্তীতে অসুস্থ বা সফরে অক্ষম হয়ে পড়ার সময়েও সাওয়াব পাওয়ার সৌভাগ্য হারিয়ে ফেলল।
সঞ্চয়ের মূলনীতি: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে 'উমর (রাযি.)-এর বর্ণিত হাদীসের উপদেশ অনুযায়ী, সুস্থ থাকাকালে অসুস্থতাকালীন সময়ের জন্য এবং জীবিত থাকাকালে মৃত্যুপরবর্তী অনন্ত জীবনের জন্য বেশি বেশি নেক আমল সঞ্চয় করে নেওয়া উচিত।
۞ اَللّٰهُمَّ اِنِّيْ اَعُوْذُبِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحُزْنِ وَ اَعُوْذُبِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَ الْكَسَلِ وَ اَعُوْذُبِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَ الْبُخْلِ وَ اَعُوْذُبِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَ قَهْرِ الرِّجَالِ
উচ্চারণ
আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুযনি, ওয়া আউযুবিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়া আউযুবিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখলি ওয়া আউযুবিকা মিন গালাবাতিত দাইনি ওয়া কাহরির রিজালি।
অনুবাদ
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই চিন্তা ও পেরেশানী থেকে এবং আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই অপারগতা ও অলসতা থেকে এবং আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে এবং আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই ঋণের বোঝা ও মানুষের ক্ষোভ থেকে।
সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং: ১৫৫৫
ফজিলত / আমল
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাযি.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে আনসারী একজন লোককে দেখতে পেলেন, যার নাম আবূ উমামা। রাসূল ﷺ তাকে বললেন, আবূ উমামা! ব্যাপার কী, নামাযের সময় ছাড়াও তোমাকে মসজিদে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে? আবূ উমামা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! অনেক ঋণ এবং দুনিয়ার চিন্তা আমাকে গ্রাস করে রেখেছে। তখন রাসূল ﷺ তাকে বললেন, আমি কি তোমাকে এমন কিছু কালেমা শিখিয়ে দেব, যেগুলো বললে আল্লাহ তোমার চিন্তাকে দূর করে দেবেন এবং তোমার ঋণগুলো পরিশোধ করে দেবেন। তিনি বলেন, জি হ্যাঁ ইয়া রাসুলাল্লাহ! অবশ্যই বলুন, তখন রাসূল ﷺ তাকে উপরোক্ত দু‘আটি শিখিয়ে দেন এবং তা সকাল-সন্ধ্যায় পড়তে বলেন। আবূ উমামা বলেন, আমি রাসূল ﷺ এর এ দু‘আটি পড়তে লাগলাম। ফলে আল্লাহ আমার চিন্তা দূর করে দিলেন এবং আমার ঋণগুলোও আদায় করে দিলেন।
প্রশ্ন
তীব্র বৃষ্টি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো শরযী ওযরের কারণে মসজিদে উপস্থিত হতে না পারলে, ঘরে বা অফিসে নামায আদায় করলে কি জামা‘আতের পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে?
উত্তর
জী, কোনো ব্যক্তি যদি নিয়মিত মসজিদে গিয়ে জামা‘আতে নামায আদায় করে থাকেন; কিন্তু অসুস্থতা, তীব্র বৃষ্টি বা অন্য কোনো শরযী ওযরের কারণে কোনোদিন মসজিদে উপস্থিত হতে না পারেন, তাহলে ঘরে বা অফিসে নামায আদায় করলেও ইনশাআল্লাহ তিনি মসজিদে উপস্থিত হয়ে জামা‘আতে নামায আদায় করার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবেন। এ ক্ষেত্রে বাসা বা অফিসে সুযোগ থাকলে জামা‘আতের সঙ্গে নামায আদায় করবেন। আর সুযোগ না থাকলে একাকী আদায় করবেন।
শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ওযর বা বাধ্যবাধকতার কারণে বান্দা স্বাভাবিক আমল থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হলে, খাঁটি নিয়ত ও অভ্যাসের কারণে সে মূল আমলকারীর সমপরিমাণ সওয়াবের অধিকারী হয়।
উত্তর দিয়েছেনঃ আরিফুর রহমান
মুফতী, ফাতাওয়া বিভাগ, মুসলিম বাংলা
লেখক ও গবেষক, হাদীস বিভাগ, মুসলিম বাংলা
বিবরণ
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাবুক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করে মদীনার নিকটবর্তী হলেন, তখন তিনি বললেন, মদীনাতে এমন সম্প্রদায় রয়েছে যারা কোন দূরপথ ভ্রমন করেনি, এবং কোন উপত্যকাও অতিক্রম করেনি তবুও তারা তোমাদের সাথে (সাওয়াবে) শরীক রয়েছে। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তারা তো মদীনায়-ই অবস্থান করছিল। তখন তিনি বললেন, তারা মদীনায়ই রয়ে গেছে, তবে ওযর তাদের আটকে রেখেছিল।
সহীহ বুখারি, হাদীস নং: ৬৬৮৯
মুহাম্মাদ ত্বহা হুসাইন
বিস্তারিত
তাবুক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট: তাবুক যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত সাহাবীদের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, মদীনায় অবস্থানরত কিছু মানুষ সশরীরে না এসেও প্রতিটি পথ, প্রান্তর ও টিলায় সাহাবীদের সাথে ছিল এবং তারা জিহাদের পূর্ণ সওয়াব পাবে। কারণ জিহাদে অংশ নেওয়ার খাঁটি নিয়ত থাকা সত্ত্বেও অসুস্থতা বা শরয়ী ওযরই তাদের আটকে রেখেছিল।
বিছানায় মৃত্যুর পরও শাহাদাতের মর্যাদা: যে ব্যক্তি একনিষ্ঠ মনে আল্লাহর কাছে শাহাদাত প্রার্থনা করে, ওযর বা স্বাভাবিক কারণে সে নিজ বিছানায় মৃত্যুবরণ করলেও আল্লাহ তাআলা তাকে শহীদের পূর্ণ মর্যাদা দান করেন।
সমপরিমাণ সওয়াব লাভ: সশরীরে কষ্ট-সাধনা করে আমলকারীদের মতোই সওয়াব সেই ব্যক্তিও পেয়ে যায়, যে ওযরের কারণে কাজ করতে না পারলেও অন্তরে পূর্ণ ইখলাসের সাথে নিয়ত রেখেছিল।
মূল শিক্ষা: কোনো বাধা বা ওযরের কারণে ভালো কাজ সশরীরে সম্পন্ন করতে না পারলেও বিশুদ্ধ নিয়তের (ইখলাস) গুণে আল্লাহ তাআলা আমল করার পূর্ণ সওয়াব দিয়ে দেন; তাই সর্বদা পরিশুদ্ধ নিয়ত রাখা আবশ্যক।