মুসিবতে কল্যাণ
مَاۤ اَصَابَکَ مِنۡ حَسَنَۃٍ فَمِنَ اللّٰہِ ۫ وَمَاۤ اَصَابَکَ مِنۡ سَیِّئَۃٍ فَمِنۡ نَّفۡسِکَ ؕ وَاَرۡسَلۡنٰکَ لِلنَّاسِ رَسُوۡلًا ؕ وَکَفٰی بِاللّٰہِ شَہِیۡدًا
অনুবাদ
তোমার যা-কিছু কল্যাণ লাভ হয়, তা কেবল আল্লাহরই পক্ষ হতে, আর তোমার যা-কিছু অকল্যাণ ঘটে, তা তোমার নিজেরই কারণে। এবং (হে নবী!) আমি তোমাকে মানুষের কাছে রাসূল করে পাঠিয়েছি। আর (এ বিষয়ের) সাক্ষীরূপে আল্লাহই যথেষ্ট।
সূরা আন নিসা, আয়াত নং: ৭৯
তাফসীর
এ আয়াতসমূহে দুটি সত্য তুলে ধরা হয়েছে।
(এক) এ জগতে যা-কিছু হয়, তা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও হুকুমেই হয়। কারও কোন উপকার লাভ হলে তাও আল্লাহর হুকুমেই হয় এবং কারও কোন ক্ষতি হলে তাও আল্লাহর হুকুমেই হয়।
(দুই) দ্বিতীয়ত জানানো হয়েছে, কারও কোন উপকার বা ক্ষতির হুকুম আল্লাহ তাআলা কখন দেন ও কিসের ভিত্তিতে দেন। এ সম্পর্কে আয়াতে বলা হয়েছে, কারও কোন উপকার ও কল্যাণ লাভের যে ব্যাপারটা, তা কেবলই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ।
কেননা মানুষের কোনো কল্যাণই তার নিজস্ব প্রাপ্য নয়; সবই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও তাওফীকের ফল। আর কোনো অকল্যাণ দেখা দিলে তা মূলত মানুষের নিজের কর্মফল। তাই লাভ-লোকসান বা বিপদ-আপদের জন্য অন্যকে দায়ী না করে নিজের আমল সংশোধন, তাওবা এবং আল্লাহর দিকেই ফিরে আসা উচিত।
তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানীঃ সূরা আন নিসা ( আয়াত নং - ৭৯ )
আরবি মূল পাঠ
عن أبي هريرة – رضي الله عنه – قَالَ: قَالَ رَسُولُ الله – صلى الله عليه وسلم: «مَنْ يُرِدِ اللهُ بِهِ خَيْرًا يُصِبْ مِنْهُ».
অনুবাদ
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা যার কল্যাণ চান তাকে বালা–মুসিবত দেন।
সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৫৬৪৫
ব্যাখ্যা
এ হাদীছে প্রত্যেক মু'মিনের জন্য অনেক বড় সুসংবাদ রয়েছে। কেননা মানুষের সাধারণত কোনও না কোনও দুঃখ-কষ্ট ও বালা-মসিবত থাকেই। থাকে শারীরিক রোগ- ব্যাধি ও মানসিক কষ্ট। দেখা দেয় জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি ও নানারকম পেরেশানি। এ হাদীছ জানাচ্ছে, এসবের ভেতর কোনও না কোনও কল্যাণ নিহিত থাকে। বান্দাকে সেইসব কল্যাণ দেওয়ার জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এসব কষ্ট ও পেরেশানী দিয়ে থাকেন।
সুতরাং কোন মু'মিনই আল্লাহ তা'আলার দিক থেকে কল্যাণকামনার বাইরে নয়। যে-কেউ সবর করবে, সেই আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ লাভ করবে। কল্যাণ দুনিয়াবীও হতে পারে, পরকালীনও হতে পারে। দুনিয়াবী কল্যাণ তো এই যে, বিপদ- আপদ হলে মু'মিন আল্লাহ তা'আলার অভিমুখী হয়। ফলে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সে সাহায্য লাভ করে। আল্লাহ তা'আলা তার মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করেন, রোগ- ব্যাধি থেকে আরোগ্য দান করেন, তাকে নানামুখী অভিজ্ঞতা দান করেন, তার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, ফলে মানুষ তার সাহায্যে এগিয়ে আসে, তার প্রতি সহমর্মী হয় কিংবা ফিরিশতা দিয়ে তাকে সাহায্য করেন ও তার প্রতি রহমত বর্ষণ করেন।
মোটকথা ইহকালীন কোনও না কোনও লাভ তার হয়ই। আর পরকালীন লাভ তো স্পষ্ট, যেমন পেছনের হাদীছগুলো দ্বারা জানা গেছে যে, এর দ্বারা গুনাহ মাফ হয় ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
۞ اَللّٰهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُبِكَ مِنْ جَهْدِالْبَلَاءِ وَدَرْكِ الشَّقَاءِ وَسُوْءِ الْقَضَاءِ و شَمَاتَةِ الْاَعْدَاءِ
উচ্চারণ
আল্লাহুম্মা ইন্নী আ‘ঊযুবিকা মিন জাহদিল বালা-ই ওয়া দারকিশ শাক্বা-ই ওয়া সূ-ইল ক্বদা-ই ওয়া শামাতাতিল আ’দা।
অনুবাদ
হে আল্লাহ, অবশ্যই আমি তোমার নিকট কঠিন দুরাবস্থা, দুর্ভাগ্যের নাগাল, মন্দভাগ্য এবং দুশমনের হাসি থেকে রক্ষা কামনা করছি।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭০৭
ফজিলত ও আমল
রাসুলুল্লাহ সা. তার সাহাবীদের বলতেন, তোমরা ভয়াবহ বিপদ, হতভাগ্যের অতল গহ্বর, মন্দ তাকদীর এবং শত্রুর আনন্দ প্রকাশ থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর। (অর্থাৎ উক্ত দু'আ পড়তে বলতেন।)
প্রশ্ন
আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, বারবার বিপদ আসার কারণ কি? বিপদ দূর করার জন্য কি আমল করবো?
উত্তর
জীবনে বারবার বিপদ আসা বা কষ্টের সম্মুখীন হওয়াটা মানুষের জন্য খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কুরআন ও হাদিসের আলোকে বারবার বিপদ আসার কিছু কারণ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ঈমানের পরীক্ষা
২. গুনাহ মাফ ও মাকাম বৃদ্ধি
৩. আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনা
৪. গুনাহের পরিণাম
বিপদ থেকে মুক্তির জন্য ৫টি শক্তিশালী আমল:
১. সবর বা ধৈর্য ধরা
২. বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
৩. বেশি বেশি দু'আ ইউনুস পাঠ করা
৪. আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল (ভরসা) করা
৫. নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া
উত্তর দিয়েছেনঃ আব্দুল কাইয়ুম মুফতী ও মুহাদ্দিস, দারুল কুরআন আল ইসলামিয়া মাদ্রাসা মুহাম্মদপুর, ঢাকা
শিরোনাম
বিবরণ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“মুমিনের অবস্থা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। আর এ বৈশিষ্ট্য মুমিন ছাড়া অন্য কারও নেই।
সে সুখ-শান্তি লাভ করলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এটি তার জন্য কল্যাণকর।
আর দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্য ধারণ করে এটিও তার জন্য কল্যাণকর।”
সহীহ মুসলিম হাদীস নং: ২৯৯৯
শিরোনাম
মুফতী হাসান সিদ্দীকুর রহমান
বিস্তারিত
মানুষের গোনাহ ও আল্লাহর নাফরমানিই একের পর এক বালা-মুসিবতের অন্যতম কারণ। তবে আল্লাহ তাআলা পরম দয়ালু; তিনি সব গোনাহের শাস্তি দেন না, বরং অধিকাংশই ক্ষমা করে দেন। আর যে শাস্তি দুনিয়াতে দেন, তাও পূর্ণ নয়; সামান্য অংশমাত্র। তাই মুসিবত নাযিল হলে আত্মসমালোচনা করে গোনাহ বর্জন, তাওবা এবং আল্লাহর আনুগত্যে ফিরে আসাই মুমিনের কর্তব্য।
মুমিনদের ওপর বিপদ-মুসিবত আসে আর কাফিররা অনেক সময় সুখে থাকে—এতে আয়াতের সঙ্গে কোনো বৈপরীত্য নেই। কারণ, সব বিপদই গোনাহের শাস্তি নয়। কখনো তা গোনাহের কাফফারা, কখনো পরীক্ষা, কখনো মর্যাদা বৃদ্ধি, আবার কখনো আখিরাতের শাস্তি লাঘবের মাধ্যম হয়। তাই মুমিনের বিপদকে সবসময় গোনাহের শাস্তি মনে করা সঠিক নয়।
বোঝা গেলো, বিপদাপদ ও বালা-মুসীবত ধৈর্যের পরীক্ষার জন্যও হতে পারে যে, এসব মুসীবত সত্ত্বেও কে আল্লাহর উপর আস্থা রাখে, আর কে আল্লাহকে অভিযুক্ত করে।
ফিরে আসি আগের কথায়। বালা-মুসীবত যদিও সব সময় গোনাহের কারণে আসে না কিন্তু কুরআন-হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী অধিকাংশ সময় গোনাহের কারণেই এসে থাকে। নিম্নলিখিত হাদীসটি লক্ষ্য করুন।
বিপদ-মুসিবত ও দুর্যোগের সময় আমাদের আত্মসমালোচনা করা উচিত—এত সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও আমরা কতটুকু গুনাহ বর্জন করতে পেরেছি এবং নেক আমলের ঘাটতি কতটুকু পূরণ করতে পেরেছি? যদি গুনাহ থেকে ফিরে না আসি, তাহলে দুর্যোগ থেকে মুক্তির আশা করা কীভাবে সম্ভব?
গুনাহ ও আল্লাহর নাফরমানী বিষের মতো; এর পরিণতি ধ্বংস ও বরবাদি। তাই মুক্তি পেতে হলে অন্যের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেকেই তাওবা, আত্মশুদ্ধি এবং নেক আমলের পথে এগিয়ে আসতে হবে।
আযাব-গযব থেকে বাঁচতে গুনাহ বর্জন ও নেক আমল শুরু করা অপরিহার্য। তবে সব গুনাহ একসঙ্গে ছাড়া কঠিন হওয়ায় ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া উচিত। বুযুর্গদের মতে, কুদৃষ্টি, কুকথা ও কুধারণা বর্জন করতে পারলে অন্যান্য গুনাহ ত্যাগ সহজ হয়।
অন্যদিকে সালামের প্রসার, সব ভালো কাজে ডান দিককে প্রাধান্য দেওয়া এবং বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করা নেক আমলকে সহজ করে। আর বিপদ-মুসিবতের সময় বিশেষভাবে দ্বীনি ইলম অর্জন, আল্লাহর মহব্বত বৃদ্ধি এবং অন্তরে খোদাভীতি সৃষ্টি করার প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত।