সূরা
পারা

Loading verses...

অন্যান্য

অনুবাদ
তেলাওয়াত

সূরা বনী-ইসরাঈল (الإسراء) | ইহুদী জাতি

মাক্কী

মোট আয়াতঃ ১১১

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

سُبۡحٰنَ الَّذِیۡۤ اَسۡرٰی بِعَبۡدِہٖ لَیۡلًا مِّنَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ اِلَی الۡمَسۡجِدِ الۡاَقۡصَا الَّذِیۡ بٰرَکۡنَا حَوۡلَہٗ لِنُرِیَہٗ مِنۡ اٰیٰتِنَا ؕ اِنَّہٗ ہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ ١

ছুবহা-নাল্লাযীআছরা-বিআ‘বদিহী লাইলাম মিনাল মাছজিদিল হারা-মি ইলাল মাছজিদিল আকসাল্লাযী বা-রাকনা- হাওলাহূলিনুরিয়াহূমিন আ-য়া-তিনা- ইন্নাহূ হুওয়াছছামী‘উল বাসীর।

পবিত্র সেই সত্তা, যিনি নিজ বান্দাকে রাতারাতি মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যান, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখানোর জন্য। নিশ্চয়ই তিনি সব কিছুর শ্রোতা এবং সব কিছুর জ্ঞাতা।

তাফসীরঃ

১. মিরাজের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত। সীরাত ও হাদীসের কিতাবসমূহে ঘটনাটি বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। তার সারমর্ম এইরূপ হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম রাতের বেলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসলেন এবং তাঁকে একটি জন্তুর পিঠে সওয়ার করালেন। জন্তুটির নাম ছিল বুরাক। সেটি বিদ্যুৎগতিতে তাঁকে মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে নিয়ে গেল। এই হল মিরাজ ভ্রমণের প্রথম অংশ। একে ইসরা বলা হয়। তারপর হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম তাঁকে সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে সাত আসমানে নিয়ে গেলেন। প্রত্যেক আসমানে অতীতের কোনও না কোনও নবীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হল। তারপর জান্নাতের সিদরাতুল মুনতাহা নামক একটি বৃক্ষের কাছে পৌঁছলেন এবং তিনি আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সৌভাগ্য লাভ করলেন। এ সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর উম্মতের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেন। তারপর রাতের মধ্যেই তিনি মক্কা মুকাররমায় ফিরে আসেন। এ আয়াতে সফরের কেবল প্রথম অংশটুকুই বর্ণনা করা হয়েছে। কেননা সামনে যে আলোচনা আসছে তার সম্পর্ক এই অংশের সাথেই বেশি। তবে সফরের দ্বিতীয় অংশের বর্ণনাও কুরআন মাজীদে আছে, যা শেষ দিকে সূরা নাজমে আসছে (৫৩ : ১৩-১৮)। সহীহ রিওয়ায়াত অনুযায়ী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ অলৌকিক সফর জাগ্রত অবস্থাতেই হয়েছিল। এভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁকে নিজ কুদরতের এক মহা নিদর্শন দেখিয়ে দেন। এটা সম্পূর্ণ গলত কথা যে, এ ঘটনা স্বপ্নযোগে হয়েছিল, জাগ্রত অবস্থায় নয়। গলত হওয়ার কারণ, একথা বহু সহীহ হাদীসের পরিপন্থী তো বটেই, খোদ কুরআন মাজীদেরও খেলাফ। কুরআন মাজীদের বর্ণনাশৈলী দ্বারা সুস্পষ্টভাবে জানা যায় এটা ছিল এক অস্বাভাবিক ঘটনা, যাকে আল্লাহ তাআলা নিজের নিদর্শন সাব্যস্ত করেছেন। এটা যদি একটা স্বপ্নমাত্র হত, তবে তাতে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কেননা স্বপ্নে তো মানুষ কত কিছুই দেখে থাকে। কাজেই এ ঘটনা স্বপ্নযোগে ঘটে থাকলে কুরআন মাজীদে একে আল্লাহ তাআলার নিদর্শন সাব্যস্ত করার কোন অর্থ থাকে না।

وَاٰتَیۡنَا مُوۡسَی الۡکِتٰبَ وَجَعَلۡنٰہُ ہُدًی لِّبَـنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اَلَّا تَتَّخِذُوۡا مِنۡ دُوۡنِیۡ وَکِیۡلًا ؕ ٢

ওয়া আ-তাইনা-মূছাল কিতা-বা ওয়া জা‘আলনা-হু হুদাল লিবানী ইছরাঈলা আল্লাতাত্তাখিযূমিন দূনী ওয়াকীলা-।

এবং আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম এবং তাকে বনী ইসরাঈলের জন্য হিদায়াতের মাধ্যম বানিয়েছিলাম। আদেশ করেছিলাম, তোমরা আমার পরিবর্তে অন্য কাউকে কর্মবিধায়করূপে গ্রহণ করো না।

ذُرِّیَّۃَ مَنۡ حَمَلۡنَا مَعَ نُوۡحٍ ؕ اِنَّہٗ کَانَ عَبۡدًا شَکُوۡرًا ٣

যুররিইইয়াতা মান হামালনা- মা‘আ নূহিন ইন্নাহূকা-না ‘আবদান শাকূরা-।

হে ওই সকল লোকের বংশধরগণ! যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম। সে ছিল খুবই শোকর গোজার বান্দা।

তাফসীরঃ

২. হযরত নূহ আলাইহিস সালামের নৌকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এ কারণে যে, যারা সেই নৌকায় সওয়ার হয়েছিল, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে রক্ষা করেছিলেন। ফলে তারা বন্যায় ডোবেনি। এটা যেহেতু আল্লাহ তাআলার একটি বিশেষ অনুগ্রহ ছিল, তাই তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে, সে অনুগ্রহের শোকর এটাই যে, তাদের বংশধরগণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ বানাবে না।

وَقَضَیۡنَاۤ اِلٰی بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ فِی الۡکِتٰبِ لَتُفۡسِدُنَّ فِی الۡاَرۡضِ مَرَّتَیۡنِ وَلَتَعۡلُنَّ عُلُوًّا کَبِیۡرًا ٤

ওয়া কাদাইনা ইলা-বানী ইছরাঈলা ফিল কিতা-বি লাতুফছিদুন্না ফিল আরদি মাররাতাইনি ওয়া লাতা‘লুন্না ‘উলুওওয়ান কাবীরা-।

আমি কিতাবে মীমাংসা দান করে বনী ইসরাঈলকে অবহিত করেছিলাম, তোমরা পৃথিবীতে দু’বার বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং ঘোর অহংকার প্রদর্শন করবে।

فَاِذَا جَآءَ وَعۡدُ اُوۡلٰىہُمَا بَعَثۡنَا عَلَیۡکُمۡ عِبَادًا لَّنَاۤ اُولِیۡ بَاۡسٍ شَدِیۡدٍ فَجَاسُوۡا خِلٰلَ الدِّیَارِ ؕ وَکَانَ وَعۡدًا مَّفۡعُوۡلًا ٥

ফাইযা-জাআ ওয়া‘দুঊলা-হুমা-বা‘আছনা -‘আলাইকুম ‘ইবা-দাল্লানাউলী বা’ছিন শাদীদিন ফাজা-ছূখিলা-লাদ দিয়া-রি ওয়া কা-না ওয়া‘দাম মাফ ‘ঊলা-।

সুতরাং যখন সেই ঘটনা দু’টির প্রথমটি সমুপস্থিত হল, তখন আমি তোমাদের উপর আমার এমন বান্দাদেরকে আধিপত্য দান করলাম, যারা ছিল প্রচণ্ড লড়াকু। তারা তোমাদের নগরে প্রবেশ করে ছড়িয়ে পড়ল। এটা ছিল এমন এক প্রতিশ্রুতি, যা কার্যকর হওয়ারই ছিল।

তাফসীরঃ

৩. বনী ইসরাঈরের নাফরমানী যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন তাদের উপর শাস্তি নাযিল করা হল। বাবেলের রাজা বুখত নাস্সার তাদের উপর আক্রমণ চালাল এবং তাদেরকে পাইকাড়িভাবে হত্যা করল। যারা প্রাণে রক্ষা পেয়েছিল তাদেরকে বন্দী করে ফিলিস্তিন থেকে বাবেলে নিয়ে গেল। সেখানে তারা দীর্ঘদিন তার দাস হিসেবে নির্বাসিত জীবন যাপন করতে থাকে। এ আয়াতে সেই ঘটনার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

ثُمَّ رَدَدۡنَا لَکُمُ الۡکَرَّۃَ عَلَیۡہِمۡ وَاَمۡدَدۡنٰکُمۡ بِاَمۡوَالٍ وَّبَنِیۡنَ وَجَعَلۡنٰکُمۡ اَکۡثَرَ نَفِیۡرًا ٦

ছু ম্মা রাদাদনা-লাকুমুল কাররাতা ‘আলাইহিম ওয়া আমদাদনা-কুম বিআমওয়া-লিওঁ ওয়া বানীনা ওয়া জা‘আলনা-কুম আকছারা নাফীরা-।

তারপর আমি তোমাদেরকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাদের উপর আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ দিলাম এবং তোমাদের ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততিতে বৃদ্ধি সাধন করলাম। আর তোমাদের লোকসংখ্যা আগের তুলনায় বৃদ্ধি করলাম।

তাফসীরঃ

৪. বনী ইসরাঈল প্রায় সত্তর বছর পর্যন্ত বুখতে নাসসারের দাসত্ব করে। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি দয়া করলেন। ইরানের রাজা সাইরাস বাবেলে আক্রমণ চালালেন এবং সেদেশ দখল করে নিলেন। সেখানে ইয়াহুদীদের দুর্দশা দেখে তার বড় দয়া হল। তিনি তাদেরকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় ফিলিস্তিনে বসবাসের সুযোগ দিলেন। এভাবে তাদের সুদিন আবার ফিরে আসল। তারা ধনে-জনে সমৃদ্ধ হয়ে উঠল এবং একটা বড়-সড় জনগোষ্ঠী হিসেবে তারা সেখানে বসবাস করতে থাকল। কিন্তু সুদিন ফিরে পাওয়ার পর তারা ফের তাদের পুরোনো চরিত্রে ফিরে গেল। আবার আগের মত পাপাচারে লিপ্ত হল। ফলে দ্বিতীয় ঘটনা ঘটল, যা সামনের আয়াতে বর্ণিত হচ্ছে।

اِنۡ اَحۡسَنۡتُمۡ اَحۡسَنۡتُمۡ لِاَنۡفُسِکُمۡ ۟ وَاِنۡ اَسَاۡتُمۡ فَلَہَا ؕ فَاِذَا جَآءَ وَعۡدُ الۡاٰخِرَۃِ لِیَسُوۡٓءٗا وُجُوۡہَکُمۡ وَلِیَدۡخُلُوا الۡمَسۡجِدَ کَمَا دَخَلُوۡہُ اَوَّلَ مَرَّۃٍ وَّلِیُتَبِّرُوۡا مَا عَلَوۡا تَتۡبِیۡرًا ٧

ইন আহছানতুম আহছানতুম লিআনফুছিকুম ওয়া ইন আছা’তুম ফালাহা- ফাইযাজাআ ওয়া‘দুল আ-খিরাতি লিইয়াছূঊ উজূহাকুম ওয়ালিইয়াদখুলুল মাছজিদা কামা-দাখালূহু আওওয়ালা মাররাতিওঁ ওয়া লিইউতাব্বিরূমা-‘আলাও তাতবীরা-।

তোমরা সৎকর্ম করলে তা নিজেদেরই কল্যাণার্থে করবে আর যদি মন্দ কাজ কর, তাতেও নিজেদেরই অকল্যাণ হবে। অতঃপর যখন দ্বিতীয় ঘটনার নির্ধারিত কাল আসল, (তখন আমি তোমাদের উপর অপর শত্রু চাপিয়ে দিলাম,) যাতে তারা তোমাদের চেহারা বিকৃত করে দেয় এবং যাতে আগের বার তারা যেভাবে প্রবেশ করেছিল, এবারও সেভাবে মসজিদে প্রবেশ করে এবং যা-কিছুর উপর তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় তা মিসমার করে দেয়।

তাফসীরঃ

৫. কেউ কেউ বলেন, এই দ্বিতীয় শত্রু হল ‘এন্টিউকাস এপিফানিউস’। হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের আবির্ভাবের কিছুকাল আগে সে বায়তুল মাকদিসে হামলা করে ইয়াহুদীদের উপর গণহত্যা চালিয়েছিল। কারও মতে এর দ্বারা রোম সম্রাট তীতূসের আক্রমণকে বোঝানো হয়েছিল। সে আক্রমণ চালিয়েছিল হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে আসমানে তুলে নেওয়ার পর। যদিও বনী ইসরাঈল বিভিন্নকালে বিভিন্ন শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু এ দুই শত্রু দ্বারাই তারা সর্বাপেক্ষা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সে কারণেই আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে এই দুই শত্রুর উল্লেখ করেছেন। তারা প্রথম শত্রু অর্থাৎ বুখত নাস্সারের হাতে আক্রান্ত হয়েছিল সেই সময়, যখন তারা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের শরীয়ত অমান্য করে ব্যাপক পাপাচারে লিপ্ত হয়। আর দ্বিতীয় শত্রুর কবলে পড়েছিল হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধাচরণ করে। সামনে বলা হচ্ছে, তোমরা যদি হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধিতায় লিপ্ত থাক, তবে তোমাদের সাথে পুনরায় একই আচরণ করা হবে।

عَسٰی رَبُّکُمۡ اَنۡ یَّرۡحَمَکُمۡ ۚ وَاِنۡ عُدۡتُّمۡ عُدۡنَا ۘ وَجَعَلۡنَا جَہَنَّمَ لِلۡکٰفِرِیۡنَ حَصِیۡرًا ٨

‘আছা-রাব্বুকুম আই ইঁয়ারহামাকুম ওয়া ইন ‘উততুম ‘উদ না- ওয়া জা‘আলনাজাহান্নামা লিলকা-ফিরীনা হাসীরা-।

যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের প্রতি দয়া করবেন, কিন্তু তোমরা যদি একই কাজের পুনরাবৃত্তি কর, তবে আমিও পুনরাবৃত্তি করব। আর আমি তো জাহান্নামকে কাফেরদের জন্য কারাগার বানিয়েই রেখেছি।

তাফসীরঃ

৬. অর্থাৎ তোমরা যদি ফের অন্যায়-অনাচার কর, আমিও পুনরায় তোমাদের শাস্তি দান করব। বস্তুত ইয়াহুদীদের চরিত্রই হল উপদ্রব করা, ফাসাদ করে বেড়ানো। তা থেকে তারা নিবৃত্ত হওয়ার নয়। তাই তো তারা আবারও ফাসাদ সৃষ্টিতে লিপ্ত হয়। কাফের ও মুশরিকদের সাথে যোগ-সাজস করে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত আঁটে, ফলে তাদের উপর আযাব নেমে আসে। তাদেরকে পর্যায়ক্রমে আরব-উপদ্বীপ থেকে উৎখাত করা হয়। পুনরায় তারা ফিৎনায় লিপ্ত হলে আল্লাহ তাআলার সাক্ষাৎ আযাবরূপে তাদের বিরুদ্ধে হিটলালের আবির্ভাব হয়। আবারও তারা ইসরাঈল-রাষ্ট্রের মাধ্যমে ফাসাদে নেমেছে এবং ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে উপর্যুপরি উৎপাত চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস কোনও না কোনও পন্থায় তাদের উপর আবারও আল্লাহ তাআলার গযব নেমে আসবে এবং সবশেষে হযরত মাহদী ও ঈসা আলাইহিস সালামের হাতে তাদের সর্বপ্রধান উপদ্রবকারী দাজ্জালসহ তাদের গোটা জাতিকে খতম করে দেওয়া হবে। -অনুবাদক

اِنَّ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنَ یَہۡدِیۡ لِلَّتِیۡ ہِیَ اَقۡوَمُ وَیُبَشِّرُ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ الَّذِیۡنَ یَعۡمَلُوۡنَ الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ اَجۡرًا کَبِیۡرًا ۙ ٩

ইন্না হা-যাল কুরআ-না ইয়াহদী লিল্লাতী হিয়া আকওয়ামুওয়াইউবাশশিরুল মু’মিনীনাল্লাযীনা ইয়া‘মালূনাসসা-লিহা-তি আন্না লাহুম আজরান কাবীরা-।

বস্তুত এ কুরআন সেই পথ দেখায়, যা সর্বাপেক্ষা সরল আর যারা (এর প্রতি) ঈমান এনে সৎকর্ম করে, তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য আছে মহা প্রতিদান।
১০

وَّاَنَّ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡاٰخِرَۃِ اَعۡتَدۡنَا لَہُمۡ عَذَابًا اَلِیۡمًا ٪ ١۰

ওয়া আন্নাল্লাযীনা লা-ইউ’মিনূনা বিলআ-খিরাতি আ‘তাদনা-লাহুম ‘আযা-বান আলীমা-।

আর (সতর্ক করে দেয় যে,) যারা আখেরাতে বিশ্বাস রাখে না তাদের জন্য আমি যন্ত্রণাময় শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।
১১

وَیَدۡعُ الۡاِنۡسَانُ بِالشَّرِّ دُعَآءَہٗ بِالۡخَیۡرِ ؕ وَکَانَ الۡاِنۡسَانُ عَجُوۡلًا ١١

ওয়া ইয়াদ‘উল ইনছা-নুবিশশাররি দু‘আআহূবিলখাইরি ওয়া কানা-ল ইনছা-নু ‘আজূলা-।

মানুষ সেইভাবেই অমঙ্গল প্রার্থনা করে, যেভাবে তার মঙ্গল প্রার্থনা করা উচিত। বস্তুত মানুষ বড় ব্যস্তমতি।

তাফসীরঃ

৭. কাফেরগণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলত কুফরের কারণে যদি আমাদের উপর শাস্তি অবধারিত হয় তবে এখনই নগদ নগদ কেন দেওয়া হচ্ছে না? এ আয়াতে তাদের সেই কথার দিকেই ইশারা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে যে, তারা আযাবের মত মন্দ জিনিসকে এমনব্যস্ত-সমস্ত হয়ে চাচ্ছে, যেন তা কোন ভালো জিনিস।
১২

وَجَعَلۡنَا الَّیۡلَ وَالنَّہَارَ اٰیَتَیۡنِ فَمَحَوۡنَاۤ اٰیَۃَ الَّیۡلِ وَجَعَلۡنَاۤ اٰیَۃَ النَّہَارِ مُبۡصِرَۃً لِّتَبۡتَغُوۡا فَضۡلًا مِّنۡ رَّبِّکُمۡ وَلِتَعۡلَمُوۡا عَدَدَ السِّنِیۡنَ وَالۡحِسَابَ ؕ وَکُلَّ شَیۡءٍ فَصَّلۡنٰہُ تَفۡصِیۡلًا ١٢

ওয়া জা‘আলনাল্লাইলা ওয়ান্নাহা-রাআ-ইয়াতাইনি ফামা হাওনাআ-য়াতাল্লাইলি ওয়া জা‘আলনাআ-য়াতান্নাহা-রি মুবসিরাতাল লিতাবতাগূফাদলাম মির রাব্বিকুম ওয়ালিতা‘লামূ‘আদাদাছ ছিনীনা ওয়াল হিছা-বা ওয়া কুল্লা শাইয়িন ফাসসালনা-হু তাফসীলা-।

আমি রাত ও দিনকে দু’টি নিদর্শনরূপে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর রাতের নিদর্শনকে অন্ধকার করেছি আর দিনের নিদর্শনকে করেছি আলোকিত, যাতে তোমরা নিজ প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যাতে তোমরা বছর-সংখ্যা ও (মাসের) হিসাব জানতে পার। আমি সবকিছু পৃথক-পৃথকভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছি।

তাফসীরঃ

৮. অর্থাৎ, পালাক্রমে রাত ও দিনের শৃঙ্খলিত আগমন আল্লাহ তাআলার কুদরত, রহমত ও হিকমতেরই নিদর্শন। রাতের বেলা অন্ধকার ছেয়ে যায়, যাতে মানুষ তখন বিশ্রাম নিতে পারে। আবার দিনের বেলা আলো ছড়িয়ে পড়ে, ফলে মানুষ রুজি-রোজগারের সন্ধানে চলাফেরা করতে পারে। কুরআন মাজীদ রুজি-রোজগারকে ‘আল্লাহ তাআলার করুণা’ শব্দে ব্যক্ত করেছে (বিস্তারিত দ্র. সূরা নাহল, আয়াত ১৬ : ১৪-এর টীকা)। রাত ও দিনের পরিবর্তনের কারণেই তারিখ নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
১৩

وَکُلَّ اِنۡسَانٍ اَلۡزَمۡنٰہُ طٰٓئِرَہٗ فِیۡ عُنُقِہٖ ؕ وَنُخۡرِجُ لَہٗ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ کِتٰبًا یَّلۡقٰىہُ مَنۡشُوۡرًا ١٣

ওয়া কুল্লা ইনছা-নিন আলঝামনা-হু তাইরাহূফী ‘উনুকিহী ওয়ানুখরিজুলাহূইয়াওমাল কিয়া-মাতি কিতা-বাইঁ ইয়ালকা-হু মানশূরা-।

আমি প্রত্যেক মানুষের (কাজের) পরিণাম তার গলদেশে সেঁটে দিয়েছি এবং কিয়ামতের দিন আমি (তার আমলনামা) লিপিবদ্ধরূপে তার সামনে বের করে দেব, যা সে উন্মুক্ত পাবে।

তাফসীরঃ

৯. ‘পরিণাম গলদেশে সেঁটে দেওয়া’-এর অর্থ এই যে, প্রত্যেকের সমস্ত কর্ম প্রতি মুহূর্তে লেখা হচ্ছে, যা তার ভালো-মন্দ পরিণামের নিশানাদিহি করে। কিয়ামতের দিন তার এ আমলনামা তার সামনে খুলে দেওয়া হবে। যা সে নিজেই পড়তে পারবে। হযরত কাতাদা (রহ.) বলেন, দুনিয়ায় যে ব্যক্তি নিরক্ষর ছিল কিয়ামতের দিন তাকেও আমলনামা পড়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে।
১৪

اِقۡرَاۡ کِتٰبَکَ ؕ  کَفٰی بِنَفۡسِکَ الۡیَوۡمَ عَلَیۡکَ حَسِیۡبًا ؕ ١٤

ইকরা’ কিতা-বাকা কাফা-বিনাফছিকাল ইয়াওমা ‘আলাইকা হাছীবা-।

(বলা হবে) তুমি নিজ আমলনামা পড়। আজ তুমি নিজেই নিজের হিসাব নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
১৫

مَنِ اہۡتَدٰی فَاِنَّمَا یَہۡتَدِیۡ لِنَفۡسِہٖ ۚ وَمَنۡ ضَلَّ فَاِنَّمَا یَضِلُّ عَلَیۡہَا ؕ وَلَا تَزِرُ وَازِرَۃٌ وِّزۡرَ اُخۡرٰی ؕ وَمَا کُنَّا مُعَذِّبِیۡنَ حَتّٰی نَبۡعَثَ رَسُوۡلًا ١٥

মানিহতাদা-ফাইন্নামা-ইয়াহতাদী লিনাফছিহী ওয়ামান দাল্লা ফাইন্নামা-ইয়াদিল্লু ‘আলাইহা ওয়ালা-তাঝিরু ওয়া-ঝিরাতুওঁবিঝরা উখরা- ওয়ামা-কুন্নামু‘আযযি বীনা হাত্তা-নাব‘আছা রাছূলা-।

যে ব্যক্তি সরল পথে চলে, সে তো সরল পথে চলে নিজ মঙ্গলের জন্যই আর যে ব্যক্তি ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করে, সে নিজের ক্ষতির জন্যই তা অবলম্বন করে। কোনও ভার বহনকারী অন্য কারও ভার বহন করবে না। ১০ আমি কখনও কাউকে শাস্তি দেই না, যতক্ষণ না (তার কাছে) কোন রাসূল পাঠাই।

তাফসীরঃ

১০. অর্থাৎ একজনের গুনাহের বোঝা অন্যজন বহন করবে না যে, সে তার শাস্তি নিজের মাথায় নিয়ে তার নিষ্কৃতির ব্যবস্থা করে দেবে। বরং পাপ যে করবে, তার জন্য দায়ীও সে নিজেই হবে এবং তার শাস্তিও তার নিজেকেই ভোগ করতে হবে। -অনুবাদক
১৬

وَاِذَاۤ اَرَدۡنَاۤ اَنۡ نُّہۡلِکَ قَرۡیَۃً اَمَرۡنَا مُتۡرَفِیۡہَا فَفَسَقُوۡا فِیۡہَا فَحَقَّ عَلَیۡہَا الۡقَوۡلُ فَدَمَّرۡنٰہَا تَدۡمِیۡرًا ١٦

ওয়া ইযাআরাদনাআননুহলিকা কারইয়াতান আমারনা-মুতরাফীহা-ফাফাছাকূ ফীহাফাহাককা ‘আলাইহাল কাওলুফাদাম্মার না-হা-তাদমীরা-।

যখন কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি তখন তাদের বিত্তবান লোকদেরকে (ঈমান ও আনুগত্যের) হুকুম দেই, কিন্তু তারা তাতে নাফরমানী করে, ফলে তাদের সম্পর্কে কথা চূড়ান্ত হয়ে যায় ১১ এবং আমি তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলি।

তাফসীরঃ

১১. পাপাচারের কারণে তাদের জন্য শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়। -অনুবাদক
১৭

وَکَمۡ اَہۡلَکۡنَا مِنَ الۡقُرُوۡنِ مِنۡۢ بَعۡدِ نُوۡحٍ ؕ وَکَفٰی بِرَبِّکَ بِذُنُوۡبِ عِبَادِہٖ خَبِیۡرًۢا بَصِیۡرًا ١٧

ওয়া কাম আহলাকনা-মিনাল কুরূনি মিম বা‘দি নূহিওঁ ওয়া কাফা-বিরাব্বিকা বিযুনূবি ‘ইবা-দিহী খাবীরাম বাসীরা-।

আমি নূহের পর কত মানবগোষ্ঠীকেই ধ্বংস করেছি! তোমার প্রতিপালক নিজ বান্দাদের পাপরাশি সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত, তিনি সবকিছু দেখছেন।
১৮

مَنۡ کَانَ یُرِیۡدُ الۡعَاجِلَۃَ عَجَّلۡنَا لَہٗ فِیۡہَا مَا نَشَآءُ لِمَنۡ نُّرِیۡدُ ثُمَّ جَعَلۡنَا لَہٗ جَہَنَّمَ ۚ یَصۡلٰىہَا مَذۡمُوۡمًا مَّدۡحُوۡرًا ١٨

মান কা-না ইউরীদুল ‘আ-জিলাতা ‘আজ্জালনা-লাহূফীহা-মা-নাশাউ লিমান নুরীদুছুম্মা জা‘আলনা-লাহূজাহান্নামা ইয়াসলা-হা-মাযমূমাম মাদহূরা-।

কেউ দুনিয়ার নগদ লাভ কামনা করলে আমি যাকে ইচ্ছা, যতটুকু ইচ্ছা, এখানেই তাকে তা নগদ দিয়ে দেই। ১২ তারপর আমি তার জন্য জাহান্নাম রেখে দিয়েছি, যাতে সে লাঞ্ছিত ও বিতাড়িতরূপে প্রবেশ করবে।

তাফসীরঃ

১২. এর দ্বারা সেই ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যে দুনিয়ার উন্নতিকেই নিজ জীবনের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নিয়েছে, আখেরাতকে সে হয় বিশ্বাসই করে না অথবা সে নিয়ে তার কোন চিন্তা নেই। এমন সব ব্যক্তিও এর অন্তর্ভুক্ত, যারা সৎকাজ করে অর্থ-সম্পদ বা সুনাম-সুখ্যাতি লাভের জন্য, আল্লাহ তাআলাকে রাজি করার জন্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা যে দুনিয়ায় এসব পাবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই এবং এরও কোনও নিশ্চয়তা নেই যে, তারা যা-যা কামনা করে সবই পাবে। হাঁ, তাদের মধ্যে আমি যাকে দেওয়া সমীচীন মনে করি এবং যে পরিমাণ দেওয়া সমীচীন মনে করি, দুনিয়ায় দিয়ে দেই। কিন্তু আখেরাতে তাদের ঠিকানা অবশ্যই জাহান্নাম।
১৯

وَمَنۡ اَرَادَ الۡاٰخِرَۃَ وَسَعٰی لَہَا سَعۡیَہَا وَہُوَ مُؤۡمِنٌ فَاُولٰٓئِکَ کَانَ سَعۡیُہُمۡ مَّشۡکُوۡرًا ١٩

ওয়া মান আরা-দাল আ-খিরাতা ওয়া ছা‘আ- লাহা- ছা‘ইয়াহা- ওয়া হুওয়া মু’মিনুন ফাউলাইকা কা-না ছা‘ইউহুম মাশকূরা-।

আর যে ব্যক্তি আখেরাত (-এর লাভ) চায় এবং সেজন্য যথোচিতভাবে চেষ্টা করে, সে যদি মুমিন হয়, তবে এরূপ লোকের চেষ্টার পরিপূর্ণ মর্যাদা দেওয়া হবে।
২০

کُلًّا نُّمِدُّ ہٰۤؤُلَآءِ وَہٰۤؤُلَآءِ مِنۡ عَطَآءِ رَبِّکَ ؕ وَمَا کَانَ عَطَـآءُ رَبِّکَ مَحۡظُوۡرًا ٢۰

কুল্লান নুমিদ্দুহাউলাই ওয়া হাউলাই মিন ‘আতাই রাব্বিকা ওয়ামা-কা-না ‘আতাউ রাব্বিকা মাহজূরা-।

(হে নবী! দুনিয়ায়) তোমার প্রতিপালকের দানের যে ব্যাপারটা, আমি তা দ্বারা এদেরকেও ধন্য করি এবং ওদেরকেও। ১৩ (দুনিয়ায়) তোমার প্রতিপালকের দান কারও জন্যই রুদ্ধ নয়।

তাফসীরঃ

১৩. এস্থলে عطاء (দান) দ্বারা রিযক বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা দুনিয়ায় মুমিন-কাফির, মুত্তাকী-ফাসেক নির্বিশেষে সকলকেই রিযক দিয়ে থাকেন। রিযকের দুয়ার কারও জন্যই বন্ধ নয়।
২১

اُنۡظُرۡ کَیۡفَ فَضَّلۡنَا بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ ؕ وَلَلۡاٰخِرَۃُ اَکۡبَرُ دَرَجٰتٍ وَّاَکۡبَرُ تَفۡضِیۡلًا ٢١

উনজু র কাইফা ফাদ্দালনা-বা‘দাহুম ‘আলা-বা‘দিওঁ ওয়ালাল আ-খিরাতুআকবারু দারাজা-তিওঁ ওয়া আকবারু তাফদীলা-।

লক্ষ্য কর, আমি কিভাবে তাদের কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। ১৪ নিশ্চিত জেন, আখেরাত মর্যাদার দিক থেকেও মহত্তর এবং মাহাত্ম্যের দিক থেকেও শ্রেষ্ঠতর।

তাফসীরঃ

১৪. অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা নিজ হিকমত অনুযায়ী কাউকে বেশি রিযক দেন এবং কাউকে কম। এটা একান্ত তাঁর ইচ্ছা। কাজেই এর ফিকিরে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। বরং বান্দার পূর্ণ চেষ্টা যার পেছনে ব্যয় করা উচিত তা হচ্ছে আখেরাতের সাফল্য অর্জন। কেননা দুনিয়াবী স্বার্থের তুলনায় তা বহুগুণে শ্রেষ্ঠ; বরং উভয়ের মধ্যে কোন তুলনাই চলে না।
২২

لَا تَجۡعَلۡ مَعَ اللّٰہِ اِلٰـہًا اٰخَرَ فَتَقۡعُدَ مَذۡمُوۡمًا مَّخۡذُوۡلًا ٪ ٢٢

লা-তাজ‘আল মা‘আল্লা-হি ইলা-হান আ-খারা ফাতাক‘উদা মাযমূমাম মাখযূলা-।

আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে মাবুদ বানিও না। অন্যথায় তুমি নিন্দাযোগ্য (ও) নিঃসহায় হয়ে পড়বে। ১৫

তাফসীরঃ

১৫. ১৯ নং আয়াতে বলা হয়েছিল, আখেরাতের কল্যাণ লাভের জন্য বান্দার কর্তব্য যথোচিত চেষ্টা করা। তার দ্বারা ইশারা ছিল আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ মেনে চলার প্রতি। এবার এখান থেকে তাঁর কিছু বিধি-নিষেধের বিবরণ দেওয়া হচ্ছে। তা শুরু করা হয়েছে তাওহীদের হুকুম দ্বারা। কেননা তাওহীদের বিশ্বাস ছাড়া কোন আমল কবুল হয় না। তারপর ‘হুকুকুল ইবাদ’ সংক্রান্ত কিছু বিধান পেশ করা হয়েছে।
২৩

وَقَضٰی رَبُّکَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِیَّاہُ وَبِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا ؕ اِمَّا یَبۡلُغَنَّ عِنۡدَکَ الۡکِبَرَ اَحَدُہُمَاۤ اَوۡ کِلٰہُمَا فَلَا تَقُلۡ لَّہُمَاۤ اُفٍّ وَّلَا تَنۡہَرۡہُمَا وَقُلۡ لَّہُمَا قَوۡلًا کَرِیۡمًا ٢٣

ওয়া কাদা-রাব্বুকা আল্লা-তা‘বুদূ ইল্লাইয়্যা-হু ওয়াবিলওয়া-লিদাইনি ইহছা-নান ইম্মা-ইয়াবলুগান্না ‘ইনদাকাল কিবারা আহাদুহুমাআও কিলা-হুমা-ফালা-তাকুল লাহুমা উফফিওঁ ওয়ালা-তানহারহুমা-ওয়া কুল লাহুমা-কাওলান কারীমা-।

তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো, পিতা-মাতার কোনও একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উফ্ পর্যন্ত বলো না ১৬ এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।

তাফসীরঃ

১৬. ‘উফ্’ পর্যন্ত বলো না’এর অর্থ, তাদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করো না এবং তাদরকে বিরক্তিসূচক কোন কথা বলো না, যেমন তারা যদি কোন কথা বারবার বলে বা অপ্রয়োজনীয় কোন কথা বলে, যেমনটা বৃদ্ধ ও শিশুরা করে থাকে, তখন বিরক্তির সাথে তার জবাব দিও না। -অনুবাদক
২৪

وَاخۡفِضۡ لَہُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحۡمَۃِ وَقُلۡ رَّبِّ ارۡحَمۡہُمَا کَمَا رَبَّیٰنِیۡ صَغِیۡرًا ؕ ٢٤

ওয়াখফিদলাহুমা-জানা-হাযযুলিল মিনার রাহমাতি ওয়াকু র রাব্বির হামহুমা-কামারাব্বাইয়া-নী সাগীরা-।

এবং তাদের প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণের সাথে তাদের সামনে নিজেকে বিনয়াবনত করো এবং দু‘আ করো, হে আমার প্রতিপালক! তারা যেভাবে আমার শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছে, তেমনি আপনিও তাদের প্রতি রহমতের আচরণ করুন।
২৫

رَبُّکُمۡ اَعۡلَمُ بِمَا فِیۡ نُفُوۡسِکُمۡ ؕ اِنۡ تَکُوۡنُوۡا صٰلِحِیۡنَ فَاِنَّہٗ کَانَ لِلۡاَوَّابِیۡنَ غَفُوۡرًا ٢٥

রাব্বুকুম আ‘লামুবিমা ফী নুফূছিকুম ইন তাকূনূসা-লিহীনা ফাইন্নাহূকা-না লিল আওওয়া-বীনা গাফূরা-।

তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের অন্তরে কি আছে তা ভালো জানেন। তোমরা যদি নেককার হয়ে যাও, তবে যারা বেশি বেশি তার দিকে রুজু হয় তিনি তাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করেন। ১৭

তাফসীরঃ

১৭. অর্থাৎ, তোমরা যদি ঈমানদার হও এবং সামগ্রিকভাবে সৎকর্মে রত থাকার চেষ্টা কর, তবে এ অবস্থায় মানবীয় দুর্বলতা হেতু তোমাদের দ্বারা কোন ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলে এবং সেজন্য তোমরা আল্লাহর দিকে রুজু হয়ে তাওবা করলে আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন।
২৬

وَاٰتِ ذَا الۡقُرۡبٰی حَقَّہٗ وَالۡمِسۡکِیۡنَ وَابۡنَ السَّبِیۡلِ وَلَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِیۡرًا ٢٦

ওয়া আ-তি যাল কুরবা-হাক্কাহূওয়াল মিছকীনা ওয়াবনাছ ছাবীলি ওয়ালা-তুবাযযি র তাবযীরা-।

আত্মীয়-স্বজনকে তাদের হক আদায় করো এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও (তাদের হক প্রদান করো)। আর নিজেদের অর্থ-সম্পদ অপ্রয়োজনীয় কাজে উড়াবে না। ১৮

তাফসীরঃ

১৮. কুরআন মাজীদ এস্থলে تَبْذِيْرْ শব্দ ব্যবহার করেছে। সাধারণত تَبْذِيْرْ ও اِسْرَافْ উভয়ের অর্থ করা হয় ‘অপব্যয়’। কিন্তু উভয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। যদি বৈধ কাজে ব্যয় করা হয়, কিন্তু প্রয়োজনের বেশি বা মাত্রাতিরিক্ত করা হয়, তাকে ‘ইসরাফ’ বলে আর অবৈধ কাজে অর্থ ব্যয়কে বলে ‘তাবযীর’। এ কারণেই এখানে তরজমা করা হয়েছে ‘অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থ-সম্পদ উড়ানো’।
২৭

اِنَّ الۡمُبَذِّرِیۡنَ کَانُوۡۤا اِخۡوَانَ الشَّیٰطِیۡنِ ؕ وَکَانَ الشَّیۡطٰنُ لِرَبِّہٖ کَفُوۡرًا ٢٧

ইন্নাল মুবাযযি রীনা কা-নূইখওয়া-নাশশাইয়া-তীনি ওয়া কা-নাশ শাইতা-নু লিরাব্বিহী কাফূরা-।

জেনে রেখ, যারা অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থ উড়ায়, তারা শয়তানের ভাই। আর শয়তান নিজ প্রতিপালকের ঘোর অকৃতজ্ঞ।
২৮

وَاِمَّا تُعۡرِضَنَّ عَنۡہُمُ ابۡتِغَآءَ رَحۡمَۃٍ مِّنۡ رَّبِّکَ تَرۡجُوۡہَا فَقُلۡ لَّہُمۡ قَوۡلًا مَّیۡسُوۡرًا ٢٨

ওয়া ইম্মা-তু‘রিদান্না ‘আনহুমুবতিগাআ রাহমাতিম মির রাব্বিকা তারজূহা-ফাকুল লাহুম কাওলাম মাইছূরা-।

যদি কখনও তাদের (অর্থাৎ আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদের) থেকে এ কারণে তোমার মুখ ফেরানোর দরকার হয় যে, তুমি তোমার প্রতিপালকের রহমতের প্রত্যাশায় রয়েছ, ১৯ তবে সে ক্ষেত্রেও তাদের সাথে নম্রতার সাথে কথা বলো।

তাফসীরঃ

১৯. অর্থাৎ, নিজের কাছে টাকা-পয়সা না থাকা অবস্থায় যদি কোন অভাবগ্রস্ত আসে আর তখন তাকে কিছু দেওয়া সম্ভব না হয় কিন্তু এই আশায় থাক যে, আল্লাহ তাআলা তাওফীক দিলে তখন তাদেরকে সাহায্য করবে, সেক্ষেত্রে তাদের কাছে নম্র ভাষায় অপারগতা প্রকাশ করবে।
২৯

وَلَا تَجۡعَلۡ یَدَکَ مَغۡلُوۡلَۃً اِلٰی عُنُقِکَ وَلَا تَبۡسُطۡہَا کُلَّ الۡبَسۡطِ فَتَقۡعُدَ مَلُوۡمًا مَّحۡسُوۡرًا ٢٩

ওয়ালা- তাজ‘আল ইয়াদাকা মাগলূলাতান ইলা- ‘উনুকিকা ওয়ালা- তাবছুতহা- কুল্লাল বাছতিফাতাক‘উদা মালূমাম মাহছূরা-।

(কৃপণতাবশে) নিজের হাত ঘাড়ের সাথে বেঁধে রেখ না এবং (অপব্যয়ী হয়ে) তা সম্পূর্ণরূপে খুলে রেখ না, যদ্দরুণ তোমাকে নিন্দাযোগে ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়তে হবে।
৩০

اِنَّ رَبَّکَ یَبۡسُطُ الرِّزۡقَ لِمَنۡ یَّشَآءُ وَیَقۡدِرُ ؕ  اِنَّہٗ کَانَ بِعِبَادِہٖ خَبِیۡرًۢا بَصِیۡرًا ٪ ٣۰

ইন্না রাব্বাকা ইয়াবছুতুর রিঝকা লিমাইঁ ইয়াশাউ ওয়া ইয়াকদিরু ইন্নাহূকা-না বি‘ইবা-দিহী খাবীরাম বাসীরা-।

বস্তুত তোমার প্রতিপালক যার জন্য ইচ্ছা করেন জীবিকা প্রশস্ত করে দেন এবং (যার জন্য ইচ্ছা) সংকুচিত করে দেন। জেনে রেখ, তিনি নিজ বান্দাদের অবস্থাদি সম্পর্কে সম্যক অবগত এবং তাদেরকে তিনি ভালোভাবে দেখছেন।
৩১

وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَوۡلَادَکُمۡ خَشۡیَۃَ اِمۡلَاقٍ ؕ نَحۡنُ نَرۡزُقُہُمۡ وَاِیَّاکُمۡ ؕ اِنَّ قَتۡلَہُمۡ کَانَ خِطۡاً کَبِیۡرًا ٣١

ওয়ালা-তাকতুলূআওলা-দাকুম খাশইয়াতা ইমলা-কিন নাহনুনারঝুকুহুম ওয়া ইয়্যাকুম ইন্না কাতলাহুম কা-না খিতআন কাবীরা-।

দারিদ্র্যের ভয়ে নিজ সন্তানদেরকে হত্যা করো না। ২০ আমি তাদেরকেও রিযক দেই এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয়ই তাদেরকে হত্যা করা গুরুতর অপরাধ।

তাফসীরঃ

২০. আরব মুশরিকগণ অনেক সময় কন্যা সন্তানকে এ কারণে হত্যা করত যে, নিজ গৃহে কন্যা সন্তান থাকাকে তারা সামাজিকভাবে লজ্জাষ্কর মনে করত। আবার অনেক সময় ভয় করত খাওয়া-পরানোর খরচ যোগাতে গিয়ে গরীব হয়ে যাবে। আর এ কারণেও তারা সন্তান হত্যা করত।
৩২

وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا ٣٢

ওয়ালা-তাকরাবুঝ ঝিনাইন্নাহূকা-না ফা-হিশাতাওঁ ওয়া ছাআ ছাবীলা-।

এবং ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতা ও বিপথগামিতা।
৩৩

وَلَا تَقۡتُلُوا النَّفۡسَ الَّتِیۡ حَرَّمَ اللّٰہُ اِلَّا بِالۡحَقِّ ؕ وَمَنۡ قُتِلَ مَظۡلُوۡمًا فَقَدۡ جَعَلۡنَا لِوَلِیِّہٖ سُلۡطٰنًا فَلَا یُسۡرِفۡ فِّی الۡقَتۡلِ ؕ اِنَّہٗ کَانَ مَنۡصُوۡرًا ٣٣

ওয়ালা-তাকতুলুন্নাফছাল্লাতী হাররামাল্লা-হু ইল্লা-বিল হাক্কি ওয়া মান কুতিলা মাজলূমান ফাকাদ জা‘আলনা-লিওয়ালিইয়িহী ছুলতা-নান ফালা-ইউছরিফ ফিল কাতলি ইন্নাহূকা-না মানসূরা-।

আল্লাহ যেই প্রাণকে মর্যাদা দান করেছেন তাকে হত্যা করো না, তবে (শরীয়ত অনুযায়ী) তোমরা তার অধিকার লাভ করলে ভিন্ন কথা। ২১ যাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়,আমি তার অলিকে (কিসাস গ্রহণের) অধিকার দিয়েছি। সুতরাং সে যেন হত্যাকার্যে সীমালংঘন না করে। ২২ নিশ্চয়ই সে এর উপযুক্ত যে, তার সাহায্য করা হবে।

তাফসীরঃ

২১. কাউকে হত্যা করার অধিকার লাভ হয় মাত্র কয়েকটি অবস্থায়। তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থার কথা পরবর্তী বাক্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তা হল, কাউকে যদি অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়, তবে তার অলি অর্থাৎ ওয়ারিশগণ আদালতী অনুষ্ঠানাদির পর হত্যাকারীকে হত্যা করা বা করানোর অধিকার সংরক্ষণ করে। পরিভাষায় একে ‘কিসাস’ বলা হয়।
৩৪

وَلَا تَقۡرَبُوۡا مَالَ الۡیَتِیۡمِ اِلَّا بِالَّتِیۡ ہِیَ اَحۡسَنُ حَتّٰی یَبۡلُغَ اَشُدَّہٗ ۪ وَاَوۡفُوۡا بِالۡعَہۡدِ ۚ اِنَّ الۡعَہۡدَ کَانَ مَسۡـُٔوۡلًا ٣٤

ওয়ালা-তাকরাবূমা-লাল ইয়াতীমি ইল্লা-বিল্লাতী হিয়া আহছানুহাত্তা-ইয়াবলুগা আশুদ্দাহূ ওয়া আওফূবিল‘আহদি ইন্নাল ‘আহদা কা-না মাছউলা।

এবং ইয়াতীম যতক্ষণ না পরিপক্কতায় উপনীত হয়, তার সম্পদের কাছেও যেও না, তবে এমন পন্থায় যা (তার পক্ষে) উত্তম। ২৩ আর অঙ্গীকার পূরণ করো। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে (তোমাদের) জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

তাফসীরঃ

২৩. ইয়াতীমদের আত্মীয়-স্বজন, বিশেষত তার অভিভাবকদের লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে, ইয়াতীম যদি তার মৃত পিতার রেখে যাওয়া সম্পদের কোন অংশ পায়, তবে তাকে আমানত মনে করবে। সে সম্পদে ইয়াতীমের পক্ষে যা লাভজনক কেবল সে রকম কাজ-কারবারই জায়েয হবে। এমন কোনও কাজ তাতে করা যাবে না, যাতে তার ক্ষতি হওয়ার আশংকা থাকে। যেমন তা থেকে কাউকে ঋণ দেওয়া বা তার পক্ষ হতে কাউকে কিছু উপহার দেওয়া ইত্যাদি। অবশ্য সে যখন পরিপক্কতায় উপনীত হবে, অর্থাৎ সাবালকত্ব লাভ করবে এবং নিজের লাভ-ক্ষতি উপলব্ধি করার মত বুঝ-সমঝ তার ভেতর এসে যাবে, তখন তার সম্পদ তার হাতে বুঝিয়ে দেওয়া অবশ্য কর্তব্য। সূরা নিসায় (৪ : ২) এ মাসআলা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
৩৫

وَاَوۡفُوا الۡکَیۡلَ اِذَا کِلۡتُمۡ وَزِنُوۡا بِالۡقِسۡطَاسِ الۡمُسۡتَقِیۡمِ ؕ ذٰلِکَ خَیۡرٌ وَّاَحۡسَنُ تَاۡوِیۡلًا ٣٥

ওয়া আওফুল কাইলা ইযা-কিলতুম ওয়াঝিনূবিলকিছতা-ছিল মুছতাকীমি যা-লিকা খাইরুওঁ ওয়া আহছানুতা’বীলা-।

যখন পরিমাপ পাত্র দ্বারা কাউকে কোন জিনিস মেপে দাও, তখন পরিপূর্ণ মাপে দিও আর ওজন করার জন্য সঠিক দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করো। এ পন্থাই সঠিক এবং এরই পরিণাম উৎকৃষ্ট।
৩৬

وَلَا تَقۡفُ مَا لَیۡسَ لَکَ بِہٖ عِلۡمٌ ؕ اِنَّ السَّمۡعَ وَالۡبَصَرَ وَالۡفُؤَادَ کُلُّ اُولٰٓئِکَ کَانَ عَنۡہُ مَسۡـُٔوۡلًا ٣٦

ওয়ালা-তাকফুমা-লাইছা লাকা বিহী ‘ইলমুন ইন্নাছ ছাম‘আ ওয়াল বাসারা ওয়াল ফুআ-দা কুল্লুউলাইকা কা-না ‘আনহু মাছঊলা-।

যে বিষয়ে তোমার নিশ্চিত জ্ঞান নেই (তাকে সত্য মনে করে) তার পিছনে পড়ো না। ২৪ জেনে রেখ, কান, চোখ ও অন্তর এর প্রতিটি সম্পর্কে (তোমাদেরকে) জিজ্ঞেস করা হবে। ২৫

তাফসীরঃ

২৪. অর্থাৎ, কারও সম্পর্কে যদি অভিযোগ ওঠে সে কোনও অপরাধ বা কোনও গুনাহের কাজ করেছে, তবে যতক্ষণ পর্যন্ত শরয়ী সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা তার সত্যতা প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত যেমন কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জায়েয নয়, তেমনি সত্যিই সে ওই অপরাধ বা গুনাহের কাজটি করেছে, অন্তরে এরূপ বিশ্বাস পোষণও আদৌ জায়েয নয়। আয়াতের অর্থ এরূপও হতে পারে যে, যে বিষয় নিশ্চিতভাবে জানা নেই এবং তা জানার উপর দুনিয়া ও আখেরাতের কোনও কাজও নির্ভরশীল নয়, অহেতুক এরূপ বিষয়ের খোঁজ-খবর ও তত্ত্ব তালাশে লেগে পড়া জায়েয নয়।
৩৭

وَلَا تَمۡشِ فِی الۡاَرۡضِ مَرَحًا ۚ اِنَّکَ لَنۡ تَخۡرِقَ الۡاَرۡضَ وَلَنۡ تَبۡلُغَ الۡجِبَالَ طُوۡلًا ٣٧

ওয়া লা-তামশি ফিল আরদিমারাহান ইন্নাকা লান তাখরিকাল আরদা ওয়া লান তাবলুগাল জিবা-লা তূলা-।

ভূপৃষ্ঠে দম্ভভরে চলো না। তুমি তো ভূমিকে ফাটিয়ে ফেলতে পারবে না এবং উচ্চতায় পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। ২৬

তাফসীরঃ

২৬. দম্ভভরে চলার ধরন দু’টি। (ক) কেউ তো মাটির উপর জোরে-জোরে পা ফেলে এবং (খ) কেউ কেউ বুকটান করে চলার চেষ্টা করে। প্রথম অবস্থার জন্য বলা হয়েছে, তোমরা পা যতই জোরে ফেল না কেন, মাটি ফাটিয়ে তো ফেলতে পারবে না! আর দ্বিতীয় অবস্থার জন্য বলা হয়েছে, বুকটান করে নিজেকে লম্বা করার চেষ্টা করছ না কি? তা যতই চেষ্টা কর না কেন পাহাড় সমান তো আর উঁচু হতে পারবে না! লম্বা ও উঁচু হওয়াটাই যদি মর্যাদার মাপকাঠি হয়, তবে তোমাদের তুলনায় তো পাহাড়েরই মর্যাদা বেশি হওয়ার কথা ছিল।
৩৮

کُلُّ ذٰلِکَ کَانَ سَیِّئُہٗ عِنۡدَ رَبِّکَ مَکۡرُوۡہًا ٣٨

কুল্লুযা-লিকা কা-না ছাইয়িউহূ‘ইনদা রাব্বিকা মাক রূহা-।

এ সবই এমন মন্দ কাজ, ২৭ যা তোমার প্রতিপালকের কাছে ঘৃণ্য।

তাফসীরঃ

২৭. অর্থাৎ যেসব করতে নিষেধ করা হয়েছে, সেগুলো করা মন্দ ও আল্লাহর কাছে ঘৃণ্য আর যা করতে আদেশ করা হয়েছে, তা না করা মন্দ ও আল্লাহর কাছে ঘৃণ্য। অর্থাৎ যথাক্রমে করা ও না করার দৃষ্টিকোণ থেকে সবগুলোই মন্দ। -অনুবাদক
৩৯

ذٰلِکَ مِمَّاۤ اَوۡحٰۤی اِلَیۡکَ رَبُّکَ مِنَ الۡحِکۡمَۃِ ؕ وَلَا تَجۡعَلۡ مَعَ اللّٰہِ اِلٰـہًا اٰخَرَ فَتُلۡقٰی فِیۡ جَہَنَّمَ مَلُوۡمًا مَّدۡحُوۡرًا ٣٩

যা-লিকা মিম্মাআওহাইলাইকা রাব্বুকা মিনাল হিকমাতি ওয়ালা-তাজ‘আল মা‘আল্লা-হি ইলা-হান আ-খারা ফাতুলকা-ফী জাহান্নামা মালূমাম মাদহূরা-।

(হে নবী!) এগুলো এমন হিকমতের কথা, যা তোমার প্রতিপালক ওহীর মাধ্যমে তোমার কাছে পৌঁছিয়েছেন এবং (হে মানুষ!) আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে মাবুদ বানিও না, অন্যথায় তুমি নিন্দিত ও ধিকৃত হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
৪০

اَفَاَصۡفٰىکُمۡ رَبُّکُمۡ بِالۡبَنِیۡنَ وَاتَّخَذَ مِنَ الۡمَلٰٓئِکَۃِ اِنَاثًا ؕ  اِنَّکُمۡ لَتَقُوۡلُوۡنَ قَوۡلًا عَظِیۡمًا ٪ ٤۰

আফাআসফা-কুম রাব্বুকুম বিলবানীনা ওয়াত্তাখাযা মিনাল মালাইকাতি ইনা-ছান ইন্নাকুম লাতাকূলূনা কাওলান ‘আজীমা-।

তোমাদের প্রতিপালক পুত্র সন্তান দেওয়ার জন্য তোমাদেরকে বেছে নিয়েছেন আর নিজের জন্য বুঝি ফেরেশতাদেরকে কন্যারূপে গ্রহণ করেছেন? ২৮ প্রকৃতপক্ষে তোমরা বড় গুরুতর কথা বলছ।

তাফসীরঃ

২৮. পিছনে কয়েক জায়গায় গেছে, আরব মুশরিকগণ ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তাআলার কন্যা বলত, অথচ তারা নিজেদের জন্য মেয়ে-সন্তানের জন্ম পছন্দ করত না; বরং অত্যন্ত গ্লানিকর মনে করত। সর্বদা আশা করত যেন তাদের পুত্র সন্তান জন্মায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, এটা বড় আজব ব্যাপার যে, তোমাদের ধারণা মতে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তো পুত্র দেওয়ার জন্য বাছাই করেছেন আবার নিজের জন্য রেখেছেন মেয়ে, যা কিনা তোমাদের দৃষ্টিতে বাবার পক্ষে গ্লানিকর।
৪১

وَلَقَدۡ صَرَّفۡنَا فِیۡ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنِ لِیَذَّکَّرُوۡا ؕ وَمَا یَزِیۡدُہُمۡ اِلَّا نُفُوۡرًا ٤١

ওয়া লাকাদ সাররাফনা-ফী হা-যাল কুরআ-নি লিইয়াযযাক্কারূ ওয়ামা-ইয়াঝীদুহুম ইল্লা-নুফূরা-।

আমি এ কুরআনে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাদান করেছি, যাতে মানুষ সচেতন হয়, কিন্তু এতে তাদের পলায়নপরতাই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৪২

قُلۡ لَّوۡ کَانَ مَعَہٗۤ اٰلِـہَۃٌ کَمَا یَقُوۡلُوۡنَ اِذًا لَّابۡتَغَوۡا اِلٰی ذِی الۡعَرۡشِ سَبِیۡلًا ٤٢

কুল লাও কা-না মা‘আহূ আ-লিহাতুনকামা- ইয়াকূ লূনা ইযাল্লাব তাগাও ইলাযিল‘আরশি ছাবীলা-।

বলে দাও, আল্লাহর সঙ্গে যদি আরও ইলাহ থাকত, যেমন তোমরা বলছ তবে তারা আরশ-অধিপতি (প্রকৃত ইলাহের)-এর উপর প্রভাব বিস্তারের কোন পথ খুঁজত। ২৯

তাফসীরঃ

২৯. এটা তাওহীদের পক্ষে ও শিরকের বিরুদ্ধে এমন এক দলীল, যা যে-কারও পক্ষেই বোঝা সহজ। দলীলটির সারমর্ম হল, ইলাহ এমন কোনও সত্তাকেই বলা যায়, যিনি হবেন সর্বশক্তিমান, যে- কোনও রকমের কাজ করার ক্ষমতা যার আছে এবং যিনি কারও অধীন হবেন না। বিশ্বজগতে আল্লাহ তাআলা ছাড়া আরও ইলাহ থাকলে, প্রত্যেকেই এ গুণের অধিকারী হত। ফলে প্রত্যেকেই অন্যের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন হত এবং প্রত্যেকেরই ক্ষমতা হত পরিপূর্ণ। আর সেক্ষেত্রে সব ইলাহ মিলে আরশ অধিপতি ইলাহের উপর প্রভাবও বিস্তার করতে সক্ষম হত। যদি বলা হয়, আল্লাহর উপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা তাদের নেই, বরং তারা আল্লাহ তাআলার কর্তৃত্বাধীন, তবে তারা কেমন ইলাহ হল? এর দ্বারা প্রমাণ হয়ে যায় প্রকৃত ইলাহ একজনই। তিনি ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কেউ নয়।
৪৩

سُبۡحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یَقُوۡلُوۡنَ عُلُوًّا کَبِیۡرًا ٤٣

ছুবহা-নাহু ওয়া তা‘আ-লা-‘আম্মা-ইয়াকূ লূনা ‘উলুওওয়ান কাবীরা-।

বস্তুত তারা যেসব কথা বলে, তাঁর সত্তা তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও সমুচ্চ।
৪৪

تُسَبِّحُ لَہُ السَّمٰوٰتُ السَّبۡعُ وَالۡاَرۡضُ وَمَنۡ فِیۡہِنَّ ؕ وَاِنۡ مِّنۡ شَیۡءٍ اِلَّا یُسَبِّحُ بِحَمۡدِہٖ وَلٰکِنۡ لَّا تَفۡقَہُوۡنَ تَسۡبِیۡحَہُمۡ ؕ اِنَّہٗ کَانَ حَلِیۡمًا غَفُوۡرًا ٤٤

তুছাব্বিহুলাহুছছামা-ওয়া-তুছ ছাব ‘উ ওয়াল আর দুওয়া মান ফীহিন্না ওয়া ইম মিন শাইয়িন ইল্লা-ইউছাব্বিহুবিহামদিহী ওয়ালা-কিল লা-তাফকাহূনা তাছবীহাহুম ইন্নাহূ কা-না হালীমান গাফূরা-।

সাত আসমান ও যমীন এবং এদের অন্তর্ভুক্ত সমস্ত সৃষ্টি তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করে, এমন কোন জিনিস নেই, যা তাঁর সপ্রশংস তাসবীহ পাঠ করে না। কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ বুঝতে পার না। ৩০ বস্তুত তিনি পরম সহিষ্ণু, অতি ক্ষমাশীল।

তাফসীরঃ

৩০. এর দুই ব্যাখ্যা হতে পারে (ক) যাবতীয় বস্তু তাদের নিজ-নিজ অবস্থা দ্বারা আল্লাহ তাআলার তাসবীহ (পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা) করে। কেননা প্রতিটি বস্তুই এমন যে, তার সৃজন ও সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ শক্তি ও তাঁর একত্বের প্রমাণ মেলে এবং উপলব্ধি করা যায় প্রতিটি বস্তু একান্তভাবে তাঁরই আজ্ঞাধীন। (খ) এটাও অসম্ভব নয় যে, প্রতিটি বস্তু প্রকৃত অর্থেই তাসবীহ পাঠ করে, কিন্তু আমরা তা বুঝতে পারি না। কেননা আল্লাহ তাআলা জগতের প্রতিটি জিনিস, এমনকি পাথরের ভেতরও এক রকমের অনুভূতি-শক্তি দান করেছেন। যে শক্তি দ্বারা সবকিছুর পক্ষেই তাসবীহ পাঠ সম্ভব। কুরআন মাজীদের বেশ ক’টি আয়াতের আলোকে এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাই বেশি সঠিক মনে হয়। আধুনিক বিজ্ঞানও স্বীকার করে নিয়েছে যে, পাথরের মধ্যেও এক ধরনের অনুভব শক্তি আছে।
৪৫

وَاِذَا قَرَاۡتَ الۡقُرۡاٰنَ جَعَلۡنَا بَیۡنَکَ وَبَیۡنَ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡاٰخِرَۃِ حِجَابًا مَّسۡتُوۡرًا ۙ ٤٥

ওয়া ইযা-কারা’তাল কুরআ-না জা‘আলনা-বাইনাকা ওয়া বাইনাল্লাযীনা লা-ইউ’মিনূনা বিলআ-খিরাতি হিজা-বাম মাছতূরা-।

(হে নবী!) তুমি যখন কুরআন পড়, তখন আমি তোমার এবং যারা আখেরাতে ঈমান রাখে না তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য পর্দা রেখে দেই। ৩১

তাফসীরঃ

৩১. যারা নিজ সংশোধন ও আখেরাতের চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ উদাসীন, কেবল দুনিয়ার ধান্ধা নিয়ে ব্যস্ত, যাদের অন্তরে সত্য জানার কোন আগ্রহ নেই; বরং সত্যের বিপরীতে জেদ ও হঠকারিতা প্রদর্শনকেই নীতি বানিয়ে নিয়েছে, তারা সত্য সম্পর্কে চিন্তা করার ও সত্য বোঝার তাওফীক থেকে বঞ্চিত থাকে। এটাই সেই অদৃশ্য পর্দা, যা তাদের ও নবীর মধ্যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, এটাই সেই আচ্ছাদন, যা দ্বারা তাদের অন্তর ঢেকে দেওয়া হয় এবং এটাই সেই বধিরতা যদ্দরুণ তারা সত্য কথা শোনার যোগ্যতা হতে বঞ্চিত থাকে।
৪৬

وَّجَعَلۡنَا عَلٰی قُلُوۡبِہِمۡ اَکِنَّۃً اَنۡ یَّفۡقَہُوۡہُ وَفِیۡۤ اٰذَانِہِمۡ وَقۡرًا ؕ وَاِذَا ذَکَرۡتَ رَبَّکَ فِی الۡقُرۡاٰنِ وَحۡدَہٗ وَلَّوۡا عَلٰۤی اَدۡبَارِہِمۡ نُفُوۡرًا ٤٦

ওয়া জা‘আলনা ‘আলা-কুলূবিহিম আকিন্নাতান আইঁ ইয়াফকাহূহু ওয়া ফীআ-যা-নিহিম ওয়াকরাওঁ ওয়া ইযা-যাকারতা রাব্বাকা ফিল কুরআ-নি ওয়াহদাহূওয়াল্লাও ‘আলা আদবা-রিহিম নুফূরা-।

আর আমি তাদের অন্তরের উপর আচ্ছাদন রেখে দিয়েছি, যাতে তারা তা বুঝতে না পারে এবং তাদের কানে বধিরতা সৃষ্টি করে দেই। আর তুমি যখন কুরআনে তোমার একমাত্র প্রতিপালকের উল্লেখ কর, তখন তারা বিতৃষ্ণাভরে পিছন ফিরিয়ে চলে যায়।
৪৭

نَحۡنُ اَعۡلَمُ بِمَا یَسۡتَمِعُوۡنَ بِہٖۤ اِذۡ یَسۡتَمِعُوۡنَ اِلَیۡکَ وَاِذۡ ہُمۡ نَجۡوٰۤی اِذۡ یَقُوۡلُ الظّٰلِمُوۡنَ اِنۡ تَتَّبِعُوۡنَ اِلَّا رَجُلًا مَّسۡحُوۡرًا ٤٧

নাহনুআ‘লামুবিমা-ইয়াছতামি‘ঊনা বিহী ইয ইয়াছতামি‘ঊনা ইলাইকা ওয়া ইযহুম নাজওয়াইযইয়াকূলুজ্জা-লিমূনা ইন তাত্তাবি‘উনা ইল্লা-রাজুলাম মাছহূরা-।

তারা যখন তোমার কথা কান পেতে শোনে, তখন কেন শোনে তা আমি ভালো করে জানি এবং যখন তারা পরস্পরে কানাকানি করে, যখন জালেমগণ (তাদের স্বগোত্রীয় মুসলিমদেরকে) বলে, তোমরা তো কেবল একজন যাদুগ্রস্ত লোকের অনুসরণ করছ (তখন তাদের সে কথাও আমি ভালোভাবে জানি)।
৪৮

اُنۡظُرۡ کَیۡفَ ضَرَبُوۡا لَکَ الۡاَمۡثَالَ فَضَلُّوۡا فَلَا یَسۡتَطِیۡعُوۡنَ سَبِیۡلًا ٤٨

উনজু র কাইফা দারাবূলাকাল আমছা-লা ফাদালূল ফালা -ইয়াছতাতী‘ঊনা ছাবীলা-।

লক্ষ্য কর, তারা তোমার প্রতি কেমন (পরিহাসমূলক) দৃষ্টান্ত আরোপ করছে। তারা পথ হারিয়েছে সুতরাং তারা আর পথে আসতে পারবে না।
৪৯

وَقَالُوۡۤا ءَاِذَا کُنَّا عِظَامًا وَّرُفَاتًا ءَاِنَّا لَمَبۡعُوۡثُوۡنَ خَلۡقًا جَدِیۡدًا ٤٩

ওয়া কা-লূআইযা-কুন্না-‘ইজা-মাওঁ ওয়া রুফা-তান আইন্না-লামাব‘ঊছূনা খালকান জাদীদা-।

তারা বলে, আমরা যখন অস্থিতে পরিণত হব এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাব, তারপরও কি আমরা নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?
৫০

قُلۡ کُوۡنُوۡا حِجَارَۃً اَوۡ حَدِیۡدًا ۙ ٥۰

কুল কূনূহিজা-রাতান আও হাদীদা-।

বলে দাও, তোমরা পাথর বা লোহা হয়ে যাও!
৫১

اَوۡ خَلۡقًا مِّمَّا یَکۡبُرُ فِیۡ صُدُوۡرِکُمۡ ۚ فَسَیَقُوۡلُوۡنَ مَنۡ یُّعِیۡدُنَا ؕ قُلِ الَّذِیۡ فَطَرَکُمۡ اَوَّلَ مَرَّۃٍ ۚ فَسَیُنۡغِضُوۡنَ اِلَیۡکَ رُءُوۡسَہُمۡ وَیَقُوۡلُوۡنَ مَتٰی ہُوَ ؕ قُلۡ عَسٰۤی اَنۡ یَّکُوۡنَ قَرِیۡبًا ٥١

আও খালকাম মিম্মা-ইয়াকবুরু ফী সূদূ রিকুম ফাছাইয়াকূলূনা মাইঁ ইউ‘ঈদুনা- কুল্লিলাযী ফাতারাকুম আওওয়ালা মাররাতিন ফাছাইউনগিদূনা ইলাইকা রুঊছাহুম ওয়া ইয়াকূলূনা মাতা-হুওয়া কুল ‘আছাআইঁ ইয়াকূনা কারীবা-।

অথবা এমন কোন সৃষ্টি হয়ে যাও, যে সম্পর্কে তোমাদের মনের ভাবনা হল যে, তা (জীবিত করা) আরও কঠিন। (তবুও তোমাদেরকে ঠিকই জীবিত করা হবে)। অতঃপর তারা বলবে, কে আমাদেরকে পুনরায় জীবিত করবে? বলে দিও, তিনিই জীবিত করবেন, যিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন। ৩২ তারপর তারা তোমাদের সামনে মাথা নেড়ে-নেড়ে বলবে, এরূপ কখন হবে? ৩৩ বলে দিও, সম্ভবত সে সময়টি কাছেই এসে গেছে।

তাফসীরঃ

৩২. ইশারা করা হচ্ছে, কোন জিনিসকে প্রথমবার নাস্তি থেকে অস্তিতে আনাই বেশি কঠিন হয়ে থাকে। একবার সৃষ্টি করার পর পুনরায় সৃষ্টি অতটা কঠিন হয় না। যেই আল্লাহ প্রথমবার সৃষ্টির মত কঠিনতর কাজটিও নিজ কুদরতে অনায়াসে সম্পন্ন করতে পেরেছেন, তিনি যে আবারও সৃষ্টি করতে পারবেন এটা মানতে সমস্যা কোথায়?
৫২

یَوۡمَ یَدۡعُوۡکُمۡ فَتَسۡتَجِیۡبُوۡنَ بِحَمۡدِہٖ وَتَظُنُّوۡنَ اِنۡ لَّبِثۡتُمۡ اِلَّا قَلِیۡلًا ٪ ٥٢

ইয়াওমা ইয়াদ‘ঊকুম ফাতাছতাজীবূনা বিহামদিহী ওয়া তাজুননূনা ইল্লাবিছতুম ইল্লাকালীলা-।

যে দিন তিনি তোমাদেরকে ডাকবেন, তোমরা তাঁর প্রশংসারত হয়ে তাঁর হুকুম পালন করবে এবং তোমাদের মনে হবে (দুনিয়ায়) তোমরা অল্প কিছুকালই অবস্থান করেছিলে।
৫৩

وَقُلۡ لِّعِبَادِیۡ یَقُوۡلُوا الَّتِیۡ ہِیَ اَحۡسَنُ ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ یَنۡزَغُ بَیۡنَہُمۡ ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ کَانَ لِلۡاِنۡسَانِ عَدُوًّا مُّبِیۡنًا ٥٣

ওয়া কুল লি‘ইবা-দী ইয়াকূলুল্লাতী হিয়া আহছানু ইন্নাশশাইতা-না ইয়ানঝাগু বাইনাহুম ইন্নাশশাইতা-না কা-না লিলইনছা-নি ‘আদুওওয়াম মুবীনা-।

আমার (মুমিন) বান্দাদের বলে দাও, তারা যেন এমন কথাই বলে, যা উত্তম। ৩৪ নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টি করে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। ৩৫

তাফসীরঃ

৩৪. মুশরিকদের তাচ্ছিল্যভাব ও ব্যঙ্গাত্মক কথা শুনে মুমিনগণ হয়ত কঠোর-কঠিন কথা বলে ফেলত। তাই আদেশ করা হচ্ছে নিজেদের পারস্পরিক কথাবার্তায় তো বটেই, এমন কি বেদীনদের সাথে কথা বলার সময়ও কোমলতা অবলম্বন কর। রূঢ় ও অশালীন ভাষা হতে বেঁচে থেক এবং সর্বাবস্থায় উত্তম ও হৃদয়গ্রাহী কথা বলো। কেননা মনে আঘাত দিয়ে কথা বললে তাদের দ্বারা সত্যগ্রহণ করা দুরূহ হয়ে যাবে। উদ্দেশ্য তো দূরে সরানো নয়; বরং কাছে টানা যাতে তারা সত্যগ্রহণে প্রস্তুত হয়ে যায় আর সেজন্য উত্তম কথাই ফলপ্রসূ। -অনুবাদক
৫৪

رَبُّکُمۡ اَعۡلَمُ بِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّشَاۡ یَرۡحَمۡکُمۡ اَوۡ اِنۡ یَّشَاۡ یُعَذِّبۡکُمۡ ؕ وَمَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ عَلَیۡہِمۡ وَکِیۡلًا ٥٤

রাব্বুকুম আ‘লামুবিকুম ইয়ঁইয়াশা’ ইয়ারহামকুম আও ইয়ঁইয়াশা’ ইউ‘আযযি বকুম ওয়ামাআরছালনা-কা ‘আলাইহিম ওয়াকীলা-।

তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে ভালোভাবেই জানেন। তিনি চাইলে তোমাদের প্রতি দয়া করেন এবং চাইলে তোমাদেরকে শাস্তি দেন। (হে নবী!) আমি তোমাকে তাদের কাজকর্মের যিম্মাদার বানিয়ে পাঠাইনি।
৫৫

وَرَبُّکَ اَعۡلَمُ بِمَنۡ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ وَلَقَدۡ فَضَّلۡنَا بَعۡضَ النَّبِیّٖنَ عَلٰی بَعۡضٍ وَّاٰتَیۡنَا دَاوٗدَ زَبُوۡرًا ٥٥

ওয়া রাব্বুকা আ‘লামুবিমান ফিছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদি ওয়ালাকাদ ফাদ্দালনাবা‘দান্নাবিইয়ীনা ‘আলা-বা‘দিওঁ ওয়া আ-তাইনা-দা-ঊদা ঝাবূরা-।

যারা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আছে, তোমার প্রতিপালক তাদেরকে ভালোভাবে জানেন। আমি কতক নবীকে কতক নবীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। আর আমি দাঊদকে যাবূর দিয়েছিলাম।
৫৬

قُلِ ادۡعُوا الَّذِیۡنَ زَعَمۡتُمۡ مِّنۡ دُوۡنِہٖ فَلَا یَمۡلِکُوۡنَ کَشۡفَ الضُّرِّ عَنۡکُمۡ وَلَا تَحۡوِیۡلًا ٥٦

কুলিদ‘উল্লাযীনা ঝা‘আমতুম মিন দূনিহী ফালা- ইয়ামলিকূনা কাশফাদদুররি ‘আনকুম ওয়ালা-তাহবীলা-।

(যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য মাবুদ মানে, তাদেরকে) বলে দাও, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে মাবুদ মনে করেছ, তাদেরকে ডাক দিয়ে দেখ। তারা তোমাদের কোন কষ্ট দূর করতে পারবে না এবং তা পরিবর্তনও করতে পারবে না।
৫৭

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ یَدۡعُوۡنَ یَبۡتَغُوۡنَ اِلٰی رَبِّہِمُ الۡوَسِیۡلَۃَ اَیُّہُمۡ اَقۡرَبُ وَیَرۡجُوۡنَ رَحۡمَتَہٗ وَیَخَافُوۡنَ عَذَابَہٗ ؕ اِنَّ عَذَابَ رَبِّکَ کَانَ مَحۡذُوۡرًا ٥٧

উলাইকাল্লাযীনা ইয়াদ‘ঊনা ইয়াবতাগূনা ইলা-রাব্বিহিমুল ওয়াছীলাতা আইয়ুহুম আকরাবু ওয়া ইয়ারজূনা রাহমাতাহূও ইয়াখা-ফূনা ‘আযা-বাহূ ইন্না আযা-বা রাব্বিকা কা-না মাহযূরা-।

তারা যাদেরকে ডাকে, তারা নিজেরাই তো এই লক্ষে তাদের প্রতিপালক পর্যন্ত পৌঁছার অছিলা সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে আল্লাহর বেশি নিকটবর্তী হতে পারে এবং তারা তাঁর রহমতের আশা করে ও তাঁর আযাবকে ভয় করে। ৩৬ নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালকের আযাব এমন, যাকে ভয় করাই উচিত।

তাফসীরঃ

৩৬. এর দ্বারা প্রতিমা নয়, বরং সেই সকল ফিরিশতা ও জিনকে বোঝানো হয়েছে, আরব মুশরিকগণ যাদেরকে প্রভুত্বের আসনে বসিয়েছিল। আয়াতের সারমর্ম হল, তারা খোদা হবে কি, তারা নিজেরাই তো আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি এবং তারা সর্বদা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের উপায় খোঁজে।
৫৮

وَاِنۡ مِّنۡ قَرۡیَۃٍ اِلَّا نَحۡنُ مُہۡلِکُوۡہَا قَبۡلَ یَوۡمِ الۡقِیٰمَۃِ اَوۡ مُعَذِّبُوۡہَا عَذَابًا شَدِیۡدًا ؕ کَانَ ذٰلِکَ فِی الۡکِتٰبِ مَسۡطُوۡرًا ٥٨

ওয়া ইম্মিন কারইয়াতিন ইল্লা-নাহনুমুহলিকূহা-কাবলা ইয়াওমিল কিয়া-মাতি আও মু‘আযযি বূহা-‘আযা-বান শাদীদান কা-না যা-লিকা ফিল কিতা-বি মাছতূরা-।

এমন কোন জনপদ নেই, যাকে আমি কিয়ামতের আগে ধ্বংস করব না অথবা তাকে অন্য কোন কঠিন শাস্তি দেব না। একথা (তাকদীরের) কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। ৩৭

তাফসীরঃ

৩৭. অর্থাৎ, কাফেরদের উপর এই মুহূর্তে শাস্তি অবতীর্ণ হচ্ছে না বলে তারা যেন মনে না করে চিরদিনের জন্য নিষ্কৃতি পেয়ে গেছে। নিষ্কৃতি তারা পাবে না। হতে পারে এই দুনিয়াতেই তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। আর তা যদি নাও হয়, তবে কিয়ামত যে হবে তাতে তো কোনও সন্দেহ নেই। তখন সকলেই ধ্বংস হবে। তারপর আখেরাতে তাদেরকে অনন্তকাল শাস্তিভোগ করতে হবে।
৫৯

وَمَا مَنَعَنَاۤ اَنۡ نُّرۡسِلَ بِالۡاٰیٰتِ اِلَّاۤ اَنۡ کَذَّبَ بِہَا الۡاَوَّلُوۡنَ ؕ وَاٰتَیۡنَا ثَمُوۡدَ النَّاقَۃَ مُبۡصِرَۃً فَظَلَمُوۡا بِہَا ؕ وَمَا نُرۡسِلُ بِالۡاٰیٰتِ اِلَّا تَخۡوِیۡفًا ٥٩

ওয়ামা মানা‘আনাআননুরছিলা বিলআ-য়া-তি ইল্লাআন কাযযাবা বিহাল আওওয়ালূনা ওয়া আ-তাইনা-ছামূদান না-কাতা মুবসিরাতান ফাজালামূবিহা- ওয়ামা- নুরছিলুবিল আয়া-তি ইল্লা- তাখবীফা-।

(কাফেরদের ফরমায়েশী নিদর্শন) পাঠানো হতে আমাকে কেবল এ বিষয়টাই বিরত রেখেছে যে, পূর্ববর্তীগণ এরূপ নিদর্শন (দেখার পরও তা) অস্বীকার করেছিল। ৩৮ আমি ছামুদ জাতিকে উষ্ট্রী দিয়েছিলাম, যা চোখ খোলার জন্য যথেষ্ট ছিল, কিন্তু তারা তার প্রতি জুলুম করেছিল। আমি নিদর্শন পাঠাই ভয় দেখানোরই জন্য।

তাফসীরঃ

৩৮. মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু সুস্পষ্ট মুজিযা দেখা সত্ত্বেও মুশরিকগণ তাঁর কাছে নিত্য নতুন মুজিযা দাবী করত। এটা তাদের সেই দাবীর জবাব। বলা হচ্ছে, ফরমায়েশী মুজিযা দেখানোর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার একটা নীতি আছে। নীতিটি হল, এরূপ মুজিযা দেখানোর পরও যদি কাফেরগণ ঈমান না আনে, তবে তাদেরকে আযাব দিয়ে ধ্বংস করে ফেলা হয়। তার একটা দৃষ্টান্ত হল ছামুদ জাতি। তাদের দাবী অনুযায়ী পাহাড় থেকে একটি উটনী বের করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা ঈমান আনেনি। ফলে তারা শাস্তিতে নিপতিত হয়। আল্লাহ তাআলার জানা আছে, ফরমায়েশী মুজিযা দেখানো হলেও মুশরিকগণ ঈমান আনবে না। পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মত তারাও নবীকে বরাবর অস্বীকার করতে থাকবে। ফলে তাদেরকে ধ্বংস করা অনিবার্য হয়ে যাবে। কিন্তু এখনই যেহেতু তাদেরকে ধ্বংস করা আল্লাহ তাআলার হিকমতের অনুকূল নয়, তাই তাদেরকে ফরমায়েশী মুজিযা দেখানো হচ্ছে না।
৬০

وَاِذۡ قُلۡنَا لَکَ اِنَّ رَبَّکَ اَحَاطَ بِالنَّاسِ ؕ  وَمَا جَعَلۡنَا الرُّءۡیَا الَّتِیۡۤ اَرَیۡنٰکَ اِلَّا فِتۡنَۃً لِّلنَّاسِ وَالشَّجَرَۃَ الۡمَلۡعُوۡنَۃَ فِی الۡقُرۡاٰنِ ؕ  وَنُخَوِّفُہُمۡ ۙ  فَمَا یَزِیۡدُہُمۡ اِلَّا طُغۡیَانًا کَبِیۡرًا ٪ ٦۰

ওয়া ইযকুলনা-লাকা ইন্না রাব্বাকা আহা-তা বিন্না-ছি ওয়ামা-জা‘আলনার রু’ইয়াল্লাতীআরাইনা-কা ইল্লা-ফিতনাতাললিন্না-ছি ওয়াশশাজারাতাল মাল‘ঊনাতা ফিল কুরআ-নি ওয়ানুখাওবিফুহুম ফামা-ইয়াঝীদুহুম ইল্লা-তুগইয়া-নান কাবীরা-।

(হে নবী!) সেই সময়কে স্মরণ কর, যখন আমি বলেছিলাম, তোমার প্রতিপালক (নিজ জ্ঞান দ্বারা) সমস্ত মানুষকে পরিবেষ্টন করে আছেন। ৩৯ আর আমি তোমাকে যে দৃশ্য দেখিয়েছি, তাকে কাফেরদের জন্য কেবল পরীক্ষার বিষয়ই বানিয়েছি ৪০ এবং কুরআনে বর্ণিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিকেও। আমি তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করে যাচ্ছি, কিন্তু তাতে তাদের ঘোর অবাধ্যতাই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তাফসীরঃ

৩৯. অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি ভালোভাবেই জানেন এসব হঠকারী লোক কোন অবস্থাতেই ঈমান আনবে না। অতঃপর তাদের হঠকারিতার দু’টি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। (এক) আল্লাহ তাআলা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিরাজের সফরে যেসব দৃশ্য দেখিয়েছিলেন, তা ছিল তাঁর নবুওয়াতের খোলা দলীল। কাফেরগণ বায়তুল মুকাদ্দাস সম্পর্কে বহু প্রশ্ন তাঁকে করেছিল। তিনি সবগুলোর ঠিক-ঠিক উত্তরও দিয়েছিলেন, যা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল তিনি সত্যিই রাতের ভেতর এ সফর করে এসেছেন। কিন্তু এ রকম সাক্ষাত প্রমাণ লাভের পরও তারা ঈমান আনেনি; বরং নিজেদের জিদকেই ধরে রাখে। (দুই) কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে, জাহান্নামীদের খাবার হবে ‘যাক্কূম’ গাছ। আরও বলা হয়েছে, এ গাছ জাহান্নামেই জন্মায়। একথা শুনে কাফেরগণ ঈমান আনবে কি উল্টো ঠাট্টা করতে লাগল যে, শোন কথা, আগুনের ভেতর নাকি গাছ জন্মাবে! এটাও কী সম্ভব? তারা চিন্তা করল না যেই সত্তা আগুন সৃষ্টি করেছেন, তিনি যদি সেই আগুনের ভেতর অন্যান্য উদ্ভিদ থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের কোন গাছ সৃষ্টি করে দেন, আগুনের তাপ যার জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং উপযোগী, তাতে আশ্চর্যের কী আছে?
৬১

وَاِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ  قَالَ ءَاَسۡجُدُ لِمَنۡ خَلَقۡتَ طِیۡنًا ۚ ٦١

ওয়া ইযকুলনা-লিলমালাইকাতিছ জু দূলিআ-দামা ফাছাজাদূ ইল্লাইবলীছা কালা আআছজু দুলিমান খালাকতা তীনা-।

এবং সেই সময়কে স্মরণ কর, যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম, আদমকে সিজদা কর। তখন তারা সিজদা করল, কিন্তু ইবলীস করল না। সে বলল, আমি কি তাকে সিজদা করব, যাকে আপনি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন?
৬২

قَالَ اَرَءَیۡتَکَ ہٰذَا الَّذِیۡ کَرَّمۡتَ عَلَیَّ ۫ لَئِنۡ اَخَّرۡتَنِ اِلٰی یَوۡمِ الۡقِیٰمَۃِ لَاَحۡتَنِکَنَّ ذُرِّیَّتَہٗۤ اِلَّا قَلِیۡلًا ٦٢

কা-লা আরাআইতাকা হা-যাল্লাযী কাররামতা ‘আলাইইয়া লাইন আখখারতানি ইলাইয়াওমিল কিয়া-মাতি লাআহতানিকান্না যুররিইইয়াতাহূইল্লা-কালীলা-।

সে বলতে লাগল, বলুন তো, এই কি সেই সৃষ্টি, যাকে আপনি আমার উপর মর্যাদা দান করেছেন! আপনি যদি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দেন, তবে আমি তার বংশধরদের মধ্যে অল্পসংখ্যক ছাড়া বাকি সকলের চোয়ালে লাগাম পরিয়ে দেব। ৪১

তাফসীরঃ

৪১. অর্থাৎ, চোয়ালে লাগাম পরিয়ে যেমন ঘোড়া ও অন্যান্য পশুকে নিজ আয়ত্তে রাখা হয়, তেমনি তাদেরকে আমার কর্তৃত্বাধীন করে নেব।
৬৩

قَالَ اذۡہَبۡ فَمَنۡ تَبِعَکَ مِنۡہُمۡ فَاِنَّ جَہَنَّمَ جَزَآؤُکُمۡ جَزَآءً مَّوۡفُوۡرًا ٦٣

কা-লাযহাব ফামান তাবি‘আকা মিনহুম ফাইন্না জাহান্নামা জাঝাউকুমজাঝাআম মাওফূরা-।

আল্লাহ বললেন, যাও, তাদের মধ্যে যে-কেউ তোমার অনুগামী হবে, জাহান্নামই হবে তোমাদের সকলের শাস্তিপরিপূর্ণ শাস্তি।
৬৪

وَاسۡتَفۡزِزۡ مَنِ اسۡتَطَعۡتَ مِنۡہُمۡ بِصَوۡتِکَ وَاَجۡلِبۡ عَلَیۡہِمۡ بِخَیۡلِکَ وَرَجِلِکَ وَشَارِکۡہُمۡ فِی الۡاَمۡوَالِ وَالۡاَوۡلَادِ وَعِدۡہُمۡ ؕ وَمَا یَعِدُہُمُ الشَّیۡطٰنُ اِلَّا غُرُوۡرًا ٦٤

ওয়াছতাফঝিঝ মানিছতাতা‘তা মিনহুম বিসাওতিকা ওয়া আজলিব ‘আলাইহিম বিখাইলিকা ওয়া রাজিলিকা ওয়া শা-রিকহুম ফিল আমওয়া-লি ওয়াল আওলা-দি ওয়া‘ইদহুম ওয়ামাইয়া‘ইদুহুমুশশাইতা-নুইল্লা-গুরূরা-।

তাদের মধ্যে যার উপর তোমার ক্ষমতা চলে নিজ ডাক দ্বারা বিভ্রান্ত কর, ৪২ তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী দ্বারা তাদের উপর চড়াও হও, ৪৩ তাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে অংশীদার হয়ে যাও ৪৪ এবং তাদেরকে যত পার প্রতিশ্রুতি দাও। বস্তুত শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয়।

তাফসীরঃ

৪২. ‘ডাক দ্বারা বিভ্রান্ত করা’-এর অর্থ অন্তরে পাপকর্মের প্ররোচনা দেওয়া হয়, যেমন কোন কোন মুফাসসিরের মত। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এর দ্বারা গান-বাদ্যের শব্দ বোঝানো হয়েছে, যার আছরে মানুষ পাপকর্মে লিপ্ত হয়।
৬৫

اِنَّ عِبَادِیۡ لَیۡسَ لَکَ عَلَیۡہِمۡ سُلۡطٰنٌ ؕ وَکَفٰی بِرَبِّکَ وَکِیۡلًا ٦٥

ইন্না ‘ইবা-দী লাইছা লাকা ‘আলাইহিম ছুলতা-নুওঁ ওয়া কাফা-বিরাব্বিকা ওয়াকীলা-।

নিশ্চয়ই আমার যারা বান্দা, তাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা চলবে না। ৪৫ (তাদের) রক্ষকরূপে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট।

তাফসীরঃ

৪৫. ‘আমার বান্দা’ বলে সেই সকল মুখলিস ও নিষ্ঠাবান বান্দাদের বোঝানো হয়েছে, যারা আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করতে সচেষ্ট থাকে।
৬৬

رَبُّکُمُ الَّذِیۡ یُزۡجِیۡ لَکُمُ الۡفُلۡکَ فِی الۡبَحۡرِ لِتَبۡتَغُوۡا مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ اِنَّہٗ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا ٦٦

রাব্বুকুমুল্লাযী ইউঝজী লাকুমুল ফুলকা ফিল বাহরি লিতাবতাগূমিন ফাদলিহী ইন্নাহূকানা বিকুম রাহীমা-।

তিনিই তোমাদের প্রতিপালক, যিনি সাগরে তোমাদের জন্য নৌযান চালান, যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ সন্ধান কর। তিনি তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।
৬৭

وَاِذَا مَسَّکُمُ الضُّرُّ فِی الۡبَحۡرِ ضَلَّ مَنۡ تَدۡعُوۡنَ اِلَّاۤ اِیَّاہُ ۚ فَلَمَّا نَجّٰىکُمۡ اِلَی الۡبَرِّ اَعۡرَضۡتُمۡ ؕ وَکَانَ الۡاِنۡسَانُ کَفُوۡرًا ٦٧

ওয়া ইযা-মাছছাকুমুদদুররু ফিল বাহরি দাল্লা মান তাদ‘ঊনা ইল্লাইয়্যা-হু ফালাম্মানাজ্জা-কুম ইলাল বাররি আ‘রাদতুম ওয়া কা-নাল ইনছা-নুকাফূরা-।

সাগরে যখন তোমাদের কোন বিপদ দেখা দেয়, তখন তোমরা যাদেরকে (অর্থাৎ যেই দেবতাদেরকে) ডাক তারা অন্তর্হিত হয়ে যায়, সঙ্গে থাকেন কেবল আল্লাহ। তিনি যখন তোমাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছিয়ে দেন, অমনি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ ঘোর অকৃতজ্ঞ।
৬৮

اَفَاَمِنۡتُمۡ اَنۡ یَّخۡسِفَ بِکُمۡ جَانِبَ الۡبَرِّ اَوۡ یُرۡسِلَ عَلَیۡکُمۡ حَاصِبًا ثُمَّ لَا تَجِدُوۡا لَکُمۡ وَکِیۡلًا ۙ ٦٨

আফাআমিনতুম আইঁ ইয়াখছিফা বিকুমজা-নিবাল বাররি আও ইউরছিলা ‘আলাইকুমহা-সিবান ছু ম্মা লা-তাজিদূলাকুম ওয়াকীলা-।

তবে কি তোমরা এর থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছ যে, আল্লাহ স্থলেরই কোথাও তোমাদেরকে ধসিয়ে দিতে পারেন অথবা তোমাদের প্রতি পাথরবর্ষী ঝড় পাঠাতে পারেন, তখন আর তোমরা নিজেদের কোন রক্ষাকর্তা পাবে না? ৪৬

তাফসীরঃ

৪৬. অর্থাৎ হে মানুষ! আল্লাহ তাআলার দয়ায় সাগরের গ্রাস থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার পর ভাবছ নাকি চিরতরে নিরাপদ হয়ে গেলে, যদ্দরুন আবার নাশোকর ও নাফরমানিতে লিপ্ত হচ্ছ? এমন কি হতে পারে না যে, তিনি স্থলেই তোমাদেরকে ধসিয়ে দেবেন, ফলে ভূগর্ভে চিরতরে হারিয়ে যাবে? তোমরা সর্বক্ষণ আল্লাহ তাআলার মুঠোর মধ্যে রয়েছ, চাইলে তিনি ভূমিকম্প, ভূমিধস, অগ্নিবর্ষণ, পাথরবর্ষণ ইত্যাদি যে কোন শাস্তি দিয়ে তোমাদেরকে ধ্বংস করে ফেলতে পারেন, যা থেকে তোমাদেরকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। -অনুবাদক
৬৯

اَمۡ اَمِنۡتُمۡ اَنۡ یُّعِیۡدَکُمۡ فِیۡہِ تَارَۃً اُخۡرٰی فَیُرۡسِلَ عَلَیۡکُمۡ قَاصِفًا مِّنَ الرِّیۡحِ فَیُغۡرِقَکُمۡ بِمَا کَفَرۡتُمۡ ۙ ثُمَّ لَا تَجِدُوۡا لَکُمۡ عَلَیۡنَا بِہٖ تَبِیۡعًا ٦٩

আম আমিনতুম আইঁ ইউ‘ঈদাকুম ফীহি তা-রাতান উখরা-ফাইউরছিলা ‘আলাইকুমকাসিফাম মিনার রীহি ফাইউগরিকাকুম বিমা-কাফারতুম ছু ম্মা লা-তাজিদূলাকুম ‘আলাইনা বিহী তাবী‘আ-।

না কি তোমরা এর থেকেও নিশ্চিন্ত হয়ে গেছ যে, তিনি তোমাদেরকে আবার তাতেই (অর্থাৎ সাগরে) নিয়ে যেতে পারেন, তারপর তোমাদের প্রতি প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ু পাঠিয়ে অকৃতজ্ঞতার শাস্তি-স্বরূপ তোমাদেরকে ডুবিয়ে দেবেন, যখন তোমরা এমন কাউকে পাবে না, যে এ ব্যাপারে আমার পিছনে লাগতে পারে। ৪৭

তাফসীরঃ

৪৭. অর্থাৎ, আমি তাদেরকে কেন ধ্বংস করেছি এ বিষয়ে যেমন আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার ক্ষমতা কারও নেই, তেমনি আমার ফায়সালা টলানোর জন্যও আমার পিছনে লাগার সাধ্য কেউ রাখে না।
৭০

وَلَقَدۡ کَرَّمۡنَا بَنِیۡۤ اٰدَمَ وَحَمَلۡنٰہُمۡ فِی الۡبَرِّ وَالۡبَحۡرِ وَرَزَقۡنٰہُمۡ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ وَفَضَّلۡنٰہُمۡ عَلٰی کَثِیۡرٍ مِّمَّنۡ خَلَقۡنَا تَفۡضِیۡلًا ٪ ٧۰

ওয়ালাকাদ কাররামনা-বানীআ-দামা ওয়া হামালনা-হুম ফিল বাররি ওয়াল বাহরি ওয়া রাঝাকনা হুম মিনাততাইয়িবা-তি ওয়া ফাদ্দালনা-হুম ‘আলা কাছীরিম মিম্মান খালাকনাতাফদীলা-।

বাস্তবিকপক্ষে আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি এবং স্থলে ও জলে তাদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করেছি, তাদেরকে উত্তম রিযক দান করেছি এবং আমার বহু মাখলুকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। ৪৮

তাফসীরঃ

৪৮. পূর্বে মানুষ সম্পর্কে শয়তানের তাচ্ছিল্যবাক্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘একেই আপনি আমার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন’? তারপর মানুষের অকৃতজ্ঞতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এবার জানানা হচ্ছে যে, বাস্তবিকই মানুষকে অন্যান্য সৃষ্টির উপর বহুমুখী শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে। এর দাবি হল, সে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতায় লিপ্ত থাকবে। কেননা, তাকে শ্রেষ্ঠত্ব তো এমনিই দেওয়া হয় নি। এর দ্বারা পরীক্ষা নেওয়া উদ্দেশ্য যে, সে আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞ থেকে তাঁর অনুগত হয়ে চলে, না অকৃতজ্ঞতা করে তার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়। যে কর্মপন্থাই অবলম্বন করুন না কেন, তার পুরোপুরি হিসাব তার থেকে নেওয়া হবে, যেমন পরের আয়াতে জানানো হয়েছে। -অনুবাদক
৭১

یَوۡمَ نَدۡعُوۡا کُلَّ اُنَاسٍۭ بِاِمَامِہِمۡ ۚ فَمَنۡ اُوۡتِیَ کِتٰبَہٗ بِیَمِیۡنِہٖ فَاُولٰٓئِکَ یَقۡرَءُوۡنَ کِتٰبَہُمۡ وَلَا یُظۡلَمُوۡنَ فَتِیۡلًا ٧١

ইয়াওমা নাদ‘ঊ কুল্লা উনা-ছিম বিইমা-মিহিম ফামান উতিয়া কিতা-বাহূবিইয়ামীনিহী ফাউলাইকা ইয়াকরাঊনা কিতা-বাহুম ওয়ালা-ইউজলামূনা ফাতীলা-।

সেই দিনকে স্মরণ কর, যখন আমি সমস্ত মানুষকে তাদের আমলনামাসহ ডাকব। তারপর যাদেরকে তাদের আমলনামা দেওয়া হবে ডান হাতে, তারা তাদের আমলনামা পড়বে এবং তাদের প্রতি সুতা পরিমাণও জুলুম করা হবে না।
৭২

وَمَنۡ کَانَ فِیۡ ہٰذِہٖۤ اَعۡمٰی فَہُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ اَعۡمٰی وَاَضَلُّ سَبِیۡلًا ٧٢

ওয়া মান কা-না ফী হা-যিহীআ‘মা-ফাহুওয়া ফিল আ-খিরাতি আ‘মা- ওয়া আদাল্লু ছাবীলা-।

আর যে ব্যক্তি দুনিয়ায় অন্ধ হয়ে থেকেছে সে আখেরাতেও অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট থাকবে। ৪৯

তাফসীরঃ

৪৯. এখানে অন্ধ হয়ে থাকার অর্থ দুনিয়ায় সত্য না দেখা ও সত্য হতে মুখ ফিরিয়ে রাখা। যে ব্যক্তি এরূপ করবে আখেরাতেও সে মুক্তির পথ দেখতে পাবে না।
৭৩

وَاِنۡ کَادُوۡا لَیَفۡتِنُوۡنَکَ عَنِ الَّذِیۡۤ اَوۡحَیۡنَاۤ اِلَیۡکَ لِتَفۡتَرِیَ عَلَیۡنَا غَیۡرَہٗ ٭ۖ وَاِذًا لَّاتَّخَذُوۡکَ خَلِیۡلًا ٧٣

ওয়া ইন কা-দূলাইয়াফতিনূনাকা ‘আনিল্লাযীআওহাইনাইলাইকা লিতাফতারিয়া ‘আলাইনা-গাইরাহূ ওয়া ইযাল্লাত্তাখযূকা খালীলা-।

(হে নবী!) আমি তোমার কাছে যে ওহী পাঠিয়েছি, কাফেরগণ তোমাকে তা থেকে বিচ্যুত করার উপক্রম করছিল, যাতে তুমি এর পরিবর্তে অন্য কোন কথা রচনা করে আমার নামে পেশ কর। সেক্ষেত্রে তারা তোমাকে অবশ্যই নিজেদের পরম বন্ধু বানিয়ে নিত। ৫০

তাফসীরঃ

৫০. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর দাওয়াত থেকে ফেরানোর জন্য মুশরিকরা বহুমুখী প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, যেমন তাঁর কাছে তাদের একটা প্রস্তাব ছিল, আপনি যদি আমাদের দেব-দেবীদের নিন্দা করা ছেড়ে দেন তবে আমরা আপনার মাবুদের ইবাদত করব, আরেক প্রস্তাব ছিল আপনি কুরআন থেকে প্রতিমাদের নিন্দামূলক অংশটুকু বদলে দিন, আরও বলেছিল, আপনি গরীব মুসলিমদের বাদ দিয়ে আমাদের জন্য যদি খাস মজলিস করেন, তবে আমরা তাতে যোগ দেব, এমনি আরও বিভিন্ন প্রস্তাব। আল্লাহ তাআলা বলছেন, হে নবী! আপনি আমার হেফাজত ও তত্ত্বাবধানে আছেন, নয়ত আপনি তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করে আমার প্রেরিত ওহী থেকে সরেই যেতেন। এভাবে এ আয়াতে সত্যের উপর অবিচলিত রাখার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আল্লাহ তাআলার বিশেষ মেহেরবানীর কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। এভাবে মানুষকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, কুরআন ও দীনের হিফাজতের কাজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিন্দুমাত্র শিথিলতা প্রদর্শন করেননি এবং ওহী ও সত্য থেকে একচুল বিচ্যুত হননি। আর আল্লাহ তাআলার হিফাজতের কারণে তাঁর দ্বারা তা হওয়া সম্ভবও ছিল না। ليفتنونك (অর্থ তারা আপনাকে ফিতনায় ফেলত)-এর দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য, ছলনা দিয়ে ওহীর হুকুম থেকে বিচ্যুত করা। -অনুবাদক
৭৪

وَلَوۡلَاۤ اَنۡ ثَبَّتۡنٰکَ لَقَدۡ کِدۡتَّ تَرۡکَنُ اِلَیۡہِمۡ شَیۡئًا قَلِیۡلًا ٭ۙ ٧٤

ওয়া লাওলাআন ছাব্বাতনা-কা লাকাদ কিততা তারকানুইলাইহিম শাইআন কালীলা-।

আমি যদি তোমাকে অবিচলিত না রাখতাম, তবে তুমিও তাদের দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়ার উপক্রম করতে।
৭৫

اِذًا لَّاَذَقۡنٰکَ ضِعۡفَ الۡحَیٰوۃِ وَضِعۡفَ الۡمَمَاتِ ثُمَّ لَا تَجِدُ لَکَ عَلَیۡنَا نَصِیۡرًا ٧٥

ইযাল্লাআযাকনা-কা দি‘ফাল হায়া-তি ওয়া দি‘ফাল মামা-তি ছু ম্মা লা-তাজিদুলাকা ‘আলাইনা-নাসীরা-।

আর তা হলে আমি দুনিয়ায়ও তোমাকে দ্বিগুণ শাস্তি দিতাম এবং মৃত্যুর পরও দ্বিগুণ। অতঃপর আমার বিরুদ্ধে তুমি কোন সাহায্যকারী পেতে না। ৫১

তাফসীরঃ

৫১. আল্লাহ তাআলা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে মাছুম বানিয়েছিলেন। আর সে কারণে তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্থির ও অবিচল থাকেন। তিনি কাফেরদের কোন কথা শুনবেন বা সেইমত কাজ করবেন এর তো দূর-দূরান্তেরও কোন সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও নাফরমানী করলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে দ্বিগুণ শাস্তি দেবেন বলে শাসিয়ে দিয়েছেন। আসলে তাঁর ক্ষেত্রে এটা কেবলই ধরে নেওয়ার পর্যায়ভুক্ত। মূল উদ্দেশ্য উম্মতকে সতর্ক করা। বোঝানো হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের একমাত্র ভিত্তি সৎকর্ম। এটা সকলের জন্যই সাধারণ নিয়ম। সুতরাং কোন ব্যক্তি সে আল্লাহ তাআলার যতই নৈকট্যপ্রাপ্ত হোক, যদি নাফরমানী করে বসে, তবে সে শাস্তির উপযুক্ত হয়ে যাবে, বরং নৈকট্যপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে তার শাস্তি হবে দ্বিগুণ।
৭৬

وَاِنۡ کَادُوۡا لَیَسۡتَفِزُّوۡنَکَ مِنَ الۡاَرۡضِ لِیُخۡرِجُوۡکَ مِنۡہَا وَاِذًا لَّا یَلۡبَثُوۡنَ خِلٰفَکَ اِلَّا قَلِیۡلًا ٧٦

ওয়া ইন কা-দূলাইয়াছতাফিঝঝূনাকা মিনাল আরদি লিইউখরিজূকা মিনহা- ওয়া ইযাল্লা ইয়ালবাছূনা খিলা-ফাকা ইল্লা-কালীলা-।

তাছাড়া তারা এই ভূমি (মক্কা) থেকে তোমাদেরকে উচ্ছেদ করার ফিকিরে আছে, যাতে তোমাদেরকে এখান থেকে বের করে দিতে পারে। আর সে রকম হলে তোমার পর তারাও এখানে বেশি দিন থাকতে পারবে না। ৫২

তাফসীরঃ

৫২. অর্থাৎ, মক্কা মুকাররমা থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে চলে যাওয়ার পর কাফেরগণও এখানে বেশি কাল থাকতে পারবে না। সুতরাং বাস্তবে তাই হয়েছিল। হিজরতের আট বছর পর মক্কা মুকাররমায় ইসলামের বিজয় অর্জিত হয় এবং নবম বছর সমস্ত কাফেরকে এখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুকুম দেওয়া হয়। সূরা তাওবার শুরুতে তা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
৭৭

سُنَّۃَ مَنۡ قَدۡ اَرۡسَلۡنَا قَبۡلَکَ مِنۡ رُّسُلِنَا وَلَا تَجِدُ لِسُنَّتِنَا تَحۡوِیۡلًا ٪ ٧٧

ছুন্নাতা মান কাদ আরছালনা-কাবলাকা মিররুছুলিনা-ওয়ালা-তাজিদুলিছুন্নাতিনা-তাহবীলা।

এটা আমার নিয়ম, যা আমি তোমার পূর্বে আমার যে রাসূলগণকে পাঠিয়েছিলাম, তাদের ক্ষেত্রে অবলম্বন করেছিলাম। তুমি আমার নিয়মে কোন পরিবর্তন পাবে না।
৭৮

اَقِمِ الصَّلٰوۃَ لِدُلُوۡکِ الشَّمۡسِ اِلٰی غَسَقِ الَّیۡلِ وَقُرۡاٰنَ الۡفَجۡرِ ؕ اِنَّ قُرۡاٰنَ الۡفَجۡرِ کَانَ مَشۡہُوۡدًا ٧٨

আকিমিসসালা-তা লিদুলূকিশশামছি ইলা-গাছাকিল্লাইলি ওয়া কুরআ-নাল ফাজরি ইন্না কুরআ-নাল ফাজরি কা-না মাশহূদা-।

(হে নবী!) সূর্য হেলার সময় থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামায কায়েম কর ৫৩ এবং ফজরের সময় কুরআন পাঠে যত্নবান থাক। স্মরণ রেখ, ফজরের তিলাওয়াতে ঘটে থাকে সমাবেশ। ৫৪

তাফসীরঃ

৫৩. সূর্য হেলার পর থেকে রাতের অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত নামায কায়েম দ্বারা জোহর, আসর মাগরিব ও ইশা-এই চার নামাযের প্রতি ইশারা করা হয়েছে। ফজরের নামাযকে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর কারণ, ফজরের নামায আদায়ের জন্য মানুষকে ঘুম থেকে জাগতে হয়। ফলে অন্য নামায অপেক্ষা এ নামাযে কষ্ট বেশি হয়। তাই আলাদাভাবে উল্লেখ করে এ নামাযের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৭৯

وَمِنَ الَّیۡلِ فَتَہَجَّدۡ بِہٖ نَافِلَۃً لَّکَ ٭ۖ عَسٰۤی اَنۡ یَّبۡعَثَکَ رَبُّکَ مَقَامًا مَّحۡمُوۡدًا ٧٩

ওয়া মিনাল্লাইলি ফাতাহাজ্জাদ বিহী নাফিলাতাল্লাকা ‘আছাআইঁ ইয়াব‘আছাকা রাব্বুকা মাকা-মাম মাহমূদা-।

রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়বে, যা তোমার জন্য এক অতিরিক্ত ইবাদত। ৫৫ আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে ‘মাকামে মাহমুদ’-এ পৌঁছাবেন। ৫৬

তাফসীরঃ

৫৫. ‘অতিরিক্ত ইবাদত’ দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে, সে সম্পর্কে দু’টি মত আছে। (ক) কতক মুফাসসির বলেন, এ নামায অর্থাৎ, তাহাজ্জুদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য একটি অতিরিক্ত ফরয ছিল। সাধারণ মুসলিমদের প্রতি এটা ফরয করা হয়নি। (খ) কারও মতে অতিরিক্ত হওয়ার অর্থ নফল হওয়া। অর্থাৎ, তাহাজ্জুদ একটি নফল ইবাদত, যেমন আম মুসলিমদের জন্য, তেমনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যও।
৮০

وَقُلۡ رَّبِّ اَدۡخِلۡنِیۡ مُدۡخَلَ صِدۡقٍ وَّاَخۡرِجۡنِیۡ مُخۡرَجَ صِدۡقٍ وَّاجۡعَلۡ لِّیۡ مِنۡ لَّدُنۡکَ سُلۡطٰنًا نَّصِیۡرًا ٨۰

ওয়া কুররাব্বি আদখিলনী মুদ খালা সিদকিওঁ ওয়া আখরিজনী মুখরাজা সিদকিওঁ ওয়াজ‘আলনী মিল্লাদুনকা ছুলতা-নান নাসীরা-।

এবং দু‘আ কর ‘হে প্রতিপালক! আমাকে যেখানে প্রবেশ করাবে, কল্যাণের সাথে প্রবেশ করিও এবং যেখান থেকে বের করবে কল্যাণের সাথে বের করো এবং আমাকে তোমার নিকট থেকে বিশেষভাবে এমন ক্ষমতা দান করো, যার সাথে (তোমার) সাহায্য থাকবে। ৫৭

তাফসীরঃ

৫৭. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন মক্কা মুকাররমা থেকে হিজরত করে মদীনা মুনাওয়ারায় নিজ ঠিকানা বানানোর হুকুম দেওয়া হয়, সেই পটভূমিতেই এ আয়াত নাযিল হয়েছিল। তখনই তাকে এরূপ দু‘আ করতে বলা হয়েছিল। এতে প্রবেশ করানো বলতে মদীনা মুনাওয়ারায় প্রবেশ করানো এবং বের করা বলতে মক্কা মুকাররমা থেকে বের করা বোঝানো হয়েছে। তবে শব্দমালা সাধারণ। কাজেই যখন কেউ কোন নতুন জায়গায় যাওয়ার বা নতুন কোন কাজ করার ইচ্ছা করে, তখনও সে এ দু‘আ পড়তে পারে।
৮১

وَقُلۡ جَآءَ الۡحَقُّ وَزَہَقَ الۡبَاطِلُ ؕ اِنَّ الۡبَاطِلَ کَانَ زَہُوۡقًا ٨١

ওয়া কুল জাআল হাক্কুওয়া ঝাহাকাল বা-তিলু ইন্নাল বা-তিলা কা-না ঝাহূকা-।

এবং বল, সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, নিশ্চয়ই মিথ্যা এমন জিনিস, যা বিলুপ্ত হওয়ারই। ৫৮

তাফসীরঃ

৫৮. এ আয়াতে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, সত্য তথা ইসলাম ও মুসলিমদের বিজয় অর্জিত হবে। সুতরাং যখন মক্কা বিজয় হয় এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র কাবায় ঢুকে তাতে স্থাপিত মূর্তিসমূহ অপসারণ করেন, তখন তাঁর পবিত্র মুখে এ আয়াতই উচ্চারিত হচ্ছিল।
৮২

وَنُنَزِّلُ مِنَ الۡقُرۡاٰنِ مَا ہُوَ شِفَآءٌ وَّرَحۡمَۃٌ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ ۙ وَلَا یَزِیۡدُ الظّٰلِمِیۡنَ اِلَّا خَسَارًا ٨٢

ওয়া নুনাঝঝিলুমিনাল কুরআ-নি মা হুওয়া শিফাউওঁ ওয়া রাহমাতুল লিলমু’মিনীনা ওয়ালা- ইয়াঝীদুজ্জা-লিমীনা ইল্লা-খাছা-রা-।

আমি নাযিল করছি এমন কুরআন, যা মুমিনদের পক্ষে শেফা ও রহমত। তবে জালেমদের ক্ষেত্রে এর দ্বারা ক্ষতি ছাড়া অন্য কিছু বৃদ্ধি হয় না।
৮৩

وَاِذَاۤ اَنۡعَمۡنَا عَلَی الۡاِنۡسَانِ اَعۡرَضَ وَنَاٰ بِجَانِبِہٖ ۚ وَاِذَا مَسَّہُ الشَّرُّ کَانَ یَــُٔوۡسًا ٨٣

ওয়া ইযাআন‘আমনা-‘আলাল ইনছা-নি আ‘রাদা-ওয়া নাআ-বিজা-নিবিহী ওয়া ইযা-মাছছাহুশ শাররু কা-না ইয়াঊছা-।

আমি মানুষকে যখন কোন নি‘আমত দেই, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও পাশ কাটিয়ে যায়। আর যদি কোন অনিষ্ট তাকে স্পর্শ করে তবে সে সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে পড়ে।
৮৪

قُلۡ کُلٌّ یَّعۡمَلُ عَلٰی شَاکِلَتِہٖ ؕ  فَرَبُّکُمۡ اَعۡلَمُ بِمَنۡ ہُوَ اَہۡدٰی سَبِیۡلًا ٪ ٨٤

কুল কুল্লুইঁ ইয়া‘মালু‘আলা-শা-কিলাতিহী ফারাব্বুকুম আ‘লামুবিমান হুওয়া আহদাছাবীলা-।

বলে দাও, প্রত্যেকে নিজ-নিজ পন্থায় কাজ করছে, কে বেশি সঠিক পথে তা তোমার প্রতিপালকই ভালো জানেন।
৮৫

وَیَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الرُّوۡحِ ؕ قُلِ الرُّوۡحُ مِنۡ اَمۡرِ رَبِّیۡ وَمَاۤ اُوۡتِیۡتُمۡ مِّنَ الۡعِلۡمِ اِلَّا قَلِیۡلًا ٨٥

ওয়া ইয়াছআলূনাকা ‘আনির রূহি কুলির রূহুমিন আমরি রাববী ওয়ামাঊতীতুম মিনাল ‘ইল মি ইল্লা-কালীলা-।

(হে নবী!) তারা তোমাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, রূহ আমার প্রতিপালকের হুকুমঘটিত। তোমাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে সামান্যমাত্র। ৫৯

তাফসীরঃ

৫৯. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত আছে, কতিপয় ইয়াহুদী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পরীক্ষা করার অভিপ্রায়ে প্রশ্নে করেছিল, রূহ কি জিনিস? তারই উত্তরে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। উত্তরে কেবল ততটুকু কথাই বলা হয়েছে, যতটুকু মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব। অর্থাৎ, কেবল এতটুকু কথা যে, ‘রূহ সরাসরি আল্লাহ তাআলার আদেশ দ্বারা সৃষ্ট। মানুষের দেহ ও অন্যান্য মাখলুকের ক্ষেত্রে তো লক্ষ্য করা যায়, তাদের সৃষ্টিতে বাহ্যিক আসবাব-উপকরণের কিছু ভূমিকা আছে। যেমন নর-নারীর মিলনে বাচ্চা জন্ম নেয়। কিন্তু রূহের বিষয়টা এ রকম নয়। তার সৃষ্টিতে এ রকম কোন কিছুর ভূমিকা মানুষের দৃষ্টিগোচর হয় না। এটা সরাসরি আল্লাহ তাআলার হুকুমে অস্তিত্ব লাভ করে। রূহ সম্পর্কে এর বেশি বোঝা মানব বুদ্ধির পক্ষে সম্ভব নয়। তাই বলা হয়েছে, তোমাদেরকে অতি সামান্যই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক কিছুই তোমাদের পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। অনেক জিনিসই তোমাদের জ্ঞান-বুদ্ধির অতীত।
৮৬

وَلَئِنۡ شِئۡنَا لَنَذۡہَبَنَّ بِالَّذِیۡۤ اَوۡحَیۡنَاۤ اِلَیۡکَ ثُمَّ لَا تَجِدُ لَکَ بِہٖ عَلَیۡنَا وَکِیۡلًا ۙ ٨٦

ওয়া লাইন শি’না-লানাযহাবান্না বিল্লায ীআওহাইনাইলাইকা ছু ম্মা লা-তাজিদুলাকা বিহী ‘আলাইনা-ওয়াকীলা-।

আমি ইচ্ছা করলে তোমার কাছে যে ওহী পাঠিয়েছি, তা সবই প্রত্যাহার করতে পারতাম, তারপর তুমি তা ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আমার বিরুদ্ধে কোন সাহায্যকারীও পেতে না।
৮৭

اِلَّا رَحۡمَۃً مِّنۡ رَّبِّکَ ؕ اِنَّ فَضۡلَہٗ کَانَ عَلَیۡکَ کَبِیۡرًا ٨٧

ইল্লা-রাহমাতাম মিররাব্বিকা ইন্না ফাদলাহূকা-না ‘আলাইকা কাবীরা-।

কিন্তু তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে এটা এক রহমত (যে, ওহীর ধারা চালু আছে)। বস্তুত তোমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ সুবিপুল।
৮৮

قُلۡ لَّئِنِ اجۡتَمَعَتِ الۡاِنۡسُ وَالۡجِنُّ عَلٰۤی اَنۡ یَّاۡتُوۡا بِمِثۡلِ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنِ لَا یَاۡتُوۡنَ بِمِثۡلِہٖ وَلَوۡ کَانَ بَعۡضُہُمۡ لِبَعۡضٍ ظَہِیۡرًا ٨٨

কুল লাইনিজ তামা‘আতিল ইনছুওয়াল জিন্নু‘আলাআইঁ ইয়া’তূবিমিছলি হা-যাল কুরআনি লা-ইয়া’তূনা বিমিছলিহী ওয়া লাও কা -না বা‘দুহুম লিবা‘দিন জাহীরা-।

বলে দাও, এই কুরআনের মত বাণী তৈরি করে আনার জন্য যদি সমস্ত মানুষ ও জিন একত্র হয়ে যায়, তবুও তারা এ রকম কিছু আনতে পারবে না, তাতে তারা একে অন্যের যতই সাহায্য করুক।
৮৯

وَلَقَدۡ صَرَّفۡنَا لِلنَّاسِ فِیۡ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنِ مِنۡ کُلِّ مَثَلٍ ۫ فَاَبٰۤی اَکۡثَرُ النَّاسِ اِلَّا کُفُوۡرًا ٨٩

ওয়া লাকাদ সাররাফনা-লিন্না-ছি ফী হা-যাল কুরআ-নি মিন কুল্লি মাছালিন, ফাআবা আকছারুন্না-ছি ইল্লা-কুফূরা-।

আমি মানুষের কল্যাণার্থে এ কুরআনে সর্বপ্রকার শিক্ষণীয় বিষয় নানাভাবে বর্ণনা করেছি, তা সত্ত্বেও অধিকাংশ লোক অস্বীকৃতি ছাড়া অন্য কিছুতে রাজি নয়।
৯০

وَقَالُوۡا لَنۡ نُّؤۡمِنَ لَکَ حَتّٰی تَفۡجُرَ لَنَا مِنَ الۡاَرۡضِ یَنۡۢبُوۡعًا ۙ ٩۰

ওয়া কা-লূলান নু’মিনা লাকা হাত্তা-তাফজুরা লানা-মিনাল আরদিইয়ামবূ‘আ-।

তারা বলে, আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার প্রতি ঈমান আনব না, যতক্ষণ না তুমি ভূমি থেকে আমাদের জন্য এক প্রস্রবণ বের করে দেবে।
৯১

اَوۡ تَکُوۡنَ لَکَ جَنَّۃٌ مِّنۡ نَّخِیۡلٍ وَّعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الۡاَنۡہٰرَ خِلٰلَہَا تَفۡجِیۡرًا ۙ ٩١

আও তাকূনা লাকা জান্নাতুম মিন নাখীলিওঁ ওয়া ‘ইনাবিন ফাতুফাজ্জিরাল আনহা-রা খিলা-লাহা- তাফজীরা-।

অথবা তোমার জন্য খেজুর ও আঙ্গুরের একটি বাগান হয়ে যাবে এবং তুমি তার ফাঁকে-ফাঁকে মাটি ফেড়ে নদী-নালা প্রবাহিত করে দেবে।
৯২

اَوۡ تُسۡقِطَ السَّمَآءَ کَمَا زَعَمۡتَ عَلَیۡنَا کِسَفًا اَوۡ تَاۡتِیَ بِاللّٰہِ وَالۡمَلٰٓئِکَۃِ قَبِیۡلًا ۙ ٩٢

আও তুছকিতাছছামাআ কামা-ঝা‘আমতা ‘আলাইনা-কিছাফান আও তা’তিয়া বিল্লা-হি ওয়াল মালাইকাতি কাবীলা-।

অথবা তুমি যেমন দাবী করে থাক, আকাশকে খণ্ড-বিখণ্ড করে আমাদের উপর ফেলে দেবে কিংবা আল্লাহ ও ফিরিশতাগণকে আমাদের সামনা-সামনি নিয়ে আসবে।
৯৩

اَوۡ یَکُوۡنَ لَکَ بَیۡتٌ مِّنۡ زُخۡرُفٍ اَوۡ تَرۡقٰی فِی السَّمَآءِ ؕ  وَلَنۡ نُّؤۡمِنَ لِرُقِیِّکَ حَتّٰی تُنَزِّلَ عَلَیۡنَا کِتٰبًا نَّقۡرَؤُہٗ ؕ  قُلۡ سُبۡحَانَ رَبِّیۡ ہَلۡ کُنۡتُ اِلَّا بَشَرًا رَّسُوۡلًا ٪ ٩٣

আও ইয়াকূনা লাকা বাইতুম মিন ঝুখরুফিন আও তারকা-ফিছছামাই ওয়ালান নু’মিনা লিরুকিইইকা হাত্তা-তুনাঝঝিলা ‘আলাইনা-কিতা-বান নাকরাউহূ কুল ছুবহা-না রাববী হাল কুনতুইল্লা-বাশারার রাছূলা-।

অথবা তোমার জন্য একটি সোনার ঘর হয়ে যাবে অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করবে, কিন্তু আমরা তোমার আকাশে আরোহণকেও ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের প্রতি এমন এক কিতাব অবতীর্ণ করবে, যা আমরা পড়তে পারব। (হে নবী!) বলে দাও, আমার প্রতিপালক পবিত্র। আমি তো একজন মানুষ মাত্র, যাকে রাসূল করে পাঠানো হয়েছে। ৬০

তাফসীরঃ

৬০. ৮৯ থেকে ৯২ পর্যন্ত আয়াতসমূহে মক্কার মুশরিকদের বিভিন্ন দাবী-দাওয়া বর্ণিত হয়েছে। তাদের এসব দাবী ছিল কেবলই জেদপ্রসূত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন মুজিযা তাদের সামনে প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা তাঁর কাছে নিত্য-নতুন মুজিযার ফরমায়েশ করত। আল্লাহ তাআলা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের সমস্ত ফরমায়েশের জবাবে সংক্ষেপে জানিয়ে দিতে বলেছেন যে, আমি খোদা নই যে, এসব কাজে আমার এখতিয়ার থাকবে। আমি তো কেবলই একজন মানুষ। তবে আল্লাহ তাআলা আমাকে নবী করে পাঠিয়েছেন এবং সে কারণে তিনি নিজ হিকমত অনুযায়ী আমাকে কিছু মুজিযা দান করেছেন। আমি নিজ ক্ষমতাবলে সেসব মুজিযার বাইরে কোন মুজিযা দেখাতে পারি না।
৯৪

وَمَا مَنَعَ النَّاسَ اَنۡ یُّؤۡمِنُوۡۤا اِذۡ جَآءَہُمُ الۡہُدٰۤی اِلَّاۤ اَنۡ قَالُوۡۤا اَبَعَثَ اللّٰہُ بَشَرًا رَّسُوۡلًا ٩٤

ওয়ামা- মানা‘আন্না-ছা আইঁ ইউ’মিনূ ইয জাআহুমুল হুদা ইল্লাআন কা-লূ আবা‘আছাল্লা-হু বাশারার রাছূলা-।

যখন তাদের কাছে হিদায়াতের বার্তা আসল তখন তাদেরকে কেবল এ বিষয়টাই ঈমান আনতে বাধা দিয়েছিল যে, তারা বলত, আল্লাহ কি একজন মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন?
৯৫

قُلۡ لَّوۡ کَانَ فِی الۡاَرۡضِ مَلٰٓئِکَۃٌ یَّمۡشُوۡنَ مُطۡمَئِنِّیۡنَ لَنَزَّلۡنَا عَلَیۡہِمۡ مِّنَ السَّمَآءِ مَلَکًا رَّسُوۡلًا ٩٥

কুল্লাও কা-না ফিল আরদি মালাইকাতুইঁ ইয়ামশূনা মুতমাইন্নীনা লানাঝঝালনা‘আলাইহিম মিনাছছামাই মালাকার রাছূলা-।

বলে দাও, পৃথিবীতে যদি ফিরিশতাগণ নিশ্চিন্তে বিচরণ করত, তবে আমি নিশ্চয়ই কোন ফিরিশতাকে তাদের কাছে রাসূল করে পাঠাতাম। ৬১

তাফসীরঃ

৬১. অর্থাৎ, নবীর জন্য এটা জরুরী যে, যাদের কাছে তাকে পাঠানো হবে তিনি তাদের সমজাতীয় হবেন, যাতে তিনি তাদের স্বভাবগত চাহিদা বুঝতে পারেন, তাদের মনস্তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারেন এবং সে অনুযায়ী তাদের পথ প্রদর্শন করতে পারেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তো নবী করে পাঠানো হয়েছে মানব জাতির কাছে। তাই তাঁর মানুষ হওয়াটা আপত্তির বিষয় হতে পারে না; বরং এটাই সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত। হাঁ, দুনিয়ায় যদি ফিরিশতা বসবাস করত, তবে নিঃসন্দেহে তাদের কাছে একজন ফিরিশতাকেই রাসূল করে পাঠানো হত।
৯৬

قُلۡ کَفٰی بِاللّٰہِ شَہِیۡدًۢا بَیۡنِیۡ وَبَیۡنَکُمۡ ؕ اِنَّہٗ کَانَ بِعِبَادِہٖ خَبِیۡرًۢا بَصِیۡرًا ٩٦

কুল কাফা-বিল্লা-হি শাহীদাম বাইনী ওয়া বাইনাকুম ইন্নাহূকা-না বি‘ইবা-দিহী খাবীরাম বাসীরা-।

বল, আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হওয়ার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। নিশ্চয়ই তিনি নিজ বান্দাদের সম্পর্কে পরিপূর্ণরূপে অবগত, তিনি সবকিছু দেখছেন।
৯৭

وَمَنۡ یَّہۡدِ اللّٰہُ فَہُوَ الۡمُہۡتَدِ ۚ وَمَنۡ یُّضۡلِلۡ فَلَنۡ تَجِدَ لَہُمۡ اَوۡلِیَآءَ مِنۡ دُوۡنِہٖ ؕ وَنَحۡشُرُہُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ عَلٰی وُجُوۡہِہِمۡ عُمۡیًا وَّبُکۡمًا وَّصُمًّا ؕ مَاۡوٰىہُمۡ جَہَنَّمُ ؕ کُلَّمَا خَبَتۡ زِدۡنٰہُمۡ سَعِیۡرًا ٩٧

ওয়া মাইঁ ইয়াহদিল্লা -হু ফাহুওয়াল মুহতাদি ওয়ামাইঁ ইউদলিলফালান তাজিদালাহুম আওলিয়াআ মিন দূ নিহী ওয়ানাহশুরুহুম ইয়াওমাল কিয়া-মাতি ‘আলা-ওজূহিহিম ‘উমইয়াওঁ ওয়া বুকমাওঁ ওয়া সুম্মাম মা’ওয়া-হুম জাহান্নামু কুল্লামা-খাবাত ঝিদনা-হুম ছা‘ঈরা-।

আল্লাহ যাকে হিদায়াত দান করেন সেই সঠিক পথপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। আর যাকে তিনি বিপথগামী করেন, তার জন্য তুমি কিছুতেই তাকে ছাড়া অন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না। কিয়ামতের দিন তাদেরকে অন্ধ, বোবা ও বধিররূপে মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায় সমবেত করব। তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। যখনই তার আগুন স্তিমিত হতে শুরু করবে অমনি আমি তা আরও বেশি উত্তপ্ত করে দেব।
৯৮

ذٰلِکَ جَزَآؤُہُمۡ بِاَنَّہُمۡ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَقَالُوۡۤا ءَاِذَا کُنَّا عِظَامًا وَّرُفَاتًا ءَاِنَّا لَمَبۡعُوۡثُوۡنَ خَلۡقًا جَدِیۡدًا ٩٨

যা-লিকা জাঝাউহুম বিআন্নাহুম কাফারূবিআ-য়া-তিনা- ওয়াকা-লূ আইযা- কুন্না‘ইজা-মাওঁ ওয়া রুফা-তান আইন্না-লামাব‘ঊছূনা খালকান জাদীদা-।

এটাই তাদের শাস্তি। কেননা তারা আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করেছিল এবং বলেছিল, আমরা যখন (মরে) অস্থিতে পরিণত হব ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাব, তারপরও আমাদেরকে নতুনভাবে জীবিত করে ওঠানো হবে?
৯৯

اَوَلَمۡ یَرَوۡا اَنَّ اللّٰہَ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ قَادِرٌ عَلٰۤی اَنۡ یَّخۡلُقَ مِثۡلَہُمۡ وَجَعَلَ لَہُمۡ اَجَلًا لَّا رَیۡبَ فِیۡہِ ؕ فَاَبَی الظّٰلِمُوۡنَ اِلَّا کُفُوۡرًا ٩٩

আওয়া লাম ইয়ারাও আন্নাল্লা-হাল্লাযী খালাকাছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদা কা-দিরুন ‘আলাআইঁ ইয়াখলুকা মিছলাহুম ওয়া জা‘আলা লাহুম আজালাল লা-রাইবা ফীহি ফাআবাজ্জা-লিমূনা ইল্লা-কুফূরা-।

তারা কি বুঝতে পারল না যে, যেই আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তিনি তাদের মত মানুষ পুনরায় সৃষ্টি করতেও সক্ষম? তিনি তাদের জন্য স্থির করে রেখেছেন এমন এক কাল, যার (আসার) মধ্যে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তথাপি জালেমগণ অস্বীকৃতি ছাড়া অন্য কিছুতে সম্মত নয়।
১০০

قُلۡ لَّوۡ اَنۡتُمۡ تَمۡلِکُوۡنَ خَزَآئِنَ رَحۡمَۃِ رَبِّیۡۤ اِذًا لَّاَمۡسَکۡتُمۡ خَشۡیَۃَ الۡاِنۡفَاقِ ؕ  وَکَانَ الۡاِنۡسَانُ قَتُوۡرًا ٪ ١۰۰

কুল্লাও আনতুম তামলিকূনা খাঝাইনা রাহমাতি রাববীইযাল্লাআমছাকতুম খাশইয়াতাল ইনফা-কি ওয়া কা-নাল ইনছা-নুকাতূরা-।

(হে নবী! কাফেরদেরকে) বলে দাও, আমার প্রতিপালকের রহমতের ভাণ্ডার যদি তোমাদের এখতিয়ারাধীন থাকত, তবে খরচ হয়ে যাওয়ার ভয়ে তোমরা অবশ্যই হাত বন্ধ করে রাখতে। ৬২ মানুষ বড়ই সংকীর্ণমনা।

তাফসীরঃ

৬২. এখানে রহমতের ভাণ্ডার দ্বারা নবুওয়াত দানের এখতিয়ার বোঝানো হয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতকে অস্বীকার করে মক্কার কাফেরগণ বলত, এটা মক্কা ও তায়েফের বড় কোন ব্যক্তিকে কেন দেওয়া হল না। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল, কাউকে নবুওয়াত দিলে সেটা আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী দেওয়া উচিত ছিল। আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে বলছেন, নবুওয়াত দেওয়ার ক্ষমতা যদি তোমাদের হাতে ছাড়া হত, তবে তোমরা অর্থ-সম্পদের ক্ষেত্রে যেমন কার্পণ্য কর, এক্ষেত্রেও তেমনি কার্পণ্য করতে। ফলে খরচ হয়ে যাওয়ার ভয়ে তা কাউকে দিতে না।
১০১

وَلَقَدۡ اٰتَیۡنَا مُوۡسٰی تِسۡعَ اٰیٰتٍۭ بَیِّنٰتٍ فَسۡـَٔلۡ بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اِذۡ جَآءَہُمۡ فَقَالَ لَہٗ فِرۡعَوۡنُ اِنِّیۡ لَاَظُنُّکَ یٰمُوۡسٰی مَسۡحُوۡرًا ١۰١

ওয়া লাকাদ আ-তাইনা-মূছা-তিছ‘আ আ-য়া-তিম বাইয়িনা-তিন ফাছআল বানী ইছরাঈলা ইয জাআহুম ফাকা-লা লাহূফির‘আউনুইন্নী লাআজুন্নুকা ইয়া-মূছামাছহূরা-।

আমি মূসাকে নয়টি স্পষ্ট নিদর্শন দিয়েছিলাম। ৬৩ বনী ইসরাঈলকে জিজ্ঞেস করে দেখ, সে যখন তাদের কাছে আসল, তখন ফির‘আউন তাকে বলেছিল, হে মূসা! তোমার সম্পর্কে তো আমার ধারণা কেউ তোমাকে যাদু করেছে।

তাফসীরঃ

৬৩. নিদর্শনগুলো কী ছিল? একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যাখ্যা করেছেন যে, এগুলো ছিল নয়টি বিধান, যথা ১. শিরক করবে না। ২. চুরি করবে না, ৩. ব্যভিচার করবে না, ৪. কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করবে না, ৫. মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কাউকে হত্যা বা অন্য কোন শাস্তির সম্মুখীন করবে না, ৬. যাদু করবে না, ৭. সুদ খাবে না, ৮. চরিত্রবতী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করবে না এবং ৯. যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাবে না (আবু দাঊদ, নাসাঈ, ইবন মাজা) [ইমাম ইবন কাছীর (রহ) সহ আরও অনেকের মতে ‘নয়টি নিদর্শন’ দ্বারা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নয়টি নিদর্শনকে বোঝানো হয়েছে। তা হল, শুভ্রৌজ্জ্বল হাত, লাঠি, দুর্ভিক্ষ, ফসলহানি, প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত। -অনুবাদক]
১০২

قَالَ لَقَدۡ عَلِمۡتَ مَاۤ اَنۡزَلَ ہٰۤؤُلَآءِ اِلَّا رَبُّ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ بَصَآئِرَ ۚ وَاِنِّیۡ لَاَظُنُّکَ یٰفِرۡعَوۡنُ مَثۡبُوۡرًا ١۰٢

কা-লা লাকাদ ‘আলিমতা মাআনঝালা হাউলাই ইল্লা-রাব্বুছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদিবাসাইরা ওয়া ইন্নী লাআজুন্নুকা ইয়া-ফির‘আওনুমাছবূরা-।

মূসা বলল, তুমি ভালো করেই জান, এসব নিদর্শন অন্য কেউ নয়; বরং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই সুস্পষ্ট উপলব্ধি সৃষ্টির জন্য অবতীর্ণ করেছেন। আর হে ফির‘আউন! তোমার সম্পর্কে তো আমার ধারণা তোমার ধ্বংস আসন্ন।
১০৩

فَاَرَادَ اَنۡ یَّسۡتَفِزَّہُمۡ مِّنَ الۡاَرۡضِ فَاَغۡرَقۡنٰہُ وَمَنۡ مَّعَہٗ جَمِیۡعًا ۙ ١۰٣

ফাআরা-দা আইঁ ইয়াছতাফিঝঝাহুম মিনাল আরদি ফাআগরাকনা-হু ওয়া মাম মা‘আহূ জামী‘আ-।

তারপর ফির‘আউন সংকল্প করেছিল, তাদেরকে (অর্থাৎ বনী ইসরাঈলকে) সে দেশ থেকে উচ্ছেদ করবে, কিন্তু আমি তাকে এবং সঙ্গীগণকে সকলকে নিমজ্জিত করলাম।
১০৪

وَّقُلۡنَا مِنۡۢ بَعۡدِہٖ لِبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اسۡکُنُوا الۡاَرۡضَ فَاِذَا جَآءَ وَعۡدُ الۡاٰخِرَۃِ جِئۡنَا بِکُمۡ لَفِیۡفًا ؕ ١۰٤

ওয়া কুলনা-মিম বা‘দিহী লিবানীইছরাঈলাছকুনুল আরদাফাইযা-জাআ ওয়া‘দুল আ-খিরাতী জি’না-বিকুম লাফীফা-।

তারপর বনী ইসরাঈলকে বললাম, তোমরা ভূ-পৃষ্ঠে বসবাস কর, তারপর যখন আখেরাতের ওয়াদা পূরণের সময় এসে যাবে, তখন আমি তোমাদের সকলকে একত্র করে উপস্থিত করব।
১০৫

وَبِالۡحَقِّ اَنۡزَلۡنٰہُ وَبِالۡحَقِّ نَزَلَ ؕ  وَمَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ اِلَّا مُبَشِّرًا وَّنَذِیۡرًا ۘ ١۰٥

ওয়া বিলহাক্কিআনঝালনা-হু ওয়া বিলহাক্কিনাঝালা ওয়ামাআরছালনা-কা ইল্লামুবাশশিরাওঁ ওয়া নাযীরা-।

আমি এ কুরআনকে সত্যসহই নাযল করেছি এবং সত্যসহই এটা অবতীর্ণ হয়েছে। (হে নবী!) আমি তোমাকে কেবল একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই পাঠিয়েছি।
১০৬

وَقُرۡاٰنًا فَرَقۡنٰہُ لِتَقۡرَاَہٗ عَلَی النَّاسِ عَلٰی مُکۡثٍ وَّنَزَّلۡنٰہُ تَنۡزِیۡلًا ١۰٦

ওয়া কুরআ-নান ফারাকনা-হুলিতাকরাআহূ ‘আলান্না-ছি ‘আলা- মুকছিওঁ ওয়া নাঝঝালনা-হু তানঝীলা-।

আমি কুরআনকে আলাদা আলাদা অংশ করে দিয়েছি, যাতে তুমি তা মানুষের সামনে থেমে থেমে পড়তে পার আর আমি এটা নাযিল করেছি অল্প-অল্প করে।
১০৭

قُلۡ اٰمِنُوۡا بِہٖۤ اَوۡ لَا تُؤۡمِنُوۡا ؕ  اِنَّ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡعِلۡمَ مِنۡ قَبۡلِہٖۤ اِذَا یُتۡلٰی عَلَیۡہِمۡ یَخِرُّوۡنَ لِلۡاَذۡقَانِ سُجَّدًا ۙ ١۰٧

কুল আ-মিনূবিহীআও লা-তু’মিনূ ইন্নাল্লাযীনা ঊতুল ‘ইলমা মিন কাবলিহীইযাইউতলা-‘আলাইহিম ইয়াখিররূনা লিল আযকা-নি ছুজ্জাদা-(ছিজদাহ-৪)।

(কাফেরদেরকে) বলে দাও, তোমরা এতে ঈমান আন বা নাই আন, যাদেরকে এর আগে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, তাদের সামনে যখন (কুরআন) পড়া হয় তখন তারা থুতনি ফেলে সিজদায় পড়ে যায়।
১০৮

وَّیَقُوۡلُوۡنَ سُبۡحٰنَ رَبِّنَاۤ اِنۡ کَانَ وَعۡدُ رَبِّنَا لَمَفۡعُوۡلًا ١۰٨

ওয়া ইয়াকূলূনা ছুবহা-না রাব্বিনাইন কা-না ওয়া‘দুরাব্বিনা-লামাফ‘ঊলা-।

এবং বলে, আমাদের প্রতিপালক পবিত্র, নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালকের ওয়াদা বাস্তবায়িত হয়েই থাকে। ৬৪

তাফসীরঃ

৬৪. এর দ্বারা যাদেরকে তাওরাত ও ইনজীলের জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তাদেরকে বোঝানো হয়েছে। এসব কিতাবে শেষ নবীর আগমন সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। তাই এর অকৃত্রিম অনুসারীরা কুরআন মাজীদ শুনে বলত, আল্লাহ তাআলা আখেরী যামানায় যে কিতাব নাযিলের এবং যেই নবী পাঠানোর ওয়াদা করেছিলেন, তা পূর্ণ হয়ে গেছে।
১০৯

وَیَخِرُّوۡنَ لِلۡاَذۡقَانِ یَبۡکُوۡنَ وَیَزِیۡدُہُمۡ خُشُوۡعًا ٛ ١۰٩

ওয়া ইয়াখিররূনা লিলআযকা-নি ইয়াবকূনা ওয়া ইয়াঝীদুহুম খুশূ‘আ-।

এবং তারা কাঁদতে কাঁদতে থুতনির উপর লুটিয়ে পড়ে এবং এটা (অর্থাৎ কুরআন) তাদের অন্তরের বিনয় আরও বৃদ্ধি করে। ৬৫

তাফসীরঃ

৬৫. এটা সিজদার আয়াত। আরবীতে এ আয়াত যখনই তিলাওয়াত করা হবে সিজদা করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। অবশ্য কেবল তরজমা পড়ার দ্বারা সিজদা ওয়াজিব হয় না। মুখে উচ্চারণ না করে মনে মনে পড়লেও সিজদা ওয়াজিব হয় না।
১১০

قُلِ ادۡعُوا اللّٰہَ اَوِ ادۡعُوا الرَّحۡمٰنَ ؕ اَیًّا مَّا تَدۡعُوۡا فَلَہُ الۡاَسۡمَآءُ الۡحُسۡنٰی ۚ وَلَا تَجۡہَرۡ بِصَلَاتِکَ وَلَا تُخَافِتۡ بِہَا وَابۡتَغِ بَیۡنَ ذٰلِکَ سَبِیۡلًا ١١۰

কুলিদ‘উল্লা-হা আবিদ ‘উর রাহমা-না আইঁ ইয়াম্মা-তাদ‘ঊ ফালাহুল আছমাঊল হুছনা-ওয়ালা-তাজহার বিসালা-তিকা ওয়ালা-তুখা-ফিত বিহা-ওয়াবতাগি বাইনা যালিকা ছাবীলা-।

বলে দাও, তোমরা আল্লাহকে ডাক বা রহমানকে ডাক, যে নামেই তোমরা (আল্লাহকে) ডাক, (একই কথা। কেননা) সমস্ত সুন্দর নাম তো তাঁরই। ৬৬ তুমি নিজের নামায বেশি উঁচু স্বরে পড়বে না এবং অতি নিচু স্বরেও নয়; বরং উভয়ের মাঝামাঝি পন্থা অবলম্বন করবে। ৬৭

তাফসীরঃ

৬৬. এ আয়াতের পটভূমি নিম্নরূপ, মুশরিকরা জানত না আল্লাহ তাআলার একটি নাম রহমান। ফলে মুসলিমগণ যখন ‘ইয়া আল্লাহ’, ‘ইয়া রহমান’ বলে ডাকত, মুশরিকরা তা নিয়ে ঠাট্টা করত। তারা বলত, একদিকে তো তোমরা বলছ ‘আল্লাহ এক’। অন্যদিকে দুই খোদাকে ডাকছ। আল্লাহকে এবং তাঁর সাথে রহমানকে। এ আয়াতের তাদের সেই অবান্তর কথার উত্তর দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, ‘আল্লাহ’ ও ‘রহমান’ উভয়ই আল্লাহ তাআলারই নাম। বরং তাঁর এ ছাড়াও আরও অনেক ভালো ভালো নাম আছে। সেগুলোকে ‘আল-আসমাউল হুসনা’ বলে। তাঁকে তার যে-কোনও নামেই ডাকা যায়। তাতে তাওহীদের আকীদা দূষিত হয় না।
১১১

وَقُلِ الۡحَمۡدُ لِلّٰہِ الَّذِیۡ لَمۡ یَتَّخِذۡ وَلَدًا وَّلَمۡ یَکُنۡ لَّہٗ شَرِیۡکٌ فِی الۡمُلۡکِ وَلَمۡ یَکُنۡ لَّہٗ وَلِیٌّ مِّنَ الذُّلِّ وَکَبِّرۡہُ تَکۡبِیۡرًا ٪ ١١١

ওয়া কুল্লি হামদুলিল্লা-হিল্লাযী লাম ইয়াত্তাখিযওয়ালাদাওঁ ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহূশারীকুন ফিল মুলকি ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহূওয়ালিইয়ুম মিনাযযুলিল ওয়া কাব্বিরহু তাকবীরা-।

বল, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি, তাঁর রাজত্বে কোন অংশীদার নেই এবং অক্ষমতা হতে রক্ষার জন্য তাঁর কোন অভিভাবকের প্রয়োজন নেই। ৬৮ তাঁর মহিমা বর্ণনা কর, ঠিক যেভাবে তাঁর মহিমা বর্ণনা করা উচিত।

তাফসীরঃ

৬৮. বহু মুশরিকের ধারণা ছিল, যেই সত্তার পুত্র সন্তান নেই এবং যার রাজত্বেও কোন অংশীদার নেই সে তো বড়ই দুর্বল হবে। এ আয়াত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সন্তান বা সাহায্যকারীর দরকার তো তারই হয়, যে নিজে দুর্বল। আল্লাহ তাআলার সত্তা অসীম শক্তিমান। কাজেই দুর্বলতা দূর করার জন্য তার না সন্তানের দরকার আছে, না সাহায্যকারীর।
সূরা বনী-ইসরাঈল | মুসলিম বাংলা