সূরা
পারা

Loading verses...

অন্যান্য

অনুবাদ
তেলাওয়াত

সূরা ইউসুফ (يوسف) | নবী ইউসুফ (আঃ)

মাক্কী

মোট আয়াতঃ ১১১

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

الٓرٰ ۟  تِلۡکَ اٰیٰتُ الۡکِتٰبِ الۡمُبِیۡنِ ۟ ١

আলিফ লাম রা- তিলকা আ-য়া-তুল কিতা-বিল মুবীন।

আলিফ-লাম-রা। এগুলো সত্যকে পরিস্ফুটনকারী কিতাবের আয়াত।

اِنَّاۤ اَنۡزَلۡنٰہُ قُرۡءٰنًا عَرَبِیًّا لَّعَلَّکُمۡ تَعۡقِلُوۡنَ ٢

ইন্নাআনঝালনা-হু কুরআ-নান ‘আরাবিইইয়াল লা‘আল্লাকুম তা‘কিলূন।

আমি একে আরবী ভাষার কুরআনরূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার।

نَحۡنُ نَقُصُّ عَلَیۡکَ اَحۡسَنَ الۡقَصَصِ بِمَاۤ اَوۡحَیۡنَاۤ اِلَیۡکَ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنَ ٭ۖ وَاِنۡ کُنۡتَ مِنۡ قَبۡلِہٖ لَمِنَ الۡغٰفِلِیۡنَ ٣

নাহনুনাকুসসু‘আলাইকা আহছানাল কাসাসি বিমাআওহাইনাইলাইকা হা-যাল কুরআনা ওয়া ইন কুনতা মিন কাবলিহী লামিনাল গা-ফিলীন।

(হে নবী!) আমি ওহী মারফত এই যে কুরআন তোমার কাছে পাঠিয়েছি, এর মাধ্যমে তোমাকে এক উৎকৃষ্টতম ঘটনা শোনাচ্ছি, যদিও তুমি এর আগে এ সম্পর্কে (অর্থাৎ এ ঘটনা সম্পর্কে) বিলকুল অনবহিত ছিলে।

اِذۡ قَالَ یُوۡسُفُ لِاَبِیۡہِ یٰۤاَبَتِ اِنِّیۡ رَاَیۡتُ اَحَدَ عَشَرَ کَوۡکَبًا وَّالشَّمۡسَ وَالۡقَمَرَ رَاَیۡتُہُمۡ لِیۡ سٰجِدِیۡنَ ٤

ইয কা-লা ইঊছুফুলিআবীহি ইয়াআবাতি ইন্নী রাআইতু আহাদা ‘আশারা কাওকাবাওঁ ওয়াশশামছা ওয়াল কামারা রাআইতুহুম লী ছা-জিদীন।

(এটা সেই সময়ের কথা,) যখন ইউসুফ নিজ পিতা (ইয়াকুব আলাইহিস সালাম) কে বলেছিল, আব্বাজী! আমি (স্বপ্নযোগে) এগারটি নক্ষত্র এবং সূর্য ও চন্দ্রকে দেখেছি। আমি দেখেছি তারা সকলে আমাকে সিজদা করছে।

قَالَ یٰبُنَیَّ لَا تَقۡصُصۡ رُءۡیَاکَ عَلٰۤی اِخۡوَتِکَ فَیَکِیۡدُوۡا لَکَ کَیۡدًا ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ لِلۡاِنۡسَانِ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ ٥

কা-লা ইয়া-বুনাইইয়া লা-তাকসুস রু’ইয়া-কা ‘আলা-ইখওয়াতিকা ফাইয়াকীদূলাকা কাইদান ইন্নাশশাইতা-না লিলইনছা-নি ‘আদুওউম মুবীন।

সে বলল, বাছা! নিজের এ স্বপ্ন তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা করো না, পাছে তারা তোমার বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র করে। কেননা শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।

তাফসীরঃ

১. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তার ব্যাখ্যা হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের জানা ছিল। তার ব্যাখ্যা ছিল এই যে, এক সময় হযরত ইউসুফ আলাইহিস অতি উচ্চ মর্যাদা লাভ করবেন। ফলে এমনকি তার এগার ভাই ও পিতা-মাতা তার বাধ্য ও অনুগত হয়ে যাবে। অপর দিকে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সর্বমোট পুত্র ছিল বারজন। তার মধ্যে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ও বিনইয়ামীন ছিলেন এক মায়ের এবং অন্যরা অন্য মায়ের। হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের আশঙ্কা ছিল এ স্বপ্নের কথা শুনলে সৎ ভাইয়েরা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়তে পারে এবং শয়তানের প্ররোচনায় তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপও গ্রহণ করতে পারে।

وَکَذٰلِکَ یَجۡتَبِیۡکَ رَبُّکَ وَیُعَلِّمُکَ مِنۡ تَاۡوِیۡلِ الۡاَحَادِیۡثِ وَیُتِمُّ نِعۡمَتَہٗ عَلَیۡکَ وَعَلٰۤی اٰلِ یَعۡقُوۡبَ کَمَاۤ اَتَمَّہَا عَلٰۤی اَبَوَیۡکَ مِنۡ قَبۡلُ اِبۡرٰہِیۡمَ وَاِسۡحٰقَ ؕ  اِنَّ رَبَّکَ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ ٪ ٦

ওয়া কাযা-লিকা ইয়াজতাবীকা রাব্বুকা ওয়া ইউ‘আলিলমুকা মিন তা’বীলিল আহা-দীছিওয়া ইউতিম্মুনি‘মাতাহূ‘আলাইকা ওয়া ‘আলা-আ-লি ইয়া‘কূবা কামাআতাম্মাহা‘আলাআবাওয়াইকা মিন কাবলুইবরা-হীমা ওয়া ইছহা-কা ইন্না রাব্বাকা ‘আলীমুন হাকীম।

আর এভাবেই তোমার প্রতিপালক তোমাকে (নবুওয়াতের জন্য) মনোনীত করবেন এবং তোমাকে সকল কথার সঠিক মর্মোদ্ধার শিক্ষা দেবেন (স্বপ্নের তাবীর জানাও তার অন্তর্ভুক্ত) এবং তোমার প্রতি ও ইয়াকুবের সন্তানদের প্রতি নিজ অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন, যেভাবে ইতঃপূর্বে তিনি পূর্ণ করেছিলেন তোমার পিতৃদ্বয়- ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতি। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

২. অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যেমন এ স্বপ্নের মাধ্যমে তোমাকে সুসংবাদ দিয়েছেন যে, সকলে তোমার অনুগত হয়ে যাবে, তেমনি তিনি নবুওয়াত দানের মাধ্যমে তোমাকে আরও বহু নি‘আমতে পরিপ্লুত করে তুলবেন।

لَقَدۡ کَانَ فِیۡ یُوۡسُفَ وَاِخۡوَتِہٖۤ اٰیٰتٌ لِّلسَّآئِلِیۡنَ ٧

লাকাদ কা-না ফী ইঊছুফা ওয়া ইখওয়াতিহীআ-য়া-তুল লিছছাইলীন।

প্রকৃতপক্ষে যারা (তোমার কাছে এ ঘটনা) জিজ্ঞেস করছে, তাদের জন্য ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের ঘটনায় আছে বহু নিদর্শন।

তাফসীরঃ

৩. বাহ্যত এর দ্বারা সেই কাফেরদের প্রতি ইশারা করা হয়েছে, যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিল, বনী ইসরাঈল ফিলিস্তিন ছেড়ে মিসরের অভিবাসী হয়েছিল কেন? তাদের এ প্রশ্নের আসল উদ্দেশ্য তো ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লা-জবাব করা। তারা মনে করেছিল তিনি উত্তর দিতে সক্ষম হবেন না। আল্লাহ তাআলা বোঝাচ্ছেন যে, তাদের প্রশ্ন দূরভিসন্ধিমূলক হলেও এ ঘটনার ভেতর তাদের জন্য বহু শিক্ষা রয়েছে যদি তারা আকল-বুদ্ধিকে কাজে লাগায়। (এক) প্রথমত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র মুখে এ ঘটনাটি বিবৃত হওয়া তাঁর নবুওয়াতের এক সাক্ষাৎ প্রমাণ। এটাই কি কিছু কম শিক্ষা? (দুই) হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে যত চক্রান্ত করা হয়েছে, সে চক্রান্তের হোতা তাঁর ভাইয়েরা হোক বা যুলায়খা ও তার সখীরা, শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটিরই মুখোশ খুলে গেছে এবং চূড়ান্ত বিজয় ও অভাবিতপূর্ব সম্মান হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামেরই নসীব হয়েছে।

اِذۡ قَالُوۡا لَیُوۡسُفُ وَاَخُوۡہُ اَحَبُّ اِلٰۤی اَبِیۡنَا مِنَّا وَنَحۡنُ عُصۡبَۃٌ ؕ  اِنَّ اَبَانَا لَفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنِۣ ۚۖ ٨

ইযকা-লূলাইঊছুফুওয়া আখূহু আহাব্বুইলাআবীনা-মিন্না-ওয়া নাহনু‘উসবাতুন ইন্না আবা-না-লাফী দালা-লিম মুবীন।

(এটা সেই সময়ের ঘটনা) যখন ইউসুফের (সৎ) ভাইগণ (পরস্পরে) বলেছিল, নিশ্চয়ই আমাদের পিতার কাছে আমাদের তুলনায় ইউসুফ ও তার (সহোদর) ভাই (বিনইয়ামীনই) বেশি প্রিয়, অথচ আমরা (তার পক্ষে) একটি সুসংহত দল। #%৪ #%আমাদের বিশ্বাস যে, আমাদের পিতা সুস্পষ্ট কোনও বিভ্রান্তিতে নিপতিত।

তাফসীরঃ

৪. অর্থাৎ, আমাদের যেমন বয়স ও শক্তি বেশি, তেমনি আমরা সংখ্যায়ও অধিক। সে কারণে আমরা পিতার বাহুবলও বটে। তাঁর যখন কোন সাহায্যের দরকার হয়, তখন আমরাই তাঁর সাহায্য করার ক্ষমতা রাখি। সুতরাং তাঁর উচিত আমাদেরকেই বেশি মহব্বত করা।

اقۡتُلُوۡا یُوۡسُفَ اَوِ اطۡرَحُوۡہُ اَرۡضًا یَّخۡلُ لَکُمۡ وَجۡہُ اَبِیۡکُمۡ وَتَکُوۡنُوۡا مِنۡۢ بَعۡدِہٖ قَوۡمًا صٰلِحِیۡنَ ٩

উকতুলূইঊছুফা আবিতরাহূহুআরদাইঁ ইয়াখলুলাকুম ওয়াজহু আবীকুম ওয়াতাকূনূমিম বা‘দিহী কাওমান সা-লিহীন।

(সুতরাং এর সমাধান এই যে,) তোমরা ইউসুফকে হত্যা করে ফেল অথবা তাকে অন্য কোনও স্থানে ফেলে আস, যাতে তোমাদের পিতার সবটা মনোযোগ কেবল তোমাদেরই দিকে চলে আসে। আর এসব করার পর তোমরা (তাওবা করে) ভালো লোক হয়ে যাবে।

তাফসীরঃ

৫. এ তরজমা করা হয়েছে আয়াতের একটি তাফসীর অনুযায়ী। যেন তাদের ধারণা ছিল গুনাহ তো বড়জোর একটাই হবে! আর তাওবা দ্বারা যে-কোনও গুনাহই মাফ হয়ে যায়। সুতরাং এটা করার পর তোমরা তাওবা করে নিও, তারপর সারা জীবন ভালো হয়ে চলো। অথচ কারও উপর জুলুম করা হলে সে গুনাহ কেবল তাওবা দ্বারাই মাফ হয় না; বরং স্বয়ং মজলুম কর্তৃক ক্ষমা করাও জরুরী। এ বাক্যটির আরও এক তাফসীরও হতে পারে। তা এই যে, এর দ্বারা তারা পরে তাওবা করে ভালো হয়ে যাওয়ার কথা বোঝাতে চায়নি; বরং এর অর্থ হচ্ছে এসব করার পর তোমাদের সব ব্যাপার ঠিক হয়ে যাবে। অর্থাৎ, পিতার পক্ষ হতে কারও প্রতি পৃথক আচরণের কোনও সম্ভাবনা থাকবে না। কুরআন মাজীদের শব্দমালার প্রতি লক্ষ্য করলে এ তরজমারও অবকাশ আছে।
১০

قَالَ قَآئِلٌ مِّنۡہُمۡ لَا تَقۡتُلُوۡا یُوۡسُفَ وَاَلۡقُوۡہُ فِیۡ غَیٰبَتِ الۡجُبِّ یَلۡتَقِطۡہُ بَعۡضُ السَّیَّارَۃِ اِنۡ کُنۡتُمۡ فٰعِلِیۡنَ ١۰

কা-লা কাইলুমমিনহুমলা-তাকতুলূইঊছুফা ওয়া আলকুহুফীগায়া-বাতিল জুব্বি ইয়ালতাকিতহু বা‘দুছছাইইয়া-রাতি ইন কুনতুম ফা-‘ইলীন।

তাদের মধ্যে একজন বলল, ইউসুফকে হত্যা করো না। বরং তোমরা যদি কিছু করতেই চাও, তবে তাকে কোনও গভীর কুয়ায় ফেলে দাও, যাতে কোন কাফেলা তাকে তুলে নিয়ে যায়।
১১

قَالُوۡا یٰۤاَبَانَا مَا لَکَ لَا تَاۡمَنَّا عَلٰی یُوۡسُفَ وَاِنَّا لَہٗ لَنٰصِحُوۡنَ ١١

কা-লূইয়াআবা-না-মা-লাকা লা-তা‘মান্না-‘আলা-ইঊছুফা ওয়া ইন্না-লাহূলানা-সিহূন।

(সুতরাং) তারা (তাদের পিতাকে) বলল, আব্বা! আপনার কী হল যে, আপনি ইউসুফের ব্যাপারে আমাদের উপর বিশ্বাস রাখেন না? অথচ এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, আমরা তার পরম শুভাকাক্সক্ষী?

তাফসীরঃ

৬. অনুমান করা যায় যে, ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তাঁর ভাইয়েরা এর আগেও নিজেদের সঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাতে সম্মতি দেননি।
১২

اَرۡسِلۡہُ مَعَنَا غَدًا یَّرۡتَعۡ وَیَلۡعَبۡ وَاِنَّا لَہٗ لَحٰفِظُوۡنَ ١٢

আরছিলহু মা‘আনা-গাদাইঁ ইয়ারতা‘ ওয়া ইয়াল‘আব ওয়া ইন্না-লাহূলাহাফিজূন।

আগামীকাল তাকে আমাদের সাথে (বেড়াতে) পাঠান। সে খাবে-দাবে এবং ক্ষাণিকটা খেলাধুলা করবে। বিশ্বাস করুন, আমরা তাকে হেফাজত করব।
১৩

قَالَ اِنِّیۡ لَیَحۡزُنُنِیۡۤ اَنۡ تَذۡہَبُوۡا بِہٖ وَاَخَافُ اَنۡ یَّاۡکُلَہُ الذِّئۡبُ وَاَنۡتُمۡ عَنۡہُ غٰفِلُوۡنَ ١٣

কা-লা ইন্নী লাইয়াহঝুনুনীআন তাযহাবূবিহী ওয়া আখা-ফূআইঁ ইয়া’কুলাহুযযি‘বুওয়া আনতুম ‘আনহু গা-ফিলূন।

ইয়াকুব বলল, তোমরা তাকে নিয়ে গেলে আমার (বিরহজনিত) কষ্ট হবে এবং আমার এই ভয়ও আছে যে, কখনও তার প্রতি তোমরা অমনোযোগী হলে নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলবে।

তাফসীরঃ

৭. কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম স্বপ্নে দেখেছিলেন একটি নেকড়ে বাঘ হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের উপর আক্রমণ করছে। সেই স্বপ্ন-জনিত আশঙ্কাই তাঁর এ কথায় প্রকাশ পেয়েছে।
১৪

قَالُوۡا لَئِنۡ اَکَلَہُ الذِّئۡبُ وَنَحۡنُ عُصۡبَۃٌ اِنَّاۤ اِذًا لَّخٰسِرُوۡنَ ١٤

কা-লূলাইন আকালাহুযযি’বুওয়া নাহনু‘উসবাতুন ইন্নাইযাল লাখা-ছিরূন।

তারা বলল, আমরা একটি সুসংহত দল হওয়া সত্ত্বেও যদি নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলে, তবে তো আমরা বিলকুল শেষ হয়ে গেছি।
১৫

فَلَمَّا ذَہَبُوۡا بِہٖ وَاَجۡمَعُوۡۤا اَنۡ یَّجۡعَلُوۡہُ فِیۡ غَیٰبَتِ الۡجُبِّ ۚ وَاَوۡحَیۡنَاۤ اِلَیۡہِ لَتُنَبِّئَنَّہُمۡ بِاَمۡرِہِمۡ ہٰذَا وَہُمۡ لَا یَشۡعُرُوۡنَ ١٥

ফালাম্মা-যাহাবূবিহী ওয়া আজমা‘উআইঁ ইয়াজ‘আলূহু ফী গায়া-বাতিল জুব্বি ওয়া আওহাইনাইলাইহি লাতুনাব্বিআন্নাহুম বিআমরিহিম হা-যা-ওয়াহুম লা-ইয়াশ‘উরূন।

অতঃপর তারা যখন তাকে সাথে নিয়ে গেল আর তারা তো সিদ্ধান্ত স্থির করেছিল তাকে গভীর কুয়ায় নিক্ষেপ করবে (সেমতে তারা নিক্ষেপও করল), তখন আমি ইউসুফের কাছে ওহী পাঠালাম, (একটা সময় আসবে, যখন) তুমি তাদেরকে অবশ্যই জানাবে যে, তারা এই কাজ করেছিল আর তখন তারা বুঝতেই পারবে না (যে, তুমি কে?)।

তাফসীরঃ

৯. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তখন ছিলেন শিশু। বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী তখন তাঁর বয়স ছিল সাত বছর। সুতরাং এ আয়াতে যে ওহীর কথা বলা হয়েছিল, তা নবুওয়াতের ওহী ছিল না। বরং এটা ছিল সেই জাতীয় ওহী, যা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের মা’ কিংবা হযরত মারয়াম আলাইহিস সালামের বেলায় ব্যবহৃত হয়েছে। এর সারমর্ম এই যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যে-কোনও উপায়ে অভয়-বাণী শুনিয়ে দিয়েছিলেন। তাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এমন একটা দিন আসবে, যখন এরা তোমার সামনে মাথা নোয়াবে এবং এখন এরা যেসব দুষ্কর্ম করছে তার সবই তখন তুমি তাদের সামনে তুলে ধরবে আর তখন তারা তোমাকে চিনতেও পারবে না। সুতরাং তাদের এখনকার আচরণে তুমি ভয় পেও না। সামনে ৮৯ নং আয়াতে আসছে, মিসরের শাসক হওয়ার পর ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদের সামনে তাদের আচরণ তুলে ধরেছিলেন।
১৬

وَجَآءُوۡۤ اَبَاہُمۡ عِشَآءً یَّبۡکُوۡنَ ؕ ١٦

ওয়া জাঊআবা-হুম ‘ইশাআইঁ ইয়াবকূন।

রাতে তারা কাঁদতে কাঁদতে তাদের পিতার কাছে আসল।
১৭

قَالُوۡا یٰۤاَبَانَاۤ اِنَّا ذَہَبۡنَا نَسۡتَبِقُ وَتَرَکۡنَا یُوۡسُفَ عِنۡدَ مَتَاعِنَا فَاَکَلَہُ الذِّئۡبُ ۚ وَمَاۤ اَنۡتَ بِمُؤۡمِنٍ لَّنَا وَلَوۡ کُنَّا صٰدِقِیۡنَ ١٧

কা-লূইয়াআবা-নাইন্না-যাহাবনা-নাছতাবিকুওয়া তারাকনা-ইঊছুফা ‘ইনদা মাতা-‘ইনাফাআকালাহুযযি’বু ওয়ামাআনতা বিমু’মিনিল লানা-ওয়ালাও কুন্না-সা-দিকীন।

বলতে লাগল, আব্বাজী! বিশ্বাস করুন, আমরা দৌড়-প্রতিযোগিতায় চলে গিয়েছিলাম আর ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম। এই অবকাশে নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু আপনি তো আমাদের কথা বিশ্বাস করবেন না, তাতে আমরা যতই সত্যবাদী হই।
১৮

وَجَآءُوۡ عَلٰی قَمِیۡصِہٖ بِدَمٍ کَذِبٍ ؕ قَالَ بَلۡ سَوَّلَتۡ لَکُمۡ اَنۡفُسُکُمۡ اَمۡرًا ؕ فَصَبۡرٌ جَمِیۡلٌ ؕ وَاللّٰہُ الۡمُسۡتَعَانُ عَلٰی مَا تَصِفُوۡنَ ١٨

ওয়া জাঊ ‘আলা-কামীসিহী বিদামিন কাযিবিন কা-লা বাল ছাওওয়ালাত লাকুম আনফুছুকুম আমরান ফাসাবরুন জামীলুওঁ ওয়াল্লা-হুল মুছতা‘আ-নু‘আলা-মাতাসিফূন।

আর তারা ইউসুফের জামায় মেকি রক্তও মাখিয়ে এনেছিল। ১০ তাদের পিতা বলল, (এটা সত্য নয়) বরং তোমাদের মন নিজের পক্ষ থেকে একটা গল্প বানিয়ে নিয়েছে। সুতরাং আমার জন্য ধৈর্যই শ্রেয়। আর তোমরা যেসব কথা তৈরি করছ সে ব্যাপারে আল্লাহরই সাহায্য প্রার্থনা করি।

তাফসীরঃ

১০. কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, তারা জামায় রক্ত মাখিয়ে এনেছিল, কিন্তু জামাটি ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত। কোথাও ছেঁড়া-ফাড়ার কোনও চিহ্ন ছিল না। তা দেখে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম মন্তব্য করেছিলেন, বাঘটিকে বড় প্রশিক্ষিত দেখছি! সে শিশুটিকে তো খেয়ে ফেলল, অথচ তার জামাটি একটুও ছিঁড়ল না, যেমনটা তেমনই রয়ে গেল। মোটকথা তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে, বাঘে খাওয়ার কথাটি সম্পূর্ণ তাদের বানানো কেচ্ছা। তাই তিনি বলে দিলেন, একথা তোমরা নিজেদের পক্ষ থেকে তৈরি করে নিয়েছ।
১৯

وَجَآءَتۡ سَیَّارَۃٌ فَاَرۡسَلُوۡا وَارِدَہُمۡ فَاَدۡلٰی دَلۡوَہٗ ؕ قَالَ یٰبُشۡرٰی ہٰذَا غُلٰمٌ ؕ وَاَسَرُّوۡہُ بِضَاعَۃً ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌۢ بِمَا یَعۡمَلُوۡنَ ١٩

ওয়া জাআত ছাইইয়া-রাতুন ফাআরছালূওয়া-রিদাহুম ফাআদলা-দালওয়াহূ কা-লা ইয়া-বুশরা-হা-যা-গুলা-মুওঁ ওয়া আছাররূহু বিদা-‘আতাওঁ ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুম বিমা-ইয়া‘মালূন।

এবং (অন্য দিকে তারা ইউসুফকে যেখানে কুয়ায় ফেলেছিল, সেখানে) একটি যাত্রীদল আসল। তারা তাদের একজন লোককে পানি আনতে পাঠাল। সে (কুয়ায়) নিজ বালতি ফেলল। (তার ভেতর ইউসুফ আলাইহিস সালামকে দেখে) সে বলে উঠল, তোমরা সুসংবাদ শোন, এ যে একটি বালক। ১১ অতঃপর যাত্রীদলের লোক তাকে একটি পণ্য মনে করে লুকিয়ে রাখল। আর তারা যা-কিছু করছিল সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত ছিলেন।

তাফসীরঃ

১১. বর্ণিত আছে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে কুয়ায় ফেলা হলে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে তিনি তার ভেতর সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকেন। কুয়ার ভেতর একটি পাথর ছিল। তিনি তার উপর উঠে বসে থাকলেন। যখন যাত্রীদলের পাঠানো লোকটি কুয়ার ভেতর বালতি ফেলল, তিনি সেই বালতিতে সওয়ার হয়ে গেলেন। লোকটি বালতি টেনে তুলতেই দেখতে পেল তার ভেতর একটি বালক। অমনি সে চিৎকার করে ওঠল এবং তার মুখ থেকে ওই কথা বের হয়ে গেল, যা এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
২০

وَشَرَوۡہُ بِثَمَنٍۭ بَخۡسٍ دَرَاہِمَ مَعۡدُوۡدَۃٍ ۚ  وَکَانُوۡا فِیۡہِ مِنَ الزَّاہِدِیۡنَ ٪ ٢۰

ওয়া শারাওহু বিছামানিম বাখছিন দারা-হিমা মা‘দূদাতিওঁ ওয়া কা-নূফীহি মিনাঝঝাহিদীন।

এবং (তারপর) তারা ইউসুফকে অতি অল্প দামে বিক্রি করে দিল- যা ছিল মাত্র কয়েক দিরহাম। বস্তুত ইউসুফের প্রতি তাদের বিশেষ আগ্রহ ছিল না। ১২

তাফসীরঃ

১২. কুরআন মাজীদের বর্ণনাভঙ্গি দ্বারা বাহ্যত এটাই বোঝা যায় যে, বিক্রেতা ছিল যাত্রীদলের লোক এবং হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে নিজেদের কাছে রাখার কোন আগ্রহ তাদের ছিল না; বরং তাকে বিক্রি করে যা-ই পাওয়া যায় সেটাকেই তারা লাভ মনে করেছিল, যেহেতু তা মুফতে অর্জিত হচ্ছিল। তাই যখন ক্রেতা পাওয়া গেল তখন নামমাত্র মূল্যে তাঁকে বিক্রি করে দিল। অবশ্য কোন কোন রিওয়ায়াতে ঘটনার যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তাতে প্রকাশ, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তাঁর ভাইয়েরা কুয়ায় ফেলে যাওয়ার পর বড় ভাই ইয়াহুদা রোজ তাঁর খবর নিতে আসত। কিছু খাবার-দাবারও দিয়ে যেত। তৃতীয় দিন তাঁকে কুয়ায় না পেয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল। শেষ পর্যন্ত যাত্রীদলের কাছে তাঁকে পেয়ে গেল। এ সময় অন্যান্য ভাইয়েরাও সেখানে উপস্থিত হল। তারা যাত্রীদলকে বলল, এ বালক আমাদের গোলাম। সে পালিয়ে গিয়েছিল। তোমাদের আগ্রহ থাকলে আমরা একে তোমাদের কাছে বিক্রি করতে পারি। ভাইদের আসল উদ্দেশ্য তো ছিল কোনও উপায়ে তাকে পিতার কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া। তাকে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন তাদের লক্ষ্য ছিল না। তাই তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যাত্রীদলের কাছে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিল। বাইবেলেও বলা হয়েছে তাঁর বিক্রেতা ছিল ভাইয়েরাই। তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যাত্রীদলের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল।
২১

وَقَالَ الَّذِی اشۡتَرٰىہُ مِنۡ مِّصۡرَ لِامۡرَاَتِہٖۤ اَکۡرِمِیۡ مَثۡوٰىہُ عَسٰۤی اَنۡ یَّنۡفَعَنَاۤ اَوۡ نَتَّخِذَہٗ وَلَدًا ؕ وَکَذٰلِکَ مَکَّنَّا لِیُوۡسُفَ فِی الۡاَرۡضِ ۫ وَلِنُعَلِّمَہٗ مِنۡ تَاۡوِیۡلِ الۡاَحَادِیۡثِ ؕ وَاللّٰہُ غَالِبٌ عَلٰۤی اَمۡرِہٖ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ٢١

ওয়া কা-লাল্লাযিশ তারা-হু মিম মিসরা লিমরাআতিহীআকরিমী মাছওয়াহু ‘আছাআইঁ ইয়ানফা‘আনাআও নাত্তাখিযাহূওয়ালাদাওঁ ওয়া কাযা-লিকা মাক্কান্না-লিইঊছুফা ফিল আরদি ওয়া লিনু‘আলিল মাহূমিন তা’বীলিল আহা-দীছি ওয়াল্লা-হু গা-লিবুন ‘আলাআমরিহী ওয়ালা-কিন্না আকছারা-ন্না-ছি লা-ইয়া‘লামূন।

মিসরের যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করেছিল, সে তার স্ত্রীকে বলল, একে সম্মানজনকভাবে রাখবে। আমার মনে হয় সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা একে পুত্র বানিয়ে নেব। ১৩ এভাবে আমি ইউসুফকে সে দেশে প্রতিষ্ঠা দান করলাম, তাকে কথাবার্তার সঠিক মর্ম শেখানোর জন্য। ১৪ নিজ কাজে আল্লাহ পূর্ণ ক্ষমতাবান, কিন্তু বহু লোক জানে না।

তাফসীরঃ

১৩. وَ لِنُعَلِّمَهٗ-এর ’و‘ অব্যয়টি অতিরিক্ত। তরজমা সে হিসেবেই করা হয়েছে। কারও মতে এর দ্বারা لنعلمه (তাকে শেখানোর জন্য) বাক্যটিকে উহ্য বাক্য لِيَحْكُمْ بالعدل (যাতে সে ন্যায়পরায়ণতার সাথে শাসন করে)-এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ ইউসুফকে মুক্তিদান ও তাকে মিসরে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, সে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে, মানুষের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাজে নেতৃত্ব দেবে এবং আল্লাহর কিতাব ও বিধি-বিধান শিখে তা জারি করবে (বা রাজকীয় লোকদের সাথে ওঠাবসা করে রাষ্ট্রীয় রীতি-নীতি, কথাবার্তা ও ধরন-ধারণ শিখবে এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যাসহ যে কোন কথার মর্ম অনুধাবনের যোগ্যতা অর্জন করবে)। [তাফসীরে মাজহারী ও উছমানী অবলম্বনে]। -অনুবাদক
২২

وَلَمَّا بَلَغَ اَشُدَّہٗۤ اٰتَیۡنٰہُ حُکۡمًا وَّعِلۡمًا ؕ وَکَذٰلِکَ نَجۡزِی الۡمُحۡسِنِیۡنَ ٢٢

ওয়া লাম্মা-বালাগা আশুদ্দাহূআ-তাইনা-হু হুকমাওঁ ওয়া ‘ইলমাওঁ ওয়া কাযা-লিকা নাজঝিল মুহছিনীন।

ইউসুফ যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হল, তখন আমি তাকে হিকমত ও ইলম দান করলাম। যারা সৎকর্ম করে, এভাবেই আমি তাদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।
২৩

وَرَاوَدَتۡہُ الَّتِیۡ ہُوَ فِیۡ بَیۡتِہَا عَنۡ نَّفۡسِہٖ وَغَلَّقَتِ الۡاَبۡوَابَ وَقَالَتۡ ہَیۡتَ لَکَ ؕ قَالَ مَعَاذَ اللّٰہِ اِنَّہٗ رَبِّیۡۤ اَحۡسَنَ مَثۡوَایَ ؕ اِنَّہٗ لَا یُفۡلِحُ الظّٰلِمُوۡنَ ٢٣

ওয়ারা-ওয়াদাত হুল্লাতী হুওয়া ফী বাইতিহা-‘আন নাফছিহী ওয়া গাল্লাকাতিল আবওয়া-বা ওয়াকা-লাত হাইতা লাকা কা-লা মা‘আ-যাল্লা-হি ইন্নাহূরাববী-আহছানা মাছওয়াইয়া; ইন্নাহূলা-ইউফলিহুজ্জা-লিমূন।

যে নারীর ঘরে সে থাকত, সে তাকে ফুসলানোর চেষ্টা করল ১৫ এবং সবগুলো দরজা বন্ধ করে দিল ও বলল, এসে পড়। ইউসুফ বলল, আল্লাহ পানাহ! তিনি আমার মনিব। তিনি আমাকে ভালোভাবে রেখেছেন। ১৬ সত্য কথা হচ্ছে, যারা জুলুম করে তারা কৃতকার্য হয় না।

তাফসীরঃ

১৫. এস্থলে ‘মনিব’ বলে আল্লাহ তাআলাকেও বোঝানো যেতে পারে এবং মিসরের সেই আযীযকেও, যে ইউসুফ আলাইহিস সালামকে নিজ গৃহে সম্মানজনকভাবে রেখেছিল। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, তুমি আমার মনিবের স্ত্রী। তোমার কথা শুনে আমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা কিভাবে করতে পারি?
২৪

وَلَقَدۡ ہَمَّتۡ بِہٖ ۚ وَہَمَّ بِہَا لَوۡلَاۤ اَنۡ رَّاٰ بُرۡہَانَ رَبِّہٖ ؕ کَذٰلِکَ لِنَصۡرِفَ عَنۡہُ السُّوۡٓءَ وَالۡفَحۡشَآءَ ؕ اِنَّہٗ مِنۡ عِبَادِنَا الۡمُخۡلَصِیۡنَ ٢٤

ওয়া লাকাদ হাম্মাত বিহী ওয়া হাম্মা বিহা-লাওলা-আর রাআ-বুরহা-না রাব্বিহী কাযা-লিকা লিনাসরিফা ‘আনহুছছূআ ওয়াল ফাহশাআ ইন্নাহূমিন ‘ইবা-দিনাল মুখলাসীন।

স্ত্রীলোকটি তো স্পষ্টভাবেই ইউসুফের সাথে (অসৎ কর্ম) কামনা করেছিল আর ইউসুফের মনেও স্ত্রীলোকটির প্রতি ইচ্ছা জাগ্রত হয়েই যাচ্ছিল যদি না সে নিজ প্রতিপালকের প্রমাণ দেখতে পেত। ১৭ আমি তার থেকে অসৎ কর্ম ও অশ্লীলতাকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যই এরূপ করেছিলাম। নিশ্চয়ই সে আমার মনোনীত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তাফসীরঃ

১৭. এ আয়াতের তাফসীর দু’ভাবে করা যায়। (এক) হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম নিজ প্রতিপালকের পক্ষ হতে একটি প্রমাণ না দেখলে তাঁর মনেও যুলায়খার প্রতি ঝোঁক সৃষ্টি হয়ে যেত, কিন্তু আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যেহেতু তিনি একটি প্রমাণ দেখতে পেয়েছিলেন, (যার ব্যাখ্যা সামনে আসছে) তাই তাঁর অন্তরে সে নারীর প্রতি কোনও কু-ভাব দেখা দেয়নি। (দুই) আয়াতের অর্থ এমনও হতে পারে যে, শুরুতে তাঁর অন্তরেও কিছুটা ঝোঁক সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল, যা একটা সাধারণ মানবীয় চাহিদা ছিল। হযরত হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী (রহ.) এর একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, রোযাদার ব্যক্তি পিপাসার্ত অবস্থায় যদি ঠাণ্ডা পানি দেখে, তবে তার অন্তরে স্বাভাবিকভাবেই সে পানির প্রতি একটা আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, কিন্তু তাই বলে সে রোযা ভাঙ্গার মোটেই ইচ্ছা করে না। ঠিক এ রকমই হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের অন্তরে অনিচ্ছাজনিত একটা ঝোঁক দেখা দিয়ে থাকবে। তিনি স্বীয় প্রতিপালকের নিদর্শন দেখতে না পেলে সেই ঝোঁক হয়ত আরও সামনে এগিয়ে যেত, কিন্তু তিনি যেহেতু প্রতিপালকের নিদর্শন দেখতে পেয়েছিলেন, তাই মুহূর্তের ভেতর সেই অনিচ্ছাকৃত ঝোঁকও লোপ পেয়ে যায়। অধিকাংশ তাফসীরবিদ এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাকেই গ্রহণ করেছেন। কেননা আরবী ব্যাকরণের দিকে লক্ষ্য করলে এ ব্যাখ্যাই বেশি নিয়মসিদ্ধ হয়। দ্বিতীয়ত এর দ্বারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের চরিত্র যে কতটা উচ্চ পর্যায়ের ছিল তা ভালো অনুমান করা যায়। তার অন্তরে এই অনিচ্ছাকৃত ঝোঁকও যদি সৃষ্টি না হত, তবে গুনাহ থেকে আত্মরক্ষা খুব বেশি কঠিন হত না। এটা বেশি কঠিন হয় অন্তরে ঝোঁক দেখা দেওয়ার পরই। আর তখন বলিষ্ঠ নীতিবোধ ও অসাধারণ মনোবল ছাড়া নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব হয় না। কুরআন ও হাদীস দ্বারা জানা যায়, মনের চাহিদা সত্ত্বেও যদি আল্লাহ তাআলার ভয়ে নিজেকে সংযত রেখে গুনাহ থেকে বিরত থাকা যায়, তবে তা অধিকতর সওয়াব ও পুরস্কারের কারণ হয়। প্রশ্ন থেকে যায় যে, আয়াতে আল্লাহ তাআলা যে বিষয়টাকে “স্বীয় প্রতিপালকের দলীল” সাব্যস্ত করেছেন, সে দলীল আসলে কী ছিল? এ প্রশ্নের পরিষ্কার ও নিখুঁত উত্তর হল এই যে, এর দ্বারা সেই কাজটির গুনাহ হওয়ার দলীল বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সেটি যে একটা পাপকর্ম এই বিষয়টি তিনি চিন্তা করেছিলেন এবং এ কারণে তিনি তা থেকে বিরত থেকেছিলেন। কোন-কোন বর্ণনায় এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যে, তখন তাঁকে তাঁর মহান পিতা হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের প্রতিকৃতি দেখানো হয়েছিল আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
২৫

وَاسۡتَبَقَا الۡبَابَ وَقَدَّتۡ قَمِیۡصَہٗ مِنۡ دُبُرٍ وَّاَلۡفَیَا سَیِّدَہَا لَدَا الۡبَابِ ؕ قَالَتۡ مَا جَزَآءُ مَنۡ اَرَادَ بِاَہۡلِکَ سُوۡٓءًا اِلَّاۤ اَنۡ یُّسۡجَنَ اَوۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ٢٥

ওয়াছ তাবাকাল বা-বা ওয়া কাদ্দাত কামীসাহূমিন দুবুরিওঁ ওয়া আলফাইয়া-ছাইয়িদাহালাদাল বা-বি কা-লাত মা-জাঝাউ মান আরা-দা বিআহলিকা ছূআন ইল্লাআইঁ ইউছজানা আও ‘আযা-বুন আলীম।

এবং তারা একজনের পেছনে আরেকজন দৌড়ে দরজার দিকে গেল এবং (এই টানা-হেঁচড়ার ভেতর) স্ত্রীলোকটি তার জামা পেছন দিক থেকে ছিঁড়ে ফেলল। ১৮ এ অবস্থায় তারা স্ত্রীলোকটির স্বামীকে দরজায় দাঁড়ানো পেল। স্ত্রীলোকটি তৎক্ষণাৎ (কেচ্ছা ফাঁদার লক্ষ্যে স্বামীকে) বলল, যে ব্যক্তি তোমার স্ত্রীর সাথে মন্দ কাজের ইচ্ছা করে, তার শাস্তি কারারুদ্ধ করা বা অন্য কোন কঠিন শাস্তি দেওয়া ছাড়া আর কী হতে পারে?

তাফসীরঃ

১৮. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম স্ত্রীলোকটি থেকে মুখ ফিরিয়ে দরজার দিকে পালাচ্ছিলেন আর স্ত্রীলোকটি তাঁকে পেছন দিক থেকে টেনে ধরছিল। এই টানা-হেঁচড়ার কারণে পেছন দিক থেকে জামা ছিঁড়ে যায়।
২৬

قَالَ ہِیَ رَاوَدَتۡنِیۡ عَنۡ نَّفۡسِیۡ وَشَہِدَ شَاہِدٌ مِّنۡ اَہۡلِہَا ۚ اِنۡ کَانَ قَمِیۡصُہٗ قُدَّ مِنۡ قُبُلٍ فَصَدَقَتۡ وَہُوَ مِنَ الۡکٰذِبِیۡنَ ٢٦

কা-লা হিয়া রা-ওয়াদাতনী ‘আন নাফছী ওয়া শাহিদা শা-হিদুম মিন আহলিহা- ইন কা-না কামীসুহূকুদ্দা মিন কুবুলিন ফাসাদাকাত ওয়া হুওয়া মিনাল কা-যিবীন।

ইউসুফ বলল, সে নিজেই তো আমাকে ফুসলাচ্ছিল। স্ত্রীলোকটির পরিবারের একজন সাক্ষ্য দিল, ইউসুফের জামার সম্মুখ দিক থেকে ছিঁড়ে থাকলে স্ত্রীলোকটিই সত্য বলেছে আর সে মিথ্যাবাদী।
২৭

وَاِنۡ کَانَ قَمِیۡصُہٗ قُدَّ مِنۡ دُبُرٍ فَکَذَبَتۡ وَہُوَ مِنَ الصّٰدِقِیۡنَ ٢٧

ওয়া ইন কা-না কামীসুহূকুদ্দা মিন দুবুরিন ফাকাযাবাত ওয়া হুওয়া মিনাসসা-দিকীন।

আর যদি তার জামা পেছন দিক থেকে ছিঁড়ে থাকে, তবে স্ত্রীলোকটি মিথ্যা বলেছে এবং সে সত্যবাদী। ১৯

তাফসীরঃ

১৯. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যে নির্দোষ, আল্লাহ তাআলা এটা আযীযের কাছে পরিষ্কার করে দিতে চাইলেন। আর এজন্য তিনি এই ব্যবস্থা করলেন যে, যুলায়খারই পরিবারের এক ব্যক্তিকে মীমাংসাকারী বানিয়ে দিলেন। সে সত্য-মিথ্যার মধ্যে প্রভেদ করার জন্য এমন এক আলামত বলে দিল যার যৌক্তিকতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তার বক্তব্য ছিল, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের জামা সম্মুখ দিক থেকে ছিঁড়ে থাকলে সেটা প্রমাণ করবে যে, তিনি স্ত্রীলোকটির দিকে এগোতে চাচ্ছিলেন আর স্ত্রীলোকটি হাত বাড়িয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। এই জোরাজুরির ভেতর তাঁর জামা ছিঁড়ে যায়। কিন্তু তাঁরা জামা যদি পিছন দিক থেকে ছিঁড়ে থাকে, তবে তার অর্থ হবে তিনি পালানোর চেষ্টা করছিলেন আর যুলায়খা পশ্চাদ্বাবন করে তাকে আটকাতে চাচ্ছিল। এক পর্যায়ে যুলায়খা তাঁর জামা ধরে তাঁকে নিজের দিকে টেনে নিতে চাইলে তাতে জামা ছিঁড়ে যায়। এক তো তার একথা অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ছিল। দ্বিতীয়ত নির্ভরযোগ্য কিছু হাদীস দ্বারা জানা যায় এ সাক্ষ্য দিয়েছিল যুলায়খার পরিবারের একটি ছোট্ট শিশু, তখনও পর্যন্ত যার কথা বলার মত বয়স হয়নি। আল্লাহ তাআলা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের পবিত্রতা প্রমাণ করার জন্য তখন তাকে কথা বলার শক্তি দান করেন, যেমন কথা বলার শক্তি হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে দান করেছিলেন। মোটকথা এই অনস্বীকার্য প্রমাণ হাতে পাওয়ার পর আযীযের আর কোনও সন্দেহ থাকল না যে, সবটা দোষ তার স্ত্রীরই এবং ইউসুফ আলাইহিস সালাম এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্দোষ।
২৮

فَلَمَّا رَاٰ قَمِیۡصَہٗ قُدَّ مِنۡ دُبُرٍ قَالَ اِنَّہٗ مِنۡ کَیۡدِکُنَّ ؕ اِنَّ کَیۡدَکُنَّ عَظِیۡمٌ ٢٨

ফালাম্মা-রাআ-কামীসাহূকুদ্দা মিন দুবরিন কা-লা ইন্নাহূমিন কাইদিকুন্ন ইন্না কাইদাকুন্না ‘আজীম।

অতঃপর স্বামী যখন দেখল তার জামা পেছন থেকে ছিঁড়েছে, তখন সে বলল, এটা তোমাদের নারীদের ছলনা, বস্তুত তোমাদের ছলনা বড়ই কঠিন।
২৯

یُوۡسُفُ اَعۡرِضۡ عَنۡ ہٰذَا ٜ  وَاسۡتَغۡفِرِیۡ لِذَنۡۢبِکِ ۚۖ  اِنَّکِ کُنۡتِ مِنَ الۡخٰطِئِیۡنَ ٪ ٢٩

ইঊছুফুআ‘রিদ‘আন হা-যা-ওয়াছতাগফিরী লিযামবিকি ইন্নাকি কুনতি মিনাল খা-তিঈন।

ইউসুফ! তুমি এ বিষয়টাকে একদম পাত্তা দিও না। আর হে নারী! তুমি নিজ অপরাধের জন্য ক্ষমা চাও। নিশ্চয় তুমিই অপরাধী ছিলে। ২০

তাফসীরঃ

২০. আযীয বিলক্ষণ বুঝে ফেলেছিলেন, অপরাধ করেছিল তার স্ত্রীই। কিন্তু সম্ভবত দুর্নামের ভয়ে বিষয়টা গোপন করেছিলেন।
৩০

وَقَالَ نِسۡوَۃٌ فِی الۡمَدِیۡنَۃِ امۡرَاَتُ الۡعَزِیۡزِ تُرَاوِدُ فَتٰىہَا عَنۡ نَّفۡسِہٖ ۚ قَدۡ شَغَفَہَا حُبًّا ؕ اِنَّا لَنَرٰىہَا فِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ ٣۰

ওয়া কা-লা নিছওয়াতুন ফিল মাদীনাতিম রাআতুল ‘আঝীঝি তুরা-বিদুফাতা-হা-‘আন নাফছিহী কাদ শাগাফাহা-হুব্বান ইন্না লানারা-হা-ফী দালা-লিম মুবীন।

নগরে কতিপয় নারী বলাবলি করল, ‘আযীযের স্ত্রী তার তরুণ গোলামকে ফুসলাচ্ছে। তরুণটির ভালোবাসা তাকে বিভোর করে ফেলেছে। আমাদের ধারণা সে নিশ্চয়ই সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে লিপ্ত রয়েছে।
৩১

فَلَمَّا سَمِعَتۡ بِمَکۡرِہِنَّ اَرۡسَلَتۡ اِلَیۡہِنَّ وَاَعۡتَدَتۡ لَہُنَّ مُتَّکَاً وَّاٰتَتۡ کُلَّ وَاحِدَۃٍ مِّنۡہُنَّ سِکِّیۡنًا وَّقَالَتِ اخۡرُجۡ عَلَیۡہِنَّ ۚ فَلَمَّا رَاَیۡنَہٗۤ اَکۡبَرۡنَہٗ وَقَطَّعۡنَ اَیۡدِیَہُنَّ وَقُلۡنَ حَاشَ لِلّٰہِ مَا ہٰذَا بَشَرًا ؕ اِنۡ ہٰذَاۤ اِلَّا مَلَکٌ کَرِیۡمٌ ٣١

ফালাম্মা-ছামি‘আত বিমাকরিহিন্না আরছালাত ইলাইহিন্না ওয়া আ‘তাদাত লাহুন্না মুত্তাকাআওঁ ওয়া আ-তাত কুল্লা ওয়াহিদাতিম মিনহুন্না ছিক্কীনাওঁ ওয়া কা-লাতিখরুজ ‘আলাইহিন্না ফালাম্মা-রাআইনাহূআকবারনাহূওয়া কাত্তা‘না আইদিয়াহুন্না ওয়াকুলনা হা-শা লিল্লা-হি মা- হা-যা-বাশারান ইন হা-যা ইল্লা-মালাকুন কারীম।

সুতরাং যখন সে (অর্থাৎ, আযীযের স্ত্রী) সেই নারীদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনল, ২১ তখন সে বার্তা পাঠিয়ে তাদেরকে (নিজ গৃহে) ডেকে আনল এবং তাদের জন্য তাকিয়া-বিশিষ্ট একটি জলসার ব্যবস্থা করল এবং তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে ছুরি দিল ২২ এবং (ইউসুফকে) বলল, একটু বের হয়ে তাদের সামনে আস। অতঃপর সেই নারীরা যেই না ইউসুফকে দেখল, তাকে বিস্ময়কর (রকমের রূপবান) পেল এবং (তারা তার অপরূপ রূপে হতভম্ব হয়ে) নিজ-নিজ হাত কেটে ফেলল। আর তারা বলে উঠল, আল্লাহ পানাহ! এ ব্যক্তি কোন মানুষ নয়। এ সম্মানিত ফেরেশতা ছাড়া কিছুই হতে পারে না।

তাফসীরঃ

২১. তাদের আতিথেয়তার জন্য দস্তরখানে ফল রাখা হয়েছিল এবং তা কাটার জন্য তাদেরকে ছুরি দেওয়া হয়েছিল। সম্ভবত যুলায়খা অনুমান করতে পেরেছিল সে নারীরা যখন হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে দেখবে, তখন সম্বিৎ হারিয়ে নিজ-নিজ হাতেই ছুরি চালিয়ে বসবে। সুতরাং সামনে বলা হয়েছে, তারা যখন হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে দেখল, তখন তার রূপ ও সৌন্দর্যে এতটা মোহিত হয়ে গেল যে, সত্যিই তারা তাদের মনের অজান্তে হাতে ছুরি চালিয়ে দিল।
৩২

قَالَتۡ فَذٰلِکُنَّ الَّذِیۡ لُمۡتُنَّنِیۡ فِیۡہِ ؕ وَلَقَدۡ رَاوَدۡتُّہٗ عَنۡ نَّفۡسِہٖ فَاسۡتَعۡصَمَ ؕ وَلَئِنۡ لَّمۡ یَفۡعَلۡ مَاۤ اٰمُرُہٗ لَیُسۡجَنَنَّ وَلَیَکُوۡنًا مِّنَ الصّٰغِرِیۡنَ ٣٢

কা-লাত ফাযা-লিকুন্নাল্লাযী লুমতুন্নানী ফীহি ওয়া লাকাদ রা-ওয়াততুহূ‘আন নাফছিহী ফাছতা‘সামা ওয়া লাইল্লাম ইয়াফ‘আল মাআ-মুরুহূলাইউছজানান্না ওয়া লাইয়াকূনাম মিনাসসা-গিরীন।

সে (অর্থাৎ) আযীযের স্ত্রী বলল, এবার দেখ, এই হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যার ব্যাপারে তোমরা আমার নিন্দা করেছ। একথা সত্যই যে, আমি আমার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তাকে ফুসলানি দিয়েছিলাম, কিন্তু সে নিজেকে রক্ষা করেছে। সে যদি আমার কথা না শোনে, তবে তাকে অবশ্যই কারারুদ্ধ করা হবে এবং সে নির্ঘাত লাঞ্ছিত হবে।
৩৩

قَالَ رَبِّ السِّجۡنُ اَحَبُّ اِلَیَّ مِمَّا یَدۡعُوۡنَنِیۡۤ اِلَیۡہِ ۚ وَاِلَّا تَصۡرِفۡ عَنِّیۡ کَیۡدَہُنَّ اَصۡبُ اِلَیۡہِنَّ وَاَکُنۡ مِّنَ الۡجٰہِلِیۡنَ ٣٣

কা-লা রাব্বিছছিজনুআহাব্বুইলাইইয়া মিম্মা-ইয়াদ‘ঊনানীইলাইহি ওয়া ইল্লা-তাসরিফ ‘আন্নী কাইদাহুন্না আসবুইলাইহিন্না ওয়াআকুম মিনাল জা-হিলীন।

ইউসুফ দু‘আ করল, হে প্রতিপালক! এই নারীগণ আমাকে যে কাজের দিকে ডাকছে, তা অপেক্ষা কারাগারই আমার বেশি পছন্দ। ২৩ তুমি যদি আমাকে তাদের ছলনা থেকে রক্ষা না কর, তবে আমার অন্তর তাদের দিকে আকৃষ্ট হবে এবং যারা অজ্ঞতাসুলভ কাজ করে আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।

তাফসীরঃ

২৩. কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, যেই নারীরা ইতঃপূর্বে যুলায়খার নিন্দা করছিল, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে দেখার পর তারাই হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে উপদেশ দিতে শুরু করল যে, তোমার উচিত তোমার মালকিনের কথা মানা। কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, সেই নারীদের মধ্যেও কেউ কেউ উপদেশ দানের ছলে নিভৃতে ডেকে নিয়ে পাপকর্মের আহ্বান জানাতে শুরু করল। এ কারণেই হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম নিজ দু‘আয় কেবল যুলায়খার নয়, বরং সকলের কথাই উল্লেখ করেছিলেন।
৩৪

فَاسۡتَجَابَ لَہٗ رَبُّہٗ فَصَرَفَ عَنۡہُ کَیۡدَہُنَّ ؕ اِنَّہٗ ہُوَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ ٣٤

ফাছতাজা-বা লাহূরাব্বুহূফাসারাফা ‘আনহু কাইদাহুন্না ইন্নাহূহুওয়াছছামী‘উল ‘আলীম।

সুতরাং ইউসুফের প্রতিপালক তাঁর দু‘আ কবুল করলেন এবং সেই নারীদের ছলনা থেকে তাকে রক্ষা করলেন। নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
৩৫

ثُمَّ بَدَا لَہُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ مَا رَاَوُا الۡاٰیٰتِ لَیَسۡجُنُنَّہٗ حَتّٰی حِیۡنٍ ٪ ٣٥

ছু ম্মা বাদা-লাহুম মিম বা‘দি মা-রাআউল আ-য়া-তি লাইয়াছজুনুন্নাহূহাত্তা-হীন।

অতঃপর (ইউসুফের পবিত্রতার) বহু নিদর্শন দেখা সত্ত্বেও তারা এটাই সমীচীন মনে করল যে, তাকে কিছু কালের জন্য কারাগারে পাঠাবেই। ২৪

তাফসীরঃ

২৪. অর্থাৎ, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যে নির্দোষ এবং তার চরিত্র সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ এর বহু দলীল-প্রমাণ তাদের সামনে উপস্থিত ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও আযীয যেহেতু তার স্ত্রীকে দুর্নাম থেকে বাঁচাতে ও ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চাচ্ছিল, তাই সে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে কিছু কালের জন্য কারারুদ্ধ করে রাখাই সমীচীন মনে করল।
৩৬

وَدَخَلَ مَعَہُ السِّجۡنَ فَتَیٰنِ ؕ قَالَ اَحَدُہُمَاۤ اِنِّیۡۤ اَرٰىنِیۡۤ اَعۡصِرُ خَمۡرًا ۚ وَقَالَ الۡاٰخَرُ اِنِّیۡۤ اَرٰىنِیۡۤ اَحۡمِلُ فَوۡقَ رَاۡسِیۡ خُبۡزًا تَاۡکُلُ الطَّیۡرُ مِنۡہُ ؕ نَبِّئۡنَا بِتَاۡوِیۡلِہٖ ۚ اِنَّا نَرٰىکَ مِنَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ٣٦

ওয়া দাখালা মা‘আহুছ ছিজনা ফাতাইয়া-ন কা-লা আহাদুহুমাইন্নীআরা-নী আ‘সিরু খামরা- ওয়া কা-লাল আ-খারু ইন্নীআরা-নী আহমিলুফাওকা রা’ছী খুবঝান তা’কুলুততাইরু মিনহু নাব্বি’না-বিতা’ওয়ীলিহী ইন্না-নারা-কা মিনাল মুহছিনীন।

ইউসুফের সাথে আরও দু’জন যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। ২৫ তাদের একজন (একদিন ইউসুফকে) বলল, আমি (স্বপ্নে) নিজেকে দেখলাম, মদ নিংড়াচ্ছি। আর দ্বিতীয়জন বলল, আমি (স্বপ্নে) দেখলাম যে, নিজ মাথায় রুটি বহন করছি এবং পাখি তা থেকে খাচ্ছে। তুমি আমাদেরকে এর ব্যাখ্যা বলে দাও। আমরা তোমাকে একজন ভালো মানুষ দেখছি।

তাফসীরঃ

২৫. রিওয়ায়াত দ্বারা জানা যায়, তাদের একজন বাদশাহকে মদ পান করাত আর দ্বিতীয়জন ছিল তার বাবুর্চি। তাদের প্রতি বাদশাহকে বিষ পান করানোর অভিযোগ ছিল এবং সেই অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছিল। সেটাই তাদের কারাবাসের কারণ। কারাগারে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সঙ্গে সাক্ষাত হলে তারা তাঁর কাছে নিজ-নিজ স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইল।
৩৭

قَالَ لَا یَاۡتِیۡکُمَا طَعَامٌ تُرۡزَقٰنِہٖۤ اِلَّا نَبَّاۡتُکُمَا بِتَاۡوِیۡلِہٖ قَبۡلَ اَنۡ یَّاۡتِیَکُمَا ؕ ذٰلِکُمَا مِمَّا عَلَّمَنِیۡ رَبِّیۡ ؕ اِنِّیۡ تَرَکۡتُ مِلَّۃَ قَوۡمٍ لَّا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَہُمۡ بِالۡاٰخِرَۃِ ہُمۡ کٰفِرُوۡنَ ٣٧

কা-লা লা-ইয়া’তীকুমা-তা‘আ-মুন তুরঝাকা-নিহীইল্লা-নাব্বা’তুকুমা-বিতা’বীলিহী কাবলা আইঁ ইয়া’তিয়াকুমা- যা-লিকুমা-মিম্মা-‘আল্লামানী রাববী ইন্নী তারাকতু মিল্লাতা কাওমিল লা-ইউ’মিনূনা বিল্লা-হি ওয়াহুম বিলআ-খিরাতি হুম কা-ফিরূন।

ইউসুফ বলল, (কারাগারে) তোমাদেরকে যে খাবার দেওয়া হয়, তা আসার আগেই আমি তোমাদেরকে এর রহস্য বলে দেব। ২৬ এটা সেই জ্ঞানের অংশ, যা আমার প্রতিপালক আমাকে দান করেছেন। (কিন্তু তার আগে তোমরা আমার একটা কথা শোন)। ব্যাপার এই যে, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না ও যারা আখেরাতে অবিশ্বাসী, আমি তাদের দীন পরিত্যাগ করেছি। ২৭

তাফসীরঃ

২৬. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যখন দেখলেন সেই বন্দীদ্বয় স্বপ্নের তাবীরের ব্যাপারে তাঁর প্রতি আস্থাশীল এবং তারা তাঁকে একজন ভালো লোক বলেও বিশ্বাস করে, তখন স্বপ্নের তাবীর বলার আগে তাদেরকে সত্য-দীনের প্রতি দাওয়াত দেওয়া সমীচীন মনে করলেন। বিশেষত এ কারণেও যে, তাদের একজনের স্বপ্নের ব্যাখ্যা ছিল তাকে শূলে চড়ানো হবে। আর এভাবে তার ইহজীবন সাঙ্গ হয়ে যাবে। তাই তিনি চাইলেন, যাতে সে অন্তত মৃত্যুর আগে ঈমান আনয়ন করে, তাহলে তার আখেরাতের জীবনে মুক্তি লাভ হবে। এটাই নবীসুলভ কর্মপন্থা। তারা যখন উপযুক্ত কোন সময় পেয়ে যান, তখন আর দাওয়াত পেশ করতে বিলম্ব করেন না।
৩৮

وَاتَّبَعۡتُ مِلَّۃَ اٰبَآءِیۡۤ اِبۡرٰہِیۡمَ وَاِسۡحٰقَ وَیَعۡقُوۡبَ ؕ مَا کَانَ لَنَاۤ اَنۡ نُّشۡرِکَ بِاللّٰہِ مِنۡ شَیۡءٍ ؕ ذٰلِکَ مِنۡ فَضۡلِ اللّٰہِ عَلَیۡنَا وَعَلَی النَّاسِ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَشۡکُرُوۡنَ ٣٨

ওয়াত্তাবা‘তুমিল্লাতা আ-বাঈইবরা-হীমা ওয়া ইছহা-কা ওয়া ইয়া‘কূবা মা-কা-না লানাআন নুশরিকা বিল্লা-হি মিন শাইইন যা-লিকা মিন ফাদলিল্লা-হি আলাইনাওয়া‘আলান্না-ছি ওয়ালা-কিন্না আকছারান্না-ছি লা-ইয়াশকুরূন।

আমি আমার বাপ-দাদা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের দীন অনুসরণ করেছি। আমাদের এ অধিকার নেই যে, আল্লাহর সঙ্গে কোনও জিনিসকে শরীক করব। এটা (অর্থাৎ তাওহীদের আকীদা) আমাদের প্রতি ও সমস্ত মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহেরই অংশ। কিন্তু অধিকাংশ লোক (এ নি‘আমতের) শোকর আদায় করে না।
৩৯

یٰصَاحِبَیِ السِّجۡنِ ءَاَرۡبَابٌ مُّتَفَرِّقُوۡنَ خَیۡرٌ اَمِ اللّٰہُ الۡوَاحِدُ الۡقَہَّارُ ؕ ٣٩

ইয়া-সা-হিবাইছছিজনি আ আরবা-বুমমুতাফাররিকূনা খাইরুন আমিল্লা-হুল ওয়া-হিদুল কাহহা-র।

হে আমার কারা-সংগীদ্বয়! ভিন্ন-ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না সেই এক আল্লাহ, যার ক্ষমতা সর্বব্যাপী?
৪০

مَا تَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اِلَّاۤ اَسۡمَآءً سَمَّیۡتُمُوۡہَاۤ اَنۡتُمۡ وَاٰبَآؤُکُمۡ مَّاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ بِہَا مِنۡ سُلۡطٰنٍ ؕ اِنِ الۡحُکۡمُ اِلَّا لِلّٰہِ ؕ اَمَرَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِیَّاہُ ؕ ذٰلِکَ الدِّیۡنُ الۡقَیِّمُ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ٤۰

মা-তা‘বুদূ না মিন দূ নিহীইল্লাআছমাআন ছাম্মাইতুমূহা আনতুম ওয়া আ-বাউকুম মাআনঝালাল্লা-হু বিহা-মিন ছুলতা-নিন ইনিল হুকম ইল্লা-লিল্লা-হি আমারা আল্লাতা‘বুদূ ইল্লা-ইইয়া-হু যা-লিকাদ্দীনুল কাইয়িমুওয়ালা-কিন্না আকছারান্না-ছি লাইয়া‘লামূন।

তাঁকে ছেড়ে তোমরা যার ইবাদত করছ, তার সারবত্তা কতগুলো নামের বেশি কিছু নয়, যা তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদাগণ রেখে দিয়েছ। আল্লাহ তার পক্ষে কোনও দলীল নাযিল করেননি। হুকুম দানের ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নেই। তিনিই এ হুকুম দিয়েছেন যে, তোমরা তার ভিন্ন অন্য কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল-সোজা পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।
৪১

یٰصَاحِبَیِ السِّجۡنِ اَمَّاۤ اَحَدُکُمَا فَیَسۡقِیۡ رَبَّہٗ خَمۡرًا ۚ  وَاَمَّا الۡاٰخَرُ فَیُصۡلَبُ فَتَاۡکُلُ الطَّیۡرُ مِنۡ رَّاۡسِہٖ ؕ  قُضِیَ الۡاَمۡرُ الَّذِیۡ فِیۡہِ تَسۡتَفۡتِیٰنِ ؕ ٤١

ইয়া-সা-হিবাইছ ছিজনি আম্মাআহাদুকুমা-ফাইয়াছকী রাব্বাহূখামরাও ওয়াআম্মাল আ-খারু ফাইউসলাবুফাতা’কুলুততাইরু মিররা’ছিহী কুদিয়াল আমরুল্লাযী ফীহি তাছতাফতিয়া-ন।

হে আমার কারা সঙ্গীদ্বয়! (এখন তোমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে নাও) তোমাদের একজনের ব্যাপার এই যে, (বন্দী দশা থেকে মুক্তি পেয়ে) সে নিজ মনিবকে মদ পান করাবে। আর থাকল অপরজন। তা তাকে শূলে চড়ানো হবে। ফলে পাখিরা তার মাথা (ঠুকরে ঠুকরে) খাবে। তোমরা যে বিষয়ে জিজ্ঞেস করছিলে তার ফায়সালা (এভাবে) হয়ে গেছে।
৪২

وَقَالَ لِلَّذِیۡ ظَنَّ اَنَّہٗ نَاجٍ مِّنۡہُمَا اذۡکُرۡنِیۡ عِنۡدَ رَبِّکَ ۫  فَاَنۡسٰہُ الشَّیۡطٰنُ ذِکۡرَ رَبِّہٖ فَلَبِثَ فِی السِّجۡنِ بِضۡعَ سِنِیۡنَ ؕ٪ ٤٢

ওয়া কা-লা লিল্লাযী জান্না আন্নাহূনা-জিম মিনহুমাযকুরনী ‘ইনদা রাব্বিকা ফাআনছাহুশশাইতা-নুযিকরা রাব্বিহী ফালাবিছা ফিছছিজনি বিদ‘আ ছিনীন।

সেই দু’জনের মধ্যে যার সম্পর্কে তার ধারণা ছিল যে, সে মুক্তি পাবে, ইউসুফ তাকে বলল, নিজ প্রভুর কাছে আমার কথাও বলো। ২৮ কিন্তু শয়তান তাকে নিজ প্রভুর কাছে ইউসুফের বিষয়ে বলার কথা ভুলিয়ে দিল। সুতরাং সে কয়েক বছর কারাগারে থাকল।

তাফসীরঃ

২৮. ‘প্রভু’ বলে বাদশাহকে বোঝানো হয়েছে। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যে বন্দী সম্পর্কে বলেছিলেন যে, সে মুক্তি লাভ করবে এবং ফিরে গিয়ে নিজ প্রভুকে যথারীতি মদ পান করাবে, তাকে বললেন, তুমি নিজ প্রভু অর্থাৎ, বাদশাহর কাছে আমার কথা বলো যে, একজন নিরপরাধ লোক জেলখানায় পড়ে রয়েছে। তার ব্যাপারে আপনার হস্তক্ষেপ করা উচিত। কিন্তু আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা যে, সেই লোক বাদশাহকে এ কথা বলতে ভুলে গেল, যে কারণে তাঁকে কয়েক বছর পর্যন্ত কারাগারে পড়ে থাকতে হল।
৪৩

وَقَالَ الۡمَلِکُ اِنِّیۡۤ اَرٰی سَبۡعَ بَقَرٰتٍ سِمَانٍ یَّاۡکُلُہُنَّ سَبۡعٌ عِجَافٌ وَّسَبۡعَ سُنۡۢبُلٰتٍ خُضۡرٍ وَّاُخَرَ یٰبِسٰتٍ ؕ یٰۤاَیُّہَا الۡمَلَاُ اَفۡتُوۡنِیۡ فِیۡ رُءۡیَایَ اِنۡ کُنۡتُمۡ لِلرُّءۡیَا تَعۡبُرُوۡنَ ٤٣

ওয়া কা-লাল মালিকুইন্নীআরা-ছাব‘আ বাকারা-তিন ছিমা-নিইঁ ইয়া’কুলুহুন্না ছাব‘উন ‘ইজাফুওঁ ওয়া ছাব‘আ ছুমবুলা-তিন খুদরিওঁ ওয়া উখারা ইয়া-বিছা-তিন ইয়াআইয়ুহাল মালাউ আফতূনী ফী রু’ইয়া-ইয়া ইন কুনতুম লিররু’ইয়া-তা‘বুরূন।

(কয়েক বছর পর মিসরের) বাদশাহ (তার পারিষদবর্গকে) বলল, আমি (স্বপ্নে) দেখলাম সাতটি মোটাতাজা গাভী, যাদেরকে সাতটি রোগা-পটকা গাভী খেয়ে ফেলছে। আরও দেখলাম সাতটি সবুজ-সজীব শীষ এবং আরও সাতটি শুকনো। হে পারিষদবর্গ! তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানলে আমার এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দাও।
৪৪

قَالُوۡۤا اَضۡغَاثُ اَحۡلَامٍ ۚ وَمَا نَحۡنُ بِتَاۡوِیۡلِ الۡاَحۡلَامِ بِعٰلِمِیۡنَ ٤٤

কা-লূআদগা-ছু আহলা-মিন ওয়ামা নাহনুবিতা’বীলিল আহলা-মি বি‘আ-লিমীন।

তারা বলল, (মনে হচ্ছে) এটা দুশ্চিন্তাপ্রসূত কল্পনা। আর আমরা স্বপ্ন-ব্যাখ্যার ইলমদার (-ও) নই। ২৯

তাফসীরঃ

২৯. বাদশাহ তার দেখা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু দরবারীগণ প্রথমে তো বলে দিল, এটা কোন অর্থবহ স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে না; অনেক সময় মনে অস্থিরতা বা দুঃশ্চিন্তা থাকলে ঘুমের ভেতর সেটাই স্বপ্নরূপে দেখা দেয়। তারপর আবার বলল, এটা অর্থবহ কোন স্বপ্ন হলেও আমাদের পক্ষে এর ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কেননা এ বিদ্যায় আমাদের দখল নেই।
৪৫

وَقَالَ الَّذِیۡ نَجَا مِنۡہُمَا وَادَّکَرَ بَعۡدَ اُمَّۃٍ اَنَا اُنَبِّئُکُمۡ بِتَاۡوِیۡلِہٖ فَاَرۡسِلُوۡنِ ٤٥

ওয়া কা-লাল্লাযীনাজা-মিনহুমা-ওয়াদ্দাকারা বা‘দা উম্মাতিন আনা-উনাব্বিউকুম বিতাবীলিহী ফাআরছিলূন।

সেই দুই কয়েদীর মধ্যে যে মুক্তি পেয়েছিল এবং দীর্ঘকাল পর যার (ইউসুফের কথা) স্মরণ হয়েছিল, সে বলল, আমি আপনাদেরকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিয়ে দিচ্ছি। সুতরাং আপনারা আমাকে (কারাগারে ইউসুফের কাছে) পাঠিয়ে দিন। ৩০

তাফসীরঃ

৩০. এ হচ্ছে সেই বন্দী, যার স্বপ্নের ব্যাখ্যায় হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, সে জেল থেকে মুক্তি লাভ করবে। তিনি তাকে তার মুক্তিকালে একথাও বলেছিলেন যে, তুমি তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলো। কিন্তু সে তা বলতে ভুলে গিয়েছিল। বাদশাহ যখন নিজ স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন, তখন তার মনে পড়ল যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে স্বপ্ন-ব্যাখ্যার বিশেষ জ্ঞান দান করেছেন। এই স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যাদান তাঁর পক্ষেই সম্ভব। তাই সে বাদশাহকে বলল, কারাগারে একজন লোক আছে। সে স্বপ্নের ভাল ব্যাখ্যা করতে পারে। আপনি আমাকে তার কাছে পাঠিয়ে দিন। কুরআন মাজীদ কোন গল্পগ্রন্থ নয়। এতে যে ঘটনা বর্ণিত হয়, তার বিশেষ কোন উদ্দেশ্য থাকে। এ কারণেই ঘটনা বর্ণনায় কুরআনী রীতি হয়, যেসব খুঁটিনাটি শ্রোতা নিজেই বুঝে নিতে সক্ষম, কুরআন তা বর্ণনা করে না। সুতরাং এখানেও পরিষ্কার শব্দে একথা বলার দরকার মনে করা হয়নি যে, তারপর বাদশাহ তাকে কারাগারে পাঠালেন। সেখানে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সঙ্গে তার সাক্ষাত হল এবং সে তাকে বলল...। বরং সরাসরি কথা শুরু করা হয়েছে এখান থেকে যে, ইউসুফ! ওহে সেই ব্যক্তি, যার সব কথা সত্য হয়।
৪৬

یُوۡسُفُ اَیُّہَا الصِّدِّیۡقُ اَفۡتِنَا فِیۡ سَبۡعِ بَقَرٰتٍ سِمَانٍ یَّاۡکُلُہُنَّ سَبۡعٌ عِجَافٌ وَّسَبۡعِ سُنۡۢبُلٰتٍ خُضۡرٍ وَّاُخَرَ یٰبِسٰتٍ ۙ لَّعَلِّیۡۤ اَرۡجِعُ اِلَی النَّاسِ لَعَلَّہُمۡ یَعۡلَمُوۡنَ ٤٦

ইঊছুফুআইয়ুহাস সিদ্দীকুআফতিনা-ফী ছাব‘ই বাকারা-তিন ছিমা-নিইঁ ইয়া’কুলুহুন্না ছাব‘উন ‘ইজা-ফুওঁ ওয়া ছাব‘ই ছুমবুলা-তিন খুদরিওঁ ওয়া উখারা ইয়া-বিছা-তিল লা‘আললী আরজি‘উ ইলান্না-ছি লা‘আল্লাহুম ইয়া‘লামূন।

(সুতরাং সে কারাগারে গিয়ে ইউসুফকে বলল) ইউসুফ! ওহে সেই ব্যক্তি, যার সব কথা সত্য হয়! তুমি আমাদেরকে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দাও যে, সাতটি মোটাতাজা গাভী, যাদেরকে সাতটি রোগা-পটকা গাভী খেয়ে ফেলছে আর সাতটি সবুজ-সজীব শীষ এবং আরও সাতটি আছে, যা শুকনো, যাতে আমি লোকদের কাছে ফিরে যেতে পারি এবং (তাদেরকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানাতে পারি) যাতে তারা প্রকৃত বিষয় অবগত হতে পারে। ৩১

তাফসীরঃ

৩১. প্রকৃত বিষয় অবগত হওয়া দ্বারা এটাও বোঝানো উদ্দেশ্য যে, তারা স্বপ্নের প্রকৃত ব্যাখ্যা জানতে পারবে এবং এটাও যে, তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করতে পারবে। তারা বুঝতে সক্ষম হবে যে, বিনা দোষে এমন একজন সৎ ও ভালো লোককে কারাগারে ফেলে রাখা হয়েছে।
৪৭

قَالَ تَزۡرَعُوۡنَ سَبۡعَ سِنِیۡنَ دَاَبًا ۚ فَمَا حَصَدۡتُّمۡ فَذَرُوۡہُ فِیۡ سُنۡۢبُلِہٖۤ اِلَّا قَلِیۡلًا مِّمَّا تَاۡکُلُوۡنَ ٤٧

কা-লা তাঝরা‘ঊনা ছাব‘আ ছিনীনা দাআ-বা- ফামা-হাসাততুম ফাযারূহু ফী ছুমবুলিহীইল্লা-কালীলাম মিম্মা-তা’কুলূন।

ইউসুফ বলল, তোমরা একাধারে সাত বছর শস্য উৎপন্ন করবে। এ সময়ের ভেতর তোমরা যে শস্য সংগ্রহ করবে তা তার শীষসহ রেখে দিও, অবশ্য যে সামান্য পরিমাণ তোমাদের খাওয়ার কাজে লাগবে (তার কথা আলাদা)।
৪৮

ثُمَّ یَاۡتِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ سَبۡعٌ شِدَادٌ یَّاۡکُلۡنَ مَا قَدَّمۡتُمۡ لَہُنَّ اِلَّا قَلِیۡلًا مِّمَّا تُحۡصِنُوۡنَ ٤٨

ছু ম্মা ইয়া’তী মিম বা‘দি যা-লিকা ছাব‘উন শিদা-দুইঁ ইয়া’কুলনা মা-কাদ্দামতুম লাহুন্না ইল্লাকালীলাম মিম্মা-তুহসিনূন।

এরপর তোমাদের সামনে আসবে এমন সাতটি বছর, যা অত্যন্ত কঠিন হবে। তোমরা এই সাত বছরের জন্য যা সঞ্চয় করে রাখবে, তা খেতে থাকবে, অবশ্য যে সামান্য পরিমাণ তোমরা সংরক্ষণ করবে (কেবল তাই অবশিষ্ট থাকবে)।
৪৯

ثُمَّ یَاۡتِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ عَامٌ فِیۡہِ یُغَاثُ النَّاسُ وَفِیۡہِ یَعۡصِرُوۡنَ ٪ ٤٩

ছু ম্মা ইয়া’তী মিম বা‘দি যা-লিকা ‘আ-মুন ফীহি ইউগা-ছু ন্না-ছুওয়া ফীহি ইয়া‘সিরূন।

তারপর আসবে এমন একটি বছর যখন মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং তখন তারা আঙ্গুরের রস নিংড়াবে। ৩২

তাফসীরঃ

৩২. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম স্বপ্নের যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তার সারমর্ম ছিল এই যে, আগামী সাত বছর মওসুম ভালো থাকবে। ফলে লোকে বিপুল শস্য উৎপন্ন করতে পারবে। কিন্তু তারপর অনবরত সাত বছর খরা চলবে। স্বপ্নে যে সাতটি মোটাতাজা গাভী দেখা গেছে, তা দ্বারা সুদিনের সেই সাত বছর বোঝানো হয়েছে। আর রোগা-পটকা যে সাতটি গাভী দেখা গেছে, তা খরার সাত বছরের প্রতি ইঙ্গিত। এবার হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম খরার সাত বছরের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি স্বরূপ এই ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিলেন যে, সুদিনের সাত বছর যে ফসল উৎপন্ন হবে, তা থেকে সামান্য পরিমাণ তো দৈনন্দিন খাদ্যের জন্য ব্যবহার করবে আর অবশিষ্ট সব ফসল তার শীষ সমেত রেখে দেবে, যাতে তা পচে-গলে নষ্ট না হয়। যখন খরার সাত বছর আসবে তখন এই সঞ্চিত শস্য কাজে আসবে। সেই সাত বছর লোকে এসব খেতে পারবে। আর স্বপ্নে যে দেখা গেছে সাতটি রোগা-পটকা গাভী সাতটি মোটাতাজা গাভীকে খেয়ে ফেলছে, তার দ্বারা একথাই বোঝানো হয়েছে যে, খরার সাত বছর সুদিনের সাত বছরে যে খাদ্য সঞ্চয় করা হয়েছিল তা খাওয়া হবে। অবশ্য সে সঞ্চয় থেকে সামান্য পরিমাণ শস্য বীজ হিসেবে রেখে দিতে হবে, যা পরবর্তীকালে চাষাবাদের কাজে আসবে। যখন খরার সাত বছর অতিক্রান্ত হবে, তার পরের বছর প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে। তখন মানুষ বেশি করে আঙ্গুরের রস সংগ্রহ করবে।
৫০

وَقَالَ الۡمَلِکُ ائۡتُوۡنِیۡ بِہٖ ۚ فَلَمَّا جَآءَہُ الرَّسُوۡلُ قَالَ ارۡجِعۡ اِلٰی رَبِّکَ فَسۡـَٔلۡہُ مَا بَالُ النِّسۡوَۃِ الّٰتِیۡ قَطَّعۡنَ اَیۡدِیَہُنَّ ؕ اِنَّ رَبِّیۡ بِکَیۡدِہِنَّ عَلِیۡمٌ ٥۰

ওয়া কা-লাল মালিকু’তূনী বিহী ফালাম্মা-জাআহুর রাছূলুকা-লারজি‘ ইলা-রাব্বিকা ফাছআলহু মা-বা-লুন নিছওয়াতিল্লা-তী কাত্তা‘না আইদিয়াহুন্না ইন্না রাববী বিকাইদিহিন্না ‘আলীম।

বাদশাহ বলল, তাকে (অর্থাৎ ইউসুফকে) আমার কাছে নিয়ে এসো। সেমতে যখন তার কাছে দূত উপস্থিত হল, সে বলল, নিজ প্রভুর কাছে ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস কর, যে নারীগণ নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিল তাদের অবস্থা কী? আমার প্রতিপালক তাদের ছলনা সম্পর্কে বেশ অবগত। ৩৩

তাফসীরঃ

৩৩. এস্থলে কুরআন মাজীদ ঘটনার যে অংশ আপনা-আপনি বুঝে আসে তা লুপ্ত রেখেছে। অর্থাৎ, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম স্বপ্নের যে ব্যাখ্যা দিলেন, তা বাদশাহকে জানানো হল। বাদশাহ সে ব্যাখ্যা শুনে তাঁর মর্যাদা উপলব্ধি করলেন এবং তার নিদর্শনস্বরূপ তাঁকে নিজের কাছে ডেকে আনাতে চাইলেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি নিজের একজন দূতকে পাঠালেন। দূত হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে এ বার্তা পৌঁছালে তিনি চাইলেন প্রথমে তার উপর আরোপিত মিথ্যা অভিযোগের মীমাংসা হয়ে যাক এবং তিনি যে নির্দোষ এটা সকলের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাক। সেমতে তিনি দূতের সঙ্গে না গিয়ে বরং বাদশাহর কাছে বার্তা পাঠালেন, যে সকল নারী নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিল আপনি প্রথমে তাদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিন। সেই নারীদের যেহেতু ঘটনার আদি-অন্ত জানা ছিল তাই প্রকৃত বিষয়টা তাদের মাধ্যমেই জানা সহজ ছিল। এ কারণেই হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যুলায়খার পরিবর্তে তাদের কথা উল্লেখ করেছেন। যদিও এ সত্য জেল থেকে বের হওয়ার পরও উদ্ঘাটন করা যেত, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি এ পন্থা অবলম্বন করেছিলেন সম্ভবত এজন্য যে, তিনি চাচ্ছিলেন, তিনি কতটা নির্দোষ তা বাদশাহ, আযীয ও অন্যান্যদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাক এবং তিনি যে নিজ নির্দোষিতার ব্যাপারে পরিপূর্ণ আত্মপ্রত্যয়ী, যদ্দরুণ নির্দোষিতা প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত জেল থেকে বের হতে পর্যন্ত রাজি নন এটাও তারা বুঝতে পারুক। দ্বিতীয়ত বাদশাহর ভাব-গতি দ্বারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম অনুমান করতে পেরেছিলেন যে, তিনি তাকে বিশেষ কোন সম্মান দান করবেন। সেই সম্মান লাভের পর যদি ঘটনার তদন্ত করা হয়, তবে সে তদন্ত নিরপেক্ষ হওয়া নিয়ে জনমনে সন্দেহ দেখা দিতে পারে। এ কারণেই তিনি সমীচীন মনে করলেন, প্রথমে নিরপেক্ষ তদন্ত দ্বারা অভিযোগের সবটা কলঙ্ক ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাক, তারপরেই তিনি কারাগার থেকে বের হবেন। আল্লাহ তাআলা করলেনও তাই। বাদশাহর পরিপূর্ণ বিশ্বাস হয়ে গেল হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম নির্দোষ ও নিষ্কলুষ। অতঃপর তিনি যখন সেই নারীদের ডাকলেন এবং তিনি যেন সবকিছু জানেন এই ভাব নিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তারা প্রকৃত সত্য অস্বীকার করতে পারল না। বরং তারা পরিষ্কার ভাষায় সাক্ষ্য দিল হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পূর্ণ নির্দোষ। এ পর্যায়ে আযীয-পত্নী যুলায়খাকেও স্বীকার করতে হল যে, প্রকৃতপক্ষে ভুল তারই ছিল। সম্ভবত আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ছিল যুলায়খাকে এই সুযোগ দেওয়া, যাতে সে নিজের অপরাধ স্বীকার ও তাওবার মাধ্যমে নিজেকে পবিত্র ও শুদ্ধ করে নিতে পারে।
৫১

قَالَ مَا خَطۡبُکُنَّ اِذۡ رَاوَدۡتُّنَّ یُوۡسُفَ عَنۡ نَّفۡسِہٖ ؕ قُلۡنَ حَاشَ لِلّٰہِ مَا عَلِمۡنَا عَلَیۡہِ مِنۡ سُوۡٓءٍ ؕ قَالَتِ امۡرَاَتُ الۡعَزِیۡزِ الۡـٰٔنَ حَصۡحَصَ الۡحَقُّ ۫ اَنَا رَاوَدۡتُّہٗ عَنۡ نَّفۡسِہٖ وَاِنَّہٗ لَمِنَ الصّٰدِقِیۡنَ ٥١

কা-লা মা-খাতবুকুন্না ইয রা -ওয়াততুন্না ইঊছুফা ‘আন নাফছিহী কুলনা হা-শা লিল্লাহি মা-‘আলিমনা-‘আলাইহি মিন ছূইন কা-লাতিম রাআতুল ‘আঝীঝিলআ-না হাসহাসাল হাক্কু আনা-রা-ওয়াততুহূ‘আন নাফছিহী ওয়া ইন্নাহূলামিনাসসা-দিকীন।

বাদশাহ (সেই নারীদের ডাকিয়ে এনে তাদেরকে) বলল, তোমরা যখন ইউসুফকে ফুসলাচ্ছিলে তখন তোমাদের অবস্থা কী হয়েছিল? তারা বলল, আল্লাহ পানাহ! আমরা তার মধ্যে বিন্দুমাত্রও দোষ পাইনি। আযীযের স্ত্রী বলল, এবার সত্য কথা সকলের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। আমিই তাকে ফুসলানোর চেষ্টা করেছিলাম। প্রকৃতপক্ষে সে সম্পূর্ণ সত্যবাদী।
৫২

ذٰلِکَ لِیَعۡلَمَ اَنِّیۡ لَمۡ اَخُنۡہُ بِالۡغَیۡبِ وَاَنَّ اللّٰہَ لَا یَہۡدِیۡ کَیۡدَ الۡخَآئِنِیۡنَ ٥٢

যা-লিকা লিইয়া‘লামা আন্নী লাম আখুনহু বিলগাইবি ওয়া আন্নাল্লা-হা লা-ইয়াহদী কাইদাল খাইনীন।

(কারাগারে ইউসুফ যখন এসব কথা জানতে পারল তখন সে বলল) আমি এসব করেছি এজন্য, যাতে আযীয নিশ্চিতরূপে জানতে পারে আমি তার অনুপস্থিতিতে তার প্রতি কোন বিশ্বাসঘাতকতা করিনি এবং আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেন না।
৫৩

وَمَاۤ اُبَرِّیٴُ نَفۡسِیۡ ۚ اِنَّ النَّفۡسَ لَاَمَّارَۃٌۢ بِالسُّوۡٓءِ اِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّیۡ ؕ اِنَّ رَبِّیۡ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ٥٣

ওয়ামাউবাররিউ নাফছী ইন্নান্নাফছা লাআম্মা-রাতুম বিছছূই ইল্লা-মা-রাহিমা রাববী ইন্না রাববী গাফূরুর রাহীম।

আমি এ দাবী করি না যে, আমার মন সম্পূর্ণ পাক পবিত্র। বস্তুত মন সর্বদা মন্দ কাজেরই আদেশ করে। অবশ্য আমার রব্ব যদি দয়া করেন সেটা ভিন্ন কথা (সে অবস্থায় মনের কোন চাতুর্য চলে না)। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ৩৪

তাফসীরঃ

৩৪. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম কোন পর্যায়ের বিনয়ী ছিলেন এবং কেমন ছিল তাঁর আবদিয়াত বা আল্লাহর প্রতি দাসত্ব-চেতনার মাত্রা, তা লক্ষ্য করুন। খোদ সেই নারীদের স্বীকারোক্তি দ্বারা যখন তাঁর নির্দোষিতা প্রমাণ হয়ে গেছে তখনও তিনি বিন্দুমাত্র নিজ মাহাত্ম্য প্রকাশ করছেন না; বরং কেমন বিনয়ের সঙ্গে বলছেন, আমি যে কঠিন ফাঁদ থেকে বেঁচে গেছি এটা আমার কিছু কৃতিত্ব নয়। মন তো আমারও আছে। মন সর্বদা মন্দ কাজেরই উস্কানি দেয়। প্রকৃতপক্ষে এটা আল্লাহ তাআলারই দয়া। তিনি যাকে চান তাকে মনের ছলনা থেকে রক্ষা করেন। অবশ্য অন্যান্য দলীল-প্রমাণ দ্বারা এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহ তাআলার এ দয়া ও রহমত কেবল সেই ব্যক্তির উপরই হয়, যে গুনাহ থেকে আত্মরক্ষার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালায়, যেমন হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম চালিয়েছিলেন। তিনি দৌঁড় দিয়ে দরজা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। সেই সঙ্গে আল্লাহ তাআলার দিকে রুজু হয়ে তাঁর আশ্রয়ও প্রার্থনা করেছিলেন।
৫৪

وَقَالَ الۡمَلِکُ ائۡتُوۡنِیۡ بِہٖۤ اَسۡتَخۡلِصۡہُ لِنَفۡسِیۡ ۚ فَلَمَّا کَلَّمَہٗ قَالَ اِنَّکَ الۡیَوۡمَ لَدَیۡنَا مَکِیۡنٌ اَمِیۡنٌ ٥٤

ওয়া কা-লাল মালিকু’তূনী বিহীআছতাখলিসহু লিনাফছী ফালাম্মা-কাল্লামাহূকা-লা ইন্নাকাল ইয়াওমা লাদাইনা-মাকীনুন আমীন।

বাদশাহ বলল, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে আমার একান্ত (সহযোগী) বানাব। সুতরাং যখন (ইউসুফ বাদশাহর কাছে আসল এবং) বাদশাহ তার সাথে কথা বলল, তখন বাদশাহ বলল, আজ থেকে তুমি আমাদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাবান হলে, তোমার প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা রাখা হবে। ৩৫

তাফসীরঃ

৩৫. বাদশাহ হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সঙ্গে যেসব কথা বলেছিলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ কোন কোন রিওয়ায়াতে এভাবে এসেছে যে, তিনি সর্বপ্রথম হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাছে সরাসরি তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা শোনার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। এ সময় হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যায় এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যা বাদশাহ অন্য কারও কাছে প্রকাশ করেননি। তিনি হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হন। অতঃপর হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম খরার বছরগুলোর জন্য আগাম ব্যবস্থা নেওযার জন্য বড় চমৎকার প্রস্তাবনা রাখেন, যা বাদশাহর খুব পছন্দ হয় এবং তিনি যে একজন বিচক্ষণ ও সাধু পুরুষ বাদশাহ সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যান। এক পর্যায়ে বাদশাহ তাকে বললেন, আপনার প্রতি যেহেতু আমার পূর্ণ আস্থা আছে, তাই এখন থেকে আপনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে গণ্য হবেন। তাছাড়া হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম দুর্ভিক্ষের প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিলেন, তা শুনে বাদশাহ বললেন, এটা আঞ্জাম দেবে কে? ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন, আমি এ দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত আছি।
৫৫

قَالَ اجۡعَلۡنِیۡ عَلٰی خَزَآئِنِ الۡاَرۡضِ ۚ اِنِّیۡ حَفِیۡظٌ عَلِیۡمٌ ٥٥

কা-লাজ‘আলনী ‘আলা-খাঝাইনিল আরদি ইন্নী হাফীজুন ‘আলীম।

ইউসুফ বলল, আপনি আমাকে দেশের অর্থ-সম্পদের (ব্যবস্থাপনা) কার্যে নিযুক্ত করুন। নিশ্চিত থাকুন আমি রক্ষণাবেক্ষণ বেশ ভালো পারি এবং আমি (এ কাজের) পূর্ণ জ্ঞান রাখি। ৩৬

তাফসীরঃ

৩৬. সাধারণ অবস্থায় রাষ্ট্রীয় কোন পদ নিজে চেয়ে নেওয়া শরীয়তে অনুমোদিত নয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা নিষেধ করেছেন। কিন্তু যদি সরকারি কোন পদ কোন অযোগ্য ব্যক্তির উপর ন্যস্ত হওয়ার কারণে মানুষের ক্ষতি হবে বলে প্রবল আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে এরূপ ঠেকা অবস্থায় সৎ, যোগ্য ও মুত্তাকী ব্যক্তির পক্ষে পদ প্রার্থনা করা জায়েয আছে। এস্থলে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের আশঙ্কা ছিল, আসন্ন দুর্ভিক্ষকালে মানুষ অন্যায়-অবিচারের সম্মুখীন হতে পারে। তাছাড়া সে দেশে আল্লাহ তাআলার আইন প্রতিষ্ঠা করার জন্য হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের নিজের দায়িত্ব গ্রহণ ছাড়া কোনও উপায়ও ছিল না। এ কারণেই তিনি দেশের অর্থ বিভাগের দায়িত্ব নিজ মাথায় তুলে নেন। রিওয়ায়াত দ্বারা জানা যায়, বাদশাহ পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রের যাবতীয় ক্ষমতা তাঁর উপর ন্যস্ত করেছিলেন। ফলে তিনি সারাটা দেশের শাসক হয়ে গিয়েছিলেন। হযরত মুজাহিদ (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে, বাদশাহ তাঁর হাতে ইসলামও গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম কর্তৃক রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণের ফলে গোটা দেশে আল্লাহ তাআলার ইনসাফভিত্তিক আইন জারি করা সম্ভব হয়েছিল।
৫৬

وَکَذٰلِکَ مَکَّنَّا لِیُوۡسُفَ فِی الۡاَرۡضِ ۚ یَتَبَوَّاُ مِنۡہَا حَیۡثُ یَشَآءُ ؕ نُصِیۡبُ بِرَحۡمَتِنَا مَنۡ نَّشَآءُ وَلَا نُضِیۡعُ اَجۡرَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ٥٦

ওয়া কাযা-লিকা মাক্কান্না-লিইঊছুূফা ফিল আরদি ইয়াতাবাওওয়াউ মিনহা-হাইছু ইয়াশাউ নুসীবুবিরাহমাতিনা-মান নাশাউ ওয়ালা-নুদী‘উ আজরাল মুহছিনীন।

এবং এভাবে আমি ইউসুফকে সে দেশে এমন ক্ষমতা দান করলাম যে, সে সে দেশের যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারত। আমি যাকে চাই নিজ রহমত দান করি এবং আমি পুণ্যবানদের কর্মফল নষ্ট করি না।
৫৭

وَلَاَجۡرُ الۡاٰخِرَۃِ خَیۡرٌ لِّلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَکَانُوۡا یَتَّقُوۡنَ ٪ ٥٧

ওয়ালাআজরুল আ-খিরাতি খাইরুল লিল্লাযীনা আ-মানূওয়া কা-নূইয়াত্তাকূন।

যারা ঈমান আনে ও তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখেরাতের প্রতিদানই শ্রেয়। ৩৭

তাফসীরঃ

৩৭. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম দুনিয়ায় যে সম্মান ও ক্ষমতা লাভ করেছিলেন, কুরআন মাজীদ তার উল্লেখ করার সাথে সাথে এ বিষয়টাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আখেরাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য যে মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন সে তুলনায় এটা অতি তুচ্ছ। এভাবে পার্থিব সম্মান ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রত্যেককে নসীহত করে দেওয়া হল যে, তার সদা-সর্বদা সতর্ক থাকা চাই, যাতে দুনিয়ার সম্মান ও ক্ষমতার কারণে আখেরাতের প্রতিদান বরবাদ না হয়।
৫৮

وَجَآءَ اِخۡوَۃُ یُوۡسُفَ فَدَخَلُوۡا عَلَیۡہِ فَعَرَفَہُمۡ وَہُمۡ لَہٗ مُنۡکِرُوۡنَ ٥٨

ওয়াজাআ ইখওয়াতুইঊছুফা ফাদাখালূ‘আলাইহি ফা‘আরাফাহুম ওয়াহুম লাহূমুনকিরূন।

(যখন দুর্ভিক্ষ দেখা দিল) ইউসুফের ভাইয়েরা আসল এবং তারা তার কাছে উপস্থিত হল। ৩৮ ইউসুফ তো তাদেরকে চিনে ফেলল, কিন্তু তারা তাকে চিনল না। ৩৯

তাফসীরঃ

৩৮. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তো তাদেরকে এ কারণে চিনতে পেরেছিলেন যে, তাদের চেহারা-সুরতে বিশেষ কোন পরিবর্তন হয়নি। তাছাড়া তারা যে রেশন নিতে আসবে এ আশাও তাঁর ছিল। কিন্তু ভাইয়েরা তাকে চিনতে পারেনি। কেননা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তারা দেখেছিল তাঁর সাত বছর বয়সকালে। ইতোমধ্যে তো তিনি অনেক বড় হয়ে গেছেন। তাছাড়া মিসরের সরকারি ভবনে তিনি থাকতে পারেন এটা তো তাদের কল্পনায়ও ছিল না।
৫৯

وَلَمَّا جَہَّزَہُمۡ بِجَہَازِہِمۡ قَالَ ائۡتُوۡنِیۡ بِاَخٍ لَّکُمۡ مِّنۡ اَبِیۡکُمۡ ۚ اَلَا تَرَوۡنَ اَنِّیۡۤ اُوۡفِی الۡکَیۡلَ وَاَنَا خَیۡرُ الۡمُنۡزِلِیۡنَ ٥٩

ওয়া লাম্মা-জাহহাঝাহুম বিজাহা-ঝিহিম কা-লা’তূনী বিআখিল্লাকুম মিন আবীকুম আলাতারাওনা আন্নী ঊফিল কাইলা ওয়া আনা-খাইরুল মুনঝিলীন।

ইউসুফ যখন তাদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিল, তখন সে তাদেরকে বলল, (আগামীতে) তোমরা তোমাদের বৈমাত্রেয় ভাইকেও আমার কাছে নিয়ে এসো। ৪০ তোমরা কি দেখছ না আমি পরিমাপ-পাত্র ভরে ভরে দেই এবং আমি উত্তম অতিথিপরায়ণও বটে?

তাফসীরঃ

৪০. ঘটনা হয়েছিল এই যে, দশ ভাইয়ের প্রত্যেকে যখন মাথাপিছু একেক উট বোঝাই রসদ পেয়ে গেল, তখন তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে বলল, আমাদের একজন বৈমাত্রেয় ভাই আছে। আমাদের পিতার সেবার জন্য তার থাকার দরকার ছিল। তাই সে এখানে আসতে পারেনি। আপনি তার ভাগের রসদও আমাদেরকে দিয়ে দিন। এর জবাবে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন, রেশন বণ্টনের জন্য যে নীতিমালা স্থির করা হয়েছে, সে অনুসারে আমি এরূপ করতে পারি না। বরং পরের বার আপনারা যখন আসবেন, তখন তাকেও সঙ্গে নিয়ে আসবেন। তখন আমি প্রত্যেককে তার অংশ পুরোপুরি দিয়ে দেব। তখন যদি তাকে সঙ্গে না আনেন, তবে নিজেদের অংশও পাবেন না। কেননা তখন বোঝা যাবে আপনারা মিথ্যা দাবী করেছেন যে, আপনাদের আরও এক ভাই আছে। যারা এরূপ মিথ্যা বলে ধোঁকা দেয় তারা রেশন পেতে পারে না।
৬০

فَاِنۡ لَّمۡ تَاۡتُوۡنِیۡ بِہٖ فَلَا کَیۡلَ لَکُمۡ عِنۡدِیۡ وَلَا تَقۡرَبُوۡنِ ٦۰

ফাইল্লাম তা’তূনী বিহী ফালা-কাইলা লাকুম ‘ইনদী ওয়ালা তাকরাবূন।

তোমরা যদি তাকে আমার কাছে নিয়ে না আস তবে আমার কাছে তোমাদের জন্য কোন রসদ থাকবে না। তখন তোমরা আমার কাছেও আসবে না।
৬১

قَالُوۡا سَنُرَاوِدُ عَنۡہُ اَبَاہُ وَاِنَّا لَفٰعِلُوۡنَ ٦١

কা-লূছানুরা-ওয়িদু‘আনহু আবা-হু ওয়া ইন্না-লাফা-‘ইলূন।

তারা বলল, আমরা তার বিষয়ে তার পিতাকে সম্মত করার চেষ্টা করব, (যাতে তাকে আমাদের সাথে পাঠান) আর আমরা এটা অবশ্যই করব।
৬২

وَقَالَ لِفِتۡیٰنِہِ اجۡعَلُوۡا بِضَاعَتَہُمۡ فِیۡ رِحَالِہِمۡ لَعَلَّہُمۡ یَعۡرِفُوۡنَہَاۤ اِذَا انۡقَلَبُوۡۤا اِلٰۤی اَہۡلِہِمۡ لَعَلَّہُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ ٦٢

ওয়া কা-লা লিফিতইয়া-নিহিজ‘আলূ বিদা-‘আতাহুম ফী রিহা-লিহিম লা‘আল্লাহুম ইয়া‘রিফূনাহা ইযানকালাবূ ইলাআহলিহিম লা‘আল্লাহুম ইয়ারজি‘উন।

ইউসুফ তার ভৃত্যদেরকে বলে দিল, তারা যেন তাদের (অর্থাৎ ভাইদের) পণ্যমূল্য (যার বিনিময়ে তারা খাদ্য কিনেছে) তাদের মালপত্রের মধ্যে রেখে দেয়, ৪১ যাতে তারা নিজেদের পরিবারবর্গের কাছে ফিরে যাওয়ার পর তাদের পণ্যমূল্য চিনতে পারে। হয়ত (এই অনুগ্রহের কারণে) তারা পুনরায় আসবে।

তাফসীরঃ

৪১. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ভাইদের প্রতি এই অনুকম্পা দেখালেন যে, তারা খাদ্য ক্রয়ের জন্য যে মূল্য দিয়েছিল, তা তাদের মালপত্রের মধ্যে ফেরত রেখে দিলেন। সেকালে সোনা-রুপার মুদ্রার প্রচলন ছিল না। পণ্যমূল্য হিসেবে বিভিন্ন মালামাল ব্যবহৃত হত। কোন কোন রিওয়ায়াত দ্বারা জানা যায়, তারা কিনআন থেকে কিছু চামড়া ও জুতা নিয়ে এসেছিল। পণ্যমূল্য হিসেবে তারা সেগুলোই পেশ করল। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম সেগুলোই তাদের মালপত্রের মধ্যে ফেরত রাখলেন। আর তিনি সম-পরিমাণ মূল্য যে নিজ পকেট থেকে সরকারি কোষাগারে জমা করেছিলেন, তা এমনিতেই বুঝে আসে।
৬৩

فَلَمَّا رَجَعُوۡۤا اِلٰۤی اَبِیۡہِمۡ قَالُوۡا یٰۤاَبَانَا مُنِعَ مِنَّا الۡکَیۡلُ فَاَرۡسِلۡ مَعَنَاۤ اَخَانَا نَکۡتَلۡ وَاِنَّا لَہٗ لَحٰفِظُوۡنَ ٦٣

ফালাম্মা-রাজা‘ঊইলাআবীহিম কা-লূইয়াআবা-না-মুনি‘আ মিন্নাল কাইলুফাআরছিল মা‘আনাআখা-না-নাকতাল ওয়া ইন্না-লাহূলাহা-ফিজূ ন।

অতঃপর তারা যখন তাদের পিতার কাছে ফিরে আসল, তখন তারা বলল, আব্বাজী! আগামীতে আমাদেরকে খাদ্য দিতে অস্বীকার করা হয়েছে। ৪২ সুতরাং আপনি আমাদের সাথে আমাদের ভাই (বিনইয়ামীন)কে পাঠান, যাতে আমরা খাদ্য আনতে পারি। নিশ্চিত থাকুন আমরা তার পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করব।

তাফসীরঃ

৪২. অর্থাৎ, আমরা বিনইয়ামীনকে নিয়ে না গেলে আমাদের কাউকেই রেশন দেওয়া হবে না।
৬৪

قَالَ ہَلۡ اٰمَنُکُمۡ عَلَیۡہِ اِلَّا کَمَاۤ اَمِنۡتُکُمۡ عَلٰۤی اَخِیۡہِ مِنۡ قَبۡلُ ؕ فَاللّٰہُ خَیۡرٌ حٰفِظًا ۪ وَّہُوَ اَرۡحَمُ الرّٰحِمِیۡنَ ٦٤

কা-লা হাল আ-মানুকুম ‘আলাইহি ইল্লা-কামাআমিনতুকুম ‘আলাআখীহি মিন কাবলু ফাল্লা-হু খাইরুন হা-ফিজাওঁ ওয়াহুওয়া আরহামুর রা-হিমীন।

পিতা বলল, আমি কি তার ব্যাপারে তোমাদের উপর সেই রকম নির্ভর করব, যে রকম নির্ভর ইতঃপূর্বে তার ভাই (ইউসুফ)-এর ব্যাপারে করেছিলাম? আচ্ছা! আল্লাহই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ রক্ষাকর্তা এবং তিনি সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দয়ালু।
৬৫

وَلَمَّا فَتَحُوۡا مَتَاعَہُمۡ وَجَدُوۡا بِضَاعَتَہُمۡ رُدَّتۡ اِلَیۡہِمۡ ؕ قَالُوۡا یٰۤاَبَانَا مَا نَبۡغِیۡ ؕ ہٰذِہٖ بِضَاعَتُنَا رُدَّتۡ اِلَیۡنَا ۚ وَنَمِیۡرُ اَہۡلَنَا وَنَحۡفَظُ اَخَانَا وَنَزۡدَادُ کَیۡلَ بَعِیۡرٍ ؕ ذٰلِکَ کَیۡلٌ یَّسِیۡرٌ ٦٥

ওয়া লাম্মা-ফাতাহূমাতা-‘আহুম ওয়াজাদূবিদা-‘আতাহুম রুদ্দাত ইলাইহিম কা-লূ ইয়াআবা-না-মা-নাবগী হা-যিহী বিদা-‘আতুনা-রুদ্দাত ইলাইনা- ওয়া নামীরু আহলানা-ওয়া নাহফাজুআখা-না-ওয়া নাঝদা-দুকাইলা বা‘ঈরিন যা-লিকা কাইলুইঁ ইয়াছীর।

যখন তারা তাদের মালপত্র খুলল, তখন দেখল, তাদের পণ্যমূল্যও ফেরত দেওয়া হয়েছে। তারা বলে উঠল, আব্বাজী! আমাদের আর কী চাই? এই যে আমাদের পণ্যমূল্যও আমাদেরকে ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং (এবার) আমরা আমাদের পরিবারবর্গের জন্য (আরও) খাদ্য-সামগ্রী নিয়ে আসব, আমাদের ভাইকে হেফাজত করব এবং অতিরিক্ত এক উটের বোঝাও নিয়ে আসব। (এভাবে) এই অতিরিক্ত খাদ্য অতি সহজ। ৪৩

তাফসীরঃ

৪৩. অর্থাৎ ভাইয়ের জন্য যে অতিরিক্ত এক বোঝা পাওয়া যাবে তা দেওয়া মিসর রাজের পক্ষে অতি সহজ। অনেকে এর অর্থ করেছেন ‘আমরা যে রসদ নিয়ে এসেছি তা অতি সামান্য’ আমাদের প্রয়োজন অপেক্ষা কম। এই দুর্ভিক্ষের সময়ে এতে আমাদের কতদিন চলবে? আমাদের আরও অনেক রসদ দরকার, সেজন্য বিনইয়ামীনকে সঙ্গে যেতে হবে, নয়ত তারটা তো পাবই না, আমাদেরকেও নতুন কোন রসদ দেওয়া হবে না। -অনুবাদক
৬৬

قَالَ لَنۡ اُرۡسِلَہٗ مَعَکُمۡ حَتّٰی تُؤۡتُوۡنِ مَوۡثِقًا مِّنَ اللّٰہِ لَتَاۡتُنَّنِیۡ بِہٖۤ اِلَّاۤ اَنۡ یُّحَاطَ بِکُمۡ ۚ فَلَمَّاۤ اٰتَوۡہُ مَوۡثِقَہُمۡ قَالَ اللّٰہُ عَلٰی مَا نَقُوۡلُ وَکِیۡلٌ ٦٦

কা-লা লান উরছিলাহূমা‘আকুম হাত্তা-তু’তূনি মাওছিকাম মিনাল্লা-হি লাতা’তুন্নানী বিহী ইল্লা আইঁ ইউহা-তা বিকুম ফালাম্মা আ-তাওহু মাওছিকাহুম কা-লাল্লা-হু ‘আলামা-নাকূলুওয়াকীল।

পিতা বলল, আমি তাকে (বিন ইয়ামীনকে) তোমাদের সঙ্গে কিছুতেই পাঠাব না, যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর নামে আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও যে, তাকে অবশ্যই আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে, তবে তোমরা যদি (বাস্তবিকই) নিরুপায় হয়ে যাও (সেটা ভিন্ন কথা)। অবশেষে তারা যখন পিতাকে সেই প্রতিশ্রুতি দিল, তখন পিতা বলল, আমরা যা বলছি আল্লাহ তার তত্ত্বাবধায়ক।
৬৭

وَقَالَ یٰبَنِیَّ لَا تَدۡخُلُوۡا مِنۡۢ بَابٍ وَّاحِدٍ وَّادۡخُلُوۡا مِنۡ اَبۡوَابٍ مُّتَفَرِّقَۃٍ ؕ وَمَاۤ اُغۡنِیۡ عَنۡکُمۡ مِّنَ اللّٰہِ مِنۡ شَیۡءٍ ؕ اِنِ الۡحُکۡمُ اِلَّا لِلّٰہِ ؕ عَلَیۡہِ تَوَکَّلۡتُ ۚ وَعَلَیۡہِ فَلۡیَتَوَکَّلِ الۡمُتَوَکِّلُوۡنَ ٦٧

ওয়া কা-লা ইয়া-বানিইইয়া লা-তাদখুলূমিম বা-বিওঁ ওয়া-হিদিওঁ ওয়াদখুলূমিন আবওয়াবিম মুতাফাররিকাতিওঁ ওয়ামাউগনী ‘আনকুম মিনাল্লা-হি মিন শাইইন ইনিল হুকমু ইল্লা-লিল্লা-হি ‘আলাইহি তাওয়াক্কালতু ওয়া ‘আলাইহি ফালইয়াতাওয়াক্কালিল মুতাওয়াক্কিলূন।

এবং (সেই সঙ্গে একথাও) বলল যে, হে আমার পুত্রগণ! তোমরা (নগরে) সকলে এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না; বরং ভিন্ন-ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। ৪৪ আমি তোমাদেরকে আল্লাহর ইচ্ছা হতে রক্ষা করতে পারব না। আল্লাহ ছাড়া কারও হুকুম কার্যকর হয় না, ৪৫ আমি তাঁরই উপর নির্ভর করেছি। আর যারা নির্ভর করতে চায় তাদের উচিত তাঁরই উপর নির্ভর করা।

তাফসীরঃ

৪৪. বদনজর থেকে বাঁচার কৌশল বলে দেওয়ার সাথে সাথে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এই পরম সত্যও তুলে ধরলেন যে, মানুষের কোনও কলা-কৌশলেরই নিজস্ব কোনও ক্ষমতা নেই। যা-কিছু হয়, আল্লাহ তাআলার হিকমত ও ইচ্ছাতেই হয়। তিনি চাইলে মানুষের গৃহীত ব্যবস্থার ভেতর কার্যকারিতা সৃষ্টি করেন কিংবা চাইলে তা নিষ্ফল করে দেন। সুতরাং একজন মুমিনের কর্তব্য সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার উপর নির্ভর করা, যদিও সে নিজ সাধ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণও করবে।
৬৮

وَلَمَّا دَخَلُوۡا مِنۡ حَیۡثُ اَمَرَہُمۡ اَبُوۡہُمۡ ؕ  مَا کَانَ یُغۡنِیۡ عَنۡہُمۡ مِّنَ اللّٰہِ مِنۡ شَیۡءٍ اِلَّا حَاجَۃً فِیۡ نَفۡسِ یَعۡقُوۡبَ قَضٰہَا ؕ  وَاِنَّہٗ لَذُوۡ عِلۡمٍ لِّمَا عَلَّمۡنٰہُ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ٪ ٦٨

ওয়া লাম্মা-দাখালূমিন হাইছুআমারাহুম আবূহুম মা-কা-না ইউগনী ‘আনহুম মিনাল্লাহি মিন শাইঁইন ইল্লা-হা-জাতান ফী নাফছি ইয়া‘কুবা কাদা-হা- ওয়া ইন্নাহূ লাযূ‘ইলমিল লিমা-‘আল্লামনা-হু ওয়ালা-কিন্না আকছারান্না-ছি লা-ইয়া‘লামূন।

তারা (ভাইগণ!) যখন তাদের পিতার আদেশ মত (নগরে) প্রবেশ করল, তখন তাদের সে কৌশল আল্লাহর ইচ্ছা হতে তাদেরকে আদৌ রক্ষা করার ছিল না। তবে ইয়াকুবের অন্তরে একটা অভিপ্রায় ছিল, যা সে পূর্ণ করল। নিশ্চয়ই সে আমার শেখানো জ্ঞানের ধারক ছিল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ (প্রকৃত বিষয়) জানে না। ৪৬

তাফসীরঃ

৪৬. অর্থাৎ, বহু লোক হয় নিজেদের বাহ্যিক কলা-কৌশলকেই প্রকৃত কার্যবিধায়ক মনে করে অথবা তার উপর এতটা নির্ভর করে যে, তখন আর আল্লাহ তাআলার ক্ষমতার প্রতি তাদের নজর থাকে না। চিন্তা করে না যে, আল্লাহ তাআলা যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের সে কলা-কৌশলে ক্ষমতা সৃষ্টি না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তা ফলপ্রসূ হতে পারে না। কিন্তু হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এরূপ ছিলেন না। তিনি যখন তাঁর পুত্রদেরকে বদনজর থেকে বাঁচার কৌশল বলে দিলেন, যাকে আয়াতে তার মনের হাজত বা অভিপ্রায় শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে, তখন সেই সঙ্গে একথাও জানিয়ে দিলেন যে, এটা কেবলই একটা ব্যবস্থা। প্রকৃতপক্ষে উপকার ও ক্ষতি সাধনের এখতিয়ার আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কারও নেই। সুতরাং তাদের সে ব্যবস্থা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় বদনজর থেকে বাঁচার ব্যাপারে তো ফলপ্রসূ হল, কিন্তু আল্লাহ তাআলারই ইচ্ছায় তারা অপর এক সঙ্কটে পড়ে গেল, যার বিবরণ সামনে আসছে।
৬৯

وَلَمَّا دَخَلُوۡا عَلٰی یُوۡسُفَ اٰوٰۤی اِلَیۡہِ اَخَاہُ قَالَ اِنِّیۡۤ اَنَا اَخُوۡکَ فَلَا تَبۡتَئِسۡ بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ٦٩

ওয়া লাম্মা-দাখালূ‘আলা-ইঊছুফা আ-ওয়াইলাইহি আখা-হূকা-লা ইন্নীআনা আখূকা ফালা-তাবতাইছ বিমা-কা-নূইয়া‘মালূন।

যখন তারা ইউসুফের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তার (সহোদর) ভাই (বিনইয়ামীন)কে নিজের কাছে বিশেষ স্থান দিল। ৪৭ (এবং তাকে) বলল, আমি তোমার ভাই। অতএব তারা (অন্য ভাইয়েরা) যা করত তার জন্য দুঃখ করো না।

তাফসীরঃ

৪৭. বিভিন্ন রিওয়ায়াতে আছে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম একেকটি কক্ষে দু’-দু’জন ভাইকে থাকতে দিয়েছিলেন। এভাবে দশ ভাই পাঁচটি কক্ষে অবস্থান গ্রহণ করল। বাকি থেকে গেল বিনইয়ামীন। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন, এই একজন আমার সঙ্গে থাকবে। এভাবে সহোদর ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর একান্তে মিলিত হওয়ার সুযোগ মিলে গেল। তখন তিনি তাকে জানিয়ে দিলেন যে, আমি তোমার আপন ভাই। বিনইয়ামীন বলল, তাহলে আমি আর তাদের সাথে ফিরে যাব না। তার এ অভিপ্রায় পূরণের জন্য হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তার বিবরণ সামনে আসছে।
৭০

فَلَمَّا جَہَّزَہُمۡ بِجَہَازِہِمۡ جَعَلَ السِّقَایَۃَ فِیۡ رَحۡلِ اَخِیۡہِ ثُمَّ اَذَّنَ مُؤَذِّنٌ اَیَّتُہَا الۡعِیۡرُ اِنَّکُمۡ لَسٰرِقُوۡنَ ٧۰

ফালাম্মা- জাহহাঝাহুম বিজাহা-ঝিহিম জা‘আলাছছিকা-য়াতা ফী রাহলি আখীহি ছু ম্মা আযযানা মুআযযিনুন আইয়াতুহাল ‘ঈরু ইন্নাকুম লাছা-রিকূ ন।

অতঃপর ইউসুফ যখন তাদের রসদের ব্যবস্থা করে দিল, তখন পানি পান করার পেয়ালা নিজ (সহোদর) ভাইয়ের মালপত্রের মধ্যে রেখে দিল। তারপর এক ঘোষক চীৎকার করে বলল, ওহে যাত্রীদল! তোমরা নিশ্চয়ই চোর। ৪৮

তাফসীরঃ

৪৮. এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তাদের মালপত্রের ভেতর নিজের পক্ষ থেকেই পেয়ালা রেখে দেওয়ার পর এতটা নিশ্চয়তার সাথে তাদেরকে চোর সাব্যস্ত করাটা কিভাবে জায়েয হতে পারে? এ প্রশ্নের বিভিন্ন উত্তর দেওয়া হয়েছে। যেমন কেউ কেউ বলেন, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম পেয়ালা রেখেছিলেন অতি গোপনে। তারপর কর্মচারীরা যখন সেটি খুঁজে পেল না, তখন তারা নিজেদের তরফ থেকেই তাদেরকে চোর সাব্যস্ত করল। তারা এটা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের হুকুমে করেনি। কিন্তু কুরআন মাজীদ ঘটনাটি এখানে যেভাবে বর্ণনা করেছে, তার পূর্বাপর অবস্থা দৃষ্টে এ সম্ভাবনাটি অত্যন্ত দূরের মনে হয়। কতিপয় মুফাসসিরের অভিমত হল, তাদেরকে চোর সাব্যস্ত করা হয়েছিল অপর একটি ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে। তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তাঁর শৈশবে পিতার নিকট থেকে চুরি করেছিল। সে হিসেবেই তাদেরকে চোর বলা হয়েছে। আবার অপর একদল মুফাসসিরের মতে যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই ইউসুফ আলাইহিস সালামকে এ কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলেন, যেমন সামনে ৭৬ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেছেন, ‘এভাবে আমি ইউসুফের জন্য এ কৌশলটি করেছিলাম; তাই যা-কিছু হয়েছিল তা আল্লাহ তাআলার হুকুমেই হয়েছিল। সুতরাং এ নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ নেই। এটা সূরা কাহাফে বর্ণিত হযরত খাযির আলাইহিস সালামের ঘটনার মত। তাতে তিনি কয়েকটি কাজ এমন করেছিলেন, যা বাহ্যত শরীয়ত বিরোধী ছিল, কিন্তু তা যেহেতু আল্লাহ তাআলার তাকবীনী (অদৃশ্য রহস্য-জগতীয়) হুকুমে হয়েছিল, তাই জায়েয ছিল। এস্থলেও হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাজটিও সে রকমেরই।
৭১

قَالُوۡا وَاَقۡبَلُوۡا عَلَیۡہِمۡ مَّاذَا تَفۡقِدُوۡنَ ٧١

কা-লূওয়া আকবালূ‘আলাইহিম মা-যা-তাফকিদূন।

তারা তাদের দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কী বস্তু হারিয়েছ?
৭২

قَالُوۡا نَفۡقِدُ صُوَاعَ الۡمَلِکِ وَلِمَنۡ جَآءَ بِہٖ حِمۡلُ بَعِیۡرٍ وَّاَنَا بِہٖ زَعِیۡمٌ ٧٢

কা-লূনাফকিদুসুওয়া-‘আল মালিকি ওয়া লিমান জাআ বিহী হিমলুবা‘ঈরিওঁ ওয়া আনা বিহী ঝা‘ঈম।

তারা বলল, আমরা বাদশাহর পানপাত্র পাচ্ছি না। ৪৯ যে ব্যক্তি সেটি এনে দেবে, সে এক উটের বোঝা (পুরস্কার) পাবে। আমি তার (পুরস্কার প্রাপ্তির) জামিন।

তাফসীরঃ

৪৯. এটা ছিল রাজকীয় পানপাত্র এবং বোঝাই যাচ্ছে অতি মূল্যবান ছিল। তা না হলে তার তালাশে এতটা মেহনত করা হত না।
৭৩

قَالُوۡا تَاللّٰہِ لَقَدۡ عَلِمۡتُمۡ مَّا جِئۡنَا لِنُفۡسِدَ فِی الۡاَرۡضِ وَمَا کُنَّا سٰرِقِیۡنَ ٧٣

কা-লূতাল্লা-হি লাকাদ ‘আলিমতুমমা-জি’না-লিনুফছিদা ফিল আরদিওয়ামা-কুন্না-ছা রিকীন।

তারা (ভাইয়েরা) বলল, আল্লাহর কসম! আপনারা জানেন, আমরা দেশে ফাসাদ বিস্তার করার জন্য আসিনি এবং আমরা চোরও নই।
৭৪

قَالُوۡا فَمَا جَزَآؤُہٗۤ اِنۡ کُنۡتُمۡ کٰذِبِیۡنَ ٧٤

কা-লূফামা-জাঝাউহূ ইন কুনতুম কা-যিবীন।

তারা বলল, তোমরা যদি মিথ্যাবাদী (প্রমাণিত) হও, তবে তার শাস্তি কী হবে?
৭৫

قَالُوۡا جَزَآؤُہٗ مَنۡ وُّجِدَ فِیۡ رَحۡلِہٖ فَہُوَ جَزَآؤُہٗ ؕ کَذٰلِکَ نَجۡزِی الظّٰلِمِیۡنَ ٧٥

কা-লূজাঝাউহূমাওঁউজিদা ফী রাহলিহী ফাহুওয়া জাঝাউহূ কাযা-লিকা নাজঝিজ্জা-লিমীন।

তারা বলল, তার শাস্তি এই যে, যার মালপত্রের মধ্যে সেটি (পেয়ালাটি) পাওয়া যাবে শাস্তি স্বরূপ সেই ধৃত হবে। যারা জুলুম করে, আমরা তাদেরকে এ রকমই শাস্তি দিয়ে থাকি। ৫০

তাফসীরঃ

৫০. অর্থাৎ, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের শরীয়তে চুরির শাস্তি এটাই যে, যে ব্যক্তি চুরি করবে তাকে গ্রেফতার করে রেখে দেওয়া হবে। এভাবে আল্লাহ তাআলা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের দ্বারাই বলিয়ে দিলেন যে, চোরের এ রকম শাস্তিই প্রাপ্য। সুতরাং যে শাস্তি দেওয়া হল তা হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের শরীয়ত মোতাবেকই দেওয়া হল। না হয় বাদশাহর আইনে এ শাস্তি দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কেননা তার আইন অনুযায়ী চোরকে বেত্রাঘাত করা হত এবং তার উপর জরিমানা আরোপ করা হত। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম শাস্তি সম্পর্কে তাঁর ভাইদের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন এ লক্ষ্যেই, যাতে তাকে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের শরীয়তের বিপরীতে ফায়সালা দিতে না হয়। আবার সেই সঙ্গে ভাইকেও নিজের কাছে রাখার সুযোগ মিলে যায়।
৭৬

فَبَدَاَ بِاَوۡعِیَتِہِمۡ قَبۡلَ وِعَآءِ اَخِیۡہِ ثُمَّ اسۡتَخۡرَجَہَا مِنۡ وِّعَآءِ اَخِیۡہِ ؕ کَذٰلِکَ کِدۡنَا لِیُوۡسُفَ ؕ مَا کَانَ لِیَاۡخُذَ اَخَاہُ فِیۡ دِیۡنِ الۡمَلِکِ اِلَّاۤ اَنۡ یَّشَآءَ اللّٰہُ ؕ نَرۡفَعُ دَرَجٰتٍ مَّنۡ نَّشَآءُ ؕ وَفَوۡقَ کُلِّ ذِیۡ عِلۡمٍ عَلِیۡمٌ ٧٦

ফাবাদাআ বিআও‘ইইয়াতিহিম কাবলা বি‘আই আখীহি ছুম্মাছতাখরাজাহা-মিওঁ বি‘আই আখীহি কাযা-লিকা কিদনা-লিইঊছুফা মা-কা-না লিইয়া‘খুযা আখাহু ফী দীনিল মালিকি ইল্লা আইঁ ইয়াশাআল্লা-হু নারফা‘উ দারাজা-তিম মান্নাশাউ ওয়া ফাওকা কুল্লি যী ‘ইলমিন ‘আলীম।

তারপর ইউসুফ তার (সহোদর) ভাইয়ের থলি তল্লাশির আগে অন্য ভাইদের থলি তল্লাশি শুরু করল। তারপর পেয়ালাটি নিজ (সহোদর) ভাইয়ের থলি থেকে বের করে আনল। ৫১ এভাবে আমি ইউসুফের জন্য কৌশল করলাম। আল্লাহর এই ইচ্ছা না হলে বাদশাহর আইন অনুযায়ী ইউসুফের পক্ষে তার ভাইকে নিজের কাছে রাখা সম্ভব ছিল না। আমি যাকে ইচ্ছা করি তার মর্যাদা উঁচু করি। আর যত জ্ঞানী আছে, তাদের সকলের উপর আছেন একজন সর্বজ্ঞানী। ৫২

তাফসীরঃ

৫১. ভাইয়েরা বড় খুশী হয়ে গিয়েছিল। মনে করেছিল তারা যা চেয়েছিল তাই হয়েছে। কিন্তু তাদের খবর ছিল না ঘটনাক্রম কোন দিকে গড়ায়। যে যত বড় জ্ঞানী হওয়ারই দাবী করুক, আল্লাহ তাআলার জ্ঞান নিঃসন্দেহে সকলের উপরে।
৭৭

قَالُوۡۤا اِنۡ یَّسۡرِقۡ فَقَدۡ سَرَقَ اَخٌ لَّہٗ مِنۡ قَبۡلُ ۚ فَاَسَرَّہَا یُوۡسُفُ فِیۡ نَفۡسِہٖ وَلَمۡ یُبۡدِہَا لَہُمۡ ۚ قَالَ اَنۡتُمۡ شَرٌّ مَّکَانًا ۚ وَاللّٰہُ اَعۡلَمُ بِمَا تَصِفُوۡنَ ٧٧

কা-লূ ইয়ঁইয়াছরিকফাকাদ ছারাকা আখূল্লাহূমিন কাবলু ফাআছাররাহা-ইঊছুফুফী নাফছিহী ওয়ালাম ইউবদিহা-লাহুম কা-লা আনতুম শাররুম মা-কা-নাওঁ- ওয়াল্লা-হু আ‘লামুবিমা-তাসিফূন।

ভাইয়েরা বলল, যদি সে (বিন ইয়ামীন) চুরি করে তবে (আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা) এর আগে তার ভাইও চুরি করেছিল। ৫৩ তখন ইউসুফ তাদের কাছে প্রকাশ না করে চুপিসারে (মনে মনে) বলল, এ ব্যাপারে তোমরা তো ঢের বেশি মন্দ ৫৪ আর তোমরা যা বলছ তার প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত।

তাফসীরঃ

৫৩. অর্থাৎ, যেই চুরিকর্ম সম্পর্কে তোমরা আমার প্রতি অপবাদ লাগাচ্ছ, সে ব্যাপারে তোমাদের অবস্থা তো অনেক বেশি মন্দ। কেননা তোমরা তো খোদ আমাকেই আমার পিতার নিকট থেকে চুরি করে কুয়ায় ফেলে দিয়েছিলে।
৭৮

قَالُوۡا یٰۤاَیُّہَا الۡعَزِیۡزُ اِنَّ لَہٗۤ اَبًا شَیۡخًا کَبِیۡرًا فَخُذۡ اَحَدَنَا مَکَانَہٗ ۚ اِنَّا نَرٰىکَ مِنَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ٧٨

কা-লূইয়া আইয়ুহাল ‘আঝীঝুইন্না লাহূ আবান শাইখান কাবীরান ফাখুযআহাদানা-মাকানাহূ ইন্না-নারা-কা মিনাল মুহছিনীন।

(এবার) তারা বলতে লাগল, হে আযীয! এর অতিশয় বৃদ্ধ এক পিতা আছেন। কাজেই তার পরিবর্তে আমাদের মধ্য হতে কাউকে আপনার কাছে রেখে দিন। যারা সদয় আচরণ করে আমরা আপনাকে তাদের একজন মনে করি।
৭৯

قَالَ مَعَاذَ اللّٰہِ اَنۡ نَّاۡخُذَ اِلَّا مَنۡ وَّجَدۡنَا مَتَاعَنَا عِنۡدَہٗۤ ۙ  اِنَّاۤ اِذًا لَّظٰلِمُوۡنَ ٪ ٧٩

কা-লা মা‘আযাল্লা-হি আন না’খুযা ইল্লা-মাওঁ ওয়াজাদনা-মাতা-‘আনা-‘ইনদাহূ ইন্না ইযাল লাজা-লিমূন।

ইউসুফ বলল, এর থেকে (অর্থাৎ এই বে-ইনসাফী থেকে) আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি যে, যে ব্যক্তির কাছে আমাদের মাল পাওয়া গেছে তার পরিবর্তে অন্য কাউকে পাকড়াও করব। আমরা এরূপ করলে নিশ্চিতভাবেই আমরা জালিম হয়ে যাব।
৮০

فَلَمَّا اسۡتَیۡـَٔسُوۡا مِنۡہُ خَلَصُوۡا نَجِیًّا ؕ قَالَ کَبِیۡرُہُمۡ اَلَمۡ تَعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اَبَاکُمۡ قَدۡ اَخَذَ عَلَیۡکُمۡ مَّوۡثِقًا مِّنَ اللّٰہِ وَمِنۡ قَبۡلُ مَا فَرَّطۡتُّمۡ فِیۡ یُوۡسُفَ ۚ فَلَنۡ اَبۡرَحَ الۡاَرۡضَ حَتّٰی یَاۡذَنَ لِیۡۤ اَبِیۡۤ اَوۡ یَحۡکُمَ اللّٰہُ لِیۡ ۚ وَہُوَ خَیۡرُ الۡحٰکِمِیۡنَ ٨۰

ফালাম্মাছ তাইআছূমিনহু খালাসূনাজিইইয়ান কা-লা কাবীরুহুম আলাম তা‘লামূ আন্না আবা-কুম কাদ আখাযা ‘আলাইকুম মাওছিকাম মিনাল্লা-হি ওয়া মিন কাবলুমাফাররাততুম ফী ইঊছুফা ফালান আবরাহাল আরদা হাত্তা-ইয়া’যানা লীআবী আও ইয়াহকুমাল্লা-হু লী ওয়া হুওয়া খাইরুল হা-কিমীন।

তারা যখন ইউসুফের দিক থেকে সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে গেল, তখন নির্জনে গিয়ে চুপিসারে পরামর্শ করতে লাগল। তাদের মধ্যে যে সকলের বড় ছিল সে বলল, তোমাদের কি জানা নেই তোমাদের পিতা তোমাদের থেকে আল্লাহর নামে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন? এবং এর আগে ইউসুফের ব্যাপারে তোমরা যে ত্রুটি করেছিলে (তাও তোমাদের জানা আছে)। সুতরাং আমি তো এ দেশ ত্যাগ করব না, যাবৎ না আমার পিতা আমাকে অনুমতি দেন কিংবা আল্লাহই আমার ব্যাপারে কোনও ফায়সালা করে দেন। তিনিই সর্বাপেক্ষা উত্তম ফায়সালাকারী।
৮১

اِرۡجِعُوۡۤا اِلٰۤی اَبِیۡکُمۡ فَقُوۡلُوۡا یٰۤاَبَانَاۤ اِنَّ ابۡنَکَ سَرَقَ ۚ وَمَا شَہِدۡنَاۤ اِلَّا بِمَا عَلِمۡنَا وَمَا کُنَّا لِلۡغَیۡبِ حٰفِظِیۡنَ ٨١

ইরজি‘ঊ ইলা আবীকুম ফাকূলূইয়া আবা-নাইন্নাবনাকা ছারাকা ওয়ামাশাহিদনা ইল্লা-বিমা-‘আলিমনা-ওয়ামা-কুন্না-লিলগাইবি হা-ফিজীন।

তোমরা তোমাদের পিতার কাছে ফিরে যাও এবং তাকে বল, আব্বাজী! আপনার পুত্র চুরি করেছিল আর আমরা সে কথাই বললাম, যা আমরা জানতে পেরেছি। গায়েবের খবর রাখা তো আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
৮২

وَسۡـَٔلِ الۡقَرۡیَۃَ الَّتِیۡ کُنَّا فِیۡہَا وَالۡعِیۡرَ الَّتِیۡۤ اَقۡبَلۡنَا فِیۡہَا ؕ وَاِنَّا لَصٰدِقُوۡنَ ٨٢

ওয়াছ আলিল কারয়াতাল্লাতী কুন্না-ফীহা-ওয়াল ‘ঈরাল্লাতী আকবালনা-ফীহা- ওয়া ইন্না-লাসা-দিকূন।

আমরা যে জনপদে ছিলাম তাকে জিজ্ঞেস করুন এবং আমরা যে যাত্রী দলের সাথে এসেছি তাদের থেকে যাচাই করে নিন। নিশ্চয়ই আমরা সত্যবাদী।
৮৩

قَالَ بَلۡ سَوَّلَتۡ لَکُمۡ اَنۡفُسُکُمۡ اَمۡرًا ؕ فَصَبۡرٌ جَمِیۡلٌ ؕ عَسَی اللّٰہُ اَنۡ یَّاۡتِـیَنِیۡ بِہِمۡ جَمِیۡعًا ؕ اِنَّہٗ ہُوَ الۡعَلِیۡمُ الۡحَکِیۡمُ ٨٣

কা-লা বাল ছাওওয়ালাত লাকুম আনফুছুকুম আমরান ফাসাবরুন জামীলুন ‘আছাল্লা-হু আইঁ ইয়া’তিয়ানী বিহিম জামী‘আন ইন্নাহূহুওয়াল ‘আলীমুল হাকীম।

(সুতরাং ভাইয়েরা ইয়াকুব আলাইহিস সালামের কাছে গেল এবং বড় ভাই যা শিখিয়ে দিয়েছিল সে কথাই তাকে বলল)। ইয়াকুব (তা শুনে) বলল, না, বরং তোমাদের মন নিজের তরফ থেকে একটি কথা বানিয়ে নিয়েছে। ৫৫ সুতরাং আমার পক্ষে সবরই শ্রেয়। কিছু অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তাদের সকলকে আমার কাছে এনে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

৫৫. হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম নিশ্চিত ছিলেন বিনইয়ামীন চুরি করতে পারে না। তাই তিনি মনে করলেন, এবারও তারা কোনও গল্প বানিয়ে নিয়েছে।
৮৪

وَتَوَلّٰی عَنۡہُمۡ وَقَالَ یٰۤاَسَفٰی عَلٰی یُوۡسُفَ وَابۡیَضَّتۡ عَیۡنٰہُ مِنَ الۡحُزۡنِ فَہُوَ کَظِیۡمٌ ٨٤

ওয়া তাওয়াল্লা-‘আনহুম ওয়া কা-লা ইয়াআছাফা-‘আলা-ইঊছুফা ওয়াবইয়াদ্দাত ‘আইনা-হু মিনাল হুঝনি ফাহুওয়া কাজীম।

এবং (একথা বলে) সে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বলতে লাগল, আহা ইউসুফ! আর তার চোখ দু’টি দুঃখে (কাঁদতে কাঁদতে) সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং তার হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল।
৮৫

قَالُوۡا تَاللّٰہِ تَفۡتَؤُا تَذۡکُرُ یُوۡسُفَ حَتّٰی تَکُوۡنَ حَرَضًا اَوۡ تَکُوۡنَ مِنَ الۡہٰلِکِیۡنَ ٨٥

কা-লূতাল্লা-হি তাফতাউ তাযকুরু ইঊছুফা হাত্তা-তাকূনা হারাদান আও তাকূনা মিনাল হা-লিকীন।

তার পুত্রগণ বলতে লাগল, আল্লাহর কসম! আপনি তো ইউসুফকে ভুলবেন না, যতক্ষণ না আপনি সম্পূর্ণ জরাজীর্ণ হবেন কিংবা মারাই যাবেন।
৮৬

قَالَ اِنَّمَاۤ اَشۡکُوۡا بَثِّیۡ وَحُزۡنِیۡۤ اِلَی اللّٰہِ وَاَعۡلَمُ مِنَ اللّٰہِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ٨٦

কা-লা ইন্নামাআশকূবাছছীওয়াহুঝনীইলাল্লা-হি ওয়া আ‘লামুমিনাল্লা-হি মা-লাতা‘লামূন।

ইয়াকুব বলল, আমি আমার দুঃখ ও বেদনার অভিযোগ (তোমাদের কাছে নয়) কেবল আল্লাহরই কাছে করছি। আর আল্লাহ সম্পর্কে আমি যতটা জানি, তোমরা জান না।
৮৭

یٰبَنِیَّ اذۡہَبُوۡا فَتَحَسَّسُوۡا مِنۡ یُّوۡسُفَ وَاَخِیۡہِ وَلَا تَایۡـَٔسُوۡا مِنۡ رَّوۡحِ اللّٰہِ ؕ اِنَّہٗ لَا یَایۡـَٔسُ مِنۡ رَّوۡحِ اللّٰہِ اِلَّا الۡقَوۡمُ الۡکٰفِرُوۡنَ ٨٧

ইয়া-বানিইইয়াযহাবূফাতাহাছছাছূমিইঁ ইঊছুফা ওয়া আখীহি ওয়ালা-তাইআছূমির রাওহিল্লা-হি; ইন্নাহূলা-ইয়াইআছুমিররাওহিল্লা-হি ইল্লাল কাওমুল কা-ফিরূন।

ওহে আমার পুত্রগণ! তোমরা যাও এবং ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সন্ধান চালাও। তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, জেনে রেখ আল্লাহর রহমত থেকে কেবল তারাই নিরাশ হয়, যারা কাফের। ৫৬

তাফসীরঃ

৫৬. হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম নিশ্চিত ছিলেন যে, ইউসুফ আলাইহিস সালামও কোথাও না কোথাও জীবিত আছেন। আর বিনইয়ামীন তো আটক রয়েছে। তাই তিনি কিছু দিন পর পূর্ণ আস্থার সাথে হুকুম দিলেন, ‘তোমরা গিয়ে তাদের দু’জনকে খোঁজ কর। ইত্যবসরে তাদের আনা খাদ্যও ফুরিয়ে গিয়েছিল। আর দুর্ভিক্ষ তো চলছিলই। সুতরাং ভাইয়েরা পুনরায় মিসর যেতে মনস্থ করল। কেননা বিনইয়ামীন তো নিশ্চিতভাবেই সেখানে আছে। প্রথমে তাকে মুক্ত করে আনার চেষ্টা করা চাই। তারপর ইউসুফ আলাইহিস সালামেরও খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করা যাবে। কাজেই তারা মিসর গেল এবং প্রথমে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সাথে রসদের ব্যাপারে কথা বলল, যাতে তার মনটা কিছুটা নরম হয় এবং বিনইয়ামীনকে ফেরত নেওয়া সম্পর্কে কথা বলা সহজ হয়। পরবর্তী আয়াতসমূহে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সাথে তাদের সেই কথোপকথনের বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
৮৮

فَلَمَّا دَخَلُوۡا عَلَیۡہِ قَالُوۡا یٰۤاَیُّہَا الۡعَزِیۡزُ مَسَّنَا وَاَہۡلَنَا الضُّرُّ وَجِئۡنَا بِبِضَاعَۃٍ مُّزۡجٰىۃٍ فَاَوۡفِ لَنَا الۡکَیۡلَ وَتَصَدَّقۡ عَلَیۡنَا ؕ اِنَّ اللّٰہَ یَجۡزِی الۡمُتَصَدِّقِیۡنَ ٨٨

ফালাম্মা-দাখালূ‘আলাইহি কা-লূইয়াআইয়ুহাল ‘আঝীঝুমাছছানা-ওয়াআহলানাদদুররু ওয়া জি’না-ব্বিিদা-‘আতিম মুঝজা-তিন ফাআওফি লানাল কাইলা ওয়া তাসাদ্দাক ‘আলাইনা- ইন্নাল্লা-হা ইয়াজঝিল মুতাসাদ্দিকীন।

সুতরাং তারা যখন ইউসুফের কাছে পৌঁছল, তখন তারা (ইউসুফকে) বলল, হে আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবারবর্গ কঠিন মুসিবতে আক্রান্ত হয়েছি। আমরা সামান্য কিছু পুঁজি নিয়ে এসেছি। আপনি আমাদেরকে পরিপূর্ণ রসদ দান করুন ৫৭ এবং আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্যে অনুগ্রহকারীদেরকে মহা পুরস্কার দিয়ে থাকেন।

তাফসীরঃ

৫৭. অর্থাৎ, দুর্ভিক্ষের কারণে আমরা কঠিন দুর্দশার শিকার হয়েছি, যে কারণে আমাদের প্রয়োজনীয় রসদ কেনার জন্য যে মূল্য দরকার এবার আমরা তাও আনতে পারিনি। সুতরাং এবার আপনি আমাদেরকে যা-কিছু দেবেন তা কেবল আপনার অনুগ্রহই হবে। কুরআন মাজীদে ‘সদাকা’ تَصَدَّق শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। সদাকা বলে এমন দানকে যা দেওয়া দাতার পক্ষে অবশ্যকর্তব্য নয়। তথাপি সে তা কেবল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অনুগ্রহস্বরূপ দিয়ে থাকে।
৮৯

قَالَ ہَلۡ عَلِمۡتُمۡ مَّا فَعَلۡتُمۡ بِیُوۡسُفَ وَاَخِیۡہِ اِذۡ اَنۡتُمۡ جٰہِلُوۡنَ ٨٩

কা-লা হাল ‘আলিমতুম মা-ফা‘আলতুম বিইঊছুফা ওয়া আখীহি ইযআনতুম জা-হিলূন।

ইউসুফ বলল, তোমাদের কি খবর আছে তোমরা যখন অজ্ঞতার শিকার ছিলে তখন ইউসুফ ও তার ভায়ের সাথে কী আচরণ করেছিলে?
৯০

قَالُوۡۤا ءَاِنَّکَ لَاَنۡتَ یُوۡسُفُ ؕ قَالَ اَنَا یُوۡسُفُ وَہٰذَاۤ اَخِیۡ ۫ قَدۡ مَنَّ اللّٰہُ عَلَیۡنَا ؕ اِنَّہٗ مَنۡ یَّـتَّقِ وَیَصۡبِرۡ فَاِنَّ اللّٰہَ لَا یُضِیۡعُ اَجۡرَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ٩۰

কা-লূআ ইন্নাকা লাআনতা ইঊছুফু কা-লা আনা ইঊছুফুওয়া হা-যাআখী কাদ মান্নাল্লা-হু ‘আলাইনা- ইন্নাহূমাইঁ ইয়াত্তাকিওয়া ইয়াসবির ফাইন্নাল্লা-হা লা-ইউদী‘উ আজরাল মুহছিনীন।

(একথা শুনে) তারা বলে উঠল, তবে কি তুমিই ইউসুফ? ৫৮ ইউসুফ বলল, আমি ইউসুফ এবং এই আমার ভাই। আল্লাহ আমাদের প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন ও ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ সেরূপ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।

তাফসীরঃ

৫৮. এ পর্যন্ত তো তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে চিনতে পারছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই যখন নিজের নাম উচ্চারণ করলেন, তখন তারা ভালো করে লক্ষ্য করল ফলে তাদের ধারণা জন্মাল হয়ত তিনিই ইউসুফ।
৯১

قَالُوۡا تَاللّٰہِ لَقَدۡ اٰثَرَکَ اللّٰہُ عَلَیۡنَا وَاِنۡ کُنَّا لَخٰطِئِیۡنَ ٩١

কা-লূতাল্লা-হি লাকাদ আ-ছারাকাল্লা-হু ‘আলাইনা-ওয়া ইন কুন্না-লাখা-তিঈন।

তারা বলল, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাদের উপর তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং আমরা নিশ্চয়ই অপরাধী ছিলাম।
৯২

قَالَ لَا تَثۡرِیۡبَ عَلَیۡکُمُ الۡیَوۡمَ ؕ یَغۡفِرُ اللّٰہُ لَکُمۡ ۫ وَہُوَ اَرۡحَمُ الرّٰحِمِیۡنَ ٩٢

কা-লা লা-তাছরীবা ‘আলাইকুমুল ইয়াওমা ইয়াগফিরুল্লা-হু লাকুম ওয়া হুওয়া আরহামুর রা-হিমীন।

ইউসুফ বলল, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ আনা হবে না। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি সকল দয়ালু অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দয়ালু।
৯৩

اِذۡہَبُوۡا بِقَمِیۡصِیۡ ہٰذَا فَاَلۡقُوۡہُ عَلٰی وَجۡہِ اَبِیۡ یَاۡتِ بَصِیۡرًا ۚ  وَاۡتُوۡنِیۡ بِاَہۡلِکُمۡ اَجۡمَعِیۡنَ ٪ ٩٣

ইযহাবূবিকামীসী হা-যা-ফাআলকূহূ‘আলা-ওয়াজহি আবী ইয়া’তি বাসীরা- ওয়া’তূনী বিআহলিকুম আজমা‘ঈন।

আমার এই জামা নিয়ে যাও এবং এটা আমার পিতার চেহারার উপর রেখে দিও। এর ফলে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসবে। আর তোমাদের পরিবারের সকলকে আমার কাছে নিয়ে এসো। ৫৯

তাফসীরঃ

৫৯. এস্থলে প্রশ্ন জাগে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম নিশ্চয়ই জানতেন, তাঁর বিচ্ছেদে তাঁর মহান পিতার কী অবস্থা হতে পারে। তা সত্ত্বেও এত দীর্ঘকাল যাবৎ তিনি এমন নিরুদ্দেশের মত কাটিয়ে দিলেন যে, কোনও সূত্রেই পিতার কাছে নিজ সহীহ-সালামতে থাকার খবর পর্যন্ত পাঠানোর চেষ্টা করলেন না। অথচ তাঁর পক্ষে এটা কোনও কঠিন কাজ ছিল না। প্রথমে তিনি ছিলেন আযীযের ঘরে। তখন খবর পাঠানোর জন্য কোনও না কোনও উপায় তাঁর পেয়ে যাওয়ার কথা। মাঝখানে কয়েক বছর কারাবাসে থাকেন। মুক্তি লাভের পর তো মিসরের সর্বময় কর্তৃত্বই তাঁর হাতে এসে গিয়েছিল। তখন প্রথমেই তিনি হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামসহ পরিবারের সকলকে মিসরে ডেকে আনার ব্যবস্থা করতে পারতেন এবং এতদিনে ভাইদেরকে যে কথা বললেন, তা তাদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতকালেই বলতে পারতেন। এর ফলে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের দুঃখ-বেদনার কাল সংক্ষেপ হতে পারত। কিন্তু তিনি এসবের কিছুই করলেন না। তা কেন করলেন না? এর সোজা-সাপটা জবাব এই যে, এসব ঘটনার ভেতর আল্লাহ তাআলার অনেক বড়-বড় হিকমত ও রহস্য নিহিত ছিল। বিশেষত তিনি চাচ্ছিলেন তাঁর প্রিয় বান্দা ও রাসূল হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সবর ও সংযমের পরীক্ষা নিতে। তাই এ সুদীর্ঘ কালে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে পিতার সাথে কোনও রকম যোগাযোগের অনুমতিই দেওয়া হয়নি।
৯৪

وَلَمَّا فَصَلَتِ الۡعِیۡرُ قَالَ اَبُوۡہُمۡ اِنِّیۡ لَاَجِدُ رِیۡحَ یُوۡسُفَ لَوۡلَاۤ اَنۡ تُفَنِّدُوۡنِ ٩٤

ওয়া লাম্মা-ফাসালাতিল ‘ঈরু কা-লা আবূহুম ইন্নী লাআজিদুরীহাইঊছুফা লাওলাআন তুফান্নিদূন।

যখন এ যাত্রীদল (মিসর থেকে কিনআনের দিকে) রওয়ানা হল, তখন (কিনআনে) তাদের পিতা (আশেপাশের লোকদেরকে) বলল, তোমরা যদি আমাকে না বল যে, বুড়ো অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছে, তবে বলি, আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি। ৬০

তাফসীরঃ

৬০. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাঁর ভাইদেরকে বলে দিয়েছিলেন, তারা যেন পরিবারের সকলকে মিসরে নিয়ে আসে। সুতরাং তারা মিসর থেকে একটি যাত্রীদল আকারে রওয়ানা হল। এদিকে তো তারা মিসর থেকে রওয়ানা হল, ওদিকে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘ্রাণ পেতে লাগলেন। এটা ছিল উভয় নবীর মুজিযা এবং হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের জন্য এই সুসংবাদ যে, তার পরীক্ষার কাল আশু সমাপ্তির পথে। এস্থলে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যখন কিনআনে খুব কাছেই কুয়ার ভেতর ছিলেন, তখন তো হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাঁর কোন সুবাস পাননি, তাছাড়া তাঁর মিসর অবস্থানকালীন সময়েও ইতঃপূর্বে এ জাতীয় কোনও অনুভূতির কথা প্রকাশ করেননি। এর দ্বারা বোঝা গেল, মুজিযা কোন নবীর নিজের এখতিয়ারাধীন বিষয় নয়। আল্লাহ তাআলাই যখন চান তা প্রকাশ করেন।
৯৫

قَالُوۡا تَاللّٰہِ اِنَّکَ لَفِیۡ ضَلٰلِکَ الۡقَدِیۡمِ ٙ ٩٥

কা-লূতাল্লা-হি ইন্নাকা লাফী দালা-লিকাল কাদীম।

তারা (উপস্থিত লোকজন) বলল, আল্লাহর কসম! আপনি এখনও পর্যন্ত আপনার পুরানো ভুল ধারণার মধ্যেই আছেন। ৬১

তাফসীরঃ

৬১. অর্থাৎ, এই ভুল ধারণা যে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম এখনও জীবিত আছেন এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হবে।
৯৬

فَلَمَّاۤ اَنۡ جَآءَ الۡبَشِیۡرُ اَلۡقٰىہُ عَلٰی وَجۡہِہٖ فَارۡتَدَّ بَصِیۡرًا ۚ قَالَ اَلَمۡ اَقُلۡ لَّکُمۡ ۚۙ اِنِّیۡۤ اَعۡلَمُ مِنَ اللّٰہِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ٩٦

ফালাম্মা আন জাআল বাশীরু আলকা-হু ‘আলা-ওয়াজহিহী ফারতাদ্দা বাসীরান কালা আলাম আকুল্লাকুম ইন্নীআ‘লামুমিনাল্লা-হি মা-লা-তা‘লামূন।

তারপর যখন সুসংবাদবাহী এসে সে (ইউসুফের) জামা তার চেহারার উপর ফেলে দিল, অমনি তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসল। ৬২ সে (তার পুত্রদেরকে) বলল, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি, আল্লাহ সম্পর্কে আমি যতটা জানি তোমরা জান না?

তাফসীরঃ

৬২. ‘সুসংবাদদাতা’ ছিল হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সর্বাপেক্ষা বড় ভাই। তার নাম কোন বর্ণনায় বলা হয়েছে ‘ইয়াহূদা’ এবং কোন বর্ণনায় ‘রূবেল’। ‘সুসংবাদ দান’ দ্বারা এই বার্তা বোঝানো হয়েছে যে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম এখনও জীবিত আছেন এবং তিনি সকলকে মিসরে তাঁর কাছে যেতে বলেছেন। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের জামা চেহারায় রাখা মাত্র হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসাটাও একটা মুজিযা ছিল। মুফাসসিরগণ বলেন, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের জামার সাথে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জড়িত আছে, যথা ভাইয়েরা তার জামায় রক্ত মাখিয়ে পিতার কাছে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু জামাটি অক্ষত দেখে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম বুঝে ফেলেছিলেন যে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে কোন বাঘ-টাগে খায়নি। আবার যুলায়খা তাঁর জামা পেছন দিক থেকে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছিল এবং তা দ্বারা প্রমাণ হয়েছিল তিনি নির্দোষ। তাঁর জামারই সুবাস হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম সুদূর কিনআন থেকে অনুভব করেছিলেন। সবশেষে এই জামারই স্পর্শে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসল।
৯৭

قَالُوۡا یٰۤاَبَانَا اسۡتَغۡفِرۡ لَنَا ذُنُوۡبَنَاۤ اِنَّا کُنَّا خٰطِئِیۡنَ ٩٧

কা-লূইয়াআবা-নাছতাগফিরলানা-যুনূবানাইন্না-কুন্না-খা-তিঈন।

তারা বলল, আব্বাজী! আপনি আমাদের পাপরাশির ক্ষমার জন্য দু‘আ করুন। আমরা নিশ্চয়ই গুরুতর অপরাধী ছিলাম।
৯৮

قَالَ سَوۡفَ اَسۡتَغۡفِرُ لَکُمۡ رَبِّیۡ ؕ اِنَّہٗ ہُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ ٩٨

কা-লা ছাওফা আছতাগফিরু লাকুম রাববী ইন্নাহূহুওয়াল গাফূরুুর রাহীম।

ইয়াকুব বলল, আমি সত্ত্বর আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের ক্ষমার জন্য দু‘আ করব। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
৯৯

فَلَمَّا دَخَلُوۡا عَلٰی یُوۡسُفَ اٰوٰۤی اِلَیۡہِ اَبَوَیۡہِ وَقَالَ ادۡخُلُوۡا مِصۡرَ اِنۡ شَآءَ اللّٰہُ اٰمِنِیۡنَ ؕ ٩٩

ফালাম্মা-দাখালূ‘আলা-ইঊছুফা আ-ওয়াইলাইহি আবাওয়াইহি ওয়া কা-লাদ খুলূমিসরা ইন শাআল্লা-হু আ-মিনীন।

তারপর তারা সকলে যখন ইউসুফের কাছে উপস্থিত হল, সে তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দিল ৬৩ এবং সকলকে বলল, আপনারা সকলে মিসরে প্রবেশ করুন ইনশাআল্লাহ আপনারা এখানে স্বস্তিতে থাকবেন।

তাফসীরঃ

৬৩. পিতা-মাতা, ভ্রাতৃবর্গ ও পরিবারের অন্যান্যদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম শহরের বাইরে চলে এসেছিলেন। যখন পিতা-মাতার সঙ্গে সাক্ষাত হল তাদেরকে অত্যন্ত ভক্তি-শ্রদ্ধার সাথে নিজের কাছে বসালেন। প্রাথমিক কথাবার্তার পর আগন্তুকদের সকলকে লক্ষ্য করে বললেন, এবার সকলে নিশ্চিন্তে, নিরাপদ নগরের দিকে চলুন। এ সময় হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের গর্ভধারিণী মা জীবিত ছিলেন কিনা সে সম্পর্কে দু’ রকম বর্ণনা পাওয়া যায়। জীবিত থেকে থাকলে পিতা-মাতা দ্বারা আপন পিতা-মাতাই বোঝানো হয়েছে। আর যদি তার আগেই মৃত্যু হয়ে থাকে, তবে সৎ মা’কেও যেহেতু মায়ের মতই গণ্য করা হয়ে থাকে, তাই তাকেসহ একত্রে পিতা-মাতা বলা হয়েছে।
১০০

وَرَفَعَ اَبَوَیۡہِ عَلَی الۡعَرۡشِ وَخَرُّوۡا لَہٗ سُجَّدًا ۚ وَقَالَ یٰۤاَبَتِ ہٰذَا تَاۡوِیۡلُ رُءۡیَایَ مِنۡ قَبۡلُ ۫ قَدۡ جَعَلَہَا رَبِّیۡ حَقًّا ؕ وَقَدۡ اَحۡسَنَ بِیۡۤ اِذۡ اَخۡرَجَنِیۡ مِنَ السِّجۡنِ وَجَآءَ بِکُمۡ مِّنَ الۡبَدۡوِ مِنۡۢ بَعۡدِ اَنۡ نَّزَغَ الشَّیۡطٰنُ بَیۡنِیۡ وَبَیۡنَ اِخۡوَتِیۡ ؕ اِنَّ رَبِّیۡ لَطِیۡفٌ لِّمَا یَشَآءُ ؕ اِنَّہٗ ہُوَ الۡعَلِیۡمُ الۡحَکِیۡمُ ١۰۰

ওয়া রাফা‘আ আবাওয়াইহি ‘আলাল ‘আরশি ওয়া খাররূলাহূছুজ্জদাওঁ ওয়া কা-লা ইয়াআবাতি হা-যা-তা’বীলুরু‘ইয়া-ইয়া মিন কাবলু কাদ জা‘আলাহা-রাববী হাক্কাওঁ ওয়া কাদ আহছানা বী ইযআখরাজানী মিনাছছিজনি ওয়া জাআ বিকুম মিনাল বাদবিমিম বা‘দি আন নাঝাগাশশাইতা-নুবাইনী ওয়া বাইনা ইখওয়াতী ইন্না রাববী লাতীফুল লিমা-ইয়াশাউ ইন্নাহূহুওয়াল ‘আলীমুল হাকীম।

সে তার পিতা-মাতাকে সিংহাসনে বসাল আর তারা সকলে তার সামনে সিজদায় পড়ে গেল। ৬৪ ইউসুফ বলল, আব্বাজী! এই হল আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা, যা আমার প্রতিপালক সত্যে পরিণত করেছেন। ৬৫ তিনি আমার প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন যে, আমাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছেন এবং আপনাদেরকে দেহাত থেকে এখানে নিয়ে এসেছেন। অথচ ইতঃপূর্বে আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে শয়তান অনর্থ সৃষ্টি করেছিল। ৬৬ বস্তুত আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা করেন, তার জন্য অতি সূক্ষ্ম ব্যবস্থা করেন। নিশ্চয়ই তিনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

৬৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে এ আয়াতের যে তাফসীর বর্ণিত আছে, সে অনুযায়ী হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সামনে তাঁরা সিজদা করেছিল আল্লাহর তাআলার শোকর আদায়ের লক্ষ্যে। অর্থাৎ, তারা সিজদা করেছিল আল্লাহ তাআলাকেই। হ্যাঁ, তা করেছিল হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সামনে, তাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে। ইমাম রাযী (রহ.) এ তাফসীরকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। অন্যান্য মুফাসসিরগণ বলেন, এটা ইবাদতমূলক সিজদা ছিল না; বরং শ্রদ্ধাজ্ঞাপনমূলক সিজদা, যেমন ফেরেশতাগণ হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করেছিল। এরূপ সিজদা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের শরীয়তে জায়েয ছিল। কিন্তু মহানবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়তে এরূপ শ্রদ্ধাজ্ঞাপনমূলক সিজদাও জায়েয নয়।
১০১

رَبِّ قَدۡ اٰتَیۡتَنِیۡ مِنَ الۡمُلۡکِ وَعَلَّمۡتَنِیۡ مِنۡ تَاۡوِیۡلِ الۡاَحَادِیۡثِ ۚ فَاطِرَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ۟ اَنۡتَ وَلِیّٖ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۚ تَوَفَّنِیۡ مُسۡلِمًا وَّاَلۡحِقۡنِیۡ بِالصّٰلِحِیۡنَ ١۰١

রাব্বি কাদ আ-তাইতানী মিনাল মুলকি ওয়া ‘আল্লামতানী মিন তা’বীলিল আহা-দীছি ফা-তিরাছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদি আনতা ওয়ালিইইয়ী ফিদদুনইয়া-ওয়াল আখিরাতি তাওয়াফফানী মুছলিমাওঁ ওয়া আলহিকনী বিসসা-লিহীন।

হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজত্বেও অংশ দিয়েছ এবং দান করেছ স্বপ্ন-ব্যাখ্যার জ্ঞান। হে আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর স্রষ্টা! দুনিয়া ও আখেরাতে তুমিই আমার অভিভাবক। তুমি দুনিয়া থেকে আমাকে এমন অবস্থায় তুলে নিও, যখন আমি থাকি তোমার অনুগত। আর আমাকে পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করো।
১০২

ذٰلِکَ مِنۡ اَنۡۢبَآءِ الۡغَیۡبِ نُوۡحِیۡہِ اِلَیۡکَ ۚ وَمَا کُنۡتَ لَدَیۡہِمۡ اِذۡ اَجۡمَعُوۡۤا اَمۡرَہُمۡ وَہُمۡ یَمۡکُرُوۡنَ ١۰٢

যা-লিকা মিন আমবাইল গাইবি নূহীহি ইলাইকা ওয়ামা-কুনতা লাদাইহিম ইয আজমা‘উআমরাহুম ওয়া হুম ইয়ামকুরূন।

(হে নবী!) এসব ঘটনা গায়েবের সংবাদরাজির একটা অংশ, যা ওহীর মাধ্যমে আমি তোমাকে জানাচ্ছি। ৬৭ তুমি সেই সময় তাদের (অর্থাৎ ইউসুফের ভাইদের) কাছে উপস্থিত ছিলে না, যখন তারা ষড়যন্ত্র করে নিজেদের সিদ্ধান্ত স্থির করে ফেলেছিল (যে, তারা ইউসুফকে কুয়ায় ফেলে দেবে)।

তাফসীরঃ

৬৭. সূরার শুরুতে বলা হয়েছিল যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা সম্বলিত এ সূরা নাযিল করেছিলেন কাফেরদের একটা প্রশ্নের উত্তরে। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করেছিল, বনী ইসরাঈল মিসরে এসে বসবাস করেছিল কী কারণে? তারা নিশ্চিত ছিল, বনী ইসরাঈলের ইতিহাসের এ অধ্যায় সম্পর্কে তাঁর কিছু জানা নেই। এমন কোনও মাধ্যমও নেই, যা দ্বারা এ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব। তাই তাদের ধারণা ছিল, তিনি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে ব্যর্থ হতে দিলেন না। তিনি সে ঘটনা বর্ণনার জন্য এই পূর্ণ সূরাটিই নাযিল করে দিলেন। সূরার শেষে এখন ফলাফল বের করা হচ্ছে যে, যেহেতু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এ ঘটনা জানার মত কোন মাধ্যম ছিল না, তাই এর দাবী ছিল যারা তাকে এ প্রশ্নটি করেছিল, তারা তাঁর মুখে ঘটনার এরূপ বিশদ বিবরণ শোনার পর তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাতের উপর অবশ্যই ঈমান আনবে। কিন্তু সত্য উদ্ভাসিত হওয়ার পর তা গ্রহণ করে নেওয়া যেহেতু তাদের উদ্দেশ্য ছিল না; বরং এসব প্রশ্ন কেবলই হঠকারিতা ও জেদের বশবর্তীতেই তারা করত, তাই সামনের আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এসব সুস্পষ্ট নিদর্শন চোখে দেখা সত্ত্বেও তাদের অধিকাংশেই ঈমান আনবে না।
১০৩

وَمَاۤ اَکۡثَرُ النَّاسِ وَلَوۡ حَرَصۡتَ بِمُؤۡمِنِیۡنَ ١۰٣

ওয়ামা আকছারুন্না-ছি ওয়ালাও হারাসতা বিমু’মিনীন।

এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ লোক ঈমান আনার নয়, তাতে তোমার অন্তর যতই কামনা করুক না কেন।
১০৪

وَمَا تَسۡـَٔلُہُمۡ عَلَیۡہِ مِنۡ اَجۡرٍ ؕ  اِنۡ ہُوَ اِلَّا ذِکۡرٌ لِّلۡعٰلَمِیۡنَ ٪ ١۰٤

ওয়ামা তাছআলুহুম ‘আলাইহি মিন আজরিন ইন হুওয়া ইল্লা-যিকরুল লিল‘আ-লামীন।

অথচ এর বিনিময়ে (অর্থাৎ প্রচার কার্যের বিনিময়ে) তুমি তাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাও না। এটা তো নিখিল বিশ্বের সকলের জন্য এক উপদেশ-বার্তা।
১০৫

وَکَاَیِّنۡ مِّنۡ اٰیَۃٍ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ یَمُرُّوۡنَ عَلَیۡہَا وَہُمۡ عَنۡہَا مُعۡرِضُوۡنَ ١۰٥

ওয়া কাআইয়িম মিন আ-য়াতিন ফিছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদি ইয়ামুররূনা ‘আলাইহাওয়াহুম ‘আনহা-মু‘রিদূ ন।

আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কত নিদর্শন রয়েছে, যার উপর দিয়ে তাদের বিচরণ হয়, কিন্তু তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
১০৬

وَمَا یُؤۡمِنُ اَکۡثَرُہُمۡ بِاللّٰہِ اِلَّا وَہُمۡ مُّشۡرِکُوۡنَ ١۰٦

ওয়ামা-ইউ’মিনুআকছারুহুম বিল্লা-হি ইল্লা-ওয়াহুম মুশরিকূন।

তাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই এমন যে, তারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখলেও তা এভাবে যে, তাঁর সঙ্গে শরীক করে। ৬৮

তাফসীরঃ

৬৮. অর্থাৎ মুখে তো সকলেই বলে আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টিকর্তা ও সকলের মালিক, তা সত্ত্বেও কেউ প্রতিমা পূজা করে, কেউ বলে তাঁর পুত্র বা কন্যা আছে, কেউ তাকে আত্মা ও দেহধারী সত্তা বলে, কেউ সাধু-যাজকদেরকে ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করে, তাজিয়া, কবর ইত্যাদির পূজা করে এমন লোকও কম নয়, আরও আছে পীর পূজা ও বুদ্ধির পূজা। এভাবে বিচিত্র সব দেবতা ও তার পূজা-অর্চনা দ্বারা মানুষ খালেস তাওহীদি আকীদাকে কলঙ্কিত করছে। এমন লোক কমই পাওয়া যায়, যারা বিশ্বাস বা কর্মগত এবং স্থূল বা সূক্ষ্ম শিরকে লিপ্ত হয়ে নিজ তাওহীদী বিশ্বাসকে দূষিত করছে না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সব রকম শিরক থেকে হেফাজত করুন। -অনুবাদক (তাফসীরে উছমানী থেকে)
১০৭

اَفَاَمِنُوۡۤا اَنۡ تَاۡتِیَہُمۡ غَاشِیَۃٌ مِّنۡ عَذَابِ اللّٰہِ اَوۡ تَاۡتِیَہُمُ السَّاعَۃُ بَغۡتَۃً وَّہُمۡ لَا یَشۡعُرُوۡنَ ١۰٧

আফাআমিনূআন তা’তিয়াহুম গা-শিয়াতুমমিন‘আযা-বিল্লা-হি আও তা‘তিয়াহুমুছছা-‘আতু বাগতাতাওঁ ওয়াহুম লা-ইয়াশ‘উরূন।

তবে কি তারা এ বিষয়ের একটুও ভয় রাখে না যে, তাদের উপর আল্লাহর আযাবের কোন মুসিবত এসে পড়বে অথবা সহসা তাদের উপর তাদের অজ্ঞাতসারে কিয়ামত আপতিত হবে?
১০৮

قُلۡ ہٰذِہٖ سَبِیۡلِیۡۤ اَدۡعُوۡۤا اِلَی اللّٰہِ ۟ؔ عَلٰی بَصِیۡرَۃٍ اَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِیۡ ؕ وَسُبۡحٰنَ اللّٰہِ وَمَاۤ اَنَا مِنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ١۰٨

কুল হা-যিহী ছাবীলীআদ‘ঊইলাল্লা-হি ‘আলা-বাসীরাতিন আনা ওয়া মানিত্তাবা‘আনী ওয়া ছুবহা-নাল্লা-হি ওয়ামাআনা মিনাল মুশরিকীন।

(হে নবী!) বলে দাও, এই আমার পথ, ৬৯ আমি পরিপূর্ণ উপলব্ধির সাথে আল্লাহর দিকে ডাকি এবং যারা আমার অনুসরণ করে তারাও। আল্লাহ (সব রকম) শিরক থেকে পবিত্র। যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করে, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নই।

তাফসীরঃ

৬৯. অর্থাৎ, এই খালেস তাওহীদের পথই আমার পথ, যাতে কোন অস্পষ্টতা ও বক্রতা নেই। আমি সারা বিশ্বকে ডেকে বলছি, সব ধারণা-কল্পনা ও অংশীবাদিতা পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর দিকে এসো এবং তার তাওহীদকে আঁকড়ে ধর। এটা কোন অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে হৃদয়-মন আলোকিত করে পূর্ণ ব্যুৎপত্তির সাথেই আমি ও আমার অনুসারীগণ এই তাওহীদের আলোকিত পথ অবলম্বন করেছি এবং সকলকে এদিকে ডাকছি। আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করছি আল্লাহ তাআলা সব রকম অংশীবাদিতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র এবং আমরা তাঁর একনিষ্ঠ বান্দা- শিরক ও মুশরিকদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। -অনুবাদক
১০৯

وَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا مِنۡ قَبۡلِکَ اِلَّا رِجَالًا نُّوۡحِیۡۤ اِلَیۡہِمۡ مِّنۡ اَہۡلِ الۡقُرٰی ؕ اَفَلَمۡ یَسِیۡرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ فَیَنۡظُرُوۡا کَیۡفَ کَانَ عَاقِبَۃُ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ ؕ وَلَدَارُ الۡاٰخِرَۃِ خَیۡرٌ لِّلَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا ؕ اَفَلَا تَعۡقِلُوۡنَ ١۰٩

ওয়ামাআরছালনা-মিন কাবলিকা ইল্লা-রিজা-লাননূহীইলাইহিম মিন আহলিল কুরা- আফালাম ইয়াছীরূফিল আরদিফাইয়ানজুরূ কাইফা কা-না ‘আ-কিবাতুল্লাযীনা মিন কাবলিহিম ওয়ালাদা-রুল আ-খিরাতি খাইরুল লিল্লাযী নাত্তাকাও আফালাতা‘কিলূন।

আমি তোমার আগে যত রাসূল পাঠিয়েছি, তারা সকলে বিভিন্ন জনপদে বসবাসকারী মানুষই ছিল, যাদের প্রতি আমি ওহী নাযিল করতাম ৭০ তারা কি পৃথিবীতে বিচরণ করে দেখেনি তাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের পরিণাম কী হয়েছে? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য আখেরাতের নিবাস কতই না শ্রেয়! তবুও কি তোমরা বুদ্ধিকে কাজে লাগাবে না?

তাফসীরঃ

৭০. এটা কাফেরদের একটা প্রশ্নের উত্তর। তারা বলত, আল্লাহ তাআলা আমাদের কাছে কোন ফেরেশতাকে কেন রাসূল বানিয়ে পাঠালেন না?
১১০

حَتّٰۤی اِذَا اسۡتَیۡـَٔسَ الرُّسُلُ وَظَنُّوۡۤا اَنَّہُمۡ قَدۡ کُذِبُوۡا جَآءَہُمۡ نَصۡرُنَا ۙ فَنُجِّیَ مَنۡ نَّشَآءُ ؕ وَلَا یُرَدُّ بَاۡسُنَا عَنِ الۡقَوۡمِ الۡمُجۡرِمِیۡنَ ١١۰

হাত্তা ইযাছতাইআছাররুছুলুওয়া জান্নূআন্নাহুম কাদ কুযিবূজাআহুম নাসরুনা- ফানুজ্জিয়া মান্নাশাউ ওয়ালা-ইউরাদ্দুবা’ছুনা-‘আনিল কাওমিল মুজরিমীন।

(পূর্ববর্তী নবীদের ক্ষেত্রেও এমনই হয়েছিল যে, তাদের সম্প্রদায়ের উপর আযাব আসতে কিছুটা সময় লেগেছিল) পরিশেষে যখন নবীগণ মানুষের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেল এবং কাফেরগণ মনে করতে লাগল তাদেরকে মিথ্যা হুমকি দেওয়া হয়েছিল, তখন নবীদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছল ৭১ (অর্থাৎ কাফেরদের উপর আযাব আসে) এবং আমি যাকে ইচ্ছা করেছিলাম তাকে রক্ষা করলাম। অপরাধী সম্প্রদায় হতে আমার শাস্তি টলানো যায় না।

তাফসীরঃ

৭১. আয়াতের এ তরজমা করা হয়েছে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও অন্যান্য তাবেয়ীদের থেকে বর্ণিত তাফসীর অনুযায়ী। আল্লামা আলূসী (রহ.) দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর এটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তবে আয়াতের আরও বিভিন্ন ব্যাখ্যা করা সম্ভব। অন্যান্য মুফাসসিরগণ সেগুলোও গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তরজমা যে তাফসীরের ভিত্তিতে করা হয়েছে, সর্ববিচারে সেটিই বেশি নিখুঁত বলে মনে হয়। বোঝানো হচ্ছে যে, পূর্ববর্তী নবীগণের আমলেও ঘটনা একই রকম ঘটেছে। যখন কাফেরদেরকে প্রদত্ত অবকাশকাল দীর্ঘ হয়ে গেছে এবং এর ভেতর তাদের উপর কোন আযাব আসেনি, তখন একদিকে নবীগণ তাদের ঈমানের ব্যাপারে হতাশ হয়ে গেছেন এবং অন্যদিকে কাফেরগণ মনে করে বসেছে নবীগণ তাদেরকে আল্লাহ তাআলার আযাবের যে হুমকি দিয়েছিলেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল (নাউযুবিল্লাহ)। অবস্থা যখন এ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, তখন সহসা নবীগণের কাছে আল্লাহ তাআলার সাহায্য এসে পৌঁছে এবং অবিশ্বাসীদের উপর আযাব নাযিল হয় আর এভাবে তাঁদের কথা সত্যে পরিণত হয়।
১১১

لَقَدۡ کَانَ فِیۡ قَصَصِہِمۡ عِبۡرَۃٌ لِّاُولِی الۡاَلۡبَابِ ؕ  مَا کَانَ حَدِیۡثًا یُّفۡتَرٰی وَلٰکِنۡ تَصۡدِیۡقَ الَّذِیۡ بَیۡنَ یَدَیۡہِ وَتَفۡصِیۡلَ کُلِّ شَیۡءٍ وَّہُدًی وَّرَحۡمَۃً لِّقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ ٪ ١١١

লাকাদ কা-না ফী কাসাসিহিম ‘ইবরাতুল লিঊলিল আলবা-বি মা-কা-না হাদীছাইঁ ইউফতারা-ওয়া লা-কিন তাসদাকাল্লাযী বাইনা ইয়াদইহি ওয়া তাফসীলা কুল্লি শাইইওঁ ওয়া হুদাও ওয়া রাহমাতাল লিকাওমিইঁ ইউ’মিনূন।

নিশ্চয়ই তাদের ঘটনায় বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের উপাদান আছে। এটা এমন কোনও বাণী নয়, যা মিছামিছি গড়ে নেওয়া হয়েছে। বরং এটা এর পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সমর্থক, সবকিছুর বিশদ বিবরণ ৭২ এবং যারা ঈমান আনে তাদের জন্য হিদায়াত ও রহমতের উপকরণ।

তাফসীরঃ

৭২. কুরআন মাজীদ এক দিকে তো বলছে, সে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের সমর্থন করেছে। কেননা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহেও এ ঘটনা সমষ্টিগতভাবে এ রকমই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে “সবকিছুর বিশদ বিবরণ” বলে সম্ভবত ইশারা করেছে যে, এ ঘটনার বর্ণনায় পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে কিছুটা হেরফের হয়ে গিয়েছিল। কুরআন মাজীদ সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছে। সুতরাং বাইবেলের ‘আদিপুস্তক’-এ হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা পড়লে তার বর্ণনা কোন কোন ক্ষেত্রে কুরআন মাজীদের বর্ণনা থেকে ভিন্ন রকম পরিলক্ষিত হয়। খুব সম্ভব সে দিকেই ইশারা করা হয়েছে যে, সেসব ক্ষেত্রে কুরআন মাজীদ প্রকৃত বর্ণনা দান করেছে।
সূরা ইউসুফ | মুসলিম বাংলা