গায়রত কাকে বলে?
প্রশ্নঃ ১৩৪২৫২. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, শায়েখ গায়রত কাকে বলে। আমাকে একটু বিস্তারিত বল্লে অনেক উপকারিতা হতো
২১ জানুয়ারী, ২০২৬
ঢাকা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
‘গায়রত’ একটি আরবী শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ হলো আত্মমর্যাদা, লজ্জা, গাম্ভীর্য বা আত্মসম্মানবোধ। ইসলামি পরিভাষায়, গায়রত বলতে বোঝায়, নিজের দ্বীন, পরিবার, সতীত্ব এবং সম্মানের প্রতি একজন মুমিনের যে গভীর মমতা ও প্রতিরক্ষামূলক চেতনা কাজ করে, তাকেই গায়রত বলা হয়।
১. গায়রত কার গুণ?
গায়রত মূলত মহান আল্লাহ তাআলার একটি অন্যতম সিফাত বা গুণ। আল্লাহ তাঁর বান্দার সম্মান রক্ষা করতে এবং কোনো অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে ‘গায়রত’ প্রকাশ করেন।
عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ يَغَارُ، وَغَيْرَةُ اللَّهِ أَنْ يَأْتِيَ المُؤْمِنُ مَا حَرَّمَ اللَّهُ»
আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন যে, আল্লাহ তাআলার আত্মমর্যাদাবোধ আছে এবং আল্লাহর আত্মমর্যাদাবোধ এই যে, যেন কোন মু’মিন বান্দা হারাম কাজে লিপ্ত না হয়।
আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ (সহীহ বুখারী)
হাদীস নং: ৪৮৪৭ আন্তর্জাতিক নং: ৫২২৩
হাদীসের লিংকঃ https://muslimbangla.com/hadith/4847
হাদীসের ব্যাখ্যাঃ
গয়রত অর্থ আত্মাভিমানবোধ, একান্ত নিজের কোনও বিষয়ে অন্যের হস্তক্ষেপজনিত মনোবেদনা এবং কারও নিরঙ্কুশ অধিকারে অন্যের ভাগ বসানোর দ্বারা সৃষ্ট মানসিক উত্তেজনা। কোনও স্বামী যদি তার স্ত্রীর প্রতি অন্যের আসক্তি বা কুদৃষ্টি দেখতে পায়, তখন তার ভেতর যে চিত্তচাঞ্চল্য ও ক্ষোভ সঞ্চার হয়, সেটাই গয়রত। এমনিভাবে কোনও স্ত্রী যদি তার স্বামীকে অন্য নারীতে আসক্ত দেখে বা তার স্বামীর প্রতি অন্য নারীর আকর্ষণ লক্ষ করে, তখন তার যে মানসিক উত্তেজনা ও বেদনা বোধ হয়, তাকেই গয়রত বলে। কারণ তাতে স্বামীর বা স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকারে ভাগ বসানো হয়ে থাকে। আক্ষরিক অর্থে এ শব্দটি কেবল মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। আল্লাহর জন্য এ শব্দটি ব্যবহৃত হয় রূপকার্থে। সে ক্ষেত্রে অর্থ হবে- অসন্তোষ ও শাস্তিদান
এ হাদীছে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা যা নিষিদ্ধ করেছেন তাতে কেউ লিপ্ত হলে আল্লাহ তা'আলা গয়রত বোধ করেন। অর্থাৎ তিনি নারাজ হন। তা এ কারণে যে, আল্লাহ তা'আলা প্রজ্ঞাময়। তিনি সর্বজ্ঞ ও দয়াময়। তিনি মানুষের জন্য যা ফরয ও ওয়াজিব করেন, তার ভেতর তাদের দীন-দুনিয়ার প্রভূত কল্যাণ নিহিত থাকে। যা হারাম করেন, তার মধ্যে নিহিত থাকে তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত ক্ষতি। আদেশ-নিষেধ করার ভেতর তাঁর নিজের কোনও লাভ-ক্ষতি নেই। তিনি কোনও কিছু ফরয এজন্য করেন না যে, বান্দা তা পালন করলে তাঁর নিজের কোনও লাভ হবে। আর যা নিষেধ করেন তাও এজন্য নয় যে, বান্দা তা পালন না করলে আল্লাহর ক্ষতি হবে। সমস্ত সৃষ্টি মিলেও যদি আল্লাহর অবাধ্যতা করে ও পাপাচারে লিপ্ত হয়, তাতে আল্লাহর রাজত্বে কোনও কিছু কমবে না। আর সমস্ত সৃষ্টি মিলে আল্লাহর ইবাদত আনুগত্য করলে তাতে আল্লাহর রাজত্বে এককণাও বাড়বে না। তিনি আদেশ-নিষেধ করেন কেবলই বান্দার স্বার্থে।
তো আল্লাহ তা'আলা যখন কোনওকিছু হারাম করেন, তখন বান্দা কিভাবে নেই জিনিসে লিপ্ত হয়? বান্দার জানা আছে আল্লাহ সব দেখেন, তিনি তার হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া দেখছেন। আল্লাহ সর্বশক্তিমান। তাঁর শাস্তি অতি কঠিন। এ কাজের জন্য তিনি তাকে শাস্তিদান করবেন। তা সত্ত্বেও মানুষ কিভাবে আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ করতে পারে? তা করতে পারে তখনই, যখন সে কোনওকিছুকে পরওয়া করে না। যখন সে আল্লাহর শাস্তির ভয় করে না। যখন আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনই তার কাছে আসল মনে হয়। যখন শরী'আতের বিধানাবলী পালনের বিপরীতে নিজ খেয়াল-খুশিমত চলাকেই বেছে নেয়। এটা মারাত্মক গালাত ও চরম ধৃষ্টতা। তাই আল্লাহর গয়রত হয়। তাই তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তির ব্যবস্থা। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাঁর গয়রত ও শাস্তি থেকে হেফাজত করুন এবং তাঁর মর্জি মোতাবেক চলার তাওফীক দিন।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. এ হাদীছটি দ্বারাও মুরাকাবার শিক্ষা পাওয়া যায়। যখনই অন্তরে কোনও হারাম কাজের ইচ্ছা জাগে, সংগে সংগে ধ্যান করতে হবে যে, এরূপ কাজে আল্লাহ গয়রত বোধ করেন। ফলে এ কাজ করলে তাঁর আযাব ভোগ করতে হবে। এরূপ ধ্যান করলে হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়।
ইসলামে গায়রত প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে প্রকাশ পায়:
ক. আল্লাহর জন্য গায়রত: যখন আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করা হয় বা দ্বীনের অমর্যাদা করা হয়, তখন মুমিনের হৃদয়ে যে দহন ও প্রতিবাদী চেতনার সৃষ্টি হয়।
খ. পরিবারের জন্য গায়রত: নিজের স্ত্রী, কন্যা, বোন এবং পরিবারের নারীদের ইজ্জত-আব্রু ও পর্দা রক্ষা করার জন্য যে কঠোর যত্ন ও প্রতিরক্ষামূলক মানসিকতা থাকে। একে 'পারিবারিক গায়রত' বলা হয়।
গ. নিজের সম্মানের জন্য গায়রত: পরনির্ভরশীলতা বা অপমানজনক কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি জাওয়াদ তাহের
মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১