রক্তদান সম্পর্কে ইসলামের বিধান
প্রশ্নঃ ১০৪২০. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, রক্ত দেওয়া নেওয়া কি জায়েয? এর বিনিময় লেনদেন করার বিধান কী? যদি কারোর একান্তই রক্তের প্রয়োজন হয় তখন ঐ ব্যক্তির কী করণীয়? অমুসলিমের রক্ত গ্রহণের বিধান কী? স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক রক্তদানের বিধান কী? জানালে উপকৃত হতাম।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
রক্ত সাধারণত শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর নাপাক হিসেবে সাব্যস্ত হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় (প্রয়োজন ও কোনো কারণ ছাড়া) একজনের রক্ত অন্যের শরীরে স্থানান্তর করা হারাম। রক্ত গ্রহণের বিকল্প নেই, এমন অসুস্থ ব্যক্তিকে রক্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে-
এক. যখন কোনো অসুস্থ ব্যক্তির জীবননাশের আশঙ্কা দেখা দেয় এবং অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতে তার শরীরে অন্যের রক্ত দেওয়া ছাড়া বাঁচানোর কোনো পন্থা থাকে না, তখন রক্ত দিতে কোনো অসুবিধা নেই। বরং এ ক্ষেত্রে ইসলাম রক্তদানে উৎসাহ দিয়েছে।
দুই. রক্ত দেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ অসুস্থ ব্যক্তির মৃত্যুর আশঙ্কা নেই, কিন্তু রক্ত দেওয়া ছাড়া তার জীবনের ঝুঁকি বেড়ে যাবে অথবা রোগমুক্তি বিলম্বিত হয়; এমন অবস্থায় রক্ত দেওয়া আবশ্যিক জায়েজ।
তিন. যখন রোগীর শরীরে রক্ত দেওয়ার খুব বেশি প্রয়োজন দেখা দেয় না, বরং রক্ত না দেওয়ার অবকাশ থাকে; তখন অযথা রক্ত দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
চার. যখন জীবননাশের এবং অসুস্থতা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না, বরং শুধু শক্তি বৃদ্ধি এবং সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্দেশ্য থাকে; সে অবস্থায় ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক রক্তদান জায়েজ নয়।
রক্ত ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান
রক্ত মানুষের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক উপাদান। একজন মুসলিমের উচিত ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার অমর চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে মুমূর্ষু মুসলিম ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে পরম আনন্দে রক্ত দান করা। কোনো পার্থিব স্বার্থ নয়; বরং শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সওয়াব অর্জনের আশায় তা করা উচিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ তুমি মুমিনদের দেখবে- তারা পারস্পরিক দয়া-ভালোবাসা আর মায়া-স্নেহের বিষয়ে একটি দেহের মতো। দেহের এক অঙ্গ যখন আক্রান্ত হয়, তখন পুরো শরীরই অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০১১
শরীয়তের দৃষ্টিতে রক্ত বিক্রি করা জায়েজ নেই। কিন্তু যেসব শর্তের ভিত্তিতে রক্ত দেওয়া জায়েজ সাব্যস্ত, ওই অবস্থায় যদি কাঙ্ক্ষিত রক্ত বিনামূল্যে পাওয়া না যায়, তখন তার জন্য মূল্য দিয়ে রক্ত ক্রয় করা জায়েজ। তবে যে রক্ত দিবে তার জন্য রক্তের মূল্য নেওয়া জায়েজ নেই। (জাওয়াহিরুল ফিকহ, খ-: ২, পৃষ্ঠা: ৩৮)
অমুসলিমের রক্ত গ্রহণের বিধান
অমুসলিমের রক্ত মুসলিমের শরীরে স্থানান্তর জায়েজ। মুসলিম আর অমুসলিমের রক্তে কোনো প্রভেদ নেই। কিন্তু শরিয়তসিদ্ধ কথা হলো, কাফের-ফাসেকের স্বভাবে মন্দ ও নিন্দনীয় প্রভাব রয়েছে। কারণ তাদের নাপাক ও হারাম খাদ্য গ্রহণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। আর এতে করে খাবারের প্রভাব রক্ত-মাংসে পড়ে। তাই সে ক্ষেত্রে অমুসলিমের মন্দ স্বভাব-চরিত্রের প্রভাব মুসলিমের স্বভাব-চরিত্রে রক্তের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। (এজন্য শিশুর জন্য পাপাচারী নারীর দুধ পান করা মাকরুহ করা হয়েছে।) সুতরাং এসব ক্ষতির দিকে লক্ষ করে, অমুসলিমের রক্ত নেওয়া থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা উচিত। (জাওয়াহিরুল ফিকহ, খ-: ২, পৃষ্ঠা: ৪০)
স্বামী-স্ত্রীর রক্তদানের বিধান
স্বামীর রক্ত স্ত্রীর শরীরে, স্ত্রীর রক্ত স্বামীর শরীরে প্রবেশ করানো জায়েজ। তারা একে-অপরের জন্য অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের মতো। তারা একে-অন্যকে রক্ত দিলে বিয়ের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না। বৈবাহিক সম্পর্কও যথারীতি বহাল থাকে। কেননা ইসলামি শরিয়তের সূত্র মতে, রক্ত নেওয়া ও দেওয়ার মাধ্যমে স্বামী স্ত্রীর মাঝে মাহরামের সম্পর্ক তৈরি হয় না। (জাওয়াহিরুল ফিকহ, খ-: ২, পৃষ্ঠা: ৪০)
والله اعلم بالصواب
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন