আল মুসনাদুস সহীহ- ইমাম মুসলিম রহঃ
১৬- হজ্ব - উমরার অধ্যায়
হাদীস নং: ২৮২৪
আন্তর্জাতিক নং: ১২১৮-৪
- হজ্ব - উমরার অধ্যায়
১৭. নবী (ﷺ) এর হজ্জের বিবরণ
২৮২৪। ইসহাক ইবনে ইবরাহীম (রাহঃ) ......... জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মক্কায় এসে পৌঁছলেন প্রথমে হাজারে আসওয়াদের নিকট এসে তাতে চুমু খেলেন, অতঃপর তাওয়াফ করলেন।
كتاب الحج
باب حَجَّةِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم
وَحَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، أَخْبَرَنَا يَحْيَى بْنُ آدَمَ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ جَعْفَرِ بْنِ، مُحَمَّدٍ عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، - رضى الله عنهما - أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لَمَّا قَدِمَ مَكَّةَ أَتَى الْحَجَرَ فَاسْتَلَمَهُ ثُمَّ مَشَى عَلَى يَمِينِهِ فَرَمَلَ ثَلاَثًا وَمَشَى أَرْبَعًا .
হাদীসের ব্যাখ্যা:
হুযুর (ﷺ) মারওয়ায় সায়ী শেষ করে এই যে কথাটি বলেছিলেন, "যারা কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে আসেনি, তারা যেন নিজেদের তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে নেয়। আর আমিও যদি কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে না আসতাম, তাহলে আমিও এমনই করতাম।" এর মর্ম ও স্বরূপ বুঝার আগে একথাটি জেনে নিতে হবে যে, জাহিলিয়্যাত যুগে হজ্ব ও উমরার ক্ষেত্রে যেসব বিশ্বাসগত ও কর্মগত ভ্রান্তি প্রচলিত হয়ে অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল, এগুলোর মধ্যে একটি ভ্রান্তি এও ছিল যে, শাওয়াল, যিলকদ ও যিলহজ্ব যেগুলোকে হজ্বের মাস বলা হয়, (কেননা, হজ্বের সফর এ মাসগুলোতেই হয়ে থাকে।) এসব মাসে উমরা পালন করাকে কঠিন গুনাহ্ মনে করা হত। অথচ এ বিষয়টি ভুল ও মনগড়া ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সফরের শুরুতেই স্পষ্টভাবে লোকদেরকে এ কথা বলে দিয়েছিলেন যে, যার মন চায় সে কেবল হজ্বের ইহরাম বাঁধতে পারে, (যাকে পরিভাষায় ইফরাদ বলা হয়।) আর যার মন চায় সে শুরুতে কেবল উমরার ইহরাম বাঁধতে পারে এবং মক্কা শরীফ গিয়ে উমরা থেকে ফারেগ হয়ে হজ্বের জন্য আরেকটি ইহরাম বাঁধবে। (যাকে তামাত্তু বলা হয়।) আর যার মন চায় সে হজ্ব ও উমরার একই সঙ্গে ইহরাম বাঁধবে এবং একই ইহরামে উভয়টি আদায় করার নিয়ত করবে, (যাকে কেরান বলা হয়।)
হুযুর (ﷺ)-এর এ কথা শোনার পর সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে অল্প সংখ্যক লোকই নিজেদের বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তামাত্তু হজ্বের ইচ্ছা করলেন এবং যুল হুলায়ফায় গিয়ে কেবল উমরার ইহরাম বাঁধলেন। তাদের মধ্যে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.ও ছিলেন। অপর দিকে অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম শুধু হজ্বের অথবা এক সাথে হজ্ব ও উমরার ইহরাম বাঁধলেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উভয়টির ইহরাম বাঁধলেন, অর্থাৎ, কেরান পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। তাছাড়া নিজের কুরবানীর পশু (উট) ও তিনি মদীনা শরীফ থেকেই সাথে নিয়ে রওয়ানা হলেন। আর শরী‘আতের বিধান হচ্ছে, যে হাজী কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে হজ্ব করতে যায়, সে ঐ পর্যন্ত ইহরাম শেষ করতে পারে না, যে পর্যন্ত সে ১০ই যিলহজ্ব কুরবানী করে না নেয়। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং ঐসব সাহাবায়ে কেরাম যারা তাঁর মতই কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, তারা হজ্বের পূর্বে (অর্থাৎ, ১০ই যিলহজ্ব কুরবানীর আগে) ইহরাম থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিলেন না। কিন্তু যারা কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে আসেননি, তাদের জন্য এ ধরনের কোন অপারগতা ছিল না।
মক্কা শরীফে পৌঁছে হুযুর (ﷺ) তীব্রভাবে অনুভব করলেন যে, এই যে জাহিলিয়্যাত সুলভ একটি কথা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, হজ্বের মাসগুলোতে উমরা করা কঠিন গুনাহ- এর প্রতিবাদ ও মূলোৎপাটনের জন্য এবং মানুষের মন-মস্তিষ্ক থেকে এর সূক্ষ্ম জীবাণু দূর করার জন্য এটা খুবই জরুরী যে, ব্যাপকভাবে এর বিপরীত কাজ করে দেখানো হোক। আর এর সম্ভাব্য পন্থা এটাই ছিল যে, তাঁর সাথীদের মধ্যে থেকে বেশী সংখ্যক লোক যারা তাঁর সাথে তাওয়াফ ও সায়ী করে নিয়েছিল, তারা এ তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরায় রূপান্তরিত করে ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যাবে এবং হজ্বের জন্য নির্ধারিত সময়ে আবার ইহরাম বেঁধে নিবে। আর তিনি নিজে যেহেতু কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, এজন্য তাঁর বেলায় এর অবকাশ ও সুযোগ ছিল না। এজন্যই তিনি বললেনঃ "যদি প্রথমেই আমি ঐ বিষয়টি অনুভব করতাম, যা পরে অনুভব করেছি, তাহলে আমি কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসতাম না এবং এই তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে দিয়ে ইহরাম শেষ করে দিতাম। (কিন্তু আমি যেহেতু কুরবানীর পশু সাথে আনার কারণে এমন করতে অপারগ, তাই তোমাদেরকে বলছি যে.) তোমাদের মধ্য থেকে যারা কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসেনি, তারা যেন এই তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে নেয় এবং নিজেদের ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যায়।" হুযুর (ﷺ)-এর এ কথা শুনে সুরাকা ইবনে মালেক দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তিনি যেহেতু এখন পর্যন্ত এ কথাই জানতেন যে, হজ্বের মাসগুলোতে উমরা করা কঠিন গুনাহ, এ জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, এ দিনগুলোতে পৃথক উমরা করার এ বিধান কি কেবল এ বছরের জন্য, না এখন থেকে সবসময়ই হজ্বের মাসগুলোতে এমন করা যাবে? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ভালভাবে বুঝানোর জন্য নিজের এক হাতের আঙ্গুলগুলো অপর হাতের আঙ্গুলগুলোর মধ্যে ঢুকিয়ে বললেন: دخلت العمرة في الحج হজ্বের মধ্যে উমরা এভাবে দাখিল হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, হজ্বের মাসগুলোতে এবং হজ্বের একেবারে নিকটবর্তী দিনগুলোতেও উমরা করা যায়। এটাকে গুনাহ্ মনে করা সম্পূর্ণ ভুল ও জাহেলী বিশ্বাস, আর এ বিধানটি সব সময়ের জন্য।
যেসব সাহাবায়ে কেরাম হুযুর (ﷺ)-এর নির্দেশ মোতাবেক ইহরাম খুলে হালাল হয়ে গিয়েছিলেন, তারা এ ক্ষেত্রে মাথা মুন্ডন করেননি; বরং কেবল ছেঁটে নিয়েছিলেন। এরূপ তারা সম্ভবত এ কারণে করেছিলেন, যাতে মাথা মুন্ডানোর ফযীলতটি হজ্বের ইহরাম খোলার সময় লাভ করতে পারেন।
হজ্বের বিশেষ কার্যক্রম ৮ই যিলহজ্ব থেকে শুরু হয়- যাকে "তারবিয়ার দিন" বলা হয়। এ দিন প্রভাতে হাজী সাহেবান মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ইফরাদ অথবা কেরানকারীগণ তো আগে থেকেই ইহরাম অবস্থায় থাকেন। তাদের ছাড়া অন্য হাজীগণ এ দিনই অর্থাৎ, ৮ই যিলহজ্ব ইহরাম বেঁধে মিনার দিকে যান এবং ৯ই যিলহজ্ব সকাল পর্যন্ত এখানেই অবস্থান করেন।
রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এবং তাঁর সাথে কিছু সাহাবায়ে কেরাম- যারা নিজেদের কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, তারা তো ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। অবশিষ্ট সাহাবীগণ- যারা উমরা আদায় করে ইহরাম খুলে নিয়েছিলেন, তারা সবাই ৮ তারিখের সকালে হজ্বের ইহরাম বাঁধলেন এবং হজ্বের এ কাফেলা মিনা রওয়ানা হয়ে গেল এবং এ দিন তারা সেখানেই অবস্থান করলেন। তারপর ৯ তারিখ সকালে সূর্যোদয়ের পর আরাফার দিকে যাত্রা শুরু হল। আরাফা মিনা থেকে প্রায় ৬ মাইল এবং মক্কা শরীফ থেকে ১ মাইল দূরে অবস্থিত এবং এটা হরমের সীমানার বাইরে; বরং এ দিকে হারামের সীমানা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই আরাফার এলাকা শুরু হয়।
আরবের সাধারণ গোত্রসমূহ- যারা হজ্বের জন্য আসত, তারা সবাই ৯ই যিলহজ্ব হারামের সীমানা থেকে বাইরে গিয়ে আরাফায় অবস্থান গ্রহণ করত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর গোত্রের লোকেরা অর্থাৎ, কুরাইশগণ যারা নিজেদেরকে কাবার প্রতিবেশী ও মুতাওয়াল্লী এবং আল্লাহর হারামের অধিবাসী বলত, তারা ওকূফের জন্যও হারামের বাইরে যেত না; বরং এর সীমানার ভিতরেই মুযদালিফা অঞ্চলের মাশ'আরুল হারাম পর্বতের কাছে অবস্থান করত এবং এটাকে নিজেদের বৈশিষ্ট্য মনে করত। নিজেদের এ গোত্রীয় সনাতন প্রথার কারণে কুরাইশদের এ বিশ্বাস ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)ও মাশ'আরুল হারামের নিকটই অবস্থান করবেন। কিন্তু যেহেতু তাদের এ রীতিটি ভুল ছিল এবং ওকূফের সঠিক স্থান আরাফাই ছিল, এজন্য তিনি মিনা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময়ই লোকদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, আমার জন্য নামিরায় যেন তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়। এ নির্দেশের ভিত্তিতেই নামিরা উপত্যকায়ই হুযুর (ﷺ)-এর জন্য তাঁবু খাটানো হয়। তিনি সেখানে গিয়েই অবতরণ করেন এবং ঐ তাঁবুতেই অবস্থান গ্রহণ করেন।
এটা জানা কথা যে, ঐ দিনটি অর্থাৎ, ঐ বছরের ওকূফে আরাফার দিনটি শুক্রবার ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেদিন সূর্য চলার পর প্রথমে পূর্বে উল্লেখিত খুতবা প্রদান করলেন। তারপর যুহর ও আসরের উভয় নামায যুহরের ওয়াক্তে একই সাথে পড়লেন। হাদীসে স্পষ্টভাবে যুহরের কথা বলা হয়েছে, যার দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, তিনি ঐ দিন জুমু'আর নামায পড়েননি; বরং এর স্থলে যুহর পড়েছেন। আর তিনি যে খুতবা দিয়েছিলেন এটা জুমু'আর ছিল না; বরং আরাফা দিবসের খুতবা ছিল। সেখানে জুমু'আ না পড়ার কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, আরাফা কোন জনবসতি নয়; বরং একটি মরুপ্রান্তর। আর জুমু'আ জনবসতিতে পড়া হয়।
আরাফার দিনের এ খুতবায় তিনি যেসব বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, ঐ সময়ে ও ঐ সমাবেশে এসব জিনিসেরই ঘোষণা ও প্রচার সবচেয়ে জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খুতবার পর তিনি যুহর ও আসরের নামায একসাথে যুহরের ওয়াক্তেই আদায় করেছেন এবং মাঝে কোন সুন্নত অথবা নফলের দু'রাকআতও আদায় করেননি। উম্মত এ কথায় একমত যে, ওকূফে আরাফার এ দিনে এ দু'টি নামায এভাবেই পড়তে হবে। অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার নামাযও এ দিন মুযদালিফায় পৌঁছে ইশার ওয়াক্তে এক সাথে পড়তে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এমনই করেছিলেন- যেমন সামনে গিয়ে জানা যাবে। ঐ দিন এ নামাযগুলোর সঠিক নিয়ম ও সঠিক সময় এটাই। এর একটি রহস্যপূর্ণ কারণ তো এই হতে পারে যে, ঐ দিনটির এ বৈশিষ্ট্য সবার সামনে যেন ফুটে উঠে যে, আজকের এ দিনে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে নামাযের ওয়াক্তগুলোতেও এ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ এটাও হতে পারে যে, এ দিনের মূল ওযীফা ও কাজ হচ্ছে আল্লাহর যিকির ও দু‘আ। তাই আল্লাহর বান্দারা যাতে একাগ্রচিত্তে এতে লিপ্ত থাকতে পারে এবং যুহর থেকে মাগরিব পর্যন্ত; বরং ইশা পর্যন্ত যেন কোন নামাযের চিন্তাও করতে না হয়, এজন্য এ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
হুযুর (ﷺ) আরাফার দিনের এ খুতবায় যাকে নিজের ক্ষেত্র ও স্থান বিবেচনায় তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুতবা ও ভাষণ বলা যায়- তিনি নিজের ওফাত ও বিচ্ছেদের সময় নিকটবর্তী হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে শেষ কথাটি এই বলেছিলেন: "আমি তোমাদের জন্য হেদায়াত ও আলোর ঐ পরিপূর্ণ উপকরণ রেখে যাচ্ছি, যার পর তোমরা কখনও বিপথগামী হবে না- যদি তোমরা একে আঁকড়ে থাক এবং এর আলোতে পথ চল। আর সেটা হচ্ছে আল্লাহর পবিত্র কিতাব কুরআন মজীদ।" এর দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, মৃত্যুশয্যার শেষ দিনগুলোতে যখন প্রচণ্ড রোগের কারণে তাঁর খুবই কষ্ট হচ্ছিল, এ সময় ওসিয়ত হিসাবে তিনি যে কিছু লেখাতে চেয়েছিলেন এবং যার ব্যাপারে বলেছিলেন: "তোমরা এরপর বিপথগামী হবে না", তিনি এতে কি লেখাতে চেয়েছিলেন। বিদায় হজ্বের এ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তিনি আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে থাকার ও এর অনুসরণ করার ওসিয়ত লিখাতে চেয়েছিলেন। তিনি এ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণেও বলে দিয়েছিলেন যে, এ মর্যাদা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব কুরআন শরীফের। আর যেহেতু হযরত উমর রাযি. এ বাস্তব কথাটি জানতেন এবং আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ক্ষেত্রমত কথা বলার সাহসও দান করেছিলেন, এজন্য তিনি এ ক্ষেত্রে এ অভিমত প্রকাশ করলেন যে, হুযুর (ﷺ)-এর সারা জীবনের শিক্ষা দ্বারা আমাদের জানা হয়ে গিয়েছে যে, এ মর্যাদা আল্লাহর কিতাবেরই। তাই এ কঠিন অবস্থায় ওসিয়ত লেখা ও লেখানোর বিষয়টির তেমন প্রয়োজনও ছিল না।
হজ্বের সবচেয়ে বড় কাজ ও রুকন হচ্ছে ওকূফে আরাফা। অর্থাৎ, ৯ই যিলহজ্ব দুপুরে সূর্য ঢলে পড়ার পর যুহর ও আসরের নামায একসাথে আদায় করে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। এ হাদীস দ্বারা জানা গেল যে, হুযুর (ﷺ) এ অবস্থানকে কত দীর্ঘ করেছিলেন। যুহর ও আসরের নামায তিনি যুহরের শুরু ওয়াক্তেই পড়ে নিয়েছিলেন এবং এ সময় থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনি ওকূফ করেছিলেন। তারপর সোজা মুযদালিফায় রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং মাগরিব ও ইশার নামায সেখানে পৌঁছে এক সাথে আদায় করলেন। আর উপরে বলা হয়েছে যে, এটাই হচ্ছে এ দিনের জন্য আল্লাহর হুকুম।
মুযদালিফার এ রাতে হুযুর (ﷺ) ইশার নামায শেষ করে ফজর পর্যন্ত আরাম করলেন এবং এ রাতে তাহাজ্জুদের নামায দু'রাকআতও পড়লেন না। (অথচ তাহাজ্জুদের নামায তিনি সফরের অবস্থাতেও বাদ দিতেন না।) এর কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, ৯ই যিলহজ্বের সারাটি দিন তিনি খুবই কর্মব্যস্ত ছিলেন। সকালে মিনা থেকে রওয়ানা হয়ে আরাফায় পৌঁছলেন এবং সেখানে প্রথম ভাষণ দিলেন। তারপর যুহর ও আসরের নামায পড়লেন এবং এরপর থেকে মাগরিব পর্যন্ত একাধারে ওকূফ করলেন। তারপর এ সময়েই আরাফা থেকে মুযদালিফার পথ অতিক্রম করলেন। মনে হয়, তিনি যেন ফজর থেকে নিয়ে ইশা পর্যন্ত একাধারে বিভিন্ন কর্মব্যস্ততা ও পরিশ্রমের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তা'ছাড়া পরের দিন অর্থাৎ, ১০ই যিলহজ্বও তাঁকে এমন কর্মব্যস্ত দিন কাটাতে হবে। অর্থাৎ, সকালে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হয়ে মিনা পৌঁছা, সেখানে গিয়ে প্রথমে শয়তানকে পাথর মারা, তারপর একটি-দু'টি অথবা দশ-বিশটি নয়; বরং ষাটের অধিক উট নিজ হাতে কুরবানী করা, তারপর তাওয়াফে যিয়ারতের জন্য মিনা থেকে মক্কা যাওয়া এবং সেখান থেকে আবার মিনায় ফিরে আসা। তাই দেখা গেল যে, যেহেতু ৯ই ও ১০ই যিলহজ্বের এ দু'টি দিন খুবই কর্মব্যস্ততার ও পরিশ্রমের দিন ছিল, এজন্য এ দু'দিনের মাঝের রাতটিতে (অর্থাৎ, মুযদালিফার রাতে) পূর্ণ বিশ্রাম গ্রহণ করা জরুরী ছিল। দেহ ও দৈহিক শক্তিগুলোরও কিছু দাবী ও হক থাকে এবং এগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা এ ধরনের সমাবেশগুলোতে বেশী জরুরী হয়- যাতে সাধারণ মানুষ ইসলামের সহজীকরণের নীতি এবং বিশেষ অবস্থায় রেয়ায়াতের রীতিটি বুঝে নিতে পারে।
এ হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ হাতে তেষট্টিটি উট কুরবানী করে ছিলেন। এগুলো খুব সম্ভব ঐ তেষট্টিটিই, যেগুলো তিনি মদীনা শরীফ থেকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন। বাকী সাঁইত্রিশটি যা হযরত আলী ইয়ামান থেকে এনেছিলেন, এগুলো তিনি তার হাতেই কুরবানী করালেন। তেষট্টি সংখ্যাটির হেকমত একেবারে স্পষ্ট যে, হুযুর (ﷺ)-এর বয়স তেষট্টি বছর ছিল। তাই তিনি যেন জীবনের প্রতিটি বছরের শুকরিয়া হিসাবে একটি করে উট কুরবানী করলেন।
হুযুর (ﷺ) ও আলী রাযি. নিজের কুরবানীর উটের গোশত রান্না করে খেয়েছেন এবং শুরবাও পান করেছেন। এর দ্বারা সবার একথা জানা হয়ে গেল যে, কুরবানীদাতা নিজের কুরবানীর গোশত নিজেও খেতে পারে এবং নিজের বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে খাওয়াতে পারে।
১০ই যিলহজ্ব কুরবানীর কাজ শেষ করে হুযুর (ﷺ) তাওয়াফে যিয়ারতের জন্য মক্কা শরীফ তশরীফ নিয়ে গেলেন। সুন্নত নিয়ম ও উত্তম এটাই যে, তওয়াফে যিয়ারত কুরবানী থেকে অবসর হয়ে ১০ই যিলহজ্বেই করে নেওয়া হবে- যদিও বিলম্বেরও অবকাশ রয়েছে।
যমযমের পানি উঠিয়ে হাজীদেরকে পান করানো-এ খেদমত ও সৌভাগ্যের কাজটি প্রাচীনকাল থেকেই হুযুর (ﷺ)-এর খান্দান বনী আব্দুল মুত্তালিবের ভাগে ছিল। হুযুর (ﷺ) তাওয়াফে যিয়ারত শেষ করে যমযমের কাছে আসলেন। সে সময় তাঁর খান্দানের লোকেরা বালতি দিয়ে পানি উঠিয়ে উঠিয়ে লোকদেরকে পান করাচ্ছিল। তাঁর মনেও এ কাজে অংশ গ্রহণ করার বাসনা জাগ্রত হল। কিন্তু তিনি একেবারে সঠিক চিন্তা করলেন যে, আমি যদি এমন করি, তাহলে আমার অনুসরণ ও অনুকরণ করতে গিয়ে সকল সাথীরাই এ সৌভাগ্যে অংশ গ্রহণ করতে চাইবে। এর ফলে বনী আব্দুল মুত্তালিব তাদের দীর্ঘকালের এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। এজন্য তিনি নিজের বংশের লোকদের মন রক্ষা করার জন্য এবং তাদের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শনের জন্য অন্তরের আকাঙ্ক্ষা তো প্রকাশ করলেন, কিন্তু সাথে সাথে ঐ পরিণামদর্শিতার কথাটিও বলে দিলেন, যার কারণে তিনি নিজের এ আন্তরিক বাসনা বিসর্জন দিয়েছিলেন।
শুরুতে যেমন বলে আসা হয়েছে যে, হযরত জাবের রাযি.-এর এ হাদীসটি বিদায় হজ্বের বর্ণনায় সবচেয়ে দীর্ঘ ও সবিস্তার বর্ণনা সমৃদ্ধ হাদীস। কিন্তু এতদসত্ত্বেও অনেক ঘটনার উল্লেখ এতে বাদ পড়ে গিয়েছে। এমনকি মাথা মুড়ানো এবং দশ তারিখের খুতবার উল্লেখও এতে আসেনি, যা অন্যান্য হাদীসে উল্লেখিত রয়েছে।
হযরত জাবের রাযি.-এর এ হাদীসের কোন কোন রাবী এ হাদীসেই এ অতিরিক্ত বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এ ঘোষণাও করেছিলেন:
" نَحَرْتُ هَا هُنَا وَمِنًى كُلُّهَا مَنْحَرٌ فَانْحَرُوا فِي رِحَالِكُمْ وَوَقَفْتُ هَا هُنَا وَعَرَفَةُ كُلُّهَا مَوْقِفٌ وَوَقَفْتُ هَا هُنَا وَجَمْعٌ كُلُّهَا مَوْقِفٌ "
অর্থাৎ, আমি কুরবানী এখানে করেছি; কিন্তু মিনার সমস্ত এলাকাই কুরবানীস্থল। তাই তোমরা নিজ নিজ জায়গায় কুরবানী করতে পার। আমি আরাফায় এখানে (বড় বড় পাথরের প্রান্তরে) ওকূফ করেছি; কিন্তু সমস্ত আরাফার ময়দানই ওকূফস্থল। (তাই এর যে কোন অংশেই ওকূফ করা যায়।) আমি মুযদালিফায় এখানে (মাশ'আরুল হারামের নিকটে) অবস্থান করেছি; কিন্তু সারা মুযদালিফাই ওকূফ তথা অবস্থানস্থল। (এর যে কোন অংশেই অবস্থান করা যায়।)
হুযুর (ﷺ)-এর এ কথা শোনার পর সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে অল্প সংখ্যক লোকই নিজেদের বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তামাত্তু হজ্বের ইচ্ছা করলেন এবং যুল হুলায়ফায় গিয়ে কেবল উমরার ইহরাম বাঁধলেন। তাদের মধ্যে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.ও ছিলেন। অপর দিকে অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম শুধু হজ্বের অথবা এক সাথে হজ্ব ও উমরার ইহরাম বাঁধলেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উভয়টির ইহরাম বাঁধলেন, অর্থাৎ, কেরান পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। তাছাড়া নিজের কুরবানীর পশু (উট) ও তিনি মদীনা শরীফ থেকেই সাথে নিয়ে রওয়ানা হলেন। আর শরী‘আতের বিধান হচ্ছে, যে হাজী কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে হজ্ব করতে যায়, সে ঐ পর্যন্ত ইহরাম শেষ করতে পারে না, যে পর্যন্ত সে ১০ই যিলহজ্ব কুরবানী করে না নেয়। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং ঐসব সাহাবায়ে কেরাম যারা তাঁর মতই কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, তারা হজ্বের পূর্বে (অর্থাৎ, ১০ই যিলহজ্ব কুরবানীর আগে) ইহরাম থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিলেন না। কিন্তু যারা কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে আসেননি, তাদের জন্য এ ধরনের কোন অপারগতা ছিল না।
মক্কা শরীফে পৌঁছে হুযুর (ﷺ) তীব্রভাবে অনুভব করলেন যে, এই যে জাহিলিয়্যাত সুলভ একটি কথা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, হজ্বের মাসগুলোতে উমরা করা কঠিন গুনাহ- এর প্রতিবাদ ও মূলোৎপাটনের জন্য এবং মানুষের মন-মস্তিষ্ক থেকে এর সূক্ষ্ম জীবাণু দূর করার জন্য এটা খুবই জরুরী যে, ব্যাপকভাবে এর বিপরীত কাজ করে দেখানো হোক। আর এর সম্ভাব্য পন্থা এটাই ছিল যে, তাঁর সাথীদের মধ্যে থেকে বেশী সংখ্যক লোক যারা তাঁর সাথে তাওয়াফ ও সায়ী করে নিয়েছিল, তারা এ তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরায় রূপান্তরিত করে ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যাবে এবং হজ্বের জন্য নির্ধারিত সময়ে আবার ইহরাম বেঁধে নিবে। আর তিনি নিজে যেহেতু কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, এজন্য তাঁর বেলায় এর অবকাশ ও সুযোগ ছিল না। এজন্যই তিনি বললেনঃ "যদি প্রথমেই আমি ঐ বিষয়টি অনুভব করতাম, যা পরে অনুভব করেছি, তাহলে আমি কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসতাম না এবং এই তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে দিয়ে ইহরাম শেষ করে দিতাম। (কিন্তু আমি যেহেতু কুরবানীর পশু সাথে আনার কারণে এমন করতে অপারগ, তাই তোমাদেরকে বলছি যে.) তোমাদের মধ্য থেকে যারা কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসেনি, তারা যেন এই তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে নেয় এবং নিজেদের ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যায়।" হুযুর (ﷺ)-এর এ কথা শুনে সুরাকা ইবনে মালেক দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তিনি যেহেতু এখন পর্যন্ত এ কথাই জানতেন যে, হজ্বের মাসগুলোতে উমরা করা কঠিন গুনাহ, এ জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, এ দিনগুলোতে পৃথক উমরা করার এ বিধান কি কেবল এ বছরের জন্য, না এখন থেকে সবসময়ই হজ্বের মাসগুলোতে এমন করা যাবে? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ভালভাবে বুঝানোর জন্য নিজের এক হাতের আঙ্গুলগুলো অপর হাতের আঙ্গুলগুলোর মধ্যে ঢুকিয়ে বললেন: دخلت العمرة في الحج হজ্বের মধ্যে উমরা এভাবে দাখিল হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, হজ্বের মাসগুলোতে এবং হজ্বের একেবারে নিকটবর্তী দিনগুলোতেও উমরা করা যায়। এটাকে গুনাহ্ মনে করা সম্পূর্ণ ভুল ও জাহেলী বিশ্বাস, আর এ বিধানটি সব সময়ের জন্য।
যেসব সাহাবায়ে কেরাম হুযুর (ﷺ)-এর নির্দেশ মোতাবেক ইহরাম খুলে হালাল হয়ে গিয়েছিলেন, তারা এ ক্ষেত্রে মাথা মুন্ডন করেননি; বরং কেবল ছেঁটে নিয়েছিলেন। এরূপ তারা সম্ভবত এ কারণে করেছিলেন, যাতে মাথা মুন্ডানোর ফযীলতটি হজ্বের ইহরাম খোলার সময় লাভ করতে পারেন।
হজ্বের বিশেষ কার্যক্রম ৮ই যিলহজ্ব থেকে শুরু হয়- যাকে "তারবিয়ার দিন" বলা হয়। এ দিন প্রভাতে হাজী সাহেবান মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ইফরাদ অথবা কেরানকারীগণ তো আগে থেকেই ইহরাম অবস্থায় থাকেন। তাদের ছাড়া অন্য হাজীগণ এ দিনই অর্থাৎ, ৮ই যিলহজ্ব ইহরাম বেঁধে মিনার দিকে যান এবং ৯ই যিলহজ্ব সকাল পর্যন্ত এখানেই অবস্থান করেন।
রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এবং তাঁর সাথে কিছু সাহাবায়ে কেরাম- যারা নিজেদের কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, তারা তো ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। অবশিষ্ট সাহাবীগণ- যারা উমরা আদায় করে ইহরাম খুলে নিয়েছিলেন, তারা সবাই ৮ তারিখের সকালে হজ্বের ইহরাম বাঁধলেন এবং হজ্বের এ কাফেলা মিনা রওয়ানা হয়ে গেল এবং এ দিন তারা সেখানেই অবস্থান করলেন। তারপর ৯ তারিখ সকালে সূর্যোদয়ের পর আরাফার দিকে যাত্রা শুরু হল। আরাফা মিনা থেকে প্রায় ৬ মাইল এবং মক্কা শরীফ থেকে ১ মাইল দূরে অবস্থিত এবং এটা হরমের সীমানার বাইরে; বরং এ দিকে হারামের সীমানা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই আরাফার এলাকা শুরু হয়।
আরবের সাধারণ গোত্রসমূহ- যারা হজ্বের জন্য আসত, তারা সবাই ৯ই যিলহজ্ব হারামের সীমানা থেকে বাইরে গিয়ে আরাফায় অবস্থান গ্রহণ করত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর গোত্রের লোকেরা অর্থাৎ, কুরাইশগণ যারা নিজেদেরকে কাবার প্রতিবেশী ও মুতাওয়াল্লী এবং আল্লাহর হারামের অধিবাসী বলত, তারা ওকূফের জন্যও হারামের বাইরে যেত না; বরং এর সীমানার ভিতরেই মুযদালিফা অঞ্চলের মাশ'আরুল হারাম পর্বতের কাছে অবস্থান করত এবং এটাকে নিজেদের বৈশিষ্ট্য মনে করত। নিজেদের এ গোত্রীয় সনাতন প্রথার কারণে কুরাইশদের এ বিশ্বাস ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)ও মাশ'আরুল হারামের নিকটই অবস্থান করবেন। কিন্তু যেহেতু তাদের এ রীতিটি ভুল ছিল এবং ওকূফের সঠিক স্থান আরাফাই ছিল, এজন্য তিনি মিনা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময়ই লোকদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, আমার জন্য নামিরায় যেন তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়। এ নির্দেশের ভিত্তিতেই নামিরা উপত্যকায়ই হুযুর (ﷺ)-এর জন্য তাঁবু খাটানো হয়। তিনি সেখানে গিয়েই অবতরণ করেন এবং ঐ তাঁবুতেই অবস্থান গ্রহণ করেন।
এটা জানা কথা যে, ঐ দিনটি অর্থাৎ, ঐ বছরের ওকূফে আরাফার দিনটি শুক্রবার ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেদিন সূর্য চলার পর প্রথমে পূর্বে উল্লেখিত খুতবা প্রদান করলেন। তারপর যুহর ও আসরের উভয় নামায যুহরের ওয়াক্তে একই সাথে পড়লেন। হাদীসে স্পষ্টভাবে যুহরের কথা বলা হয়েছে, যার দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, তিনি ঐ দিন জুমু'আর নামায পড়েননি; বরং এর স্থলে যুহর পড়েছেন। আর তিনি যে খুতবা দিয়েছিলেন এটা জুমু'আর ছিল না; বরং আরাফা দিবসের খুতবা ছিল। সেখানে জুমু'আ না পড়ার কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, আরাফা কোন জনবসতি নয়; বরং একটি মরুপ্রান্তর। আর জুমু'আ জনবসতিতে পড়া হয়।
আরাফার দিনের এ খুতবায় তিনি যেসব বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, ঐ সময়ে ও ঐ সমাবেশে এসব জিনিসেরই ঘোষণা ও প্রচার সবচেয়ে জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খুতবার পর তিনি যুহর ও আসরের নামায একসাথে যুহরের ওয়াক্তেই আদায় করেছেন এবং মাঝে কোন সুন্নত অথবা নফলের দু'রাকআতও আদায় করেননি। উম্মত এ কথায় একমত যে, ওকূফে আরাফার এ দিনে এ দু'টি নামায এভাবেই পড়তে হবে। অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার নামাযও এ দিন মুযদালিফায় পৌঁছে ইশার ওয়াক্তে এক সাথে পড়তে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এমনই করেছিলেন- যেমন সামনে গিয়ে জানা যাবে। ঐ দিন এ নামাযগুলোর সঠিক নিয়ম ও সঠিক সময় এটাই। এর একটি রহস্যপূর্ণ কারণ তো এই হতে পারে যে, ঐ দিনটির এ বৈশিষ্ট্য সবার সামনে যেন ফুটে উঠে যে, আজকের এ দিনে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে নামাযের ওয়াক্তগুলোতেও এ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ এটাও হতে পারে যে, এ দিনের মূল ওযীফা ও কাজ হচ্ছে আল্লাহর যিকির ও দু‘আ। তাই আল্লাহর বান্দারা যাতে একাগ্রচিত্তে এতে লিপ্ত থাকতে পারে এবং যুহর থেকে মাগরিব পর্যন্ত; বরং ইশা পর্যন্ত যেন কোন নামাযের চিন্তাও করতে না হয়, এজন্য এ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
হুযুর (ﷺ) আরাফার দিনের এ খুতবায় যাকে নিজের ক্ষেত্র ও স্থান বিবেচনায় তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুতবা ও ভাষণ বলা যায়- তিনি নিজের ওফাত ও বিচ্ছেদের সময় নিকটবর্তী হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে শেষ কথাটি এই বলেছিলেন: "আমি তোমাদের জন্য হেদায়াত ও আলোর ঐ পরিপূর্ণ উপকরণ রেখে যাচ্ছি, যার পর তোমরা কখনও বিপথগামী হবে না- যদি তোমরা একে আঁকড়ে থাক এবং এর আলোতে পথ চল। আর সেটা হচ্ছে আল্লাহর পবিত্র কিতাব কুরআন মজীদ।" এর দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, মৃত্যুশয্যার শেষ দিনগুলোতে যখন প্রচণ্ড রোগের কারণে তাঁর খুবই কষ্ট হচ্ছিল, এ সময় ওসিয়ত হিসাবে তিনি যে কিছু লেখাতে চেয়েছিলেন এবং যার ব্যাপারে বলেছিলেন: "তোমরা এরপর বিপথগামী হবে না", তিনি এতে কি লেখাতে চেয়েছিলেন। বিদায় হজ্বের এ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তিনি আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে থাকার ও এর অনুসরণ করার ওসিয়ত লিখাতে চেয়েছিলেন। তিনি এ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণেও বলে দিয়েছিলেন যে, এ মর্যাদা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব কুরআন শরীফের। আর যেহেতু হযরত উমর রাযি. এ বাস্তব কথাটি জানতেন এবং আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ক্ষেত্রমত কথা বলার সাহসও দান করেছিলেন, এজন্য তিনি এ ক্ষেত্রে এ অভিমত প্রকাশ করলেন যে, হুযুর (ﷺ)-এর সারা জীবনের শিক্ষা দ্বারা আমাদের জানা হয়ে গিয়েছে যে, এ মর্যাদা আল্লাহর কিতাবেরই। তাই এ কঠিন অবস্থায় ওসিয়ত লেখা ও লেখানোর বিষয়টির তেমন প্রয়োজনও ছিল না।
হজ্বের সবচেয়ে বড় কাজ ও রুকন হচ্ছে ওকূফে আরাফা। অর্থাৎ, ৯ই যিলহজ্ব দুপুরে সূর্য ঢলে পড়ার পর যুহর ও আসরের নামায একসাথে আদায় করে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। এ হাদীস দ্বারা জানা গেল যে, হুযুর (ﷺ) এ অবস্থানকে কত দীর্ঘ করেছিলেন। যুহর ও আসরের নামায তিনি যুহরের শুরু ওয়াক্তেই পড়ে নিয়েছিলেন এবং এ সময় থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনি ওকূফ করেছিলেন। তারপর সোজা মুযদালিফায় রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং মাগরিব ও ইশার নামায সেখানে পৌঁছে এক সাথে আদায় করলেন। আর উপরে বলা হয়েছে যে, এটাই হচ্ছে এ দিনের জন্য আল্লাহর হুকুম।
মুযদালিফার এ রাতে হুযুর (ﷺ) ইশার নামায শেষ করে ফজর পর্যন্ত আরাম করলেন এবং এ রাতে তাহাজ্জুদের নামায দু'রাকআতও পড়লেন না। (অথচ তাহাজ্জুদের নামায তিনি সফরের অবস্থাতেও বাদ দিতেন না।) এর কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, ৯ই যিলহজ্বের সারাটি দিন তিনি খুবই কর্মব্যস্ত ছিলেন। সকালে মিনা থেকে রওয়ানা হয়ে আরাফায় পৌঁছলেন এবং সেখানে প্রথম ভাষণ দিলেন। তারপর যুহর ও আসরের নামায পড়লেন এবং এরপর থেকে মাগরিব পর্যন্ত একাধারে ওকূফ করলেন। তারপর এ সময়েই আরাফা থেকে মুযদালিফার পথ অতিক্রম করলেন। মনে হয়, তিনি যেন ফজর থেকে নিয়ে ইশা পর্যন্ত একাধারে বিভিন্ন কর্মব্যস্ততা ও পরিশ্রমের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তা'ছাড়া পরের দিন অর্থাৎ, ১০ই যিলহজ্বও তাঁকে এমন কর্মব্যস্ত দিন কাটাতে হবে। অর্থাৎ, সকালে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হয়ে মিনা পৌঁছা, সেখানে গিয়ে প্রথমে শয়তানকে পাথর মারা, তারপর একটি-দু'টি অথবা দশ-বিশটি নয়; বরং ষাটের অধিক উট নিজ হাতে কুরবানী করা, তারপর তাওয়াফে যিয়ারতের জন্য মিনা থেকে মক্কা যাওয়া এবং সেখান থেকে আবার মিনায় ফিরে আসা। তাই দেখা গেল যে, যেহেতু ৯ই ও ১০ই যিলহজ্বের এ দু'টি দিন খুবই কর্মব্যস্ততার ও পরিশ্রমের দিন ছিল, এজন্য এ দু'দিনের মাঝের রাতটিতে (অর্থাৎ, মুযদালিফার রাতে) পূর্ণ বিশ্রাম গ্রহণ করা জরুরী ছিল। দেহ ও দৈহিক শক্তিগুলোরও কিছু দাবী ও হক থাকে এবং এগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা এ ধরনের সমাবেশগুলোতে বেশী জরুরী হয়- যাতে সাধারণ মানুষ ইসলামের সহজীকরণের নীতি এবং বিশেষ অবস্থায় রেয়ায়াতের রীতিটি বুঝে নিতে পারে।
এ হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ হাতে তেষট্টিটি উট কুরবানী করে ছিলেন। এগুলো খুব সম্ভব ঐ তেষট্টিটিই, যেগুলো তিনি মদীনা শরীফ থেকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন। বাকী সাঁইত্রিশটি যা হযরত আলী ইয়ামান থেকে এনেছিলেন, এগুলো তিনি তার হাতেই কুরবানী করালেন। তেষট্টি সংখ্যাটির হেকমত একেবারে স্পষ্ট যে, হুযুর (ﷺ)-এর বয়স তেষট্টি বছর ছিল। তাই তিনি যেন জীবনের প্রতিটি বছরের শুকরিয়া হিসাবে একটি করে উট কুরবানী করলেন।
হুযুর (ﷺ) ও আলী রাযি. নিজের কুরবানীর উটের গোশত রান্না করে খেয়েছেন এবং শুরবাও পান করেছেন। এর দ্বারা সবার একথা জানা হয়ে গেল যে, কুরবানীদাতা নিজের কুরবানীর গোশত নিজেও খেতে পারে এবং নিজের বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে খাওয়াতে পারে।
১০ই যিলহজ্ব কুরবানীর কাজ শেষ করে হুযুর (ﷺ) তাওয়াফে যিয়ারতের জন্য মক্কা শরীফ তশরীফ নিয়ে গেলেন। সুন্নত নিয়ম ও উত্তম এটাই যে, তওয়াফে যিয়ারত কুরবানী থেকে অবসর হয়ে ১০ই যিলহজ্বেই করে নেওয়া হবে- যদিও বিলম্বেরও অবকাশ রয়েছে।
যমযমের পানি উঠিয়ে হাজীদেরকে পান করানো-এ খেদমত ও সৌভাগ্যের কাজটি প্রাচীনকাল থেকেই হুযুর (ﷺ)-এর খান্দান বনী আব্দুল মুত্তালিবের ভাগে ছিল। হুযুর (ﷺ) তাওয়াফে যিয়ারত শেষ করে যমযমের কাছে আসলেন। সে সময় তাঁর খান্দানের লোকেরা বালতি দিয়ে পানি উঠিয়ে উঠিয়ে লোকদেরকে পান করাচ্ছিল। তাঁর মনেও এ কাজে অংশ গ্রহণ করার বাসনা জাগ্রত হল। কিন্তু তিনি একেবারে সঠিক চিন্তা করলেন যে, আমি যদি এমন করি, তাহলে আমার অনুসরণ ও অনুকরণ করতে গিয়ে সকল সাথীরাই এ সৌভাগ্যে অংশ গ্রহণ করতে চাইবে। এর ফলে বনী আব্দুল মুত্তালিব তাদের দীর্ঘকালের এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। এজন্য তিনি নিজের বংশের লোকদের মন রক্ষা করার জন্য এবং তাদের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শনের জন্য অন্তরের আকাঙ্ক্ষা তো প্রকাশ করলেন, কিন্তু সাথে সাথে ঐ পরিণামদর্শিতার কথাটিও বলে দিলেন, যার কারণে তিনি নিজের এ আন্তরিক বাসনা বিসর্জন দিয়েছিলেন।
শুরুতে যেমন বলে আসা হয়েছে যে, হযরত জাবের রাযি.-এর এ হাদীসটি বিদায় হজ্বের বর্ণনায় সবচেয়ে দীর্ঘ ও সবিস্তার বর্ণনা সমৃদ্ধ হাদীস। কিন্তু এতদসত্ত্বেও অনেক ঘটনার উল্লেখ এতে বাদ পড়ে গিয়েছে। এমনকি মাথা মুড়ানো এবং দশ তারিখের খুতবার উল্লেখও এতে আসেনি, যা অন্যান্য হাদীসে উল্লেখিত রয়েছে।
হযরত জাবের রাযি.-এর এ হাদীসের কোন কোন রাবী এ হাদীসেই এ অতিরিক্ত বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এ ঘোষণাও করেছিলেন:
" نَحَرْتُ هَا هُنَا وَمِنًى كُلُّهَا مَنْحَرٌ فَانْحَرُوا فِي رِحَالِكُمْ وَوَقَفْتُ هَا هُنَا وَعَرَفَةُ كُلُّهَا مَوْقِفٌ وَوَقَفْتُ هَا هُنَا وَجَمْعٌ كُلُّهَا مَوْقِفٌ "
অর্থাৎ, আমি কুরবানী এখানে করেছি; কিন্তু মিনার সমস্ত এলাকাই কুরবানীস্থল। তাই তোমরা নিজ নিজ জায়গায় কুরবানী করতে পার। আমি আরাফায় এখানে (বড় বড় পাথরের প্রান্তরে) ওকূফ করেছি; কিন্তু সমস্ত আরাফার ময়দানই ওকূফস্থল। (তাই এর যে কোন অংশেই ওকূফ করা যায়।) আমি মুযদালিফায় এখানে (মাশ'আরুল হারামের নিকটে) অবস্থান করেছি; কিন্তু সারা মুযদালিফাই ওকূফ তথা অবস্থানস্থল। (এর যে কোন অংশেই অবস্থান করা যায়।)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)