আল মুসনাদুস সহীহ- ইমাম মুসলিম রহঃ

১৬- হজ্ব - উমরার অধ্যায়

হাদীস নং: ২৮২১
আন্তর্জাতিক নং: ১২১৮-১
- হজ্ব - উমরার অধ্যায়
১৭. নবী (ﷺ) এর হজ্জের বিবরণ
২৮২১। আবু বকর ইবনে শায়বা ও ইসহাক ইবনে ইবরাহীম (রাহঃ) ......... হাতিম ইবনে ইসমাঈল জাফর ইবনে মুহাম্মাদ (রাহঃ) থেকে, তিনি তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) এর কাছে গেলাম। তিনি সকলের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। অবশেষে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি বললাম, আমি মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন। অতএব তিনি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে আমার মাথার উপর রাখলেন। তিনি আমার জামার উপরদিকের বোতাম খুললেন তারপর নীচের বোতাম খুললেন। তারপর তার হাত আমার বুকের মাঝে রাখলেন। আমি তখন ছিলাম যুবক। বললেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! তোমাকে স্বাগত জানাই, তুমি যা জানতে চাও, জিজ্ঞাসা কর। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তখন তিনি (বার্ধক্যজনিত কারণে) দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ইতিমধ্যে নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেল। তিনি নিজেকে একটি চাঁদর আবৃত করে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি যখনই চাঁদরের প্রান্ত নিজ কাঁধের উপর রাখতেন- তা (আকারে) ছোট হওয়ার কারণে নীচে পড়ে যেত। তার আরেকটি বড় চাঁদর তার পাশেই আলনায় রাখা ছিলো। তিনি আমাদের নিয়ে নামাযের ইমামতি করলেন।

অতঃপর আমি বললাম- আপনি আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর (বিদায়) হজ্জ সম্পর্কে অবহিত করুন। জাবির (রাযিঃ) স্বহস্তে নয় সংখ্যার প্রতি ইঙ্গিত করে বললেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নয় বছর (মদীনায়) অবস্থান করেন এবং এ সময়কালের মধ্যে হজ্জ করেননি। অতঃপর ১০ম বর্ষে লোকদের মধ্যে ঘোষণা দেয়া হল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ বছর হজ্জে যাবেন। এবং মদীনায় বহুলোকের আগমন হল। তাদের প্রত্যেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর অনুসরণ করতে এবং তার অনুরূপ আমল করতে আগ্রহী ছিল।

আমরা তাঁর সঙ্গে রওয়ানা হলাম। আমরা যখন যুল হুলাইফা নামক স্থানে পৌছলাম- আসমা বিনতে উমায়স (রাযিঃ) মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকরকে প্রসব করলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট লোক পাঠিয়ে জানতে চাইলেন এখন আমি কি করব? তিনি বললেন, তুমি গোসল কর, একখণ্ড কাপড় দিয়ে পট্টি বেঁধে নাও এবং ইহরামের পোশাক পরিধান কর।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মসজিদে (ইহরামের দু’রাকআত) নামায আদায় করলেন। অতঃপর “কাসওয়া” নামক উটে আরোহণ করলেন। অতঃপর বায়দা নামক স্থানে তাঁর উট যখন তাঁকে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল, আমি সামনের দিকে যতদূর দৃষ্টি যায়, তাকিয়ে দেখলাম লোকে লোকারণ্য কতক সওয়ারীতে, কতক পদব্রজে অগ্রসর হচ্ছে। ডানদিকে, বাঁদিকে এবং পেছনেও একই দৃশ্য। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের মাঝখানে ছিলেন এবং তার উপর কুরআন নাযিল হচ্ছিল। একমাত্র তিনিই এর আসল তাৎপর্য জানেন এবং তিনি যা করতেন, আমরাও তাই করতাম। তিনি আল্লাহর তাওহীদ সম্বলিত এই তালবিয়া পাঠ করলেনঃ

লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, লাব্বাইকা না শারীকা লাকা লাব্বাইকা, ইন্নাল-হামদা ওয়ান-নি মাতা লাকা ওয়াল মূলক, লা শারীকা লাক।

অর্থঃ আমি তোমার নিকটে হাযির আছি হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকটে হাযির, আমি তোমার নিকটে হাযির, তোমার কোন শরীক নাই, আমি তোমার নিকটে উপস্থিত। নিশ্চিত সমস্ত প্রশংসা, নি’আমত তোমারই এবং সমগ্র রাজত্ব তোমার, তোমার কোন শরীক নেই।

লোকেরাও উপরোক্ত তালবিযা পাঠ করল যা (আজকাল) পাঠ করা হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর থেকে বেশী কিছু বলেন নাই! আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উপরোক্ত তালবিয়া পাঠ করতে থাকলেন।

জাবির (রাযিঃ) বলেন, আমরা হজ্জ ছাড়া অন্য কিছুর নিয়ত করিনি, আমরা উমরার কথা জানতাম না। অবশেষে আমরা যখন তাঁর সঙ্গে বায়তুল্লাহ শরীফে পৌছলাম তিনি রুকন (হাজারে আসওয়াদ) স্পর্শ করলেন, তারপর সাতবার কাবা ঘর তাওয়াফ করলেন- তিনবার দ্রুতগতিতে এবং চারবার স্বাভাবিক গতিতে। এরপর তিনি মাকামে ইবরাহীমে পৌছে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ

وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى

অর্থঃ “তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানরূপে গ্রহণ কর”- (সূরা বাকারাঃ ১২৫)।

তিনি মাকামে ইবরাহীমকে তাঁর ও বায়তূল্লাহর মাঝখানে রেখে (দু’রাক’আত নামায আদায় করলেন)। (জাফর বলেন) আমার পিতা (মুহাম্মাদ) বলতেন, আমি যতদুর জানি, তিনি (জাবির) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি দু-রাক’আত নামাযে সূরা ’কুল হুআল্লাহু আহাদ’ ও ’কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফিরুন’ পাঠ করেন।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাজারে আসওয়াদের কাছে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং তাতে চুমো খেলেন। তারপর তিনি দরজা দিয়ে সাফা পাহাড়ের দিকে বের হলেন এবং সাফার নিকটবর্তী হয়ে তিলাওয়াত করলেনঃ

إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ

অর্থঃ নিশ্চয়ই সাফা-মারওইয়া আল্লাহর দুটি নিদর্শনসমূহের অন্যতম” (সূরা বাকারাঃ ১৫৮)

এবং আরো বললেন আল্লাহ তাআলা যে পাহাড়ের উল্লেখ করে আরম্ভ করেছেন, আমিও তা দিয়ে আরম্ভ করব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাফা পাহাড় থেকে শুরু করলেন এবং তারপর এতটা উপরে আরোহণ করলেন যে, বায়তুল্লাহ শরীফ দেখতে পেলেন। তিনি কিবলামুখী হলেন, আল্লাহর একত্ব ও মাহাত্ন ঘোষণা করলেন এবং বললেনঃ

″লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া হুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু আনজাযা ওয়াহদাহু ওয়া নাসারা আব্দাহ ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু।″

অর্থঃ ″আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। তাঁর জন্য রাজত্ব এবং তাঁর জন্য সমস্ত প্রশংসা, তিনি প্রতিটি জিনিসের উপর শক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই। তিনি এক, তিনি নিজের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং তার বান্দাকে সাহায্য করেছেন ও শত্রু বাহিনীকে একাই পরাস্ত করেছেন″

তিনি এ দুআ পড়লেন এবং তিনি অনুরূপ তিনবার বললেন। অতঃপর তিনি নেমে মারওয়া পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হলেন- যাবত না তাঁর পা উপত্যকার সমতল ভূমিতে গিয়ে ঠেকল। তিনি দ্রুত চললেন- যাবত না উপত্যকা অতিক্রম করলেন। মারওয়া পাহাড়ে উঠার সময় হেঁটে উঠলেন, অতঃপর এখানেও তাই করলেন যা তিনি সাফা পাহাড়ে করেছিলেন। সর্বশেষ তাওয়াফে যখন তিনি মারওয়া পাহাড়ে পৌছলেন, তখন (লোকদের সম্বোধন করে) বললেনঃ যদি আমি আগেই ব্যাপারটি বুঝতে পারতাম, তাহলে আমি সাথে করে কুরবানীর পশু আনতাম না এবং (হজ্জের ইহরামকে উমরায় পরিবর্তন করতাম। অতএব তোমাদের মধ্যে যার সাথে কুরবানীর পশু নাই, সে যেন ইহরাম খুলে ফেলে এবং একে উমরায় পরিণত করে। এ সময় সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জু’শুম (রাযিঃ) দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই ব্যবস্থা কি আমাদের এ বছরের জন্য, না সর্বকালের জন্য? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাতের আঙ্গুলগুলো পরস্পরের ফাঁকে ঢূকালেন এবং দু’বার বললেন, উমরা হজ্জের মধ্যে প্রবেশ করেছে। আরও বললেনঃ না, বরং সর্বকালের জন্য, সর্বকালের জন্য।

এ সময় আলী (রাযিঃ) ইয়েমেন থেকে নবী (ﷺ) এর জন্য কুরবানীর পশু নিয়ে এলেন এবং যারা ইহরাম খুলে ফেলেছে, ফাতিমা (রাযিঃ) কে তাদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পেলেন। তিনি রং্গীণ কাপড় পরিহিতা ছিলেন এবং চোখে সুরমা দিয়েছিলেন। আলী (রাযিঃ) তা অপছন্দ করলেন। ফাতিমা (রাযিঃ) বললেন, আমার পিতা আমাকে এরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

রাবী বলেন, আলী (রাযিঃ) ইরাকে থাকতেন, অতএব ফাতিমা (রাযিঃ) যা করেছেন তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে আমি তাকে জানালাম যে আমি তার এ কাজ অপছন্দ করেছি। তিনি যা উল্লেখ করেছেন, সে বিষয়ে জানার জন্য আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ফাতিমা সত্য বলেছে, সত্য বলেছে। তুমি হজ্জের ইহরাম বাঁধার সময় কি বলেছিলে? আলী (রাযিঃ) বললেন আমি বলেছি, ইয়া আল্লাহ! আমি ইহরাম বাঁধলাম, যেরূপ ইহরাম বেঁধেছেন আপনার রাসুল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমার সঙ্গে হাদী (কুরবানীর পশু) আছে অতএব তুমি ইহরাম খুলবে না।

জাবির (রাযিঃ) বলেন, আলী (রাযিঃ) ইয়েমেন থেকে যে পশুপাল নিয়ে এসেছেন এবং নবী (ﷺ) নিজের সঙ্গে করে যে সব পশু নিয়ে এসেছিলেন, সর্বসাকুল্যে এর সংখ্যা দাঁড়াল একশত। অতএব নবী (ﷺ) এবং যাদের সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল তারা ব্যতীত আর সকলেই ইহরাম খুলে ফেললেন এবং চুল কাটলেন। তারপর যখন তারবিয়ার দিন (৮ যিলহজ্জ) আসল, লোকেরা পুনরায় ইহরাম বাঁধল এবং মিনার দিকে রওয়ানা হল। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার বাহনে সওয়ার হয়ে গেলেন এবং সেখানে যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজরের নামায আদায় করলেন। তারপর তিনি সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন এবং নামিরা নামক স্থানে গিয়ে তার জন্য একটি তাঁবু খাটানোর নির্দেশ দিলেন এবং নিজেও রওয়ানা হয়ে গেলেন।

কুরাইশগণ নিঃসন্দেহ ছিল যে, নবী (ﷺ) মাশ’আরুল হারামের কাছে অবস্থান করবেন যেমন জাহিলী যুগে কুরাইশগণ করত। কিন্তু তিনি সামনে অগ্রসর হলেন, তারপরে আরাফাতে পৌছলেন এবং দেখতে পেলেন নামিরায় তাঁর জন্য তাঁবু খাটানো হয়েছে। তিনি এখানে অবতরণ করলেন। তারপর যখন সূর্য ঢলে পড়ল, তখন তিনি তাঁর কাসওয়া (নামক উষ্ঠী) কে প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। তার পিঠে হাওদা লাগান হল। তখন তিনি বাতনে ওয়াদীতে এলেন এবং লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেনঃ

“তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সস্পদ তোমাদের জন্য হারাম (মর্যাদাপূর্ণ) যেমন তা হারাম(মর্যাদাপূর্ণ) তোমাদের এ দিনে, তোমাদের এ মাসে এবং তোমাদের এ শহরে।”

″সাবধান! জাহিলী যুগের সকল ব্যাপার (অপসংস্কৃতি) আমার উভয় পায়ের নীচে। জাহিলী যুগের রক্তের দাবিও বাতিল হল। আমি সর্ব প্রথম যে রক্তপণ বাতিল করছি, তা হল আমাদের বংশের রবীআ ইবনে হারিসের পূত্রের রক্তপণ। সে শিশু অবস্থায় বনু সা’দ এ দুগ্ধপোষ্য ছিল, তখন হুযায়ল গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে।

জাহিলী যুগের সুদও বাতিল হল। আমি প্রথমে যে সুদ বাতিল করছি তা হল আমাদের বংশের আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিরের সুদ। তার সমস্ত সুদ বাতিল হল।

তোমরা স্ত্রীলোকদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে তাদের লজ্জাস্থান নিজেদের জন্য হালাল করেছ। তাদের উপরে তোমাদের অধিকার এই যে, তারা যেন তোমাদের শয্যায় এমন কোন লোককে স্থান না দেয় যাকে তোমরা অপছন্দ কর। যদি তারা এরূপ করে তবে হালকাভাবে প্রহার কর। আর তোমাদের উপর তাদের ন্যায়সঙ্গত ভরণ-পোষণের ও পোশাক-পরিচ্ছেদের হুকুম রয়েছে।

আমি তোমাদের মাঝে এমন এক জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরে থাকলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব।”

“আমার সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হলে, তখন তোমরা কি বলবে?” তারা বলল, আমরা সাক্ষ্য দিব যে, আপনি (আল্লাহর বাণী) পৌছিয়েছেন, আপনার হক আদায় করেছেন এবং সদুপদেশ দিয়েছেন। তারপর তিনি তর্জনী আকাশের দিকে তুলে লোকদের ইশারা করে বললেন, “ইয়া আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক, তিনি তিনবার এরূপ বললেন।

তারপর (মুয়াযযিন) আযান দিলেন ও ইকামত দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যোহরের নামায আদায় করলেন। এরপর ইকামত দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আসরের নামায আদায় করলেন। তিনি এই দুই নামাযের মাঝখানে অন্য কোন নামায আদায় করেননি।

তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সওয়ার হয়ে মাওকিফ (অবস্থানস্থল) এলেন, তাঁর কাসওয়া উটের পেট পাথরের স্তুপের দিকে করে দিলেন এবং লোকদের একত্র হওয়ার জায়গা সামনে রেখে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ালেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনি এভাবে উকুফ করলেন। হলদে আভা কিছু দূরীভূত হল, এমনকি সূর্য গোলক সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেল। তিনি উসামা (রাযিঃ) কে তাঁর বাহনের পেছনদিকে বসালেন এবং কাসওয়ার নাকের দড়ি সজোরে টান দিলেন, ফলে তার মাথা মাওরিক (সওয়ারী ক্লান্তি অবসাদর জন্য যাতে পা রাখে) স্পর্শ করল। তিনি ডান হাতের ইশারায় বলেন, হে জনমণ্ডলী! ধীরে সুস্থে, ধীরে সুস্থে অগ্রসর হও। যখনই তিনি বালূর স্তূপের নিকট পৌছতেন, কাসওয়ার নাকের রশি কিছুটা ঢিল দিতেন যাতে সে উপরদিকে উঠতে পারে।

এভাবে তিনি মুযদালিফায় পৌছলেন এবং এখানে একই আযানে ও দুই ইকামতে মাগরিব ও ইশার সালাম আদায় করলেন। এই নামাযের মাঝখানে অন্য কোন নফল নামায আদায় করেননি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শুয়ে পড়লেন যাবত না ফজরের ওয়াক্ত হল। অতঃপর ভোর হয়ে গেলে তিনি আযান ও ইকামত সহ ফজরের নামায আদায় করলেন। অতঃপর তিনি কাসওয়ার পিঠে আরোহণ করে মাশ’আরুল হারাম নামক স্থানে আসলেন। এখানে তিনি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর নিকট দুআ করলেন, তার মহাত্ব বর্ণনা করলেন, কালেমা তাওহীদ পড়লেন এবং তাঁর একত্ব ঘোষণা করলেন। দিনের আলো যথেষ্ট উজ্জ্বল না হওয়া পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে এরূপ করতে থাকলেন।

সূর্য উদয়ের পূর্বে তিনি আবার রওয়ানা করছিলেন এবং ফযল ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) সওয়ারীতে তাঁর পেছনে বসলেন।

তিনি ছিলেন যুবক এবং তার মাথার চুল ছিল অত্যন্ত সুন্দর। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন অগ্রসর হলেন- পাশাপাশি একদল মহিলাও যাচ্ছিলো। ফযল (রাযিঃ) তাদের দিকে তাকাতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের হাত ফযলের চেহারার উপর রাখলেন এবং তিনি তার মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন এবং ফযল (রাযিঃ) অপরদিক হতে দেখতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পূনরায় অন্যদিক হতে ফযল (রাযিঃ) এর মুখমণ্ডলে হাত রাখলেন। তিনি আবার অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগলেন। ″বাতনে মুহাসসাব″ নামক স্থানে পৌঁছলেন এবং সওয়ারীর গতি কিছুটা দ্রুত করলেন। তিনি মধ্যপথে অগ্রসর হলেন যা জামরাতুল কুবরার দিকে বেরিয়ে গেছে। তিনি বৃক্ষের নিকটের জামরায় এলেন এবং নীচের খালি জায়গায় দাঁড়িয়ে এখানে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন এবং প্রত্যেকবার আল্লাহু আকবার- বললেন।

অতঃপর সেখানে থেকে কুরবানীর স্থানে এলেন এবং নিজ হাতে ৬৩ পশু যবেহ করলেন। তিনি কুরবানীর পশুতে আলী (রাযিঃ) কেও শরীক করলেন। অতঃপর তিনি প্রতিটি পশুর গোশতের কিছু অংশ নিয়ে একত্রে রান্না করার নির্দেশ দিলেন। অতএব তাই করা হল। তারা উভয়ে এই গোশত থেকে খেলেন এবং ঝোল পান করলেন।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সওয়ার হয়ে বায়তুল্লাহর দিকে রওয়ানা হলেন এবং মক্কায় পৌছে যোহরের নামায আদায় করলেন। অতএব বনু আব্দিল মূত্তালিব এর লোকদের কাছে আসলেন, তারা লোকদের যমযমের পানি পান করাচ্ছিল। তিনি বললেনঃ হে আব্দুল মুত্তালিবের বংশধরগণ! পানি তোল। আমি যদি আশঙ্কা না করতাম যে, পানি পান করানোর ব্যাপারে লোকেরা তোমাদের পরাভুত করে দেবে, তবে আমি নিজেও তোমাদের সাথে পানি তুলতাম। তখন তারা তাঁকে এক বালতি পানি দিল এবং তিনি তা থেকে কিছু পান করলেন।
كتاب الحج
باب حَجَّةِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، وَإِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، جَمِيعًا عَنْ حَاتِمٍ، - قَالَ أَبُو بَكْرٍ حَدَّثَنَا حَاتِمُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ الْمَدَنِيُّ، - عَنْ جَعْفَرِ بْنِ مُحَمَّدٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ دَخَلْنَا عَلَى جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ فَسَأَلَ عَنِ الْقَوْمِ، حَتَّى انْتَهَى إِلَىَّ فَقُلْتُ أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَلِيِّ بْنِ حُسَيْنٍ، . فَأَهْوَى بِيَدِهِ إِلَى رَأْسِي فَنَزَعَ زِرِّي الأَعْلَى ثُمَّ نَزَعَ زِرِّي الأَسْفَلَ ثُمَّ وَضَعَ كَفَّهُ بَيْنَ ثَدْيَىَّ وَأَنَا يَوْمَئِذٍ غُلاَمٌ شَابٌّ فَقَالَ مَرْحَبًا بِكَ يَا ابْنَ أَخِي سَلْ عَمَّا شِئْتَ . فَسَأَلْتُهُ وَهُوَ أَعْمَى وَحَضَرَ وَقْتُ الصَّلاَةِ فَقَامَ فِي نِسَاجَةٍ مُلْتَحِفًا بِهَا كُلَّمَا وَضَعَهَا عَلَى مَنْكِبِهِ رَجَعَ طَرَفَاهَا إِلَيْهِ مِنْ صِغَرِهَا وَرِدَاؤُهُ إِلَى جَنْبِهِ عَلَى الْمِشْجَبِ فَصَلَّى بِنَا فَقُلْتُ أَخْبِرْنِي عَنْ حَجَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم . فَقَالَ بِيَدِهِ فَعَقَدَ تِسْعًا فَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَكَثَ تِسْعَ سِنِينَ لَمْ يَحُجَّ ثُمَّ أَذَّنَ فِي النَّاسِ فِي الْعَاشِرَةِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَاجٌّ فَقَدِمَ الْمَدِينَةَ بَشَرٌ كَثِيرٌ كُلُّهُمْ يَلْتَمِسُ أَنْ يَأْتَمَّ بِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَيَعْمَلَ مِثْلَ عَمَلِهِ فَخَرَجْنَا مَعَهُ حَتَّى أَتَيْنَا ذَا الْحُلَيْفَةِ فَوَلَدَتْ أَسْمَاءُ بِنْتُ عُمَيْسٍ مُحَمَّدَ بْنَ أَبِي بَكْرٍ فَأَرْسَلَتْ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَيْفَ أَصْنَعُ قَالَ " اغْتَسِلِي وَاسْتَثْفِرِي بِثَوْبٍ وَأَحْرِمِي " . فَصَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي الْمَسْجِدِ ثُمَّ رَكِبَ الْقَصْوَاءَ حَتَّى إِذَا اسْتَوَتْ بِهِ نَاقَتُهُ عَلَى الْبَيْدَاءِ نَظَرْتُ إِلَى مَدِّ بَصَرِي بَيْنَ يَدَيْهِ مِنْ رَاكِبٍ وَمَاشٍ وَعَنْ يَمِينِهِ مِثْلَ ذَلِكَ وَعَنْ يَسَارِهِ مِثْلَ ذَلِكَ وَمِنْ خَلْفِهِ مِثْلَ ذَلِكَ وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَيْنَ أَظْهُرِنَا وَعَلَيْهِ يَنْزِلُ الْقُرْآنُ وَهُوَ يَعْرِفُ تَأْوِيلَهُ وَمَا عَمِلَ بِهِ مِنْ شَىْءٍ عَمِلْنَا بِهِ فَأَهَلَّ بِالتَّوْحِيدِ " لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ " . وَأَهَلَّ النَّاسُ بِهَذَا الَّذِي يُهِلُّونَ بِهِ فَلَمْ يَرُدَّ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَيْهِمْ شَيْئًا مِنْهُ وَلَزِمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم تَلْبِيَتَهُ قَالَ جَابِرٌ - رضى الله عنه - لَسْنَا نَنْوِي إِلاَّ الْحَجَّ لَسْنَا نَعْرِفُ الْعُمْرَةَ حَتَّى إِذَا أَتَيْنَا الْبَيْتَ مَعَهُ اسْتَلَمَ الرُّكْنَ فَرَمَلَ ثَلاَثًا وَمَشَى أَرْبَعًا ثُمَّ نَفَذَ إِلَى مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ - عَلَيْهِ السَّلاَمُ - فَقَرَأَ ( وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى) فَجَعَلَ الْمَقَامَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْبَيْتِ فَكَانَ أَبِي يَقُولُ وَلاَ أَعْلَمُهُ ذَكَرَهُ إِلاَّ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَقْرَأُ فِي الرَّكْعَتَيْنِ ( قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ) وَ ( قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ) ثُمَّ رَجَعَ إِلَى الرُّكْنِ فَاسْتَلَمَهُ ثُمَّ خَرَجَ مِنَ الْبَابِ إِلَى الصَّفَا فَلَمَّا دَنَا مِنَ الصَّفَا قَرَأَ ( إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ) " أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللَّهُ بِهِ " . فَبَدَأَ بِالصَّفَا فَرَقِيَ عَلَيْهِ حَتَّى رَأَى الْبَيْتَ فَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ فَوَحَّدَ اللَّهَ وَكَبَّرَهُ وَقَالَ " لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كَلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَهُ " . ثُمَّ دَعَا بَيْنَ ذَلِكَ قَالَ مِثْلَ هَذَا ثَلاَثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ نَزَلَ إِلَى الْمَرْوَةِ حَتَّى إِذَا انْصَبَّتْ قَدَمَاهُ فِي بَطْنِ الْوَادِي سَعَى حَتَّى إِذَا صَعِدَتَا مَشَى حَتَّى أَتَى الْمَرْوَةَ فَفَعَلَ عَلَى الْمَرْوَةِ كَمَا فَعَلَ عَلَى الصَّفَا حَتَّى إِذَا كَانَ آخِرُ طَوَافِهِ عَلَى الْمَرْوَةِ فَقَالَ " لَوْ أَنِّي اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِي مَا اسْتَدْبَرْتُ لَمْ أَسُقِ الْهَدْىَ وَجَعَلْتُهَا عُمْرَةً فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ لَيْسَ مَعَهُ هَدْىٌ فَلْيَحِلَّ وَلْيَجْعَلْهَا عُمْرَةً " . فَقَامَ سُرَاقَةُ بْنُ مَالِكِ بْنِ جُعْشُمٍ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلِعَامِنَا هَذَا أَمْ لأَبَدٍ فَشَبَّكَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَصَابِعَهُ وَاحِدَةً فِي الأُخْرَى وَقَالَ " دَخَلَتِ الْعُمْرَةُ فِي الْحَجِّ - مَرَّتَيْنِ - لاَ بَلْ لأَبَدٍ أَبَدٍ " . وَقَدِمَ عَلِيٌّ مِنَ الْيَمَنِ بِبُدْنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَوَجَدَ فَاطِمَةَ - رضى الله عنها - مِمَّنْ حَلَّ وَلَبِسَتْ ثِيَابًا صَبِيغًا وَاكْتَحَلَتْ فَأَنْكَرَ ذَلِكَ عَلَيْهَا فَقَالَتْ إِنَّ أَبِي أَمَرَنِي بِهَذَا . قَالَ فَكَانَ عَلِيٌّ يَقُولُ بِالْعِرَاقِ فَذَهَبْتُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مُحَرِّشًا عَلَى فَاطِمَةَ لِلَّذِي صَنَعَتْ مُسْتَفْتِيًا لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِيمَا ذَكَرَتْ عَنْهُ فَأَخْبَرْتُهُ أَنِّي أَنْكَرْتُ ذَلِكَ عَلَيْهَا فَقَالَ " صَدَقَتْ صَدَقَتْ مَاذَا قُلْتَ حِينَ فَرَضْتَ الْحَجَّ " . قَالَ قُلْتُ اللَّهُمَّ إِنِّي أُهِلُّ بِمَا أَهَلَّ بِهِ رَسُولُكَ . قَالَ " فَإِنَّ مَعِيَ الْهَدْىَ فَلاَ تَحِلُّ " . قَالَ فَكَانَ جَمَاعَةُ الْهَدْىِ الَّذِي قَدِمَ بِهِ عَلِيٌّ مِنَ الْيَمَنِ وَالَّذِي أَتَى بِهِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مِائَةً - قَالَ - فَحَلَّ النَّاسُ كُلُّهُمْ وَقَصَّرُوا إِلاَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَمَنْ كَانَ مَعَهُ هَدْىٌ فَلَمَّا كَانَ يَوْمُ التَّرْوِيَةِ تَوَجَّهُوا إِلَى مِنًى فَأَهَلُّوا بِالْحَجِّ وَرَكِبَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَصَلَّى بِهَا الظُّهْرَ وَالْعَصْرَ وَالْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ وَالْفَجْرَ ثُمَّ مَكَثَ قَلِيلاً حَتَّى طَلَعَتِ الشَّمْسُ وَأَمَرَ بِقُبَّةٍ مِنْ شَعَرٍ تُضْرَبُ لَهُ بِنَمِرَةَ فَسَارَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَلاَ تَشُكُّ قُرَيْشٌ إِلاَّ أَنَّهُ وَاقِفٌ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ كَمَا كَانَتْ قُرَيْشٌ تَصْنَعُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَأَجَازَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَتَّى أَتَى عَرَفَةَ فَوَجَدَ الْقُبَّةَ قَدْ ضُرِبَتْ لَهُ بِنَمِرَةَ فَنَزَلَ بِهَا حَتَّى إِذَا زَاغَتِ الشَّمْسُ أَمَرَ بِالْقَصْوَاءِ فَرُحِلَتْ لَهُ فَأَتَى بَطْنَ الْوَادِي فَخَطَبَ النَّاسَ وَقَالَ " إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ حَرَامٌ عَلَيْكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا أَلاَ كُلُّ شَىْءٍ مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ تَحْتَ قَدَمَىَّ مَوْضُوعٌ وَدِمَاءُ الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعَةٌ وَإِنَّ أَوَّلَ دَمٍ أَضَعُ مِنْ دِمَائِنَا دَمُ ابْنِ رَبِيعَةَ بْنِ الْحَارِثِ كَانَ مُسْتَرْضِعًا فِي بَنِي سَعْدٍ فَقَتَلَتْهُ هُذَيْلٌ وَرِبَا الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعٌ وَأَوَّلُ رِبًا أَضَعُ رِبَانَا رِبَا عَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَإِنَّهُ مَوْضُوعٌ كُلُّهُ فَاتَّقُوا اللَّهَ فِي النِّسَاءِ فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانِ اللَّهِ وَاسْتَحْلَلْتُمْ فُرُوجَهُنَّ بِكَلِمَةِ اللَّهِ وَلَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَنْ لاَ يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ أَحَدًا تَكْرَهُونَهُ . فَإِنْ فَعَلْنَ ذَلِكَ فَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَقَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُ إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ كِتَابَ اللَّهِ . وَأَنْتُمْ تُسْأَلُونَ عَنِّي فَمَا أَنْتُمْ قَائِلُونَ " . قَالُوا نَشْهَدُ أَنَّكَ قَدْ بَلَّغْتَ وَأَدَّيْتَ وَنَصَحْتَ . فَقَالَ بِإِصْبَعِهِ السَّبَّابَةِ يَرْفَعُهَا إِلَى السَّمَاءِ وَيَنْكُتُهَا إِلَى النَّاسِ " اللَّهُمَّ اشْهَدِ اللَّهُمَّ اشْهَدْ " . ثَلاَثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ أَذَّنَ ثُمَّ أَقَامَ فَصَلَّى الظُّهْرَ ثُمَّ أَقَامَ فَصَلَّى الْعَصْرَ وَلَمْ يُصَلِّ بَيْنَهُمَا شَيْئًا ثُمَّ رَكِبَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَتَّى أَتَى الْمَوْقِفَ فَجَعَلَ بَطْنَ نَاقَتِهِ الْقَصْوَاءِ إِلَى الصَّخَرَاتِ وَجَعَلَ حَبْلَ الْمُشَاةِ بَيْنَ يَدَيْهِ وَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ فَلَمْ يَزَلْ وَاقِفًا حَتَّى غَرَبَتِ الشَّمْسُ وَذَهَبَتِ الصُّفْرَةُ قَلِيلاً حَتَّى غَابَ الْقُرْصُ وَأَرْدَفَ أُسَامَةَ خَلْفَهُ وَدَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَقَدْ شَنَقَ لِلْقَصْوَاءِ الزِّمَامَ حَتَّى إِنَّ رَأْسَهَا لَيُصِيبُ مَوْرِكَ رَحْلِهِ وَيَقُولُ بِيَدِهِ الْيُمْنَى " أَيُّهَا النَّاسُ السَّكِينَةَ السَّكِينَةَ " . كُلَّمَا أَتَى حَبْلاً مِنَ الْحِبَالِ أَرْخَى لَهَا قَلِيلاً حَتَّى تَصْعَدَ حَتَّى أَتَى الْمُزْدَلِفَةَ فَصَلَّى بِهَا الْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ بِأَذَانٍ وَاحِدٍ وَإِقَامَتَيْنِ وَلَمْ يُسَبِّحْ بَيْنَهُمَا شَيْئًا ثُمَّ اضْطَجَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَتَّى طَلَعَ الْفَجْرُ وَصَلَّى الْفَجْرَ - حِينَ تَبَيَّنَ لَهُ الصُّبْحُ - بِأَذَانٍ وَإِقَامَةٍ ثُمَّ رَكِبَ الْقَصْوَاءَ حَتَّى أَتَى الْمَشْعَرَ الْحَرَامَ فَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ فَدَعَاهُ وَكَبَّرَهُ وَهَلَّلَهُ وَوَحَّدَهُ فَلَمْ يَزَلْ وَاقِفًا حَتَّى أَسْفَرَ جِدًّا فَدَفَعَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ وَأَرْدَفَ الْفَضْلَ بْنَ عَبَّاسٍ وَكَانَ رَجُلاً حَسَنَ الشَّعْرِ أَبْيَضَ وَسِيمًا فَلَمَّا دَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَرَّتْ بِهِ ظُعُنٌ يَجْرِينَ فَطَفِقَ الْفَضْلُ يَنْظُرُ إِلَيْهِنَّ فَوَضَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَدَهُ عَلَى وَجْهِ الْفَضْلِ فَحَوَّلَ الْفَضْلُ وَجْهَهُ إِلَى الشِّقِّ الآخَرِ يَنْظُرُ فَحَوَّلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَدَهُ مِنَ الشِّقِّ الآخَرِ عَلَى وَجْهِ الْفَضْلِ يَصْرِفُ وَجْهَهُ مِنَ الشِّقِّ الآخَرِ يَنْظُرُ حَتَّى أَتَى بَطْنَ مُحَسِّرٍ فَحَرَّكَ قَلِيلاً ثُمَّ سَلَكَ الطَّرِيقَ الْوُسْطَى الَّتِي تَخْرُجُ عَلَى الْجَمْرَةِ الْكُبْرَى حَتَّى أَتَى الْجَمْرَةَ الَّتِي عِنْدَ الشَّجَرَةِ فَرَمَاهَا بِسَبْعِ حَصَيَاتٍ يُكَبِّرُ مَعَ كُلِّ حَصَاةٍ مِنْهَا مِثْلِ حَصَى الْخَذْفِ رَمَى مِنْ بَطْنِ الْوَادِي ثُمَّ انْصَرَفَ إِلَى الْمَنْحَرِ فَنَحَرَ ثَلاَثًا وَسِتِّينَ بِيَدِهِ ثُمَّ أَعْطَى عَلِيًّا فَنَحَرَ مَا غَبَرَ وَأَشْرَكَهُ فِي هَدْيِهِ ثُمَّ أَمَرَ مِنْ كُلِّ بَدَنَةٍ بِبَضْعَةٍ فَجُعِلَتْ فِي قِدْرٍ فَطُبِخَتْ فَأَكَلاَ مِنْ لَحْمِهَا وَشَرِبَا مِنْ مَرَقِهَا ثُمَّ رَكِبَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَفَاضَ إِلَى الْبَيْتِ فَصَلَّى بِمَكَّةَ الظُّهْرَ فَأَتَى بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ يَسْقُونَ عَلَى زَمْزَمَ فَقَالَ " انْزِعُوا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَوْلاَ أَنْ يَغْلِبَكُمُ النَّاسُ عَلَى سِقَايَتِكُمْ لَنَزَعْتُ مَعَكُمْ " . فَنَاوَلُوهُ دَلْوًا فَشَرِبَ مِنْهُ .

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হুযুর (ﷺ) মারওয়ায় সায়ী শেষ করে এই যে কথাটি বলেছিলেন, "যারা কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে আসেনি, তারা যেন নিজেদের তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে নেয়। আর আমিও যদি কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে না আসতাম, তাহলে আমিও এমনই করতাম।" এর মর্ম ও স্বরূপ বুঝার আগে একথাটি জেনে নিতে হবে যে, জাহিলিয়্যাত যুগে হজ্ব ও উমরার ক্ষেত্রে যেসব বিশ্বাসগত ও কর্মগত ভ্রান্তি প্রচলিত হয়ে অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল, এগুলোর মধ্যে একটি ভ্রান্তি এও ছিল যে, শাওয়াল, যিলকদ ও যিলহজ্ব যেগুলোকে হজ্বের মাস বলা হয়, (কেননা, হজ্বের সফর এ মাসগুলোতেই হয়ে থাকে।) এসব মাসে উমরা পালন করাকে কঠিন গুনাহ্ মনে করা হত। অথচ এ বিষয়টি ভুল ও মনগড়া ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সফরের শুরুতেই স্পষ্টভাবে লোকদেরকে এ কথা বলে দিয়েছিলেন যে, যার মন চায় সে কেবল হজ্বের ইহরাম বাঁধতে পারে, (যাকে পরিভাষায় ইফরাদ বলা হয়।) আর যার মন চায় সে শুরুতে কেবল উমরার ইহরাম বাঁধতে পারে এবং মক্কা শরীফ গিয়ে উমরা থেকে ফারেগ হয়ে হজ্বের জন্য আরেকটি ইহরাম বাঁধবে। (যাকে তামাত্তু বলা হয়।) আর যার মন চায় সে হজ্ব ও উমরার একই সঙ্গে ইহরাম বাঁধবে এবং একই ইহরামে উভয়টি আদায় করার নিয়ত করবে, (যাকে কেরান বলা হয়।)
হুযুর (ﷺ)-এর এ কথা শোনার পর সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে অল্প সংখ্যক লোকই নিজেদের বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তামাত্তু হজ্বের ইচ্ছা করলেন এবং যুল হুলায়ফায় গিয়ে কেবল উমরার ইহরাম বাঁধলেন। তাদের মধ্যে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.ও ছিলেন। অপর দিকে অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম শুধু হজ্বের অথবা এক সাথে হজ্ব ও উমরার ইহরাম বাঁধলেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উভয়টির ইহরাম বাঁধলেন, অর্থাৎ, কেরান পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। তাছাড়া নিজের কুরবানীর পশু (উট) ও তিনি মদীনা শরীফ থেকেই সাথে নিয়ে রওয়ানা হলেন। আর শরী‘আতের বিধান হচ্ছে, যে হাজী কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে হজ্ব করতে যায়, সে ঐ পর্যন্ত ইহরাম শেষ করতে পারে না, যে পর্যন্ত সে ১০ই যিলহজ্ব কুরবানী করে না নেয়। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং ঐসব সাহাবায়ে কেরাম যারা তাঁর মতই কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, তারা হজ্বের পূর্বে (অর্থাৎ, ১০ই যিলহজ্ব কুরবানীর আগে) ইহরাম থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিলেন না। কিন্তু যারা কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে আসেননি, তাদের জন্য এ ধরনের কোন অপারগতা ছিল না।

মক্কা শরীফে পৌঁছে হুযুর (ﷺ) তীব্রভাবে অনুভব করলেন যে, এই যে জাহিলিয়্যাত সুলভ একটি কথা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, হজ্বের মাসগুলোতে উমরা করা কঠিন গুনাহ- এর প্রতিবাদ ও মূলোৎপাটনের জন্য এবং মানুষের মন-মস্তিষ্ক থেকে এর সূক্ষ্ম জীবাণু দূর করার জন্য এটা খুবই জরুরী যে, ব্যাপকভাবে এর বিপরীত কাজ করে দেখানো হোক। আর এর সম্ভাব্য পন্থা এটাই ছিল যে, তাঁর সাথীদের মধ্যে থেকে বেশী সংখ্যক লোক যারা তাঁর সাথে তাওয়াফ ও সায়ী করে নিয়েছিল, তারা এ তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরায় রূপান্তরিত করে ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যাবে এবং হজ্বের জন্য নির্ধারিত সময়ে আবার ইহরাম বেঁধে নিবে। আর তিনি নিজে যেহেতু কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, এজন্য তাঁর বেলায় এর অবকাশ ও সুযোগ ছিল না। এজন্যই তিনি বললেনঃ "যদি প্রথমেই আমি ঐ বিষয়টি অনুভব করতাম, যা পরে অনুভব করেছি, তাহলে আমি কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসতাম না এবং এই তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে দিয়ে ইহরাম শেষ করে দিতাম। (কিন্তু আমি যেহেতু কুরবানীর পশু সাথে আনার কারণে এমন করতে অপারগ, তাই তোমাদেরকে বলছি যে.) তোমাদের মধ্য থেকে যারা কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসেনি, তারা যেন এই তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে নেয় এবং নিজেদের ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যায়।" হুযুর (ﷺ)-এর এ কথা শুনে সুরাকা ইবনে মালেক দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তিনি যেহেতু এখন পর্যন্ত এ কথাই জানতেন যে, হজ্বের মাসগুলোতে উমরা করা কঠিন গুনাহ, এ জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, এ দিনগুলোতে পৃথক উমরা করার এ বিধান কি কেবল এ বছরের জন্য, না এখন থেকে সবসময়ই হজ্বের মাসগুলোতে এমন করা যাবে? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ভালভাবে বুঝানোর জন্য নিজের এক হাতের আঙ্গুলগুলো অপর হাতের আঙ্গুলগুলোর মধ্যে ঢুকিয়ে বললেন: دخلت العمرة في الحج হজ্বের মধ্যে উমরা এভাবে দাখিল হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, হজ্বের মাসগুলোতে এবং হজ্বের একেবারে নিকটবর্তী দিনগুলোতেও উমরা করা যায়। এটাকে গুনাহ্ মনে করা সম্পূর্ণ ভুল ও জাহেলী বিশ্বাস, আর এ বিধানটি সব সময়ের জন্য।

যেসব সাহাবায়ে কেরাম হুযুর (ﷺ)-এর নির্দেশ মোতাবেক ইহরাম খুলে হালাল হয়ে গিয়েছিলেন, তারা এ ক্ষেত্রে মাথা মুন্ডন করেননি; বরং কেবল ছেঁটে নিয়েছিলেন। এরূপ তারা সম্ভবত এ কারণে করেছিলেন, যাতে মাথা মুন্ডানোর ফযীলতটি হজ্বের ইহরাম খোলার সময় লাভ করতে পারেন।

হজ্বের বিশেষ কার্যক্রম ৮ই যিলহজ্ব থেকে শুরু হয়- যাকে "তারবিয়ার দিন" বলা হয়। এ দিন প্রভাতে হাজী সাহেবান মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ইফরাদ অথবা কেরানকারীগণ তো আগে থেকেই ইহরাম অবস্থায় থাকেন। তাদের ছাড়া অন্য হাজীগণ এ দিনই অর্থাৎ, ৮ই যিলহজ্ব ইহরাম বেঁধে মিনার দিকে যান এবং ৯ই যিলহজ্ব সকাল পর্যন্ত এখানেই অবস্থান করেন।

রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এবং তাঁর সাথে কিছু সাহাবায়ে কেরাম- যারা নিজেদের কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, তারা তো ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। অবশিষ্ট সাহাবীগণ- যারা উমরা আদায় করে ইহরাম খুলে নিয়েছিলেন, তারা সবাই ৮ তারিখের সকালে হজ্বের ইহরাম বাঁধলেন এবং হজ্বের এ কাফেলা মিনা রওয়ানা হয়ে গেল এবং এ দিন তারা সেখানেই অবস্থান করলেন। তারপর ৯ তারিখ সকালে সূর্যোদয়ের পর আরাফার দিকে যাত্রা শুরু হল। আরাফা মিনা থেকে প্রায় ৬ মাইল এবং মক্কা শরীফ থেকে ১ মাইল দূরে অবস্থিত এবং এটা হরমের সীমানার বাইরে; বরং এ দিকে হারামের সীমানা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই আরাফার এলাকা শুরু হয়।

আরবের সাধারণ গোত্রসমূহ- যারা হজ্বের জন্য আসত, তারা সবাই ৯ই যিলহজ্ব হারামের সীমানা থেকে বাইরে গিয়ে আরাফায় অবস্থান গ্রহণ করত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর গোত্রের লোকেরা অর্থাৎ, কুরাইশগণ যারা নিজেদেরকে কাবার প্রতিবেশী ও মুতাওয়াল্লী এবং আল্লাহর হারামের অধিবাসী বলত, তারা ওকূফের জন্যও হারামের বাইরে যেত না; বরং এর সীমানার ভিতরেই মুযদালিফা অঞ্চলের মাশ'আরুল হারাম পর্বতের কাছে অবস্থান করত এবং এটাকে নিজেদের বৈশিষ্ট্য মনে করত। নিজেদের এ গোত্রীয় সনাতন প্রথার কারণে কুরাইশদের এ বিশ্বাস ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)ও মাশ'আরুল হারামের নিকটই অবস্থান করবেন। কিন্তু যেহেতু তাদের এ রীতিটি ভুল ছিল এবং ওকূফের সঠিক স্থান আরাফাই ছিল, এজন্য তিনি মিনা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময়ই লোকদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, আমার জন্য নামিরায় যেন তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়। এ নির্দেশের ভিত্তিতেই নামিরা উপত্যকায়ই হুযুর (ﷺ)-এর জন্য তাঁবু খাটানো হয়। তিনি সেখানে গিয়েই অবতরণ করেন এবং ঐ তাঁবুতেই অবস্থান গ্রহণ করেন।

এটা জানা কথা যে, ঐ দিনটি অর্থাৎ, ঐ বছরের ওকূফে আরাফার দিনটি শুক্রবার ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেদিন সূর্য চলার পর প্রথমে পূর্বে উল্লেখিত খুতবা প্রদান করলেন। তারপর যুহর ও আসরের উভয় নামায যুহরের ওয়াক্তে একই সাথে পড়লেন। হাদীসে স্পষ্টভাবে যুহরের কথা বলা হয়েছে, যার দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, তিনি ঐ দিন জুমু'আর নামায পড়েননি; বরং এর স্থলে যুহর পড়েছেন। আর তিনি যে খুতবা দিয়েছিলেন এটা জুমু'আর ছিল না; বরং আরাফা দিবসের খুতবা ছিল। সেখানে জুমু'আ না পড়ার কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, আরাফা কোন জনবসতি নয়; বরং একটি মরুপ্রান্তর। আর জুমু'আ জনবসতিতে পড়া হয়।

আরাফার দিনের এ খুতবায় তিনি যেসব বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, ঐ সময়ে ও ঐ সমাবেশে এসব জিনিসেরই ঘোষণা ও প্রচার সবচেয়ে জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খুতবার পর তিনি যুহর ও আসরের নামায একসাথে যুহরের ওয়াক্তেই আদায় করেছেন এবং মাঝে কোন সুন্নত অথবা নফলের দু'রাকআতও আদায় করেননি। উম্মত এ কথায় একমত যে, ওকূফে আরাফার এ দিনে এ দু'টি নামায এভাবেই পড়তে হবে। অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার নামাযও এ দিন মুযদালিফায় পৌঁছে ইশার ওয়াক্তে এক সাথে পড়তে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এমনই করেছিলেন- যেমন সামনে গিয়ে জানা যাবে। ঐ দিন এ নামাযগুলোর সঠিক নিয়ম ও সঠিক সময় এটাই। এর একটি রহস্যপূর্ণ কারণ তো এই হতে পারে যে, ঐ দিনটির এ বৈশিষ্ট্য সবার সামনে যেন ফুটে উঠে যে, আজকের এ দিনে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে নামাযের ওয়াক্তগুলোতেও এ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ এটাও হতে পারে যে, এ দিনের মূল ওযীফা ও কাজ হচ্ছে আল্লাহর যিকির ও দু‘আ। তাই আল্লাহর বান্দারা যাতে একাগ্রচিত্তে এতে লিপ্ত থাকতে পারে এবং যুহর থেকে মাগরিব পর্যন্ত; বরং ইশা পর্যন্ত যেন কোন নামাযের চিন্তাও করতে না হয়, এজন্য এ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

হুযুর (ﷺ) আরাফার দিনের এ খুতবায় যাকে নিজের ক্ষেত্র ও স্থান বিবেচনায় তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুতবা ও ভাষণ বলা যায়- তিনি নিজের ওফাত ও বিচ্ছেদের সময় নিকটবর্তী হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে শেষ কথাটি এই বলেছিলেন: "আমি তোমাদের জন্য হেদায়াত ও আলোর ঐ পরিপূর্ণ উপকরণ রেখে যাচ্ছি, যার পর তোমরা কখনও বিপথগামী হবে না- যদি তোমরা একে আঁকড়ে থাক এবং এর আলোতে পথ চল। আর সেটা হচ্ছে আল্লাহর পবিত্র কিতাব কুরআন মজীদ।" এর দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, মৃত্যুশয্যার শেষ দিনগুলোতে যখন প্রচণ্ড রোগের কারণে তাঁর খুবই কষ্ট হচ্ছিল, এ সময় ওসিয়ত হিসাবে তিনি যে কিছু লেখাতে চেয়েছিলেন এবং যার ব্যাপারে বলেছিলেন: "তোমরা এরপর বিপথগামী হবে না", তিনি এতে কি লেখাতে চেয়েছিলেন। বিদায় হজ্বের এ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তিনি আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে থাকার ও এর অনুসরণ করার ওসিয়ত লিখাতে চেয়েছিলেন। তিনি এ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণেও বলে দিয়েছিলেন যে, এ মর্যাদা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব কুরআন শরীফের। আর যেহেতু হযরত উমর রাযি. এ বাস্তব কথাটি জানতেন এবং আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ক্ষেত্রমত কথা বলার সাহসও দান করেছিলেন, এজন্য তিনি এ ক্ষেত্রে এ অভিমত প্রকাশ করলেন যে, হুযুর (ﷺ)-এর সারা জীবনের শিক্ষা দ্বারা আমাদের জানা হয়ে গিয়েছে যে, এ মর্যাদা আল্লাহর কিতাবেরই। তাই এ কঠিন অবস্থায় ওসিয়ত লেখা ও লেখানোর বিষয়টির তেমন প্রয়োজনও ছিল না।

হজ্বের সবচেয়ে বড় কাজ ও রুকন হচ্ছে ওকূফে আরাফা। অর্থাৎ, ৯ই যিলহজ্ব দুপুরে সূর্য ঢলে পড়ার পর যুহর ও আসরের নামায একসাথে আদায় করে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। এ হাদীস দ্বারা জানা গেল যে, হুযুর (ﷺ) এ অবস্থানকে কত দীর্ঘ করেছিলেন। যুহর ও আসরের নামায তিনি যুহরের শুরু ওয়াক্তেই পড়ে নিয়েছিলেন এবং এ সময় থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনি ওকূফ করেছিলেন। তারপর সোজা মুযদালিফায় রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং মাগরিব ও ইশার নামায সেখানে পৌঁছে এক সাথে আদায় করলেন। আর উপরে বলা হয়েছে যে, এটাই হচ্ছে এ দিনের জন্য আল্লাহর হুকুম।
মুযদালিফার এ রাতে হুযুর (ﷺ) ইশার নামায শেষ করে ফজর পর্যন্ত আরাম করলেন এবং এ রাতে তাহাজ্জুদের নামায দু'রাকআতও পড়লেন না। (অথচ তাহাজ্জুদের নামায তিনি সফরের অবস্থাতেও বাদ দিতেন না।) এর কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, ৯ই যিলহজ্বের সারাটি দিন তিনি খুবই কর্মব্যস্ত ছিলেন। সকালে মিনা থেকে রওয়ানা হয়ে আরাফায় পৌঁছলেন এবং সেখানে প্রথম ভাষণ দিলেন। তারপর যুহর ও আসরের নামায পড়লেন এবং এরপর থেকে মাগরিব পর্যন্ত একাধারে ওকূফ করলেন। তারপর এ সময়েই আরাফা থেকে মুযদালিফার পথ অতিক্রম করলেন। মনে হয়, তিনি যেন ফজর থেকে নিয়ে ইশা পর্যন্ত একাধারে বিভিন্ন কর্মব্যস্ততা ও পরিশ্রমের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তা'ছাড়া পরের দিন অর্থাৎ, ১০ই যিলহজ্বও তাঁকে এমন কর্মব্যস্ত দিন কাটাতে হবে। অর্থাৎ, সকালে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হয়ে মিনা পৌঁছা, সেখানে গিয়ে প্রথমে শয়তানকে পাথর মারা, তারপর একটি-দু'টি অথবা দশ-বিশটি নয়; বরং ষাটের অধিক উট নিজ হাতে কুরবানী করা, তারপর তাওয়াফে যিয়ারতের জন্য মিনা থেকে মক্কা যাওয়া এবং সেখান থেকে আবার মিনায় ফিরে আসা। তাই দেখা গেল যে, যেহেতু ৯ই ও ১০ই যিলহজ্বের এ দু'টি দিন খুবই কর্মব্যস্ততার ও পরিশ্রমের দিন ছিল, এজন্য এ দু'দিনের মাঝের রাতটিতে (অর্থাৎ, মুযদালিফার রাতে) পূর্ণ বিশ্রাম গ্রহণ করা জরুরী ছিল। দেহ ও দৈহিক শক্তিগুলোরও কিছু দাবী ও হক থাকে এবং এগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা এ ধরনের সমাবেশগুলোতে বেশী জরুরী হয়- যাতে সাধারণ মানুষ ইসলামের সহজীকরণের নীতি এবং বিশেষ অবস্থায় রেয়ায়াতের রীতিটি বুঝে নিতে পারে।
এ হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ হাতে তেষট্টিটি উট কুরবানী করে ছিলেন। এগুলো খুব সম্ভব ঐ তেষট্টিটিই, যেগুলো তিনি মদীনা শরীফ থেকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন। বাকী সাঁইত্রিশটি যা হযরত আলী ইয়ামান থেকে এনেছিলেন, এগুলো তিনি তার হাতেই কুরবানী করালেন। তেষট্টি সংখ্যাটির হেকমত একেবারে স্পষ্ট যে, হুযুর (ﷺ)-এর বয়স তেষট্টি বছর ছিল। তাই তিনি যেন জীবনের প্রতিটি বছরের শুকরিয়া হিসাবে একটি করে উট কুরবানী করলেন।

হুযুর (ﷺ) ও আলী রাযি. নিজের কুরবানীর উটের গোশত রান্না করে খেয়েছেন এবং শুরবাও পান করেছেন। এর দ্বারা সবার একথা জানা হয়ে গেল যে, কুরবানীদাতা নিজের কুরবানীর গোশত নিজেও খেতে পারে এবং নিজের বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে খাওয়াতে পারে।

১০ই যিলহজ্ব কুরবানীর কাজ শেষ করে হুযুর (ﷺ) তাওয়াফে যিয়ারতের জন্য মক্কা শরীফ তশরীফ নিয়ে গেলেন। সুন্নত নিয়ম ও উত্তম এটাই যে, তওয়াফে যিয়ারত কুরবানী থেকে অবসর হয়ে ১০ই যিলহজ্বেই করে নেওয়া হবে- যদিও বিলম্বেরও অবকাশ রয়েছে।

যমযমের পানি উঠিয়ে হাজীদেরকে পান করানো-এ খেদমত ও সৌভাগ্যের কাজটি প্রাচীনকাল থেকেই হুযুর (ﷺ)-এর খান্দান বনী আব্দুল মুত্তালিবের ভাগে ছিল। হুযুর (ﷺ) তাওয়াফে যিয়ারত শেষ করে যমযমের কাছে আসলেন। সে সময় তাঁর খান্দানের লোকেরা বালতি দিয়ে পানি উঠিয়ে উঠিয়ে লোকদেরকে পান করাচ্ছিল। তাঁর মনেও এ কাজে অংশ গ্রহণ করার বাসনা জাগ্রত হল। কিন্তু তিনি একেবারে সঠিক চিন্তা করলেন যে, আমি যদি এমন করি, তাহলে আমার অনুসরণ ও অনুকরণ করতে গিয়ে সকল সাথীরাই এ সৌভাগ্যে অংশ গ্রহণ করতে চাইবে। এর ফলে বনী আব্দুল মুত্তালিব তাদের দীর্ঘকালের এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। এজন্য তিনি নিজের বংশের লোকদের মন রক্ষা করার জন্য এবং তাদের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শনের জন্য অন্তরের আকাঙ্ক্ষা তো প্রকাশ করলেন, কিন্তু সাথে সাথে ঐ পরিণামদর্শিতার কথাটিও বলে দিলেন, যার কারণে তিনি নিজের এ আন্তরিক বাসনা বিসর্জন দিয়েছিলেন।

শুরুতে যেমন বলে আসা হয়েছে যে, হযরত জাবের রাযি.-এর এ হাদীসটি বিদায় হজ্বের বর্ণনায় সবচেয়ে দীর্ঘ ও সবিস্তার বর্ণনা সমৃদ্ধ হাদীস। কিন্তু এতদসত্ত্বেও অনেক ঘটনার উল্লেখ এতে বাদ পড়ে গিয়েছে। এমনকি মাথা মুড়ানো এবং দশ তারিখের খুতবার উল্লেখও এতে আসেনি, যা অন্যান্য হাদীসে উল্লেখিত রয়েছে।

হযরত জাবের রাযি.-এর এ হাদীসের কোন কোন রাবী এ হাদীসেই এ অতিরিক্ত বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এ ঘোষণাও করেছিলেন:

" نَحَرْتُ هَا هُنَا وَمِنًى كُلُّهَا مَنْحَرٌ فَانْحَرُوا فِي رِحَالِكُمْ وَوَقَفْتُ هَا هُنَا وَعَرَفَةُ كُلُّهَا مَوْقِفٌ وَوَقَفْتُ هَا هُنَا وَجَمْعٌ كُلُّهَا مَوْقِفٌ "

অর্থাৎ, আমি কুরবানী এখানে করেছি; কিন্তু মিনার সমস্ত এলাকাই কুরবানীস্থল। তাই তোমরা নিজ নিজ জায়গায় কুরবানী করতে পার। আমি আরাফায় এখানে (বড় বড় পাথরের প্রান্তরে) ওকূফ করেছি; কিন্তু সমস্ত আরাফার ময়দানই ওকূফস্থল। (তাই এর যে কোন অংশেই ওকূফ করা যায়।) আমি মুযদালিফায় এখানে (মাশ'আরুল হারামের নিকটে) অবস্থান করেছি; কিন্তু সারা মুযদালিফাই ওকূফ তথা অবস্থানস্থল। (এর যে কোন অংশেই অবস্থান করা যায়।)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)