আল মুসনাদুস সহীহ- ইমাম মুসলিম রহঃ

১৪- রোযার অধ্যায়

হাদীস নং: ২৬২০
আন্তর্জাতিক নং: ১১৬২-৪
- রোযার অধ্যায়
৩৩. প্রতি মাসে তিন দিন, আরাফাতের দিন, আশুরার দিন, সোম ও বৃহস্পতিবার রোযা পালনের ফযীলত
২৬২০। আহমদ ইবনে সাঈদ আদ-দারিমী (রাহঃ) ......... গায়লান ইবনে জারীর (রাহঃ) এর সূত্রে এই সনদে শু’বার সূত্রে বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। তবে এই সূত্রে তিনি (গায়লান) সোমবারের উল্লেখ করেছেন, তিনি বৃহস্পতিবারের উল্লেখ করেননি।
كتاب الصيام
باب اسْتِحْبَابِ صِيَامِ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ وَصَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ وَعَاشُورَاءَ وَالِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ
وَحَدَّثَنِي أَحْمَدُ بْنُ سَعِيدٍ الدَّارِمِيُّ، حَدَّثَنَا حَبَّانُ بْنُ هِلاَلٍ، حَدَّثَنَا أَبَانُ الْعَطَّارُ، حَدَّثَنَا غَيْلاَنُ بْنُ جَرِيرٍ، فِي هَذَا الإِسْنَادِ بِمِثْلِ حَدِيثِ شُعْبَةَ غَيْرَ أَنَّهُ ذَكَرَ فِيهِ الاِثْنَيْنِ وَلَمْ يَذْكُرِ الْخَمِيسَ .

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হাদীসটির আসল মর্ম ও উদ্দেশ্য তো স্পষ্ট, তবে কয়েকটি আনুষঙ্গিক বিষয় ব্যাখ্যার দাবী রাখে। তাই এগুলোর ব্যাপারেই কিছু নিবেদন করা হচ্ছে।

হাদীসের একেবারে শুরুতে বলা হয়েছে যে, এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কিভাবে রোযা রাখেন? (অর্থাৎ, নফল রোযার বেলায় স্বয়ং আপনার রীতি ও পদ্ধতি কি?) এ প্রশ্ন শুনে তিনি অসন্তুষ্ট হলেন। এ অসন্তুষ্টি ও অপছন্দনীয়তার ধরন ঠিক তেমনই ছিল, যেমন কোন স্নেহশীল উস্তাদ ও দীক্ষাগুরু কোন ছাত্র অথবা দীক্ষা গ্রহণকারী কোন মুরীদের ভুল অথবা অশোভনীয় প্রশ্নের কারণে রাগ অথবা বিরক্তিবোধ করে থাকেন। এখানে প্রশ্নকারীকে আসল কথা জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল, অর্থাৎ, এ প্রশ্ন করা উচিত ছিল যে, আমার জন্য নফল রোযার বেলায় কি রীতি অবলম্বন করা উচিত? কিন্তু সে এর স্থলে হুযুর (ﷺ)-এর অভ্যাস ও রীতি সম্পর্কে প্রশ্ন করল। অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জীবনের বিভিন্ন শাখায়- নবুওয়তের পদমর্যাদা ও উম্মতের কল্যাণকামিতার স্বার্থে এমন কর্মপদ্ধতিও অবলম্বন করতেন, যার অনুসরণ করা প্রত্যেকের জন্য সমীচীন নয়। এ জন্য প্রশ্নকারীকে হুযুর (ﷺ)-এর অভ্যাসের কথা জিজ্ঞাসা করার পরিবর্তে আসল মাসআলা জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল। কোন উস্তাদ ও দীক্ষাগুরুর এ ধরনের রাগ ও অসন্তুষ্টিও দীক্ষা ও প্রশিক্ষণেরই একটি অংশ।

ঐ ব্যক্তির প্রশ্নটি যে হুযুর (ﷺ)-এর কাছে ভাল লাগেনি, এ কথা হযরত উমর রাযি. উপলব্ধি করে সকল মুসলমানের পক্ষ থেকে নিবেদন করলেন-
رضينا بالله ربا وبالإسلام دينا وبمحمد نبيا نعوذ بالله من غضب الله وغضب رسوله
তারপর তিনি নফল রোযা সম্পর্কে সঠিক নিয়মে জিজ্ঞাসা করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর উত্তর দান করলেন। যে ব্যক্তি বিরতি ছাড়া দৈনিকই রোযা রাখে, তার ব্যাপারে হুযুর (ﷺ) যে বললেন: 'সে রোযাও রাখল না, বেরোযাও থাকল না', এর দ্বারা এটা যে অপছন্দনীয়, এ কথা প্রকাশ করা উদ্দেশ্য- অর্থাৎ, এ পদ্ধতি ভুল।

হযরত উমর রাযি.-এর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর হুযুর (ﷺ) যে অতিরিক্ত কথাটি বললেন, এর মর্ম এই যে, রোযার বেলায় সাধারণ মুসলমানদের জন্য কেবল এতটুকুই যথেষ্ট যে, তারা রমযানের ফরয রোযাগুলো রাখবে, এ ছাড়া প্রতি মাসে তিনটি নফল রোযা রেখে নিবে- যা একে দশ এর হিসাব অনুযায়ী সওয়াবের ক্ষেত্রে ত্রিশ রোযার সমান হয়ে যাবে এবং এভাবে তারা সারা বছরের রোযার সওয়াব পেয়ে যাবে। আরো অতিরিক্ত লাভ ও বাড়তি সঞ্চয়ের জন্য আরাফার দিবস ও আশুরা দিবসের দু'টি রোযাও রেখে নিবে। হুযূর (ﷺ) আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, দয়াময় মালিকের অপার অনুগ্রহ থেকে আমি আশা করি যে, আরাফার দিনের রোযা বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গুনাহর এবং আশুরা দিবসের রোযা বিগত এক বছরের গুনাহর কাফ্ফারা হয়ে যাবে।

তবে মনে রাখতে হবে যে, আরাফার দিন যা আসলে হজ্ব দিবস- রোযা রাখার এ ফযীলত এবং এর প্রতি এ উৎসাহদান হজ্ব পালনরত ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের জন্য। হাজীদের জন্য এ দিনের বিশেষ ও শ্রেষ্ঠ ইবাদত হচ্ছে আরাফায় অবস্থান, যার জন্য যুহর ও আছরের নামায এক সাথে এবং কসর করে পড়ে নেওয়ার নির্দেশ এসেছে এবং যুহরের সুন্নতও সে দিন ছেড়ে দেওয়ার হুকুম দেওয়া হয়েছে। এ দিন যদি হাজী সাহেবান রোযা রাখেন, তাহলে তাদের জন্য আরাফায় উকুফ করা এবং সূর্যাস্তের সাথে সাথেই মুযদালেফায় রওয়ানা হয়ে যাওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণে হাজীদের জন্য আরাফার দিন রোযা রাখা পছন্দনীয় নয়; বরং এক হাদীসে এর প্রতি নিষেধাজ্ঞাও এসেছে। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিদায় হজ্বে নিজের আমল দ্বারাও এ শিক্ষাই উম্মতকে দান করেছেন। এক হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরাফার দিন ঠিক ঐ সময়ে যখন তিনি আরাফার ময়দানে উটের উপর সওয়ার ছিলেন এবং উকুফ করছিলেন- সবার সামনে দুধ পান করে নিলেন, যাতে সবাই দেখে নেয় যে, তিনি আজ রোযা রাখেননি।

হাজী ছাড়া অন্যদের জন্য আরাফার দিনের রোযাটি প্রকৃতপক্ষে ঐ দিনের ঐসব রহমত ও বরকতে অংশ গ্রহণ করার জন্য হয়ে থাকে, যা আরাফার ময়দানে হাজীদের উপর অবতীর্ণ হয়। আর এর উদ্দেশ্য এটাই হয়ে থাকে যে, আল্লাহর যেসব বান্দারা হচ্ছে শরীক হতে পারেনি তারা যেন এ দিন রোযা রেখে এ দিনের বিশেষ রহমত ও বরকত থেকে কিছু না কিছু অংশ লাভকরে নেয়। অনুরূপভাবে ইয়াওমুন নাহর তথা কুরবানীর দিন হাজী ছাড়া অন্যদেরকে যে কুরবানীর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এর রহস্যও অনেকটা এরকমই।

আশুরা দিবসের রোযাটি সকল নফল রোযার মধ্যে এ হিসাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে, রমযানের রোযা ফরয হওয়ার পূর্বে এটাই ছিল ফরয রোযা। যখন রমযানের রোযা ফরয করা হল, তখন এর ফরয হওয়ার বিধানটি রহিত করে দেওয়া হয়েছে এবং কেবল নফলের পর্যায়ে রেখে দেওয়া হয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)