আল মুসনাদুস সহীহ- ইমাম মুসলিম রহঃ

১- ঈমানের অধ্যায়

হাদীস নং: ২৮৮
আন্তর্জাতিক নং: ১৫৫-৩
- ঈমানের অধ্যায়
৭০. আমাদের নবী (ﷺ) এর শরীআত অনুসারী প্রশাসক হিসেবে ঈসা ইবনে মারইয়াম (আলাইহিস সালাম) এর অবতরণ করা, আল্লাহ কর্তৃক এ উম্মতকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করা, এ দীন রহিত না হওয়া এবং কিয়ামত পর্যন্ত এ উম্মতের একদল হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বাতিলের বিরুদ্ধে লড়তে থাকার প্রমাণ
২৮৮। কুতায়বা ইবনে সাঈদ (রাহঃ) ......... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ আল্লাহর কসম! ইবনে মারইয়াম (আলাইহিস সালাম) অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ প্রশাসকরূপে অবতীর্ণ হবেন এবং ক্রশ চুর্ণ করবেন, শুকর হত্যা করবেন, জিযিয়া রহিত করবেন। মোটাতাজা উটগুলো বন্ধনমুক্ত করে দেয়া হবে; কিন্তু তা নেবার জন্য কেউ চেষ্টা করবে না। পরস্পর হিংসা, বিদ্বেষ, শক্রতা বিদায় নিবে এবং সস্পদ গ্রহণের জন্য মানুষকে আহবান করা হবে; কিন্তু তা কেউ গ্রহণ করবে না।
كتاب الإيمان
باب نُزُولِ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ حَاكِمًا بِشَرِيعَةِ نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا لَيْثٌ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي سَعِيدٍ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ مِينَاءَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " وَاللَّهِ لَيَنْزِلَنَّ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَادِلاً فَلَيَكْسِرَنَّ الصَّلِيبَ وَلَيَقْتُلَنَّ الْخِنْزِيرَ وَلَيَضَعَنَّ الْجِزْيَةَ وَلَتُتْرَكَنَّ الْقِلاَصُ فَلاَ يُسْعَى عَلَيْهَا وَلَتَذْهَبَنَّ الشَّحْنَاءُ وَالتَّبَاغُضُ وَالتَّحَاسُدُ وَلَيَدْعُوَنَّ إِلَى الْمَالِ فَلاَ يَقْبَلُهُ أَحَدٌ " .

হাদীসের ব্যাখ্যা:

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এ বাণীতে হযরত মসীহ (আ)-এর অবতরণ এবং তাঁর কতক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ও কার্যাবলির উল্লেখ করে উম্মতকে এ বিষয়ে সংবাদ দান করেছেন। যেহেতু বিষয়টি অস্বাভাবিক প্রকৃতির ছিল, আর বহু স্থুলবুদ্ধি সম্পন্ন দুর্বল ঈমানের লোকদের এতে সন্দেহ-সংশয় হতে পারে, তাই তিনি শপথসহ এ কথা উল্লেখ করেছেন। সর্বপ্রথম বলেছেন, وَالَّذِي نفسي بیده (সেই আল্লাহর শপথ যার আয়ত্বে আমার প্রাণ) এরপর অধিক তাকিদের জন্য বলেছেন- لَيُوشِکن (অবশ্যই অচিরে) এটাও মাসীহ্ (আ)-এর অবতরণের নিশ্চিত ও নির্ঘাত এক ব্যাখ্যাবিশেষ যেভাবে কুরআন মজীদে কিয়ামত সম্বন্ধে বলা হয়েছে اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ (কিয়ামত আসন্ন)। উদ্দেশ্য হচ্ছে, এতে সন্দেহ সংশয়ের কোন সুযোগ নেই। অবশ্য আগমনকারী বুঝতে হবে। বস্তুত শপথের পর لَيُؤْشِکن - এর অর্থও এটাই যে, যে সংবাদ দেওয়া হচ্ছে তা নিশ্চিত ও নির্ঘাত।

শপথ ও لَيُوشِكُنَّ -এর মাধ্যমে অধিক তাকীদের পর এ বাণীতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে যে সংবাদ দিয়েছেন, তা সুস্পষ্ট ও সাধারণ বোধগম্য শব্দে এভাবে বর্ণনা করা যায় যে, নিশ্চিত এরূপ হবে যে, কিয়ামতের পূর্বে ঈসা ইবনে মারয়াম (আ) আল্লাহর নির্দেশে ন্যায় পরায়ণ শাসকরূপে তোমরা তথা মুসলমানদের মধ্যে (অর্থাৎ তখন তাঁর মর্যাদা মুসলমানদেরই এক ন্যায় পরায়ণ শাসক ও আমীররূপে হবে) আর তিনি শাসকরূপে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন সেগুলোর মধ্যে একটি হবে ক্রুশ যা মূর্তি পূজারীদের মূর্তির ন্যায় খ্রিস্টানদের মূর্তি হয়ে আছে, যার ওপর তাদের চূড়ান্ত গোমরাহী এবং কুফরী আকীদার ভিত্তি তা ভেঙ্গে দেবেন। ভেঙ্গে দেওয়ার অর্থ এই যে, এর যে সম্মান ও খ্রিস্টানদের মধ্যে এর যে এক প্রকার পূজা চলছে তা ধ্বংস করে দেবেন। বস্তুত এই 'ক্রুশ ধ্বংস' অর্থে তাই বুঝা চাই যা আমাদের উর্দু ভাষায় بت شکنی মূর্তি ভাঙ্গা বুঝা যায়। এভাবে তার অন্য এক পদক্ষেপ এই হবে যে, শুক্‌রগুলো হত্যা করাবেন। খ্রিস্টানদের এক বড় গোমরাহী ও খ্রিস্ট ধর্মে এক বড় পরিবর্তন এটাও যে, শুক্‌রগুলো (যা সব আসমানী শরী'আতে হারাম ছিল) সেগুলো তারা বৈধ করে নেয়। বরং এগুলো তাদের প্রিয় খাদ্য। ঈসা (আ) কেবল এগুলো নিষিদ্ধই ঘোষণা করবেন না বরং এর বংশকেই নির্মূল করার নির্দেশ দান করবেন।

এছাড়া তাঁর এক বিশেষ পদক্ষেপ এটাও হবে যে, তিনি জিযয়ার পরিসমাপ্তি ঘোষণা করবেন। (আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এ কথা বলেছেন, তখন হযরত ঈসা (আ)-এর ফায়সালা ও ঘোষণা এ ভিত্তিতেই হবে, নিজের নিকট হতে ইসলামী শরী'আত ও কানুনে হবে না) শেষে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সে সময় ধন-দৌলতের এরূপ আধিক্য ও প্রাচুর্য হবে যে, কেহ কাউকে দিতে চাইলে সে গ্রহণ করতে সম্মত হবে না। দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি এবং এর বিপরীত আখিরাতের সাওয়াব ও পুরস্কারের অন্বেষণ ও আকর্ষণ আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এরূপ সৃষ্টি হবে যে, দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় জিনিস হতে আল্লাহ্ তা'আলার সমীপে একটি সিজদা করা অধিক প্রিয় ও মূল্যবান মনে করা হবে।

হাদীসে আরো আছে, হযরত আবু হুরাইরা (রা) মসীহ্ (আ)-এর অবতরণ সম্পর্কিত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ বাণী বর্ণনা করার পর বলেন, فَاقْرَؤُوا إِنْ شِئْتُمْ الخ কিয়ামতের পূর্বে হযরত মাসীহ্ (আ)-এর বর্ণনা তোমরা যদি কুরআনে পড়তে চাও তবে সূরা নিসার এ আয়াত পাঠ কর। وَاِنۡ مِّنۡ اَہۡلِ الۡکِتٰبِ اِلَّا لَیُؤۡمِنَنَّ بِہٖ قَبۡلَ مَوۡتِہٖ آلاية (সূরা নিসা- আয়াত ১৫৯)

হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের জন্যে এতটুকু লেখাই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। শেষে হযরত আবূ হুরাইরা (রা) কুরআন মজীদে সূরা নিসার যে আয়াতের বরাত দিয়েছেন, তার তাফসীর- লিখকের কিতাব قادياني کيون مسلمان نهی اور مسئله نزول مسيح و حیات مسيح -এর ১০০-১১৩ পৃষ্ঠা দেখা যেতে পারে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)