আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৮৩- তাওহীদ অধ্যায় ও জাহমিয়্যাসহ ভ্রান্ত দলগুলোর অপনোদন

হাদীস নং: ৭০০২
আন্তর্জাতিক নং: ৭৫১০
- তাওহীদ অধ্যায় ও জাহমিয়্যাসহ ভ্রান্ত দলগুলোর অপনোদন
৩১৩৮. কিয়ামত দিবসে নবীগন ও অন্যান্যদের সাথে মহান আল্লাহর কথাবার্তা।
৭০০২। সুলাইমান ইবনে হারব (রাহঃ) ......... মা'বাদ ইবনে হিলাল আনাযী (রাহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা বসরার অধিবাসী কিছু লোক একত্রিত হয়ে আনাস ইবনে মালিক (রাযিঃ) এর কাছে গেলাম। আমাদের সাথে সাবিত (রাহঃ) কে নিলাম, যাতে তিনি আমাদের কাছে আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত শাফাআত সম্পর্কিত হাদীস জিজ্ঞাসা করেন। আমরা তাকে তার মহলেই চাশতের নামায আদায়রত পেলাম। তার কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি আমাদেরকে অনুমতি দিলেন। তখন তিনি তার বিছানায় বসা অবস্থায় ছিলেন। অতঃপর আমরা সাবিত (রাহঃ) কে অনুরোধ করলাম, তিনি যেন শাফাআতের হাদীসটি জিজ্ঞাসার পূর্বে অন্য কিছু জিজ্ঞাসা না করেন। তখন সাবিত (রাহঃ) বললেন, হে আবু হামযা! এরা বসরাবাসী আপনার ভাই, তারা শাফাআতের হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে এসেছে।
তারপর আনাস (রাযিঃ) বললেন, আমাদের কাছে মুহাম্মাদ (ﷺ) হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন মানুষ সমুদ্রের ঢেউয়ের মত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। তাই তারা আদম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে এসে বলবে, আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের কাছে সুপারিশ করুন। তিনি বলবেনঃ এ কাজের জন্য আমি নই। বরং তোমরা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে যাও। কেননা, তিনি হলেন আল্লাহর খলীল।
তখন তারা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে আসবে। তিনি বলবেনঃ আমি এ কাজের জন্য নই। তবে তোমরা মুসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে যাও। কারণ তিনি আল্লাহর সাথে বাক্যালাপ করেছেন।
তখন তারা মুসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে আসবে। তিনি বলবেনঃ আমি তো এ কাজের জন্য নই। তোমরা বরং ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে যাও। যেহেতু তিনি আল্লাহর রূহ ও বাণী।
তারা তখন ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে আসবে। তিনি বলবেন, আমি তো এ কাজের জন্য নই। তোমরা বরং মুহাম্মাদ (ﷺ) এর কাছে যাও।
এরপর তারা আমার কাছে আসবে। আমি বলব, আমিই এ কাজের জন্য। আমি তখন আমার প্রতিপালকের কাছে অনুমতি চাইব। আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে। আমাকে প্রশংসা সম্বলিত বাক্য ইলহাম করা হবে, যা দিয়ে আমি আল্লাহর প্রশংসা করব, যেগুলো এখন আমার জানা নেই। আমি সেসব প্রশংসা বাক্য দিয়ে প্রশংসা করব এবং সিজদায় পড়ে যাব। তখন আমাকে বলা হবে, ইয়া মুহাম্মাদ! মাথা ওঠাও, তুমি বল, তোমার কথা শোনা হবে। চাও, দেওয়া হবে। সুপারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। তখন আমি বলবো, হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মত! আমার উম্মত! বলা হবে, যাও, যাদের হৃদয়ে যবের দানা পরিমাণ ঈমান আছে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নাও, আমি যেয়ে এমনই করব। তারপর আমি ফিরে আসব এবং পূনরায় সেসব প্রশংসা বাক্য দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করবো এবং সিজদায় পড়ে যাবো। তখন বলা হবে, ইয়া মুহাম্মাদ! মাথা ওঠাও, তোমার কথা শোনা হবে। চাও, দেয়া হবে। সুপারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। তখনো আমি বলব, হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মত! আমার উম্মত! অতঃপর বলা হবে, যাও, যাদের মধ্যে এক অণু কিংবা সরিষা পরিমাণ ঈমান আছে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের কর। আমি গিয়ে তাই করব।
আমি পূনরায় প্রত্যাবর্তন করবো এবং সেসব প্রশংসা বাক্য দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করবো আর সিজদায় পড়ে যাবো। আমাকে বলা হবে, ইয়া মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, তোমার বক্তব্য শোনা হবে। চাও, দেওয়া হবে। সুপারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। আমি তখন বলবো, হে আমার প্রতিপালক, আমার উম্মত, আমার উম্মত। এরপর আল্লাহ বলবেন, যাও, যাদের অন্তরে সরিষার দানা অপেক্ষা ক্ষুদ্র পরিমাণও ঈমান থাকে, তাদেরকেও জাহান্নাম থেকে বের করে আন। আমি যাবো এবং তাই করবো। আমরা যখন আনাস (রাযিঃ) এর নিকট থেকে বের হয়ে আসছিলাম, তখন আমি আমার সাথীদের কোন একজনকে বললাম, আমরা যদি আবু খলীফার বাড়িতে আত্মগোপনরত হাসান বসরীর কাছে গিয়ে আনাস ইবনে মালিক (রাযিঃ) বর্ণিত হাদীসটি তাঁর কাছে বর্ণনা করতাম। এরপর আমরা হাসান বসরীর কাছে এসে তাকে অনুমতির সালাম দিলাম। তিনি আমাদেরকে প্রবেশ করতে অনুমতি দিলেন। আমরা তাকে বললাম, হে আবু সাঈদ! আমরা আপনারই ভাই, আনাস ইবনে মালিক (রাযিঃ) এর কাছ থেকে আপনার কাছে আসলাম। শাফাআত সম্পর্কে তিনি যেরূপ বর্ণনা দিয়েছেন, অনুরূপ বর্ণনা করতে আর আর কাউকে দেখিনি। তিনি বললেনঃ আমার কাছে সেটি বর্ণনা কর। আমরা তাঁকে হাদীসটি বর্ণনা করে শোনালাম। এরপর আমরা শেষস্থলে এসে বর্ণনা শেষ করলাম। তিনি বললেন, আরো বর্ণনা কর। আমরা বললাম, তিনি তো এর বেশী আমাদের কাছে বর্ণনা করেননি। তিনি বললেন, জানিনা, তিনি কি ভুলেই গেলেন, না তোমরা নির্ভরশীল হয়ে পড়বে বলে অবশিষ্টটুকু বর্ণনা করতে অপছন্দ করলেন। বিশ বছর পূর্বে যখন তিনি শক্তি সামর্থ্যে ও শক্তিতে মজবুত ছিলেন, তখন আমার কাছেও হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন। আমরা বললাম, হে আবু সাঈদ! আমাদের কাছে হাদীসটি বর্ণনা করুন। তিনি হাসলেন এবং বললেন, মানুষকে তো সৃষ্টি করা হয়েছে অতিমাত্রায় ত্বরাপ্রিয় করে। আমি তো বর্ণনার উদ্দেশ্যেই তোমাদের কাছে বিষয়টি উল্লেখ করলাম। তিনি তোমাদের কাছে যা বর্ণনা করেছেন, আমার কাছেও তা বর্ণনা করেছেন, তবে পরে এটুকুও বলেছিলেন, আমি চতূর্থবার ফিরে আসবো এবং সেসব প্রশংসা বাক্য দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করব এবং সিজদায় পড়ে যাবো। তখন বলা হবে, ইয়া মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, তোমার কথা শোনা হবে। চাও, দেওয়া হবে। শাফাআত কর, গ্রহণ করা হবে। আমি বলব, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে তাদের সম্পর্কে শাফাআত করার অনুমতি দান কর, যারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে। তখন আল্লাহ বলবেন, আমার ইজ্জত, আমার পরাক্রমশীলতা, আমার বড়ত্ব ও আমার মহত্তের কসম! যারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে, আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনব।
كتاب الرد على الجهمية و غيرهم و التوحيد
باب كَلاَمِ الرَّبِّ عَزَّ وَجَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَعَ الأَنْبِيَاءِ وَغَيْرِهِمْ
7510 - حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ حَرْبٍ، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ، حَدَّثَنَا مَعْبَدُ بْنُ هِلاَلٍ العَنَزِيُّ، قَالَ: اجْتَمَعْنَا نَاسٌ مِنْ أَهْلِ البَصْرَةِ فَذَهَبْنَا إِلَى أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، وَذَهَبْنَا مَعَنَا بِثَابِتٍ البُنَانِيِّ إِلَيْهِ يَسْأَلُهُ لَنَا عَنْ حَدِيثِ الشَّفَاعَةِ، فَإِذَا هُوَ فِي قَصْرِهِ فَوَافَقْنَاهُ يُصَلِّي الضُّحَى، فَاسْتَأْذَنَّا، فَأَذِنَ لَنَا وَهُوَ قَاعِدٌ عَلَى فِرَاشِهِ، فَقُلْنَا لِثَابِتٍ: لاَ تَسْأَلْهُ عَنْ شَيْءٍ أَوَّلَ مِنْ حَدِيثِ الشَّفَاعَةِ، فَقَالَ: يَا أَبَا حَمْزَةَ هَؤُلاَءِ إِخْوَانُكَ مِنْ أَهْلِ البَصْرَةِ جَاءُوكَ يَسْأَلُونَكَ عَنْ حَدِيثِ الشَّفَاعَةِ، فَقَالَ: حَدَّثَنَا مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: " إِذَا كَانَ يَوْمُ القِيَامَةِ مَاجَ النَّاسُ بَعْضُهُمْ [ص:147] فِي بَعْضٍ، فَيَأْتُونَ آدَمَ، فَيَقُولُونَ: اشْفَعْ لَنَا إِلَى رَبِّكَ، فَيَقُولُ: لَسْتُ لَهَا، وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِإِبْرَاهِيمَ فَإِنَّهُ خَلِيلُ الرَّحْمَنِ، فَيَأْتُونَ إِبْرَاهِيمَ، فَيَقُولُ: لَسْتُ لَهَا، وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِمُوسَى فَإِنَّهُ كَلِيمُ اللَّهِ، فَيَأْتُونَ مُوسَى فَيَقُولُ: لَسْتُ لَهَا، وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِعِيسَى فَإِنَّهُ رُوحُ اللَّهِ، وَكَلِمَتُهُ، فَيَأْتُونَ عِيسَى، فَيَقُولُ: لَسْتُ لَهَا، وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَيَأْتُونِي، فَأَقُولُ: أَنَا لَهَا، فَأَسْتَأْذِنُ عَلَى رَبِّي، فَيُؤْذَنُ لِي، وَيُلْهِمُنِي مَحَامِدَ أَحْمَدُهُ بِهَا لاَ تَحْضُرُنِي الآنَ، فَأَحْمَدُهُ بِتِلْكَ المَحَامِدِ، وَأَخِرُّ لَهُ سَاجِدًا، فَيَقُولُ: يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ، وَقُلْ يُسْمَعْ لَكَ، وَسَلْ تُعْطَ، وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ، فَأَقُولُ: يَا رَبِّ، أُمَّتِي أُمَّتِي، فَيَقُولُ: انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مِنْهَا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ شَعِيرَةٍ مِنْ إِيمَانٍ، فَأَنْطَلِقُ فَأَفْعَلُ، ثُمَّ أَعُودُ، فَأَحْمَدُهُ بِتِلْكَ المَحَامِدِ، ثُمَّ أَخِرُّ لَهُ سَاجِدًا، فَيُقَالُ: يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ، وَقُلْ يُسْمَعْ لَكَ، وَسَلْ تُعْطَ، وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ، فَأَقُولُ: يَا رَبِّ، أُمَّتِي أُمَّتِي، فَيَقُولُ: انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مِنْهَا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ - أَوْ خَرْدَلَةٍ - مِنْ إِيمَانٍ فَأَخْرِجْهُ، فَأَنْطَلِقُ، فَأَفْعَلُ، ثُمَّ أَعُودُ فَأَحْمَدُهُ بِتِلْكَ المَحَامِدِ، ثُمَّ أَخِرُّ لَهُ سَاجِدًا، فَيَقُولُ: يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ، وَقُلْ يُسْمَعْ لَكَ، وَسَلْ تُعْطَ، وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ، فَأَقُولُ: يَا رَبِّ أُمَّتِي أُمَّتِي، فَيَقُولُ: انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ أَدْنَى أَدْنَى أَدْنَى مِثْقَالِ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ، فَأَخْرِجْهُ مِنَ النَّارِ، فَأَنْطَلِقُ فَأَفْعَلُ " فَلَمَّا خَرَجْنَا مِنْ عِنْدِ أَنَسٍ قُلْتُ لِبَعْضِ أَصْحَابِنَا: لَوْ مَرَرْنَا بِالحَسَنِ وَهُوَ مُتَوَارٍ فِي مَنْزِلِ أَبِي خَلِيفَةَ فَحَدَّثْنَاهُ بِمَا حَدَّثَنَا أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ، فَأَتَيْنَاهُ فَسَلَّمْنَا عَلَيْهِ، فَأَذِنَ لَنَا فَقُلْنَا لَهُ: يَا أَبَا سَعِيدٍ، جِئْنَاكَ مِنْ عِنْدِ أَخِيكَ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، فَلَمْ نَرَ مِثْلَ مَا حَدَّثَنَا فِي الشَّفَاعَةِ، فَقَالَ: هِيهْ فَحَدَّثْنَاهُ بِالحَدِيثِ، فَانْتَهَى إِلَى هَذَا المَوْضِعِ، فَقَالَ: هِيهْ، فَقُلْنَا لَمْ يَزِدْ لَنَا عَلَى هَذَا، فَقَالَ: لَقَدْ حَدَّثَنِي وَهُوَ جَمِيعٌ مُنْذُ عِشْرِينَ سَنَةً فَلاَ أَدْرِي أَنَسِيَ أَمْ كَرِهَ أَنْ تَتَّكِلُوا، قُلْنَا: يَا أَبَا سَعِيدٍ فَحَدِّثْنَا فَضَحِكَ، وَقَالَ: خُلِقَ الإِنْسَانُ عَجُولًا مَا ذَكَرْتُهُ إِلَّا وَأَنَا أُرِيدُ أَنْ أُحَدِّثَكُمْ حَدَّثَنِي كَمَا حَدَّثَكُمْ بِهِ، قَالَ: " ثُمَّ أَعُودُ الرَّابِعَةَ فَأَحْمَدُهُ بِتِلْكَ المَحَامِدِ، ثُمَّ أَخِرُّ لَهُ سَاجِدًا، فَيُقَالُ: يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ، وَقُلْ يُسْمَعْ، وَسَلْ تُعْطَهْ، وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ، فَأَقُولُ: يَا رَبِّ ائْذَنْ لِي فِيمَنْ قَالَ: لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَيَقُولُ: وَعِزَّتِي وَجَلاَلِي، وَكِبْرِيَائِي وَعَظَمَتِي لَأُخْرِجَنَّ مِنْهَا مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ "

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসের কতিপয় বিষয়ের ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে-
(১) বার্লির দানা বা সরিষার দানা পরিমাণ বা তার চেয়ে অনেক কম পরিমাণ ঈমান থাকার যে উল্লেখ হাদীসে করা হয়েছে তার অর্থ হল ঈমানের নূরের বিশেষ পর্যায়। এ ঈমানের এ অবস্থা আমরা উপলব্ধি করতে না পারলেও আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তা অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন এবং আল্লাহর অনুমতি সহকারে ঈমানের এসব পর্যায়ের অধিকারীদেরকে দোযখ থেকে বের করবেন।

২) হাদীসের শেষাংশে একথা বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর উম্মতের (জন্য তিনবার শাফা'আত করার পর চতুর্থবার আল্লাহর দরবারে আবেদন করবেন যে, যারা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছিল তাদেরকে দোযখ থেকে বের করার অনুমতি তাকে প্রদান করা হোক। তার অর্থ হলো, যারা তওহীদের দাওয়াত কবুল করেছিল এবং ঈমান গ্রহণ করেছিল, কিন্তু দোযখ থেকে নাযাত লাভ এবং জান্নাতে যাওয়ার জন্য কোন আমল করেনি। অর্থাৎ যারা সামান্য ঈমান এবং তওহীদের এতেকাদের অধিকারী হবেন, কিন্তু সৎকর্ম শূন্য হবেন, নবী করীম (ﷺ) তাদেরকেও দোযখ থেকে বের করার জন্য আল্লাহ তা'আলার অনুমতি প্রার্থনা করবেন। বুখারী এবং মুসলিম শরীফে উল্লিখিত এবং আবু সাঈদ খুদরী (রা)-এর বর্ণিত হাদীসে সম্ভবতঃ এ শ্রেণীর লোক সম্পর্কে বলা হয়েছে: لم يعملوا خيراً قط তারা কোন সময় কোন নেক আমল করেনি। আল্লাহ্ তার নবী (ﷺ)-কে বলবেন- ليس ذالك لك অর্থাৎ তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার বিষয়টি আপনার জন্য রাখিনি। অর্থাৎ এ কাজ আপনার জন্য নয় বরং এটা আপনার ইযযত, জালাল শ্রেষ্ঠত্ব এবং فعال لما يريد শব্দের শানের জন্য সমীচীন এবং আমি স্বয়ং নিজে তা করব। আমি মনে করি যারা ঈমান আনার পর মোটেই আমল করেনি তাদেরকে দোযখ থেকে বের করা নবীর জন্য সমীচীন নয় বরং তাদেরকে ক্ষমা করার ব্যাপারটি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত।

(৩) আলোচ্য হাদীসে বিষয়টি কিঞ্চিৎ সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। হাশরের দিন লোকজন আদম (আ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার পর এবং ইবরাহীম (আ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার পূর্বে নূহ (আ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে বুখারী এবং মুসলিম শরীফের অপর এক রেওয়ায়েতে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু আলোচ্য হাদীসে নূহ (আ)-এর নাম উল্লেখিত হয়নি। এ হাদীসে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উম্মতের শাফা'আতের বিষয় উল্লেখিত হয়েছে। অথচ অনুমিত হয় যে, তিনি সর্বপ্রথম আহলে মাহশরদের হিসাব এবং ফয়সালার জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করেছেন যা 'শাফা'আতে কুবরা' হিসেবে আখ্যায়িত। হিসাব এবং ফায়সালার পরিণতি হিসেবে যখন তাঁর উম্মতের মন্দ আমলকারীগণকে দোযখের দিকে পরিচালিত হবে তখন তিনি তাদেরকে দোযখ থেকে বের করার জন্য আল্লাহর নিকট শাফা'আত করবেন।

(৪) কিয়ামতের দিন লোকজন শাফা'আতকারীদের যে অনুসন্ধান করবেন তার প্রয়োজনীয়তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের মনে সৃষ্টি করবেন এবং তারা প্রথম আদম (আ)-এর নিকট গমন করবেন। অতঃপর তার উপদেশ মোতাবেক নূহ (আ)-এর নিকট, নূহ (আ)-এর নির্দেশক্রমে ইবরাহীম (আ), অনুরূপভাবে মূসা (আ) এবং ঈসা (আ)-এর নিকট লোকজন যাবে। এসব আল্লাহর তরফ থেকে হবে এবং এজন্য হবে যে, যাতে লোকজন বাস্তবতা জানতে সক্ষম হয় যে, মাকামে মাহমূদ এবং শাফা'আতের (কুবরা) বিরাট মর্যাদা একমাত্র আখেরী নবীর জন্য নির্দিষ্ট। মোটকথা হাশরবাসীদের নিকট রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুমহান মর্যাদা প্রকাশ করার জন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এসব করা হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)