আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৮৩- তাওহীদ অধ্যায় ও জাহমিয়্যাসহ ভ্রান্ত দলগুলোর অপনোদন

হাদীস নং: ৬৯৭৪
আন্তর্জাতিক নং: ৭৪৮২
- তাওহীদ অধ্যায় ও জাহমিয়্যাসহ ভ্রান্ত দলগুলোর অপনোদন
৩১৩৪. আল্লাহ তাআলার বাণীঃ যাকে অনুমতি দেয়া হয়, সে ব্যতীত আল্লাহর কাছে কারো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না। পরে যখন তাদের অন্তর থেকে ভয় বিদূরিত হবে, তখন তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, তোমাদের প্রতিপালক কি বললেন। তদুত্তরে তারা বলবে, যা সত্য তিনি তাই বলেছেন। তিনি সমুচ্চ মহান (৪৩ঃ ২৩)।
৬৯৭৪। ইয়াহয়া ইবনে বুকায়র (রাহঃ) ......... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আল্লাহ তাঁর কোন এক নবী থেকে (মধুময় স্বরে) যেভাবে কুরআন শ্রবন করেছেন, সেভাবে আর কিছুই তিনি শোনেননি। আবু হুরায়রা (রাযিঃ) এর এক সাথী বলেছে, يَتَغَنَّى بِالْقُرْآنِ এর অর্থ আবু হুরায়রা (রাযিঃ) উচ্চস্বরে কুরআন পড়া বোঝাতেন।
كتاب الرد على الجهمية و غيرهم و التوحيد
بَابُ قَوْلِ اللَّهِ تَعَالَى: {وَلاَ تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ عِنْدَهُ إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ حَتَّى إِذَا فُزِّعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الحَقَّ وَهُوَ العَلِيُّ الكَبِيرُ} [سبأ: 23]
7482 - حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، أَخْبَرَنِي أَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّهُ كَانَ يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا أَذِنَ اللَّهُ لِشَيْءٍ مَا أَذِنَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَغَنَّى بِالقُرْآنِ» ، وَقَالَ صَاحِبٌ لَهُ: يُرِيدُ: أَنْ يَجْهَرَ بِهِ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলোচ্য হাদীছটিতে উচ্চৈঃস্বরে সুন্দর সুরে কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

مَا أَذِنَ اللهُ لِشَيْء (আল্লাহ কোনওকিছু অতটা গুরুত্বের সঙ্গে শোনেন না)। أَذِنَ শব্দটির উৎপত্তি أَذَنٌ থেকে। এর অর্থ শ্রবণ করা। أِذْنٌ থেকে নয়, যার অর্থ অনুমতি দেওয়া।

مَا أَذِنَ لِنّبِيِّ حَسَنِ الصَّوْتِ يَتَغَنَّى بِالْقُرْآنِ يَجْهَرُ بِهِ (সুমধুর সুরের নবীকর্তৃক উচ্চৈঃস্বরে সুর দিয়ে কুরআন পড়াটা আল্লাহ যতটা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন)। অর্থাৎ কোনও নবীর প্রতি আল্লাহ তা'আলা তাঁর যে কালাম নাযিল করেছেন, নবী যখন তা সুন্দর সুরে পাঠ করেন, তখন আল্লাহ তা'আলা খুব গুরুত্বের সঙ্গে তা শুনে থাকেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাতে খুশি হন। কোনও কোনও বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, প্রত্যেক নবীরই সুর ছিল মধুর। হাদীছটি দ্বারা বোঝা গেল কুরআন মাজীদ মধুর সুরে পড়া উচিত। মধুর সুরে কুরআন পড়াটা আল্লাহ পছন্দ করেন।

এর দ্বারা আরও বোঝা যায় সুন্দর সুর আল্লাহ তা'আলার একটা নি'আমত। এ নি'আমতের সদ্ব্যবহার করা উচিত। অনেকে এ নি'আমতের অপব্যবহার করে। তারা গান গেয়ে সময় নষ্ট করে, পাপ কামাই করে এবং নিজের ও অন্যদের ঈমান-আমল বরবাদ করে। এটা নি'আমতের কঠিন অকৃতজ্ঞতা। তাদের উচিত ছিল গান না গেয়ে কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল হওয়া। কুরআন তিলাওয়াত দ্বারা এমনিতেই ছাওয়াব পাওয়া যায়। তদুপরি সুর মধুর হলে সে তিলাওয়াতে নিজেরও মন নরম হয়, অন্যদেরও অন্তরে রেখাপাত করে। ফলে তারাও মনোযোগ দিয়ে শোনে। তাতে তারা ছাওয়াব তো পায়ই, সেইসঙ্গে কুরআন তিলাওয়াতের আছরে তাদের জীবনেও পরিবর্তন আসে।

يَتَغَنَّى بِالْقُرْآنِ এর অর্থ সুর দিয়ে কুরআন পড়া। অর্থাৎ কুরআন পাঠের যে বিশেষ সুর, সেই সুরে, ভক্তি ও মুহাব্বতের সঙ্গে এবং আল্লাহর ভয়ে কান্নার ভঙ্গিতে কুরআন পড়া। অধিকাংশের মতে হাদীছে এটাই বোঝানো উদ্দেশ্য। তবে এর মানে এ নয় যে, সংগীত শাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী গানের বিভিন্ন সুরের সাথে সুর মিলিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করা হবে। এরূপ পড়াটা কুরআনের সঙ্গে সুস্পষ্ট বেআদবী। তাতে কুরআনপাঠের যে মূল উদ্দেশ্য, অন্তর নরম করা, দিল-মন আল্লাহর দিকে ঝোঁকা ও ঈমান বলীয়ান করা, তা মোটেই পূরণ হয় না। কাজেই এ জাতীয় সুরে কুরআন পাঠ করা হতে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। কোনও কোনও বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবেই এ জাতীয় সুরে কুরআন পড়তে নিষেধ করা হয়েছে।

বস্তুত সুন্দর সুরে পাঠ করলে কুরআন পাঠের সৌন্দর্য বেড়ে যায়। তা বাড়ানোটা কাম্যও বটে। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

زَيَّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ.

তোমরা নিজেদের সুর দ্বারা কুরআনকে অলংকৃত করো। (সুনানে দারিমী: ৩৫৪৩; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৮৭৩৭; মুসনাদে ইবনুল জা'দ : ২০৭৭; মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী: ৭৭৪)

অপর এক হাদীছে ইরশাদ-

حَسنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ، فَإِنَّ الصَّوْتَ الْحَسَنَ يَزِيدُ الْقُرْآنَ حُسْنًا.

তোমরা নিজেদের সুর দ্বারা কুরআনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করো। কেননা সুন্দর সুর কুরআনের সৌন্দর্য বাড়ায়। (সুনানে দারিমী: ৩৫৪৪: বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান ১৯৫৫)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কুরআন মাজীদ সুর দিয়ে পড়া উচিত।

খ. সুন্দর সুর আল্লাহ তা'আলার নি'আমত। এর অপব্যবহার করতে নেই।

গ. কুরআনের ইলম মহা নি'আমত। যার এ নি'আমত অর্জিত হয়েছে, তাকে আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী হতে হবে। ধনবানদের সামনে সে নিজেকে কখনওই ক্ষুদ্র ভাববে না। তার যে সম্পদ আছে তার তুলনায় তাদের সম্পদের কোনও মূল্য নেই।

ঘ. কুরআন একমাত্র হিদায়াতগ্রন্থ। এর বর্তমানে হিদায়াতের জন্য অন্য কোনও কিতাব বা বই-পুস্তকের দ্বারস্থ হওয়া ঈমান ও বুদ্ধিমত্তার পরিপন্থি।

ঙ. আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত গুণগ্রাহী। তিনি বান্দার কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য সৎকর্মের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)