আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৮১- খবরে ওয়াহিদের প্রামাণিকতা

হাদীস নং: ৬৭৬৫
আন্তর্জাতিক নং: ৭২৬১
- খবরে ওয়াহিদের প্রামাণিকতা
৩০৬৯. নবী (ﷺ) এর একা যুবাইর (রাযিঃ)-কে শত্রুপক্ষের সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করা।
৬৭৬৫। আলী ইবনে আব্দুল্লাহ (রাহঃ) ......... জাবির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, খন্দকের যুদ্ধে নবী (ﷺ) লোকদেরকে আহবান জানালেন। যুবাইর (রাযিঃ) তাঁর আহবানে সাড়া দিলেন। তিনি আবার আহবান জানালেন। এবারও যুবাইর (রাযিঃ) সাড়া দিলেন। তিনি পুনরায় আহবান জানালেন। এবারেও যুবাইর (রাযিঃ) সাড়া দিলেন। তিনবার এরূপ হওয়ার পর তিনি বললেনঃ প্রত্যেক নবীর একজন হাওয়ারী (সাহায্যকারী) থাকে, আর যুবাইর হল আমার হাওয়ারী।
সুফিয়ান (রাহঃ) বলেনঃ আমি এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনে মুনকাদির থেকে হিফয করেছি। একবার আইয়ুব তাকে বললেন, হে আবু বকর, আপনি এদের জাবির (রাযিঃ) এর হাদীস বর্ণনা করুন। কেননা, লোকদের নিকট জাবির (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস খুবই পছন্দনীয়। তখন তিনি সে মজলিসে বললেন, আমি জাবির (রাযিঃ) থেকে শুনেছি। এ বলে তিনি ধারাবাহিক অনেক হাদীস বর্ণনা করলেন, যেগুলো আমিও জাবির (রাযিঃ) থেকে শুনেছি। আমি সুফিয়ানকে বললাম যে, সাওরী বলেছেন যে, সেটা ছিল বনু কুরায়যার যুদ্ধের দিন। তিনি বললেন, তুমি যেমন আমার কাছে বসা, ঠিক তেমনি কাছে বসে আমি মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির থেকে হিফয করেছি যে, সেটি ছিল খন্দকের দিন। সুফিয়ান বলেন, এটা একই দিন। তারপর তিনি মুচকি হাসি দিলেন।
كتاب أخبار الآحاد
باب بَعْثِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم الزُّبَيْرَ طَلِيعَةً وَحْدَهُ
7261 - حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ المَدِينِيِّ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، حَدَّثَنَا ابْنُ المُنْكَدِرِ، قَالَ: سَمِعْتُ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: نَدَبَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النَّاسَ يَوْمَ الخَنْدَقِ فَانْتَدَبَ الزُّبَيْرُ، ثُمَّ نَدَبَهُمْ فَانْتَدَبَ الزُّبَيْرُ، ثُمَّ نَدَبَهُمْ فَانْتَدَبَ الزُّبَيْرُ، ثَلاَثًا، فَقَالَ: «لِكُلِّ نَبِيٍّ حَوَارِيٌّ وَحَوَارِيَّ الزُّبَيْرُ» قَالَ سُفْيَانُ: حَفِظْتُهُ مِنْ ابْنِ المُنْكَدِرِ، وَقَالَ لَهُ أَيُّوبُ: يَا أَبَا بَكْرٍ، حَدِّثْهُمْ عَنْ جَابِرٍ، فَإِنَّ القَوْمَ يُعْجِبُهُمْ أَنْ تُحَدِّثَهُمْ عَنْ جَابِرٍ، فَقَالَ: فِي ذَلِكَ المَجْلِسِ: سَمِعْتُ جَابِرًا - فَتَابَعَ بَيْنَ أَحَادِيثَ سَمِعْتُ جَابِرًا - قُلْتُ لِسُفْيَانَ: فَإِنَّ الثَّوْرِيَّ يَقُولُ: يَوْمَ قُرَيْظَةَ، فَقَالَ: كَذَا حَفِظْتُهُ مِنْهُ، كَمَا أَنَّكَ جَالِسٌ، يَوْمَ الخَنْدَقِ، قَالَ سُفْيَانُ هُوَ يَوْمٌ وَاحِدٌ، وَتَبَسَّمَ سُفْيَانُ "

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আহযাব যুদ্ধ- যাকে খন্দকের যুদ্ধও বলা হয়, প্রবল মত অনুযায়ী এটা পঞ্চম হিজরীর শেষ দিকে সংঘটিত হয়। কোন কোন দিক বিবেচনায় এ যুদ্ধের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কুরআন মজীদে অসাধারণ ভঙ্গিতে পূর্ণ দু'রুকূতে এ যুদ্ধের অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্যই এর নামকরণ করা হয়েছে সূরা আহযাব নামে। এর বিস্তারিত আলোচনা হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থসমূহে দেখে নেওয়া যেতে পারে। এখানে সাধারণ পাঠকদের কিছুটা ধারণা দেওয়ার জন্য সংক্ষিপ্তভাবে এর ঘটনা লিখা হচ্ছে।

একথা সবার জানা যে, মক্কার কুরাইশগণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর আনীত দ্বীনের ঘোর শত্রু ছিল। বদর ও উহুদের অভিজ্ঞতা এবং অবস্থার গতি দেখার পর তারা যেন এ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল যে, ভবিষ্যতে তারা নিজেদের পক্ষ থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোন সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না। মদীনার আশেপাশে যেসব ইয়াহুদীগোত্র বসবাস করত, এদের মধ্যে বনু নযীরকে তাদের দুষ্টামি ও বিভিন্ন ফিতনা ও বিপর্যয় সৃষ্টি করার কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দেশান্তর করে দিয়েছিলেন এবং তারা খায়বারে এসে পুনর্বাসিত হয়ে গিয়েছিল। যড়যন্ত্র ও বিপর্যয় সৃষ্টি করা যেন ইয়াহুদীদের স্বভাব হয়ে গিয়েছিল। তারা এ পরিকল্পনা গ্রহণ করল যে, আরবের সকল বড় বড় গোত্রকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা হবে যে, তারা যেন নিজেদের সর্বশক্তি নিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র মদীনা আক্রমণ করে বসে এবং তাদেরকে নিস্ত-নাবুদ করে দেয়। এ উদ্দেশ্যে বনু নযীরের একটি প্রতিনিধি দল প্রথমে মক্কায় গেল এবং কুরাইশ সরদারদের সামনে- যারা ইসলাম ও মুসলমানদের দুশমন ছিল- তাদের এ পরিকল্পনা পেশ করল। সাথে সাথে এ কথাও জানিয়ে দিল যে, আমরা এর পূর্ণ চেষ্টা চালিয়ে যাব যে, অন্যান্য গোত্রও যেন এ যুদ্ধে নিজেদের পূর্ণ শক্তি নিয়ে অংশ গ্রহণ করে। আর মদীনার আশেপাশে যেসব ইয়াহুদী বসবাস করে, যেমন বনু কুরায়যা, তারাও আপনাদের সাথে সহযোগিতা করবে। এর ফলে মুসলমানগণ আপনাদের মুকাবিলা করতে পারবে না; বরং তাদের নাম নিশানা পর্যন্ত মুছে যাবে।

মক্কার কুরাইশ নেতাদেরকে রাজী করার পর এ প্রতিনিধি দল গাতফান ও বনু আসাদ ইত্যাদি গোত্র সমূহের নিকট গিয়ে তাদেরকেও এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করল এবং এ কথাও বলল যে, এ যুদ্ধের ফলে মদীনা ও এর আশপাশের পুরা এলাকার উপর- যা অত্যন্ত সবুজ-শ্যামল ও উর্বর- আপনাদের নিয়ন্ত্রণে এসে যাবে। ফলে এসব গোত্রও যুদ্ধের প্রতি উৎসাহী হয়ে গেল। এভাবে মক্কার কুরাইশ, গাতফান, বনু আসাদ ইত্যাদি আরব গোত্রের দশ হাজার মতান্তরে বার হাজার সৈন্য মদীনা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইসলামের শত্রুদের এ ঘৃণ্য পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে নিজের অভ্যাস অনুযায়ী বিশিষ্ট সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। অবস্থা এই ছিল যে, মদীনায় ঐসব মুসলানের সংখ্যা- যাদের যুদ্ধে অংশ গ্রহণের আশা করা যেতে পারত- তিন হাজারের বেশী ছিল না। তারাই তখনকার সময়ে ইসলামী ফৌজ ছিল। তাদের নিকট জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও যুদ্ধাস্ত্র শত্রু সৈন্যদের তুলনায় দশ ভাগের এক ভাগও ছিল না। এ জন্য পরামর্শক্রমেই যুদ্ধের এ কৌশল অবলম্বন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হল যে, বাইরে গিয়ে খোলা ময়দানে যুদ্ধ করা না হোক; বরং মদীনার ভিতরে থেকেই আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হোক।

হযরত সালমান ফারসী রাযি. যিনি ছিলেন ইরানী বংশোদ্ভূত, তিনি বললেন, এসব ক্ষেত্রে আমাদের দেশ ইরানে প্রচুর সংখ্যক ও শক্তিশালী সেনাদলের মোকাবিলায় এবং তাদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য একটি কৌশল ও পদ্ধতি এই অবলম্বন করা হয় যে, এমন পরিখা খনন করে নেওয়া হয়, যা মানুষ নিজে লাফ দিয়ে অতিক্রম করতে পারে না এবং কোন অশ্বারোহীও পার হয়ে যেতে পারে না। মদীনা মুনাওয়ারার তিন দিক থেকে প্রাকৃতিকভাবে পাহাড় ইত্যাদি দ্বারা এমন পরিবেষ্টিত ছিল যে, এসব দিক থেকে কোন বড় বাহিনীর আক্রমণের কোন সম্ভাবনা ছিল না। একটি দিক (উত্তর পূর্ব দিক) উন্মুক্ত ছিল এবং এ দিক থেকে শত্রুদের হামলার আশঙ্কা ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবায়ে কেরাম হযরত সালমান ফারসী রাযি.-এর পরামর্শ গ্রহণ করাই সমীচীন মনে করলেন এবং ঐ দিকে পরিখা খননের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হল। এ পরিখার গভীরতা ও প্রস্থ প্রায় দশ হাত ছিল। প্রতি দশজন মুসলমানের একটি জামাআত বানিয়ে তাদের উপর পরিখা খননের কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়। সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত পরিশ্রম ও কষ্ট স্বীকার করে প্রচণ্ড শীতের মৌসুমে রাত দিন এ খনন কাজ চালিয়ে যান। এ পরিখার দৈর্ঘ্য কোন কোন প্রত্মতত্ত্ববিদের মতে আড়াই হাজার গজ (অর্থাৎ, প্রায় দেড় মাইল) ছিল।

শত্রু সৈন্যরা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে আসল এবং খন্দকের বিপরীত ময়দানে অবস্থান গ্রহণ করল। তাদের সাথে তাবু ইত্যাদিও ছিল এবং পানাহার সামগ্রীও ছিল প্রচুর। প্রায় এক মাস পর্যন্ত তারা এখানে অবস্থান গ্রহণ করে রইল। কিন্তু খন্দক অতিক্রম করে মদীনায় আক্রমণ করা তাদের জন্য সম্ভব ছিল না। কেবল উভয়পক্ষে কিছুটা তীরান্দাযী হল।

সীরাতের কিতাবসমূহের বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, এর ফলে সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে সাতজন শহীদ হন এবং মুশরিকদের মধ্য থেকে চার জন জাহান্নামে পৌঁছে। কুরআন মজীদের সূরা আহযাবে এ যুদ্ধে মুসলমানদের কঠিন পরীক্ষা ও আত্মত্যাগের কথা যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, এভাবে অন্য কোন যুদ্ধের ঘটনা উল্লেখ করা হয়নি। সামনে কুরআন মজীদেই বলা হয়েছে যে, যখন মুসলমানদের কষ্ট, মুসীবত ও আত্মত্যাগ চরম পর্যায়ে পৌছল, তখন আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে গায়েবী সাহায্য আসল। এ সাহায্যের রূপ ছিল প্রচণ্ড বাতাস, যা শত্রু সৈন্যদের সকল তাবু উপড়িয়ে ফেলে দিল, চুলার উপর যেসব হাড়ি-পাতিল ছিল এগুলো উল্টিয়ে ফেলল এবং তাদের কিছু উট-ঘোড়া রশি ছিড়ে বিভিন্ন দিকে পালিয়ে গেল। (আমার ধারণা যে, শত্রুসৈন্যদের অনেকেই এটাকে আল্লাহর গযব মনে করেন।) শত্রুসেনাদের সেনাপতি আবু সুফিয়ানও ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল এবং এভাবে সম্পূর্ণ বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে ফিরে গেল। وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ

এ যুদ্ধে এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শত্রুসৈন্যদের অবস্থা জানার প্রয়োজন অনুভব করলেন। তাই তিনি বললে من يأتيني بخبر القوم (অর্থাৎ, কে আছে, যে আমাকে শত্রু সৈন্যদের সংবাদ এনে দিবে?) এ কথা স্পষ্ট যে, এতে জীবনের আশঙ্কাও ছিল। হযরত যুবায়ের রাযি. অগ্রসর হয়ে বললেন, এ কাজ আমি আঞ্জাম দিব। এ কথার উপর হুযুর (ﷺ) খুশী হয়ে বলেছিলেন, প্রত্যেক নবীর কিছু হাওয়ারী থাকে, আর আমার হাওয়ারী হচ্ছে যুবায়ের। উর্দু ও বাংলা ভাষায় এমন কোন শব্দ নেই যা হাওয়ারীর পূর্ণ মর্ম প্রকাশ করতে পারে। (হ্যাঁ, জীবন উৎসর্গকারী, কাজের সাথী ও সাহায্যকারী শব্দ সমূহ দ্বারা এর মর্ম কিছুটা আদায় হতে পারে।) নিঃসন্দেহে এটা হযরত যুবায়ের রাযি.-এর জন্য এক বিশেষ মর্যাদা ও ফযীলত।

হযরত যুবায়ের রাযি.-এর ব্যাপারে এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, আশারা মুবাশশারার মধ্যে হযরত আলী রাযি.-এর ন্যায় তিনিও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একান্ত নিকটাত্মীয় ছিলেন। হযরত আলী রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর চাচা আবু তালেবের পুত্র হওয়ার কারণে তাঁর চাচাতো ভাই ছিলেন। আর হযরত যুবায়ের রাযি. তাঁর ফুফী হযরত সাফিয়্যা রাযি.-এর পুত্র হওয়ার কারণে নিজের ফুফাতো ভাই ছিলেন। رضي اللَّهُ عَنْهُ وَأَرْضَاهُ
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)