আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৭৮- কিয়ামত ও ফিতনাসমূহের বিবরণ

হাদীস নং: ৬৬১৬
আন্তর্জাতিক নং: ৭০৯৭
২৯৯৩. সমুদ্রের তরঙ্গের ন্যায় ফিতনা তরঙ্গায়িত হবে।
৬৬১৬। সাঈদ ইবনে আবু মারিয়াম (রাহঃ) ......... আবু মুসা আশআরী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী (ﷺ) প্রয়োজনবশত মদীনার (দেওয়াল ঘেরা) বাগানসমূহের কোন একটি বাগানের উদ্দেশ্যে বের হলেন, আমি তার পিছনে গেলাম। তিনি যখন বাগানে প্রবেশ করলেন, আমি এর দরজায় বসে রইলাম এবং মনে মনে বললাম, অদ্য আমি নবী (ﷺ) এর প্রহরীর কাজ আঞ্জাম দিব। অবশ্য তিনি আমাকে এর নির্দেশ দেননি। নবী (ﷺ) ভিতরে গেলেন এবং স্বীয় প্রয়োজন সেরে নিলেন। এরপর একটি কূপের পোস্তার (পাড়) উপর বসে পড়লেন এবং হাঁটুর নীচের অংশের কাপড় তুলে নিয়ে উভয় পা কূপের মধ্যে ঝুলিয়ে দিলেন।
এমন সময় আবু বকর (রাযিঃ) এসে তার নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। আমি বললাম, আপনি অপেক্ষা করুন, যতক্ষণ না আমি আপনার জন্য অনুমতি নিয়ে আসছি। তিনি অপেক্ষা করলেন। আমি নবী (ﷺ) এর নিকট আসলাম এবং বললাম, হে আল্লাহর নবী! আবু বকর (রাযিঃ) আপনার কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইছেন। তিনি বললেনঃ তাকে আসার অনুমতি দাও এবং তাকে জান্নাতের শুভ সংবাদ দাও। আবু বকর (রাযিঃ) প্রবেশ করলেন এবং নবী (ﷺ) এর ডান পার্শ্বে গিয়ে বসলেন। এরপর তিনিও হাঁটুর নীচের অংশ অনাবৃত করে উভয় পা কূপের মধ্যে ঝুলিয়ে দিলেন।
এরপর উমর (রাযিঃ) আসলেন। আমি বললাম, আপনি স্বস্থানে অপেক্ষা করুন। আমি আপনার জন্য অনুমতি নিয়ে আসি। (অনুমতি প্রার্থনা করলে) নবী (ﷺ) বললেনঃ তাঁকে আসার অনুমতি দাও এবং জান্নাতের সুসংবাদ দাও। তিনি এসে নবী (ﷺ) এর বাম দিকে বসলেন এবং তিনি হাঁটুর নীচের অংশ অনাবৃত করে উভয় পা কূপের মধ্যে ঝুলিয়ে দিলেন। এতে কূপের পোস্তা পরিপূর্ণ হয়ে গেল এবং সেখানে বসার আর কোন স্থান অবশিষ্ট রইল না।
এরপর উসমান (রাযিঃ) আসলেন। আমি বললাম, আপনি স্বস্থানে অপেক্ষা করুন, যতক্ষণ আমি আপনার জন্য অনুমতি নিয়ে না আসি। নবী (ﷺ) বলেনঃ তাঁকে আসার অনুমতি দাও এবং তাকে বিপদাক্রান্ত হওয়াসহ জান্নাতের সুসংবাদ দাও। তিনি প্রবেশ করলেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে বসার কোন স্থান পেলেন না। ফলতঃ তিনি বিপরীত দিকে এসে তাদের মুখোমুখী হয়ে কুয়ার পাড়ে বসে গেলেন এবং হাঁটুদ্বয়ের নীচের অংশ অনাবৃত করে উভয় পা কুয়ার অভ্যন্তরে ঝুলিয়ে দিলেন। আমি তখন আমার অপর এক ভাইয়ের (আগমন) কামনা করছিলাম এবং আল্লাহর নিকট দু'আ করছিলাম, যেন সে (এ মুহূর্তে) আগমন করে।
ইবনে মুসাইয়্যাব বলেন, আমি এ ঘটনার মর্মার্থ এভাবে গ্রহণ করেছি যে, তাহল তাদের তিনজনের কবরের নমুনা যা এখানে একসঙ্গে হয়েছে। আর উসমান (রাযিঃ)-র ভিন্ন স্থানে।
بَابُ الفِتْنَةِ الَّتِي تَمُوجُ كَمَوْجِ البَحْرِ
7097 - حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ أَبِي مَرْيَمَ، أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ، عَنْ [ص:55] شَرِيكِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ المُسَيِّبِ، عَنْ أَبِي مُوسَى الأَشْعَرِيِّ، قَالَ: خَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا إِلَى حَائِطٍ مِنْ حَوَائِطِ المَدِينَةِ لِحَاجَتِهِ، وَخَرَجْتُ فِي إِثْرِهِ، فَلَمَّا دَخَلَ الحَائِطَ جَلَسْتُ عَلَى بَابِهِ، وَقُلْتُ: لَأَكُونَنَّ اليَوْمَ بَوَّابَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلَمْ يَأْمُرْنِي، فَذَهَبَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَضَى حَاجَتَهُ، وَجَلَسَ عَلَى قُفِّ البِئْرِ، فَكَشَفَ عَنْ سَاقَيْهِ وَدَلَّاهُمَا فِي البِئْرِ، فَجَاءَ أَبُو بَكْرٍ يَسْتَأْذِنُ عَلَيْهِ لِيَدْخُلَ، فَقُلْتُ: كَمَا أَنْتَ حَتَّى أَسْتَأْذِنَ لَكَ، فَوَقَفَ فَجِئْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ، أَبُو بَكْرٍ يَسْتَأْذِنُ عَلَيْكَ، قَالَ: «ائْذَنْ لَهُ وَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ» فَدَخَلَ، فَجَاءَ عَنْ يَمِينِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَكَشَفَ عَنْ سَاقَيْهِ وَدَلَّاهُمَا فِي البِئْرِ، فَجَاءَ عُمَرُ فَقُلْتُ: كَمَا أَنْتَ حَتَّى أَسْتَأْذِنَ لَكَ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ائْذَنْ لَهُ وَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ» فَجَاءَ عَنْ يَسَارِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَكَشَفَ عَنْ سَاقَيْهِ فَدَلَّاهُمَا فِي البِئْرِ، فَامْتَلَأَ القُفُّ، فَلَمْ يَكُنْ فِيهِ مَجْلِسٌ، ثُمَّ جَاءَ عُثْمَانُ فَقُلْتُ: كَمَا أَنْتَ حَتَّى أَسْتَأْذِنَ لَكَ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ائْذَنْ لَهُ وَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ، مَعَهَا بَلاَءٌ يُصِيبُهُ» فَدَخَلَ فَلَمْ يَجِدْ مَعَهُمْ مَجْلِسًا، فَتَحَوَّلَ حَتَّى جَاءَ مُقَابِلَهُمْ عَلَى شَفَةِ البِئْرِ، فَكَشَفَ عَنْ سَاقَيْهِ ثُمَّ دَلَّاهُمَا فِي البِئْرِ، فَجَعَلْتُ أَتَمَنَّى أَخًا لِي، وَأَدْعُو اللَّهَ أَنْ يَأْتِيَ قَالَ ابْنُ المُسَيِّبِ: «فَتَأَوَّلْتُ ذَلِكَ قُبُورَهُمْ، اجْتَمَعَتْ هَا هُنَا، وَانْفَرَدَ عُثْمَانُ»

হাদীসের ব্যাখ্যা:

কোন কোন বর্ণনায় সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণিত হলেও এটি মূলত একটি দীর্ঘ হাদীছ। এতে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাকী বি’রে আরীসে গিয়েছিলেন। বি’রে আরীস অর্থ আরীসের কুয়া। আরীস ছিল এক ইহুদির নাম। সে এ কুয়াটির মালিক ছিল। কুয়াটি ছিল কুবা মসজিদের উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রাচীরঘেরা একটি বাগানের ভেতর। কুয়াটির নামে বাগানটিরও নাম হয়ে যায় বি'রে আরীস। বর্তমানে কুয়াটির কোনও চিহ্ন নেই। তার উপর দিয়ে প্রশস্ত রাস্তা চলে গেছে।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বাগানে যাওয়ার পর হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রাযি. তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে চলে যান এবং বাগানটির দরজায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য প্রহরীর কাজ করতে থাকেন। তারপর সেখানে যথাক্রমে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি., হযরত উমর ফারুক রাযি. ও হযরত উছমান গনী রাযি.-ও উপস্থিত হন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের তিনজনকেই হযরত আবূ মূসা রাযি.-এর মাধ্যমে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। সেইসঙ্গে হযরত উছমান রাযি. সম্পর্কে একটি ভবিষ্যদ্বাণীও করেন। তাতে জানান যে, তাঁকে একটি কঠিন মসিবতের সম্মুখীন হতে হবে।

হাদীছটিতে আছে, আরীস কুয়ার তীরে তাঁরা সকলেই পা ঝুলিয়ে বসেছিলেন। তার একদিকে বসেছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ডান পাশে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. ও বাম পাশে হযরত উমর রাযি.। অপরদিকে তাঁদের মুখোমুখি হয়ে হযরত উছমান রাযি. একা বসেছিলেন।

বিখ্যাত তাবি'ঈ হযরত সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রহ. এর ব্যাখ্যা করেছেন যে, এটা ছিল তাঁদের কবর কীভাবে হবে সেদিকে ইঙ্গিত। তাঁদের কবর এভাবেই হয়েছে। মসজিদে নববীর পাশে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে তাঁর পাশাপাশি প্রথম দুই খলীফার কবর হয়েছে। হযরত উছমান গনী রাযি.-এর কবর তাঁদের থেকে আলাদা, একটু দূরে আল-বাকী' কবরস্থানে।

হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. ও হযরত উমর রাযি. যে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে বসেছিলেন, তাতে দেখা যাচ্ছে হযরত আবূ বকর রাযি. বসেছেন ডানদিকে এবং হযরত উমর রাযি. বামদিকে। এর দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত মেলে। অর্থাৎ দু'জনই অনেক ঘনিষ্ঠ এবং হযরত আবু বকর রাযি. সে ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন। কেননা তিনি ডানদিকে আর হযরত উমর রাযি, বামদিকে। বামদিকের উপর যেমন ডানদিকে শ্রেষ্ঠত্ব, হযরত উমর রাযি.-এর উপর হযরত আবু বকর রাযি.-এর শ্রেষ্ঠত্ব সেরকমই। তারপরও তাঁরা দু'জন তাঁর সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ। তাঁর দুই হাত স্বরূপ। একজন ডানহাত, একজন বামহাত। বিভিন্ন হাদীছে দেখা যায়, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সঙ্গে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. ও উমর ফারুক রাযি.-এর নামও একত্রে উল্লেখ করতেন। বলতেন, আমি, আবূ বকর ও উমর।

এ হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উছমান রাযি, সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, তিনি কোনও কঠিন বিপদে পড়বেন। কী সে কঠিন বিপদ? অন্য হাদীছে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. থেকে বর্ণিত-
ذَكَرَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فِتْنَة ، فَقَالَ : يُقْتَلُ هذَا فِيْهَا مَظْلُومًا لِعُثْمَانَ
‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ফিতনার কথা বর্ণনা করেন। তাতে তিনি বলেন, সে ফিতনায় ওই ব্যক্তি মজলুমরূপে নিহত হবে। তিনি এটা বলেছিলেন উছমানকে লক্ষ্য করে।’ (জামে' তিরমিযী: ৩৭০৮)

হযরত উছমান রাযি.-ও বুঝতে পেরেছিলেন তা কোনও কঠিন বিপদই হবে। তাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে কোনও কঠিন বিপদে পড়ার কথা জানালেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, আল্লাহ তা'আলাই সাহায্যকারী। অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি বলেছিলেন, হে আল্লাহ! আমাকে ধৈর্যধারণের তাওফীক দিয়ো।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়। হযরত উছমান রাযি.-এর খেলাফতকালের শেষদিকে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধে। সে বিদ্রোহ ছিল আব্দুল্লাহ ইবন সাবা নামক এক দুর্বৃত্তকারীর ষড়যন্ত্রের ফল। লোকটি নানা মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে তাঁর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলে। তার প্ররোচনায় মানুষ তাঁর অপসারণের দাবি তোলে। অথচ তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ ও সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত খলীফা। তিনি ন্যায়ের উপর ছিলেন। তিনি যে ন্যায়ের উপর থাকবেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে ভবিষ্যদ্বাণীও করে গিয়েছিলেন।

হযরত মুররা ইবন কা'ব রাযি. হযরত উছমান রাযি.-এর শাহাদাতের পর এরকম এক হাদীছ বর্ণনা করেন। তাতে আছে-
وَذَكَرَ الْفِتَنَ فَقَرَّبَهَا، فَمَرَّ رَجُلٌ مُقَنَّعٌ فِي ثَوْب فَقَالَ : هَذَا يَوْمَئِذٍ عَلَى الْهُدَى، فَقُمْتُ إِلَيْهِ فَإِذَا هُوَ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ قَالَ : فَأَقْبَلْتُ عَلَيْهِ بِوَجْهِهِ، فَقُلْتُ : هَذَا؟ قَالَ : نَعَمْ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন ফিতনার কথা উল্লেখ করেন এবং সেগুলো নিকটবর্তী বলে জানান। এ সময় একটি কাপড় দিয়ে মাথা ঢাকা অবস্থায় এক ব্যক্তি কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এই ব্যক্তি সেদিন হিদায়াতের উপর থাকবে। আমি উঠে তার কাছে গেলাম। দেখি তিনি উছমান ইবন আফফান। আমি তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললাম, ইনি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাঁ। (জামে' তিরমিযী: ৩৭০৪)

বস্তুত চক্রান্তকারীরাও জানত তিনি হিদায়াতের উপর আছেন। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যই ছিল ফিতনা সৃষ্টি করা। সে লক্ষ্যে তারা তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অপবাদ ও মিথ্যা অভিযোগ দাঁড় করাতে থাকে। তাতে তারা সফলও হয়ে যায়। ক্রমে মিশর, বসরা, কূফা প্রভৃতি অঞ্চলে বিদ্রোহীরা সংঘবদ্ধ হতে থাকে। পরিশেষে হিজরী ৩৫ সনে ৪ হাজার বিদ্রোহী মদীনা মুনাউওয়ারায় এসে সমবেত হয়। তারা হযরত উছমান রাযি.-কে তাঁর গৃহে অবরুদ্ধ করে ফেলে। দীর্ঘ ২ মাস ২০ দিন তিনি অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকেন। এ সময়ে সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই তাঁর কাছে বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ করার অনুমতি চান। কিন্তু মদীনা মুনাউওয়ারায় রক্তপাত হবে, এটা তিনি কিছুতেই মানতে পারছিলেন না। পরিশেষে যুলহিজ্জা মাসের ১২ তারিখ জুমু'আর দিন তারা তাঁর উপর হামলা চালায়। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় তারা তাঁকে শহীদ করে দেয়। এভাবে তিনি নিজ রক্তের বিনিময়ে এ পবিত্র নগরকে ব্যাপক রক্তপাত থেকে হেফাজত করেন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
এ হাদীছ দ্বারা আমরা যা-কিছু জানতে পারি তার কয়েকটি নিম্নরূপ-

ক. সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ।

খ. হযরত উমর রাযি. এ উম্মতের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি।

গ. হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রাযি. যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি কতটা নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, তাও এ হাদীছ দ্বারা জানা যায়।

ঘ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেককেই তাদের জীবিত অবস্থায় জান্নাতের সুসংবাদ শুনিয়েছেন। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি., হযরত উমর ফারুক রাযি. ও হযরত উছমান গনী রাযি. তাদের অন্যতম।

ঙ. কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে তার অনুমতি নেওয়া জরুরি।

চ. কেউ কোনও কল্যাণ ও বরকতপূর্ণ বিষয় অর্জন করতে পারলে নিজ ভাইয়ের জন্যও আকাঙ্ক্ষা থাকা চাই যাতে তারও তা অর্জিত হয়।

ছ. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন তার প্রত্যেকটি সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এটাও তাঁর নবুওয়াতের সত্যতার একটি দলীল।

জ. হযরত উছমান রাযি. কতটা শান্তিপ্রিয় ও সহনশীল ব্যক্তি ছিলেন, এ হাদীছ দ্বারা আমরা তাও জানতে পারি।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)